রাজনৈতিক উত্তরণ ও নারী অধিকার

বর্তমানে আমরা একটা বিশ্বগ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজে বসবাস করছি। আমাদের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি। মানবজাতির অর্জন ও সাফল্য বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। এতো সত্ত্বেও সবসময় একটা কৌতীহলোদ্দীপক প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। কোন ধরনের সমাজ নারী বান্ধব? তার মানে কোন ধরনের  শাসন ব্যবস্থায় নারী সবচেয়ে নিরাপদ? কেননা, আমাদের জানা ইতিহাসে নারীর নিরাপদ জীবন কোথাও কোনদিন ছিল না। এমন কি সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর অংশগ্রহণকে কটাক্ষের চোখে দেখা হতো। নারী জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো পারিবারিক সহিংসতা।

 

ইতোমধ্যে সমাজ অগ্রগতির পথ পরিক্রমায় অনেক ধরনের শাসন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে আজ আমরা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে উৎকৃষ্ট শাসন ব্যবস্থা বলে মেনে নিয়েছি। এ শাসন ব্যবস্থার সুফল নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। নিঃসন্দেহে এ শাসনব্যবস্থা উত্তম মানের শাসন। যেখানে মানবাধিকারের প্রশ্নগুলি অগ্রাধিকার লাভ করে। এই উত্তম শাসন ব্যবস্থায়ও নারী কতোটা নিরাপদ? গণতন্ত্র কি পারিবারিক সহিংসতা রোধ করতে পারে?

 

গণতান্তিক শাসন ব্যবস্থার অনিবার্য পূর্বশর্ত হলো আইনের শাসন। আইনের শাসনের মূল কথা, মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হলে আইন সেখানে ঐশ্বরিক শক্তি হয়ে বলবৎ হয়। কিন্তু পারিবারিক সহিংসতার লক্ষণও বিষয়গুলো এত  সূক্ষ্ম মানবিক সম্পর্কের জালে জড়িয়ে থাকে সে, নারী অপরাধির জন্য আইনের শরণাপন্ন হতে দ্বিধাবোধ করে। কেননা ভালবাসার আবরণেও নারীর উপর পারিবারিক সহিংসতা সংঘটিত হয়ে থাকে।

 

শুধুমাত্র শাসন ব্যবস্থার ধরণ পারিবারিক সহিংসতা থেকে নারীকে মুক্তি দিতে পারবেনা। গণতান্ত্রিক সমাজে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, আইনের শাসন এগুলো নারীর রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এসবের প্রত্যক্ষ ভূমিকাও অনেক। রাষ্ট্র ও শাসনতন্ত্রের অধীনে  প্রাপ্ত সুবিধা ও অধিকার ছাড়াও নারীকে আরো অধিকতর কিছু ভূমিকা তার স্বার্থ সংরক্ষণের স্বার্থেই রাখতে হবে পরিবারে। আর্থিক সামর্থ্য অর্জন, পরিবারে নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা নারীকে ধীরে ধীরে অর্জন করতে হবে। সন্তান জন্মদান, লালন-পালন, রক্ষণাবেক্ষণের মত কাজগুলোকে নিজের ইচ্ছার অধীন আনতে নারীকে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমা অর্জন করতে হবে। কেননা কাজের ধরণের জন্যও সহিংসতার শিকার হয়ে থাকে নারী। গৃহস্থালির কাজ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শুধুমাত্র নারী সদস্যদেরই করতে হবে এই সংস্কৃতির ধারণাও গৃহে নারী নির্যাতনের সুযোগ এনে দিয়েছে। সমাজ ও শাসন ব্যবস্থার ধরণ নারীকে পারিবারিক সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে কিনা সেটা এখন ভাবতে হবে নতুন করে। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি সমাজ ও শাসন ব্যবস্থার ভেতরেই নারী  নিগ্রহের উপাদান নিহিত ছিল।

 

উৎপাদন ও বন্টনের অধিকারকে কেন্দ্র করে সমাজ যেভাবে অগ্রগতি লাভ করেছে তারই ধারাবাহিকতায় আজ মানব সমাজ গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় উপনীত হয়েছে। এটা নারীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে । এখন বাকিটুকু নারীকে বুদ্ধি ও পরিশ্রম দিয়ে অর্জন করে নিতে হবে। সাংস্কৃতিকভাবে পুরুষতন্ত্র এখনও অনেক শক্তিশালী ডিভিশন অব লেবার, যৌথ পরিবারের ভাঙন, নারীর পক্ষে উপযুক্ত আইন পুরুষতন্ত্রেকে সত্যিকার ভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এখনই নারীকে তার পরিবারের নেতৃত্বদানের সামর্থ্য অর্জনের মাধ্যমে আর্থিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব নিজের পক্ষে নিতে হবে। সেজন্য নারীকে আরো দক্ষতা অর্জন করতে হবে পরিবারের ভেতরে এবং বাইরের কর্মক্ষেত্রে।

 

স্বামী ও সন্তান কেন্দ্রীক নিরাপত্তার ধারণাও নারীকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। নারীও না বুঝে অথবা নিরুপায় হয়েও এই ধারণার দাসত্ব করেছে হাজার হাজার বছর। একটা সাধারণ ধারণা নারীর মনে এই রক্ষণশীলতা তৈরি করেছিল। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এই রক্ষণশীল অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার উপাদান নিহিত আছে। সম্পদের মালিকানা ছাড়া অন্য কোন উপায়ে এই মধ্যযুগীয় ধারণা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব ছিলনা নারীর পক্ষে। ধনবাদী সমাজ এবং গণতান্ত্রিক শাসন এবং সাংস্কৃতিক আবহ নারীর সামনে অনেক সুযোগ নিয়ে হাজির হয়েছে। এর চেয়ে “নারী বান্ধব সমাজ” অতীতে কখনো ছিলনা নারীর জন্য।


সাবেরা সুলতানা

Author: Sabera Sultana

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts