রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাভাবনা এবং আজকের দিনের সংকট

আমরা যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিনি এবং জানি তিনি আমাদের বাঙালির অস্তিত্ব থেকে আলাদা কেউ নন। তিনি আমাদের নিজের মানুষ। আমাদের ভিতরের আমি যখন কথা বলি তখন আমরা তাঁর কণ্ঠের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। এখানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমস্ত কৃতিত্ব যে তিনি আমাদেরই লোক হয়ে গেছেন। এক কথায় বলা যায়, বাঙালির মানস-অস্তিত্ব নির্মাণে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। আমরা যখন যা কিছুই ভাবি তা যেন রবীন্দ্রনাথের মত করেই ভাবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই আমাদের চিন্তা-চেতনার সাংস্কৃতিক পরিধি বিস্তারের প্রতিটি স্তরে একটু একটু করে এগিয়ে দিয়েছেন। বাঙালির মনের বিকাশকে এই এগিয়ে দেবার যে ভূমিকা সেটাই তাঁর শিক্ষাচিন্তার স্বরূপ রূপে বিবেচিত হতে পারে। আলাদা করে তাঁর শিক্ষা ভাবনার স্বরূপ খোঁজার কিছু নেই। এক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে বিস্তৃত মহাসমুদ্ররূপ রচনাসমগ্র রেখে গেছেন তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপই হল বাঙালির মনন ও চৈতন্যের বিকাশের জন্য শিক্ষাচিন্তার স্মারক এবং বাহক।

শিক্ষা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নানা সময়ে নানা ভাবনার প্রয়োগ দেখতে পাই। শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা নিয়ে তিনি সময়ে অসময়ে অনেক কথা বলেছেন। তিনি প্রাচীন ভারতের প্রকৃতির সহযোগে শিক্ষাটার প্রতিই অনুরক্ত ছিলেন। তিনি মনে করতেন অতীতের সেই শিক্ষাব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন প্রয়োজন।

তিনি বলেছেন: মানুষ বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবসংসার এই দুইয়ের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে, অতএব দুইকে একত্র সমাবেশ করে বালকদিগের শিক্ষায়তন গড়লে তবেই শিক্ষার পূর্ণতা ও মানবজীবনের সমগ্রতা হয়। বিশ্বপ্রকৃতির যে আহ্বান তার থেকে বিচ্ছিন্ন করে পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে জোর করে শিক্ষার আয়োজন করলে শুধু শিক্ষাবস্তুকেই জমানো হয়। যে মন তাকে গ্রহণ করবে তার অবস্থা হয় ভারবাহি জন্তুর মতো। শিক্ষার উদ্দেশ্য তাতে ব্যর্থ হয়। আরো বলেছেন, মানবজীবনের সমগ্র আদর্শকে জ্ঞানে ও কর্মে পূর্ণ করে উপলব্ধি করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য।

তিনি নিজে শিক্ষকতাও করেছেন। শিক্ষাকে তিনি কখনো অনায়াস অর্জনের বিষয় করে তোলেননি অর্থাৎ ‘জলো’ করে তোলার পক্ষপাতি ছিলেন না। ছাত্ররা যাতে শক্ত বিষয় ভাঙতে পারে বড় বড় কথা বুঝতে পারে সেই ব্যবস্থা তিনি করতেন। তাই তাঁর ছাত্ররা দ্রুত চিন্তা করার মত ক্ষমতা অর্জনে সক্ষম হয়েছিল।  ছাত্র জীবনে শিথিলতাকে তিনি পছন্দ করতেন না। এমন কি ছাত্রদের কঠিন বই পড়াতে তিনি দ্বিধা করতেন না। একবার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রকে তিনি Ruskin এর বই পড়িয়েছেন।

শান্তিনিকেতনকে তিনি নিজের শিক্ষাচিন্তার আদর্শে গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে তিনি ঠিক মেনে নিতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে নিজস্ব শিক্ষাদর্শন ও ভিন্ন চিন্তার মাধ্যমে আশ্রম পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের কথা ভেবেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম প্রসারের লক্ষ্যে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী গড়ে তুলেছিলেন। তিনি যখন দেখলেন শান্তিনিকেতনে প্রবাসিরাও বিদ্যার্জনের জন্য এসেছে তখন তিনি ভেবে খুশি হলেন যে, শান্তিনিকেতন বাঙালিত্বের ক্ষুদ্র গণ্ডী ভেঙে বাইরের ছাত্রদের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। একে তিনি ভারতীয়দের শিক্ষাকেন্দ্র করে তুলতে চেয়েছেন যেখানে শিশুকাল থেকে ছাত্ররা একসাথে থেকে একটি জাতীয় আদর্শ চর্চা করতে পারবে, যেখানে শিক্ষাচর্চা হবে সমস্ত রকমের সাম্প্রদায়িকতামুক্ত।

একবার উনিশশো ষোল সালে আমেরিকার শিকাগো থেকে তিনি রথীন্দ্রনাথকে একটি চিঠিতে বলেন, “শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়কে বিশ্বের সঙ্গে ভারতের যোগের সূত্র করে তুলতে হবে- ঐখানে সর্বজাতিক মনুষ্যত্ব চর্চার কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে- স্বজাতিক সংকীর্ণতার যুগ শেষ হয়ে আসছে- ভবিষ্যতের জন্য যে বিশ্বজাতিক মহামিলনযজ্ঞের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে তার প্রথম আয়োজন ঐ বোলপুরের প্রান্তরেই  হবে”।

এখানে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার একটি দিক সুস্পষ্ট হয় যে তিনি একদিকে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত একটি একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন যেখানে ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চা হবে আবার অন্যদিকে  তিনি ভারতের শিক্ষার সাথে একটি আধুনিক বৈশ্বিক যোগ স্থাপনের বিষয়টিও ভেবেছিলেন।

শান্তিনিকেতনকে কখনও তিনি তাঁর রাজনৈতিক ভাবনা বা কর্মকাণ্ডের সাথে জড়াননি। তিনি শান্তিনিকেতনকে এইসব থেকে রক্ষা করেছেন। এই বিষয়ে যা জানা যায় তা হল: “কি স্বদেশী যুগের জাতীয় শিক্ষা পরিষদ আন্দোলনপর্বে  কি হোমরুল লীগ যূগের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনে; এমনকি, গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের তীব্র উত্তেজনার মধ্যে- তিনি শান্তিনিকেতনকে বাহিরের উত্তাপ হইতে রক্ষা করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন”। এখান থেকে সুস্পষ্ট হয় যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনীতিকে তিনি জোরালো ভাবেই পরিহার করেছেন।

শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা ভাষা। এই ব্যাপারে তার মতামত ছিল চূড়ান্ত। একবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সংস্কারের জন্য একটি কমিশন গঠন হয়েছিল। এই উপলক্ষে তার সভাপতি স্যার মাইকেল স্যাডলার কয়েকজনকে নিয়ে শান্তিনিকেতন পরিদর্শনে আসেন। সে সময় স্যাডলার ইংল্যান্ডের লীডস বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর এবং শিক্ষাশাস্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সাথে শিক্ষাচিন্তা নিয়ে তাঁর যে আলোচনা হয় সেটা কমিশনের রিপোর্টে প্রকাশিত হয়। এত আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে কথা বলে গেছেন তা সারা বিশ্বেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার জন্য উপযুক্ত আদর্শ হয়ে উঠতে পারতো। তিনি সেদিন বলেছিলেন, “ইংরেজি ভাল করিয়া শিখিতেই হইবে- তবে বিদ্যালয় ও কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃভাষার মাধ্যমে সকল জ্ঞান বিজ্ঞান শিখাইতে হইবে”।

কমিশনের রিপোর্ট:

It is Sir Rabindranath’s conviction that , while English should be skillfully and thoroughly taught as a second language , the  chief medium of instruction in school ( and even colleges up to the stage of the University degree)  should be the mother tongue …. He holds that that the essential things in the culture of the West should be conveyed to the whole Bengali people by means of a widely diffused education ,  but that this can only be done through a wider use of the vernacular in the schools. Education should aim at  developing the characteristic gifts of the people , especially its  love of recited poetry and of the spoken tale , its talent for music ,  it’s (too neglected)  aptitude for expression through the work of the hand ,  its power of imagination ,  its quickness of emotional response .At the same time education should endeavour to correct the defects of the national temperament ,to supply what is wanting in it to fortify what is weak , and not least to  give training in the habit of steady co- operation with others in the atert use of opportunities for social betterment , in the practice of methods of organisation for the collective good.

For these reasons, in his own school at Bolpur he gives the center place to studies  which can best be persuade in the mother tongue;  make full educational use of music and of dramatic representation of imagination in narrative and manual work  ; of social service among less fortunate neighbours of responsible self-government in the life of the school community itself . For the achievement of these aims he feels that, if the right is found for it , there is strong need for British influence in Indian education . And he speaks with gratitude of the help which he has had from  English teachers in his own school, but he would refuse such help at all cost , as being educationally harmful , where lack of sympathy prevented a true human relation between the English teacher and his Bengali pupils .( Calcutta University Commision 1917-19, Report, Vol 1 p.226- 28

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুরোটা জীবনই শিক্ষাগ্রহণের জন্য উপযুক্ত। তাঁর কোনো কর্ম, কোনো চিন্তাই শিক্ষার অভাবে অনালোকিত নয়। তিনি যা কিছুই লিখেছেন তার সমস্ত কিছুই মানবতার কল্যাণে। এক একটি ধর্ম নারীকে শুধুমাত্র ভোগ্যবস্তুরূপে চিহ্ণিত করে নারীর উপরে নির্মমভাবে ভোগের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নারীর শরীরের উপর চড়াও হয়েছে কিন্তু এক রবীন্দ্রনাথ যখন হৈমন্তী গল্পে নারীকে নিয়ে লিখেছেন ‘সে আমার সম্পত্তি নয় সে আমার সম্পদ’ তখনই বদলে গেলো পূর্বের সমস্ত গতানুগতিক ধারনা। নারী হয়ে উঠলো সাধনা দ্বারা অর্জিত ভালবাসার ধন। সমাপ্তি নামক ছোটগল্পে মৃন্ময়ীকে পাওয়ার জন্য অপূর্ব অপেক্ষা করেছে। যতদিনে মৃন্ময়ী কৈশোর কাটিয়ে নারী হয়ে ওঠেনি ততদিন অপু অপেক্ষা করেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না মৃন্ময়ী ভালবেসে অপুকে গ্রহণ করেছে ততদিন পর্যন্ত অপু অপেক্ষা করেছে।

শান্তিনিকেতনকে তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছেন তাঁর নিজস্ব শিক্ষাভাবনার রূপকল্প রূপে। এই শান্তিনিকেতন নিয়ে তিনি লিখেছিলেন শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম। এখানে তিনি তাঁর শিক্ষাচিন্তার কিছুটা উল্লেখ করেছেন। তাঁর এ শিরোনামের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় এখানের ছাত্রদের ব্রত এবং উদ্দেশ্য। মানুষের কল্যাণাকাঙ্ক্ষাই এখানের ছাত্রদের উদ্দেশ্য।

ছাত্রদের উদ্দেশ্যে তিনি যে উপদেশমূলক ভাষণ দিলেন তা শুনলে এখনও শিক্ষণীয় বলে মনে হয়।

“তোমরা ভয়ে কাতর হবে না, দুঃখে বিচলিত হবে না, ক্ষতিতে ম্রিয়মাণ হবে না, ধনের গর্বে স্ফীত হবে না; মৃত্যুকে গ্রাহ্য করবে না, সত্যকে জানতে চাইবে, মিথ্যাকে মন থেকে কথা থেকে কাজ থেকে দূর করে দেবে, সর্বদা জগতের সকল স্থানেই মনে এবং বাইরে এক ঈশ্বর আছেন এইটে নিশ্চয় জেনে আনন্দমনে সকল দুষ্কর্ম থেকে নিবৃত্ত থাকবে। কর্তব্যকর্ম প্রাণপণে করবে, সংসারের উন্নতি ধর্মপথে থেকে করবে, অথচ যখন কর্তব্যবোধে ধনসম্পদ ও সংসার ত্যাগ করতে হবে তখন কিছুমাত্র ব্যাকুল হবে না। তাহলে তোমাদের দ্বারা ভারতবর্য আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠবে- তোমরা যেখানে থাকবে সেইখানেই মঙ্গল হবে, তোমরা সকলের ভালো করবে এবং তোমাদের দেখে সকলের ভাল হবে”।

সকলের ভালো করার এই আকাঙ্ক্ষাই হল শিক্ষার মহান ব্রত আর এই ব্রতকেই মোক্ষ করার জন্য রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার এই প্রয়াস।

শিক্ষাগ্রহণ হল এক ধরনের ধর্ম। এ ধর্মে ছাত্র এবং শিক্ষকের সম্পর্ক হবে গুরু শিষ্যের সম্পর্ক। শিক্ষা কখনো পণ্য রূপে বিক্রি হতে পারে না। এতে ছাত্রশিক্ষকের সম্পর্ক যা মূলত গুরুশিষ্যের সম্পর্ক সেটা ব্যাহত হয়। দারিদ্র্য লজ্জার বিষয় নয় কিন্তু শৌখিনতাকে বর্জন করা ছাত্রদের কর্তব্য। সব রকমের পরিচ্ছন্নতা এবং শুচিতা পালনে দৃঢ় হওয়া প্রয়োজন। নিজের কাপড়চোপড়সহ সব কিছু ধোয়ামোছার কাজ নিজহাতে করা দরকার। অধ্যাপকদের ঘর গুছানোসহ অধ্যাপকদের সেবাও তাদের কর্তব্য। ছাত্রদের দায়িত্ব হল তারা নির্বিচারে অধ্যাপকদের ভক্তি করবে। প্রতিদিন তারা শিক্ষকদের প্রণাম করবে; এভাবে বিলাসত্যাগ, আত্মসংযম, গুরুজনে ভক্তি ইত্যাদি বিষয়গুলি তাদেরকে পালন করে প্রাচীন কালের আদর্শকে অনুসরণ করতে হবে বলে তিনি মনে করেছেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যাপকেরা তাদের স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক এবং অধ্যাপকদের সাথে মালিক শ্রমিক সম্পর্ক থাকবে না বরঞ্চ একে অন্যের সহযোগি হয়ে কাজ করবেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন:

“এই বিদ্যালয়ের অধ্যাপকগণকে আমি আমার অধীনস্ত বলিয়া মনে করি না। তাঁহারা স্বাধীন শুভবুদ্ধির দ্বারা কর্তব্য সম্পাদন করিয়া যাইবেন ইহাই আমি আশা করি এবং ইহার জন্যই আমি সর্বদা প্রতীক্ষা করিয়া থাকি। কোনো অনুশাসনের কৃত্রিমশক্তির দ্বারা আমি তাহাদিগকে পূণ্যকর্মে বাহ্যিকভাবে প্রবৃত্ত করিতে ইচ্ছা করি না। তাহাদিগকে আমার বন্ধু বলিয়া সহযোগি বলিয়াই জানি। বিদ্যালয়ের কর্ম যেমন আমার, তেমনি তাহাদেরও কর্ম- এ যদি না হয় তাহলে এ বিদ্যালয়ের বৃথা প্রতিষ্ঠা”।

তিনি ন্যায়, কল্যাণ, শুভবুদ্ধির উদ্বোধনের জন্য শান্তিনিকেতনের কর্মপ্রচেষ্টাকে ঢেলে সাজিয়েছিলেন। তিনি এই প্রসঙ্গে আরো বলেছেন, আত্মসংযম, শরীর মনের নির্মলতা, একাগ্রতা, গুরুভক্তি ইত্যাদির মাধ্যমে মনুষ্যত্বকে দুর্লভ ধনের মত শিষ্য বা ছাত্ররা গুরুর কাছ থেকে অর্জন করবে। মনুষ্যত্ব অর্জনই হবে দেশসেবার পথ বা উপায়।

আজকাল আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কিছু ছাত্রের মধ্যে জঙ্গী তৎপরতায় সংশ্লিষ্টতার এবং তাদের পৈশাচিক বর্বরতার যে পরিচয় পাওয়া গেছে তা অত্যন্ত ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক।

শিক্ষার সাথে ন্যায়বোধ এবং সাংস্কৃতিক কল্যাণাঙ্ক্ষার ভিত্তিমূল সুপ্রোথিত না হলে  আমাদের জাতির সংকট বেড়ে যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাচিন্তার সাথে আধুনিক প্রযুক্তি এবং মানবিকতানির্ভর সাংস্কৃতিক বলয় নির্মাণের মাধ্যমে শুভবুদ্ধির উদয় হয় এমন শিক্ষা ছাত্রদের দিতে হবে। তা যেন শুধুমাত্র পুস্তকনির্ভর এবং আয়োজনসর্বস্ব শিক্ষা না হয় যা তিনি তোতাকাহিনীতে লিখেছিলেন।

আত্মপ্রকাশ এবং সত্যপ্রকাশের মাধ্যমে মানুষের আত্মাকে মুক্ত করার সাধনাই হল রবীন্দ্রনাথের শিক্ষার আদর্শ। তিনি তাঁর শিক্ষার মিলন প্রবন্ধে বলেছেন:

“সত্যকে চাই অন্তরে উপলব্ধি করতে এবং সত্যকে চাই বাহিরে প্রকাশ করতে- কোনো সুবিধার জন্য নয়, মানুষের আত্মাকে প্রচ্ছন্নতার থেকে মুক্তি দেবার জন্যে। মানুষের সেই প্রকাশতত্ত্বটি আমাদের শিক্ষার মধ্যে প্রচার করতে হবে, কর্মের মধ্যে প্রচলিত করতে হবে, তাহলেই সকল মানুষের সম্মান করে আমরা সম্মানিত হব- নবযুগের উদ্বোধন করে আমরা জরামুক্ত হব”।

তাই শিক্ষার উদ্দেশ্য হল নিজের আত্মার মুক্তি বা আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা, সত্যকে আবিষ্কার করার আত্মবিশ্বাস মানুষকে সম্মান করার উদার মহানুভব মানববৃত্তি।

তবে শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি নিয়েও তিনি রম্যরসাত্মক গল্প রচনা করে দেখিয়েছেন কীভাবে যথার্থ শিক্ষার বদলে যে শিক্ষার অবতারণা করা হচ্ছে তাতে মানুষের স্বাভাবিক বিষয়গুলি বা মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়ের বদলে তার নিজস্ব প্রয়োজন এবং প্রকাশ থেকে বঞ্চিত করা হয়। শিক্ষার নামে মানুষের মৌলিকতার অপমৃত্যু ঘটানোর রাজনির্দেশ বা বিধিব্যবস্থা যে কতটা অমানবিক এবং স্বার্থসর্বস্ব তার একটি মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর তোতাকাহিনী নামক গল্পের শেষাংশটি উল্লেখের মাধ্যমে এর মর্মান্তিক দিকটি তুলে ধরতে পারি।

পাখির পেটে বিদ্যা ঢুকানোর জন্য বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে কলমের সাহায্য ঢুকানো হল। এতে পাখি মরে গেল। বলা হল পাখির শিক্ষা হয়েছে। এতে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে একটি ব্যাঙ্গের পরিচয় পাই।

“পাখিটা মরিল। কোন্‌‍কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্ণীছাড়া রটাইল, ‘পাখি মরিয়াছে’।

ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি’।

ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে’।

রাজা শুধাইলেন, ‘ও কি আর লাফায়’।

ভাগিনা বলিল, ‘আরে রাম!’

‘আর কি ওড়ে।’

‘না।’

‘আর কি গান গায়।’

‘না।’

‘দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।’

‘না।’

রাজা বলিলেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।’

পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হু করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌‍খস্ গজ্‌‍গজ্ করিতে লাগিল।

বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।

এখান থেকে বোঝা যায় আত্মবিকাশের নিজস্ব উপায় ছাড়া যে শিক্ষাঅর্জন তাতে প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হয় না। আজকের দিনের বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ এবং তারুণ্যের যে সংকট উপস্থিত হয়েছে এই অবস্থায় রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার  আলোকে নতুন করে চিন্তা করলে কোনো পথনির্দেশের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।

জাহিদা মেহেরুননেসা
জাহিদা মেহেরুননেসা

 

Author: জাহিদা মেহেরুন্নেসা

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts