রাজ্জাক: প্রথম যে নায়কের প্রেমে পড়েছিলাম

 

রাজ্জাক: প্রথম যে নায়কের প্রেমে পড়েছিলাম/ আফরোজা পারভীনআজ খুব মনে পড়ছে ছোট্ট শহর নড়াইলে যেদিন সিনেমা হল হলো সেদিনটির কথা। সাল তারিখ মনে নেই। হলের নাম ‘চিত্রাবাণী’। নড়াইলের টাউন হল কিছুটা বদলে সিনেমা হলের আদল দেয়া হল। সিনেমা হল হলো, কিন্তু আমরা হারালাম সারা বছর অনু্ষ্ঠান, নাটক লেগে থাকা টাউন হলটাকে। একইসাথে তাই আনন্দ বিষাদ দুটোই ছিল। তবে আনন্দের ভাগ বেশি ছিল। সিনেমা হল বলে কথা। সারা শহরে মাইকিং হলো, আসিতেছে নড়াইল চিত্রাবাণী সিনেমা হলের রূপালী পর্দায়.. আসিতেছে। আর  ওই হলে যেদিন প্রথম সিনেমার প্রথম প্রদর্শনী হল সেদিন ছোট্ট শহর ভেঙে পড়ল্ হলের সামনে।  গিজগিজ করছে মানুষ। অনেক জনসভাতেই এত মানুষ হয় না। আমি আর আমার বন্ধুরা ১২টা থেকে  বসে রইলাম হলের দরজায়। দরজা খোলামাত্র হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লাম। সে এক দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার।

এর অগে সিনেমা দেখতে আমাদের যেতে হতো যশোর কিংবা খুলনায়। তখন হলে এদেশ ছাড়াও ভারতীয় পাকিস্তানী দুই দেশের ছবিই চলত। পাড়ার কেউ একজন একটা ছবি দেখে এলে আমি ভিড়ে যেতাম তার কাছে গল্প শুনতে। আমাদের এক খালা ছিলেন।  লাইনের পর লাইন তিনি বলতেন। কাঁদতেন হাসতেন গান করতেন। এ জীবনে এমন স্মৃতিধর মানুষ আমি আর দেখিনি।

আমি প্রথম সিনেমা দেখি যশোরে। সুচিত্রা সেনের ছবি। তারপরই রাজ্জাকের ছবি। ঢাকার ছবিগুলো তখন দেখার মতো ছিল। রাজ্জাক আজিম এরপরে ওয়াসিম জসিম জাফর ইকবাল আলমগীর ইলিয়াস কাঞ্চন সোহেল রানা এরা ছিলেন নায়ক। কি তাদের মাপ ! রাজ্জাকের সেই স্মার্টনেস, পোশাক, হাসি, চাউনি, আমাকে দুর্বার টানতো। নীল আকাশের নীচে আমি রাস্তা চলেছি একা, বন্দি পাখির মতো মনটা কেঁদে মরে এসব গানের সাথে রাজ্জাকের  চিরায়ত অভিনয় সারা জীবন আমাদের মোহিত করে রেখেছে। বেহুলা, বাঁদি থেকে বেগম, টাকা আনা পাই,  আনোয়ারা, জীবন থেকে নেয়ায় তাকে পেয়েছি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়। ক্রমাগত তিনি নিজেকে ভেঙে অগ্রসর হয়েছেন।

আর সেই কৈশর আর যৌবনের রঙিন আলুথালু দিনে, আলুথালু মনে রাজ্জাক ছিলেন আমার/ আমাদের প্রথম প্রেম। প্রেমিক রাজ্জাক, প্রেমিকা অগুনতি, আমাদের বয়সের স্বপ্নবোনা মেয়েরা।

রাজ্জাক একদিনে রাজ্জাক হননি। কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে। খাটতে হয়েছে দিনের পর দিন। অধ্যবসায় অনুশীলন আর মেধা তাঁকে পরিণত করেছে কিংবদন্তিতে।

১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি  নাকতলা, দক্ষিণ কলকাতা, ভারতে জন্মগ্রহণ করেন রাজ্জাক।  রাজু, আর  রাজা নামেও তাকে অনেকে ডাকেন। পিতা আকবর হোসেন, মা  নিসারুননেছা, স্ত্রী: খাইরুন্নেছা (ভালোবেসে লক্ষ্মী বলে ডাকতেন রাজ্জাক)। সন্তান : বাপ্পারাজ (রেজাউল করিম), নাসরিন পাশা শম্পা, রওশন হোসেন বাপ্পি, আফরিন আলম ময়না, খালিদ হোসেইন সম্রাট।

কলকাতার খানপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় একটা ঘটনা ঘটে।  স্বরসতি পূজা চলাকালীন মঞ্চ নাটকে ‘বিদ্রোহী’তে গ্রামীণ কিশোর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাকে বেছে নেন।  এই  চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নায়করাজের অভিনয় জীবন শুরু।কলেজ জীবনে ‘রতন লাল বাঙালি’ সিনেমায় অভিনয় করেন ।  এ ছাড়া কলকাতায় ‘পঙ্কতিলক’ ও ‘শিলালিপি’ নামে আরো দুটি সিনেমায় অভিনয় করেন। ১৯৬৪ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কারণে পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন।

ঢাকায় চলচ্চিত্রকার আবদুল জব্বার খানের সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন।  ‘তের নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’ ছবিতে ছোট একটি চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন। এরপর ‘কার বউ’, ডাক বাবুতেও অভিনয় করেন। নায়ক হিসেবে তাঁর প্রথম ছবি জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’। সেই থেকে তিনি তিন শতাধিক বাংলা ও কয়েকটি উর্দু চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। পরিচালনা করেন ১৬টি চলচ্চিত্র।

রাজ্জাকের  প্রথম নায়িকা ছিলেন সুচন্দা। রাজ্জাক-কবরী জুটি প্রবল জনপ্রিয় ছিল। প্রথম প্রযোজিত ছবি আকাঙক্ষা।পরিচালক হিসেবে প্রথম ছবি  অনন্ত প্রেম। তিনি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছেন। শেষ ছবি ‘মালামতি’। নায়িকা ছিলেন নূতন।

রাজ্জাকের অভিনয় করা উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে, বেহুলা, আগুন নিয়ে খেলা, দর্পচূর্ণ, এতুটুকু আশা, নীল আকাশের নিচে, কখগঘঙ, জীবন থেকে নেয়া, নাচের পুতুল, অশ্রু দিয়ে লেখা, ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, রংবাজ, আলোর মিছিল, শুভদা, অভিযান, যোগাযোগ, অন্ধ বিশ্বাস, টাকা আনা পাই, ছন্দ হারিয়ে গেল, মানুষের মন, অতিথি, যোগ বিয়োগ, মধু মিলন, যে আগুনে পুড়ি, দুই পয়সার আলতা, অনেক প্রেম অনেক জ্বালা, দ্বীপ নেভে নাই, পীচ ঢালা পথ, দুই ভাই, আবির্ভাব, বন্ধু, বাঁশরী, আশার আলো, কে তুমি, মতিমহল, আনোয়ারা, নাত বউ, অবাক পৃথিবী, কি যে করি, গুণ্ডা, অনন্ত প্রেম, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা, মহানগর, বড় ভাল লোক ছিল, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, স্বরলিপি, বাদী থেকে বেগম, বাবা কেন চাকর।

তাঁকে নায়করাজ উপাধি দিয়েছিলেন চিত্রালি সম্পাদক আহমেদ জামান চৌধুরী। তাঁর সেরা প্রাপ্তি : ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হওয়া।

তিনি কলকাতার টেলি-সিনে সোসাইটি সম্মাননা পান।  টেলিভিশন এবং সিনেমার কলাকুশলীদের এই শিল্পে অবদানের জন্য ২০০০ সাল থেকে এমন সম্মাননা দিয়ে আসছে এই সোসাইটি। সম্মাননা প্রদানের প্রাক্কালে টেলি-সিনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মৃন্ময় কাঞ্জিলাল এই  বলেন, “বাংলাদেশের দর্শকদের পাশাপাশি কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছেও রাজ্জাকের অভিনয় সম্পর্কে ধারণা রয়েছে। উনি এই বাংলাতেও প্রায় সমানভাবেই জনপ্রিয়। কলকাতার বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন রাজ্জাক। তাঁর মতো একজন গুণী শিল্পীকে কলকাতায় সংবর্ধনা দিতে পেরে টেলি-সিনে সোসাইটি সত্যিই গর্ববোধ করছে।”

২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়াও তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন পাঁচবার। এছাড়া  তিনি স্বাধীনতা পদক লাভ করেন।

চলে গেলেন নায়করাজ। ২১ আগস্ট  সোমবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টায়  তাঁর মৃত্যু হয়।নায়করাজ রাজ্জাক কয়েক বছর ধরে ইউনাইটেড হাসপাতালের চিফ কার্ডিলজিস্ট ডা. মোমেনুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। হৃদরোগ ছাড়াও তিনি ক্রনিক পালমোনারি ডিজিজ, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ মাত্রায় ডায়াবেটিস রোগে দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন। এর আগেও তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্রের সহায়তায় চিকিৎসাধীন ছিলেন।

হৃদরোগে আক্রান্ত হলে (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট)  ২১ আগস্ট  বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে পরিবারের সদস্যরা অভিনেতা রাজ্জাককে ইউনাইটেড হাসপাতাল হাসপাতালে নিয়ে আসেন।  হাসপাতালে আনার পর তাঁর স্পন্দন, রক্তচাপ কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না। সন্ধ্যা ৬টা ১৩ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।

নায়ক রাজ্জাকের চলে যাবার খবর প্রচারিতহয়ামাত্র সারা দেশে নেমে আসে শোকের ছায়া। চলচ্চিত্র জগৎসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ ছুটে যান তাঁরোঁসভবনে। শহীদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভক্তদের ভিড় নামে। কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে চারদিক।

আসলেই কি চলে গেলেন এই কিংবদন্তি নায়ক! ভারতে যেমন উত্তমকুমার মহানায়ক,  রাজ্জাক আমাদের নায়করাজ। এদেশে সিনেমা শিল্পের বিকাশোন্মুখ সময় থেকে সুদীর্র্ঘকাল তিনি যেভাবে চলচ্চিত্রকে ধরে রেখেছিলেন তা শ্রদ্ধার সাথে চিরদিন স্মরণ রাখবে বাঙালি জাতি। আমাদের হৃদয়রাজ্যে তিনি নায়করাজের আসনেই থাকবেন চিরদিন।

রক্তবীজ পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতি আর কর্মের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

আফরোজা পারভীন

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment