রবীন্দ্র-সাহিত্যে কৃষি

রবীন্দ্র-সাহিত্যে কৃষি

রবীন্দ্র-সাহিত্যের বিশাল বিস্তৃতির মধ্যে কৃষি বিজ্ঞানও বিষয়াশ্রিত হয়েছে। মাটি, গাছ-পালা, বন-বনানী ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিষয়াবলী রবীন্দ্রনাথ তার অমর সাহিত্যকর্মে বিভিন্নভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। বিজ্ঞানের এই নিরস বিষয় সাহিত্যরসে সঞ্জীবিত হয়ে আমাদের নিকট মূর্ত হয়েছে।

পৃথিবীর আদি শিলাস্তর ক্ষয় পেতে পেতে মাটিতে পরিণত হয়েছে। বড় বড় গাছ-পালা, লতা-গুল্ম, ঘাস, ছত্রাক প্রভৃতি উদ্ভিদ কখনো প্রত্যক্ষ কখনো পরোক্ষভাবে মাটি তৈরিতে সহায়তা করছে। পৃথিবীর আদি থেকেই এ কাজ চলছে। রবীন্দ্রনাথ তাই তার ‘বনবাণী’ শীর্ষক বৃক্ষ বন্দনা কবিতায় উদ্ভিদের গুণকীর্তণ করেছেন

     “…………মৃত্তিকার হে বীর সন্তান,

      সংগ্রাম ঘোষিলে তুমি মৃত্তিকারে দিতে মুক্তিদান

      মরুর দূর্গ হতে……….।”

মাটি তৈরি, বিশেষতঃ মাটিকে রক্ষা করার কাজে সাহায্য করে উদ্ভিদ। প্রধানতঃ বায়ু ও পানির দ্বারা মাটির ক্ষয় সাধিত হয়। এই ক্ষয়ের জন্য মাটির ওপরের স্তরের বিলোপ ঘটে। মাটির ওপরের স্তরেই অধিকাংশ খাদ্য সঞ্চিত হয়ে থাকে। মাটির ওপর ঘাস-লতা-গুল্মের আবরণ থাকলে ক্ষয় রোধ হয় অধিক পরিমাণে বৃক্ষ রোপন বা বনভূমি সৃষ্টির মাধ্যমে। মাটির ক্ষয় নিবারণ ও সংরক্ষণ করা যায়। কবিগুরু  তাঁর ‘অরণ্য দেবতা’ প্রবন্ধে এই বিষয়েরই উল্লেখ করেছেন “ভূমির ক্রমিক  ক্ষয়ে এই যে বোলপুরের ডাঙ্গার কঙ্কাল বেড়িয়ে পড়ে বিনাশ অগ্রসর হয়ে এসেছে। একসময় এর এমন দশা ছিল না, এখানে ছিল অরণ্য। সেই অরণ্য নষ্ট হওয়ায় এখন বিপদ আসন্ন। এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে আবার আমাদের আহ্বান করতে হবে সেই বরদাত্রী বনলক্ষীকে…..।”

বালিমাটিতে বায়ু ও পানি চলাচল খুব তাড়াতাড়ি হয়। বালুকণার সংশক্তি  ক্ষমতা নেই। বালিমাটি এ কারণে পানি ধরে রাখতে পারে না। বালিতে রাসায়নিক প্রক্রিয়া কম হয়। জৈব পদার্থ ধারণ করার ক্ষমতাও নেই। সেজন্য বালিমাটির উর্বরতা শক্তিও কম হয়। রবীন্দ্রনাথ ‘ইতিহাস’ গ্রন্থে এ বিষয়ে বলেছেন, “যে মাটিতে আঠা একেবারেই নেই সেখানেও বায়ুর বেগে বা পাখির মুখে বীজ আসিয়া পড়ে, কিন্তু তাহা অঙ্কুরিত হয় না । অথবা দু-চারটি পাতা বাহির হইয়া মুষড়াইয়া যায়। কারণ, সেখানকার আলগা মাটি রস ধারণ করিয়া রাখিতে পারে না।”

আবার ‘বারিত্রপূজা’ প্রবন্ধে বলেছেন- ‘আমরা যদি কোন ক্ষেত্রে দেখতে পাই প্রচুর ফসল, তাহলে গোড়াতেই এ কথা মনে রাখতে হবে, এ ফসল বালিতে উৎপন্ন হয়নি, হয়েছে মাটিতে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, মাটির কণায় কণায় বন্ধন আছে, বালির কণায় কণায় বিচ্ছেদ।”

মাটির একেবারে নিচের স্তরে শিলাস্তর আর খনিজ পদার্থ। ওপরের অংশে থাকে জৈব পদার্থ। তাই স্বাভাবিক কারণে ওপরের মাটি হয় উর্বরা এবং নিচের নিরস অনুর্বরা শিলাস্তরের জন্য গাছ কোন খাদ্য পায়না। অনুপম উপমা সহযোগে ‘বিশ্বভারতী’ গ্রন্থে এই কথা উল্লেখ করা হয়েছে- ‘যদি কেবল ওপরিস্তরের মাটি উর্বর হয়, তবে বনস্পতি দ্রুত বেড়ে ওঠে। কিন্তু অবশেষে তার শেকড় নীরস মাটির তলায় গিয়ে ঠেকে। তখন হঠাৎ একদিন তার ডালপালা মুষড়ে যেতে আরম্ভ করে।’

মাটিতে জৈব পদার্থ মিশিয়ে মাটির উর্বরাশক্তিকে বাড়ানো হয়। লতা-পাতা, ডালপালা, প্রাণীর দেহাবশেষ দিয়ে তৈরি হয় এই জৈব পদার্থ। বার্ধক্য বয়সে নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে এক অভিভাষণে কবিগুরু বলেছেন, “মেয়াদ ফুরোলে যে গাছ মরে যায় অনেকদিন থেকে ঝরা পাতায় যে মাটি তৈরি করে সেই মাটিতে খাদ্য জমা থাকে পরবর্তী গাছের জন্য।”

তেজ বাড়ানোর জন্য মাটিতে সার ব্যবহার করা হয়। এ সম্বদ্ধে ‘আত্মশক্তি’ প্রবন্ধে বলেছেন, “আপেল গাছে যে বেশি ফল ফলিতেছে তাহার কারণ তাহার গোঁড়ায়, তাহার মাটিতে সার আছে, আমাদের আম বাগানের জমির সার বহুকাল হইল নিঃশেষিত হইয়া গিয়াছে।” আর এক জায়গায়, ‘শিক্ষা’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে বলেছেন, “অরণ্য যে মাটি থেকে প্রাণরস শোষণ করে বেঁচে আছে সেই মাটিকে আপনিই প্রতিনিয়ত প্রাণের উপাদান অজস্র যুগিয়ে থাকে, তাকে কেবলই প্রাণময় করে তোলে, ওপরের ডালে যে ফল সে ফলায় নীচের মাটিতে তার আয়োজন “নিজকৃত।” বিশ্ব-ভারতী সম্মিলনীর ভাষণে বলেছেন, “মাটি থেকে যে প্রাণের উৎস উৎসারিত হচ্ছে তা যদি চক্রপথে মাটিতে না ফেরে তবে তাতে প্রাণকে আঘাত করা হয়।……….মাটিতে ফসল ফলানো সম্বদ্ধে এই চক্ররেখা পূর্ণ হচ্ছে না বলে আমাদের চাষের মাটির দারিদ্র বেড়ে চলেছে,.. … …গাছপালা, জীবজন্তু প্রকৃতির কাছ থেকে যে সম্পদ পাচ্ছে তা তারা ফিরিয়ে দিয়ে আবর্ত গতিকে সম্পূর্ণতা দান করেছে। “বীথিকার বনস্পতি’ কবিতায় কবি ছন্দ গেঁথেছেন,

   “তোমার পুরোনো পাতা

    মাটিরে করেছে প্রত্যার্পণ,

    মাটির যা সত্যধন।”

উদ্ভিদের Vegetative growth বেশি হলে ফসল ভালো হয় না। আধুনিককালের ধর্ম প্রসঙ্গে উদাহরণ টেনে বলেছেন, “আধুনিককালের ধর্ম, ব্যাপ্তির দ্বারা কাজকে বিচার করা, গভীরতার দ্বারা নয়। তার পরিণাম হয় গাছের ডালপালার পরিব্যাপ্তির মতো, তাতে ফল হয় কম। আমরা দেখেছি যে গাছে পাতা ও ডালপালা খুব বেশি বেড়ে উঠে তাতে ফল কম হয়। Vegetative growth বেশি হলে গাছের শক্তি ওই দিকে যায়,  ফল ধরার জন্য শক্তি অভাব পড়ে।”

আগাছা ও অপ্রয়োজনীয় গাছপালা ফসলের শত্র“। রামায়ণের প্রসঙ্গে ‘যাত্রাযাত্রীতে’ লেখেন,  “কৃষিক্ষেত্র দু’রকম করে নষ্ট হতে পারে, এক, বাইরের দৌরাত্ম্য, আর এক নিজের অযত্নে।… অযত্নে নির্বাসিতা সীতার গর্বে যে যমজ সন্তান জন্মেছিল তাদর নাম লব, কুশ। লবের মূল ধাতুগত অর্থ ছেদন। আর কুশের অর্থ তো জানাই। কুশ ঘাস একবার জন্মালে ফসলের ক্ষেতকে যে কি রকম নষ্ট করে সে-ও জানা কথা। আমি যে মানেটা আন্দাজ করছি সেটা যদি একেবারেই অগ্রাহ্য না হয় তাহলেও লবের সঙ্গে কুশের একত্র জন্মানোর ঠিক তাৎপর্য কি হতে পারে এ কথা আমি পন্ডিতদের জিজ্ঞাসা করি।” কৃষির দিক থেকে লব-কুশের জন্মানোর ব্যাখ্যা এভাবে করা যেতে পারে। ‘সীতা’ শব্দের অভিধানিক অর্থ হাল চালানোর ফলে জমিতে যে রেখা পড়ে, অযত্নে ফসল ক্ষেতে আগাছা জন্মে। ‘কুশ’ এক জাতীয় কষ্টসহিষ্ণু আগাছা। মাটির গভীরে এর শেকড় প্রবেশ করে এবং বংশবিস্তার করে। জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে একে ধ্বংস না করলে পরে এর কবল থেকে জমিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় না।

মাটির উর্বরতাশক্তি ধরে রাখার জন্য একই জমিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফসলের চাষ করতে হয়। একে শস্য পর্যায় (Crop Rotation) বলা হয়। সাহিত্য পরিষদের বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ বলেন,  “তৃতীয়বার আমাকে বিশ্রাম করিতে দেওয়া উচিত ছিল। একই জমিতে একই ফসল বার বার করিতে গেলে ফসল ভালো হয় না। নিঃসন্দেহেই আমার সুহৃদগণ জানেন।”

কলম (Plant Breeding) করার কথা আমরা জানি। এর দ্বারা উদ্ভিদের ফুল, ফল ইত্যাদির গুণাগুণ বদলে দেওয়া যায়। ধ্বংস গল্পে দেখি,

“তার সারা জীবনের সখ ছিল গাছ-পালায় জোড় মিলিয়ে, তাদের চেহারা, তাদের স্বাদ বদল করে, নতুন রকমের স্বাদ তৈরি করতে। এক একটি ফুলের স্বভাব বদলাতে বছরের পর বছর কেটে যেত।” ‘সমাজ’ প্রবন্ধেও এ সম্পর্কে উল্লেখ আছে। ‘রাজাপ্রজা’ প্রবন্ধে জোড় কলম সম্পর্কে উপমা টানতে গিয়ে বলেছেন,

“সজীব পদার্থ অনেক সময় যান্ত্রিকভাবে একত্র থাকিতে থাকিতে জৈবিকভাবে মিলিয়া যায়। এমনি করিয়া ভিন্ন শ্রেণীর ডালে ডালে জুড়িয়ে বাঁধিয়া কলম লাগাইতে হয়। কিন্তু যতদিন না কালক্রমে সেই সজীব জোড়াটি লাগিয়া যায় ততদিন তো বাহিরের শক্ত বাঁধন খুলিলে চলে না।”

বর্ষার ঘনঘটায় আমন চাষের মওসুম। বুকভরা স্বপ্ন-আশা নিয়ে কৃষাণেরা মাঠে ধান বোনে। কিন্তু ফসল তুলে তার ভাগ তাকে আনন্দ করতে দেয় না, খুশিতে উদ্বেল করে তোলে না। বরং হতাশই হয়। ‘পত্রপুট’ এর চতুর্থ কবিতায় কবিগুরু মাসের ক্রম অনুসারে বর্ণনা দিয়েছেন,

“আষাঢ়েঃ শুরু হলো ফসল ক্ষেতের জীবনী রচনা মাঠে মাঠে ধানের চিকন অঙ্কুরে মাসের পর মাস যায়।……..

পৌষেঃ বিকাল বেলায় রৌদ্রকে যেমন উজাড় করে দিনান্ত শেষ গোধূলির ধূসরতায়, তেমনি সোনার ফসল চলে গেল অন্ধকারে অবরোধে।”

বাংলাদেশের চাষীরা খুবই পরিশ্রমী। দিন-ভর তারা মাঠে হাড়-ভাঙ্গা খাটা-খাটুনি করে। অন্তর দিয়ে তারা মাটিকে, গাছকে, ফসলকে ভালোবাসে, লালন করে। কিন্তু বিনিময়ে তাদের প্রাপ্য সামান্য। অত্যন্ত নিচু-মানের জীবন-যাপন করে তারা কোন রকমে বেঁচে থাকে। কবিগুরু একসময় কিছুকাল বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব বাংলা) ছিলেন। গ্রামাঞ্চলে থাকাকালে পল্লীর কষ্টসহিষ্ণু অভাবী দুঃখী মানুষের জীবন-যাপন পদ্ধতি স্বচক্ষে দেখেছেন। ‘কালান্তর’ উপন্যাসে এ নিয়ে তিনি লিখেছেন।

প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল আমাদের কৃষি ব্যবস্থা। এজন্য চাষীদের উৎকন্ঠিত থাকতে হয়। মেঘ-বৃষ্টি ও রোদ সময়মতো না পেলে ফসলের ক্ষতি হবে বা বিনষ্ট হবে। কবিরও ছিল এজন্য উৎকন্ঠা । তিনি এক পত্রে লিখেছেন,

“এ রকম মেঘ ছায়া শ্যামল বর্ষামুখর দিন মোটে আমার ভালোই লাগে। কিন্তু এই সময়টায় মাঠে যখন আউশ ধান কাটবার দিন আসন্ন হয়ে হয়ে এল, তখন মনের থেকে কিছুতেই উদ্বেগ যেতে চায় না, যে দেশে অন্যের বরাত একমাত্র চাষের ওপর সে দেশে আকাশের প্রত্যেক ইঙ্গিত নিয়ে মনটা উৎকন্ঠিত হয়ে ওঠে।”

এছাড়া কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ‘পল্লী প্রকৃতি’, ‘আশ্রমের রূপ ও বিকাশ’, ‘পিতৃস্মৃতি’ প্রভৃতি রচনাসহ অসংখ্য লেখায় গ্রাম, মাটি, গাছপালা, লতা-পাতা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বিষয়াবলী ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে আছে।

আইয়ুব হোসেন
আইয়ুব হোসেন

 

ছবি পান্থ রহমান​

 

Author: আইয়ুব হোসেন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts