ললিতাকথন

ললিতা আজ বাড়ি ফিরছে। তার নিজ গ্রামে, যেখানে তার জন্ম হয়েছিল, যেখানে তার নাড়ি পুঁতে রাখা আছে। সেই গ্রামে ফিরছে ললিতা প্রায় তের বছর পর। এতোদিন সে একটা বাধার কারণে যেতে পারেনি। কিন্তু আজ আর তার কোন বাধা নেই। সে সকল বাধা ছিন্ন করে ফিরছে তার নিজগ্রামে, নাড়ির টানে।

পনের বছর আগে ললিতার জীবনে যখন কেবল কৈশোর যাই যাই আর যৌবন আসি আসি করছে ঠিক তখন তার জীবনে এল অন্য একজন। যে ললিতাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল একটা সুন্দর জীবনের, একটা সাজানো-গোছানো নির্মল ভবিষ্যতের। কিন্তু ললিতাদের স্বপ্ন দেখা মানা, ভালোবাসা জিনিসটা তো একেবারেই নিষিদ্ধ। ললিতার সাহসের তারিফ করতে হয় বৈকি। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সবসময়ই একটু বেশি। কিন্তু একটি মেয়ের ক্ষেত্রে তা দুঃসাহসই বটে।

মানুষের ক্ষেতে খেটে খাওয়া দিন মজুরের মেয়ের পক্ষে ভালোবাসা কথাটা উচ্চারণ করাও যে অন্যায় একথা ললিতার জানা ছিল না। তাই সে ভালোবাসায় মাতালের মতো বুঁদ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঘোর তো একদিন কাটবেই। ললিতারও ঘোর কাটল। যখন তাকে নিয়ে গ্রামে সালিশ বসল, সেই সালিশে তাকে আর তার বাবা-মাকে গ্রামবাসীরা অপমান করল।  তখন তার ঘোর কাটল। যে মানুষটা তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, যার হাতে হাত রেখে ললিতা সুখের স্বর্গ রচনা করবে বলে কত স্বপ্ন এঁকেছিল মনের মাঝে, যে মানুষটা ললিতার হাত ধরে একদিন প্রতিজ্ঞা করেছিল।  বলেছিল, জীবন-মরণের সাথী হয়ে থাকবে আজীবন। সেই মানুষটার মুখ থেকে আজ একি শুনছে ললিতা? নিজের কানকে তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। ললিতা তাকে জোর করেছিল তার সাথে সম্পর্ক করতে? তার কাছ থেকে টাকা নিতো সে? তাকে ভালোবাসার মূল উদ্দেশ্য টাকা-পয়সা উসুল করে নিজের আখের গোছানো? এগুলো বলতে পারল মানুষটা! পরশুও যে কিনা বলেছিল, ‘তুই আমারে ছাইড়া গেলে আমি কিন্তু গলায় দড়ি দিমু।’

তাহলে এসব মিথ্যে ছিল! কিন্তু ললিতা তো তার প্রতি  কোন অন্যায় করেনি।  তাহলে তার সাথে সে এরকম কেন করল? সে তো কখনো চায়নি এরকম একটা কাজ করতে। দিনমজুরের মেয়েকে কোন ভালো পরিবার তাদের ঘরের বউ করতে চাইবে না এটা তো সে জানতোই। তাই মানুষটাকে সে কতবার ফিরিয়ে দিয়েছিল। মানুষটাই তো বারবার তার কাছে এসে কত কাকুতি-মিনতি করেছিল। সেই মানুষটাই আজ গ্রামের পঞ্চায়েতে এসব কি কথা বলল! ললিতা কিছুই বলল না,বলতে পারল না। সব অপরাধ মাথা পেতে নিল আর মাথা নিচু করে থাকা ওই মানুষটার দিকে তাকিয়েই থাকল। তার কষ্ট শুধু একটা জায়গায়, তার অপরাধের কারণে তার বাবা-মাকে শাস্তি পেতে হল। কতটা অপমানিত হল, কত কষ্ট পেল তারা । অবশেষে পঞ্চায়েতের রায় হলো, একমাসের মধ্যে ললিতার বিয়ে দিতে হবে। না হলে তাদের গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে। একজন চরিত্রহীন মেয়েকে গ্রামে রেখে তো গ্রামের পরিবেশ নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। গ্রামের মোড়ল লোকটি ভারী দয়ালু। তিনি নিজেই ললিতার বিয়ের দায়িত্ব নেবেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে মোড়ল সাহেব একটা পাত্র পেলেন। একে তো দিনমজুরের মেয়ে তার উপর কুলটা। তার বর খুজে পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা! তবুও এই অসাধ্য সাধন মোড়লের পক্ষেই সম্ভব। নিজ গ্রামের সম্মান বলে কথা। অনেকটা চুপিসারেই বিয়েটা হয়ে যায় ললিতার। ললিতার বরের আগের পক্ষের বউ বাচ্চা সবাই আছে। কিন্তু আগের পক্ষ অনেকদিন ধরেই শয্যাশায়ী, তাকে কেউ ধরে না তুললে ওঠার শক্তি নেই। তাই এই বিয়ে। তাও ভালো। তা না হলে কি ললিতার কপালে আর বর জুটতো?

ললিতা ঘরও পেল, বরও পেল, আর সাথে পেল কিছু গঞ্জনা। নতুন বউকে দেখতে এসে রূপের প্রশংসা করতে গিয়ে গুণের প্রশংসাও কম করলেন না লোকজন। কথা তো সত্যিই, মেয়ের কোন খুঁত না থাকলে কি আর এমন আধাবয়সী একজন লোকের সাথে কেউ কুমারি মেয়ের বিয়ে দেয়? কারো কারো কথা হল, ‘ভাইরে সবই হল টাকার খেল। ইয়ার আলির ধন-সম্পদ না থাকলে কি আর এই বয়সে ও এমন মেয়ে বিয়ে করতে পারে?’

চোখের পানিতে বুক ভাসাতে ভাসাতে ললিতা মেনে নিল, এটাই তার কপালের লিখন। কিন্তু নিজের বাবার থেকে বয়সে বড় এমন একটা লোকের কাছে যেতে তার সংকোচ লাগে। তবুও যেতে হয়। বিয়ে হলে সংসারের সকল ধর্ম-কর্ম তো করতেই হবে!

বাড়ির সকল কাজ, স্বামীসেবা,  রেডিমেট বাচ্চাকাচ্চা যারা দু’একজন তার বয়সেও বড় তাদের দেখাশোনা করতে করতে  ভালোই কাটছিল ললিতার দিনকাল।  এরমধ্যে তার স্বামীর আগের পক্ষ বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তিনি শুধু বসে বসে হুকুম করেন আর ললিতা হুকুম কায়েম করে। বাড়ির কাজের লোক আর তার মাঝে যে কোন ফারাক নেই সেটা বুঝতে পারে সে। তবুও ভাত-কাপড় পেয়ে ভালোভাবে বাঁচতে তো পারছে, এটাই তার অনেক বেশি। কিভাবে যে দুইটা বছর কেটে গেল বুঝতেই পারল না সে। কিন্তু কারো কারো কপালে সুখ যে বেশি দিন সয় না। ললিতারও সইল না। কোন একদিন বিকালবেলা ললিতা হঠাৎ বমি করে বসে। তার আগেরদিন মাথা ঘুরে পড়েও গিয়েছিল।এক বুড়ি এসব দেখে ভবিষ্যৎবাণী করলেন যে, ললিতা মা হবে। একথা শুনে ললিতার কোন ভাবান্তর না হলেও তার অপরপক্ষের মুখে চিন্তার রেখা দেখা দিলো। স্বামীকে নিজে বিয়ের অনুমতি দিলেও  সন্তানদের সম্পদে ভাগ বেড়ে যাওয়া ওনার পছন্দ হল না।তাই ললিতার দুঃখের মাত্রা আরো বেড়ে গেল। কথায় কথায় উঠতে বসতে তাকে শুনতে হল নানা অকথা-কুকথা। যে ছেলেমেয়েরা কোন দরকার পড়লেই তাকে ছোটমা ছোটমা বলে ডাকত এখন তারাও তাকে চোখের বিষ মনে করতে লাগল। ললিতার মতো তার স্বামীরও এব্যাপারে কোন ভাবান্তর নেই। তার এতো বিষয়-সম্পতি তাতে আর একটা মানুষ বাড়লে কোন অসুবিধা হবে না। তবে অসুবিধা যে কোথায় তা তিনিও হয়তো বুঝেছিলেন। তাই তিনি ললিতার একটু একটু বাড়তি খোঁজ-খবর নেয়া শুরু করেন। এই ব্যাপারটা অন্যপক্ষের কাছে কাটা ঘাঁয়ে নুনের ছিটার মতো বিঁধল। ললিতার একটু ফুরসতও মিলল না বিষয়টা কি হয়েছে তা বোঝার।  আসলেই কি সে মা হবে? সপ্তাহখানেকের মাথায় হাটবারে ললিতার স্বামী বাড়িতে ছিলেন না। তার সতীন সেদিন তাকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে যান। ওষুধ জাতীয় কিছু একটা তাকে খেতে দেন। ললিতা কি বুঝে বেঁকে বসে যে সে খাবে না। ললিতার সতীন এবং তার ছেলেমেয়েরা তার উপর জোর-জবরদস্তি করতে থাকে। এমন সময় ইয়ার আলি বাড়িতে এসে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে বড় বউয়ের ঘরে যান। গিয়ে যা দেখেন তাতে ইয়ার আলির চোখ ছানাবড়া। সবাই মিলে ললিতাকে চেপে ধরেছে কিছু একটা খাওয়ানোর জন্য। ইয়ার আলির আর বুঝতে বাকি রইল না ঘটনা কি ঘটতে যাচ্ছে। ললিতার মা হওয়ার কথা শুনেই বড় বউ যেমন আচরণ শুরু করেছে তা ইয়ার আলি বেশ ভালো ভাবেই লক্ষ্য করছেন। ইয়ার আলির কন্ঠে ‘কি হচ্ছে এসব’ শুনতেই সবাই চমকে ফিরে তাকাল। আর ললিতা যেন প্রাণ ফিরে পেল। দৌড়ে গিয়ে ইয়ার আলিকে জড়িয়ে ধরে কি যেন বলতে চাইল। কিন্তু কান্নার জোয়ারে সব ভেসে গেল। বড় বউয়ের বড় ছেলে কথা বলে উঠলে ইয়ার আলির সাথে তার বাকবিতন্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে ছেলে বাবাকে ধাক্কা দিলে তিনি শাল কাঠের পুরনো বাক্সটার উপর গিয়ে পড়েন। ইয়ার আলির মাথার পেছনে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। মুহূর্তেই সারাঘর রক্তে ভেসে যায়। ডাক্তারের কাছে নেওয়ার পথেই তিনি মারা যান।এরপর যথেষ্ট সাক্ষী-প্রমাণের ভিত্তিতে ললিতা খুনের আসামি হিসেবে পরিগণিত হয়। তার শাস্তি হয় যাবজ্জীবন কারাদন্ড।

আর যে কারণে এতো লঙ্কাকান্ড তার বালাইও নেই ললিতার জীবনে। আসলে তখন ললিতা শারীরিকভাবে অনেক দূর্বল ছিল আর তার পেটে অম্বল পড়েছিল বলেই মাথা ঘোরা আর বমি হয়েছিল। গ্রামের মানুষের চিরাচরিত ধারনার কারনে ললিতার জীবনে এমন বিপর্যয় ঘটেছিল।এটা কি ভাগ্যের বিড়ম্বনা নাকি কর্মফল!

ললিতা অপরাধ না করেও দীর্ঘ তের বছর জেল খেটে আজ সে জীবন থেকে ছাড়া পেয়েছে।তার হাড় জুড়িয়েছে।  জেলকর্তৃপক্ষের  আর  তাকে ধরে রাখার অসম্ভব। তাই সে  বাবার বাড়িতে যাচ্ছে।  বাবা সেই কবেই ওপারে চলে গেছেন। তার বুড়িমা ভিক্ষা করতে করতে কোথায় চলে গেছেন কেউ জানে না। ললিতার বাবার ভিটাতে ঘুঘু চরার মতো অবস্থা। ললিতার লাশ তার বাবার ভিটায় রেখে পুলিশরা তাদের দায়িত্ব পালন করে চলে গেলেন। বেওয়ারিশ লাশ যেমন মর্গে পরে থাকে তেমনি ললিতার লাশও তার বাবার ভিটায় পরে রইল। লোকজন আসছে দেখছে চলেও যাচ্ছে। তাদের মধ্যে কেউ একবারও মৃত্যের সদগতির কথা উচ্চারণ করল না। কেউ একজন হয়তো একবার বলেছিল, ‘লাশকে ওযূ-গোসল করানোর ব্যবস্থা করানো হচ্ছে না কেন?’ অবশ্য তিনি বাইরের লোক। উনার কথা শুনে অন্যরা তখন বলল,  ‘এমন নষ্টা মেয়েলোকের ওযূ-গোসল কে করাবে? গ্রামের কোন পুরুষমানুষও একদিন হাজত খাটেনি আর এই মেয়ে স্বামীকে খুন করে এতগুলো বছর জেল খাটল। এমন অসতী মেয়ের সদগতি করে কে পাপের ভাগীদার হতে যাবে।’

সারাটা দিন রোদে পুড়ে যখন লাশ থেকে গন্ধ বের হচ্ছে তখন কে একজন দয়াপরবশ হয়ে একটা মেথর ডেকে আনল।সেই মেথর লাশটা গ্রামের পাশের বিরাট জঙ্গলটায় ফেলে দিয়ে গেল।  তার সদগতি করল।এখন যদিও চিল-শকুন বেশি একটা দেখা যায় না তারপরও কোথা থেকে যে এত এল। চিল-শকুন  হাড় খায় না, তাই ললিতার হাড়গুলোই শুধু পড়ে রইল। হয়তো কোন একদিন  কেউ একজন এই জঙ্গলে কোন কারণে এলে এই হাড়গুলো তার পায়ে আটকাবে, হয়তো সে মানুষের হাড় চিনতে পেরে  একটু আৎকে উঠে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যাবে। নতুবা চিনতেই পারবে না। হয়তো বা কোন সাহসী দূরন্ত কিশোর ললিতার মাথার খুলিটাকে ফুটবল বানিয়ে দু’চারটা লাথিও দিতে পারে। কিছুই অসম্ভব নয়। ললিতাদের জীবন এমনি হয়। তারা জীবনভর এমনি করেই ভালোবাসা পায়।

Author: অঙ্কনা জাহান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment