লাস্ট ডিজিট ৫৬/ রনি রেজা

মোবাইল ফোনটা বেজেই চলছে। বিরক্তিকর ব্যাপার। যখন একটু তাড়াহুড়া লাগে তখন ফোনও বেয়াড়া হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠান শুরু হবার কথা সকাল ১০টায়। ইতিমধ্যে ৮টা বেজে গেছে। এখনই বের না হলে সময়মতো পৌঁছানো যাবে না। এখনও আবার শাড়ী পড়া হয়নি। একা একা শাড়ী পড়ার অভ্যেস খুব একটা নেই। সব মিলিয়ে মেজাজ খিটমিট অবস্থা। বিরক্তি সহকারে মোবাইল ফোনটা হাতে নেয় অনামিকা। ওমনি বুক ধুকপুক অবস্থা। স্ক্রিনে ভাসছে সেই পরিচিত লাস্ট ডিজিট ৫৬। হ্যাঁ সাগরই। শান্ত সাগর। চার বছর আগে এ নম্বর থেকে ফোনের জন্য নিয়মিত অপেক্ষা করতো অনামিকা বারী। এখনো কি করে না? অবশ্যই করে। না হলে স্ক্রিনের নম্বরটা দেখেই এমনটি হবে কেন? আনন্দ, অভিমান অথবা মিশ্র অনুভূতির ধাক্কায় এক অন্যরকম অস্থিরতায় ডুবে যায় অনামিকা। ড্যান্স হলের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিবর্ণ একইসঙ্গে আশ্চর্য রঙীন আলোর মত ঝলমল করে ওঠে তার ভেতরটা। প্রতিটি মুহূর্তের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা ভালবাসা নামক শব্দটি এক ধাক্কায় নিয়ে যায় চার বছর আগের দিনটিতে।

হ্যাঁ, চার বছর আগে এমনই রোদ ঝলমলে এক স্নিগ্ধ সকালে তাদের বিচ্ছেদ হয়। যদিও প্রেমের ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের চেয়ে ব্রেক-আপ শব্দটি বেশি মানানসই। কিন্তু সাগর-অনামিকার ক্ষেত্রে শব্দটি একটু কম হয়ে যায়। তাদের সম্পর্ক প্রেমের থেকেও একটু এগিয়ে। সম্পর্কের শুরু, একটু একটু করে গভীরতায় প্রবেশ, এক পর্যায়ে প্রেম নামক নির্ধারিত গন্ডি পেরিয়ে যাওয়া, সব শেষে বিচ্ছেদ পর্যন্ত সবই ঘটেছে আকস্মিকভাবে। একটু খুলে বলা যাক-

অনামিকা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংলিশে মাস্টার্স করেছে। কবিতা, ছবি আঁকা, গান, ভ্রমণ এসবের বাইরে তেমন ভাবনা নেই। ভাবনা নেই বিয়ে, সংসার, চাকরি বা সন্তান জন্ম দেওয়ার মতো সামাজিক বিষয়গুলো নিয়েও। এরমধ্যে সাগরের মতো সেমি-বেকার, এইমলেস, লাইফলেস এক বাস্তববাদী ছেলেকে নিয়ে ভাবার সময় না থাকাটাই স্বাভাবিক। মিল এক জায়গায়ই। দু’জনই সাহিত্য ভালবাসে। এর বাইরে সব কিছুতেই উল্টো মেরুর পথিক বলা যায়। অনামিকাকে আগে থেকেই পছন্দ করতো সাগর। কখনও প্রকাশ করেনি। বাস্তববাদী বলে কথা; জয় পুরো নিশ্চিত না করে মাঠে নামে না। সাহিত্যকে কেন্দ্র করেই তাদের কাছে আসা। একইসঙ্গে বাড়তে থাকে ভালবাসা। অনামিকাও জাদুকরী শক্তি দিয়ে খোলস থেকে বের করে আনে সাগরকে। শুরু হয় নিরুদ্দেশ যাত্রা। গভীরভাবে মিশতে মিশতে সাগর আবিষ্কার করে অন্য এক অনামিকাকে। অজানা শঙ্কা চেপে ধরে তাকে। কারো সঙ্গেই মিশতে দিতে চায় না অনামিকাকে। বাইরের কোনো আড্ডাই সহ্য করতে পারে না। অনামিকা লেখালেখি করে। এক আধটু আড্ডা না দিলে চলবে কীভাবে? সাহিত্য আলোচনায় প্রসারিত হয়। সমসাময়িক সাহিত্যিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলে সাহিত্যচর্চা ঠিকমত হয়ে ওঠে না। সাগরের এটা বোঝা উচিত। যেহেতু সেও এক আধটু সাহিত্য করে। সে সব কিছুই নিজ থেকে বোঝে অথচ এটা কেন বোঝে না? তাহলে কি অনামিকার প্রতি ওর আস্থা নেই? প্রশ্ন জন্ম নেয় অনামিকার মধ্যেও।

প্রতিদিনের অভ্যেসমতো সেদিনও ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় যায় অনামিকা। রোদের ঠোঁটে চুল ঠেকিয়ে চুম্বন এঁকে দেয় চায়ের মগে। আকাশ দেখার ছলে পাশের ছাদে চড়ুই দম্পতির রোমাঞ্চকর দৃশ্যে সঁপে দেয় নিজেকে। চরমভাবে অনুভব করে সাগরের পিপাসা। সাগরকে ফোন করতেই মোবাইলটা হাতে নেয়। এমন সময় সজল ভাইয়ের ফোন। রিসিভ করতেই ওয়েটিংয়ে ঢুকে পড়ে সাগর। এরআগেও কয়েকবার ট্রাই করেছিল। রিসিভ করতে পারেনি। তাই রাগটা বেসামাল হয়ে ওঠে সাগরের। যখন মেজাজ চড়ে, সে যেন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। বলা যায় তাকে নিয়ন্ত্রণ করে ভিন্ন গ্রহের অলৌকিক কিছু। সদালাপী, বিনয়ী, কৌতুকপ্রিয় মানুষটি পরিণত হয় দুর্মুখ, কটূভাষী, চৌরাস্তার মাতালে। সজল ভাইয়ের সঙ্গে কথা শেষ করে সাগরকে ফোন করতেই ছুঁড়ে মারে একগাদা অযৌক্তিক, নোংরা প্রশ্ন। যেগুলোর মধ্যে শুধু অভিযোগ আর সন্দেহই ছিল। অনামিকা দিনে দিনে তাকে অবমূল্যায়ন করতে শুরু করেছে এমন অভিযোগ এনে বলে- ‘তোমার তো এক পুরুষে হয় না। তাই আমাকে ছাড়ছোও না; আবার ভালোওবাসছো না। আগের মতো খোঁজ নাও না। ফোন করলে রিসিভ করো না। আবার পরক্ষণেই দেখি ওয়েটিং। থাকো তোমার ওসব পুরুষদের নিয়ে। আমার সঙ্গে আর যোগাযোগের চেষ্টা করো না’।

অনামিকা বোঝে-প্রত্যক পুরুষেরই কিছু বিশেষ চাওয়া বা আকাঙক্ষা হয়তো তার নারীকে ঘিরে থাকে। পুরুষ যেমন ত্যাগ করতে পারে বেশি তেমনি চাওয়াও থাকে বেশি। যাকে ঘিরে সব সময় স্বপ্ন দেখে; তার থেকে একটু বেশিই আশা করে। তাছাড়া এক আধটু খুনসুটি সম্পর্ককে আরও মজবুত করে। এগুলো বোঝে বলেই অনামিকা সব সময় শান্ত থাকার চেষ্টা করে। নিজের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ সেক্রিফাইস করেই সম্পর্কটি এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। তাই বলে এরকম নোংরা অভিযোগ! মেজাজ হারায় অনামিকাও। পাওয়া-না পাওয়ার লুকিয়ে রাখা অভিযোগ ঢেলে দেয় সেও।  

এরআগেও তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। ঘণ্টার কাঁটা একবার ঘুরে আসার আগেই ফিরে এসেছে অভিমানী মানুষটি। কখনও অনামিকা; কখনও সাগর। এবার সাগরের অন্যায়টা বেশি। সে আগে ফিরে আসুক এমনটিই চায় অনামিকা। তাই একে একে তিন দিন অপেক্ষা। এরপরও কোনো খোঁজ না পেয়ে অনামিকা নিজের থেকেই ফোন করে। অথচ এক কঠিন শর্তে আটকে দেয় সাগর। বলে- ‘যদি আমাকে একটুও ভালবেসে থাক তাহলে আর ফোন করবে না। তুমি আমার সঙ্গে যোগাযোগ না রাখলেই বুঝবো তুমি আমার কথার মূল্যায়ন করেছ; অর্থাৎ তুমি আমাকে ভালবাস।’

এরপর অনেকবার ফোন হাতে নিয়েও সাগরকে ফোন করা হয়নি। শুধু অপেক্ষা করেছে, কখন সাগর বুঝবে তার ভালবাসা। এক সময় প্রতিটি কলই তাকে উচ্ছ্বসিত করতো এমটি ভেবে- হয়তো সাগরই করেছে ফোনটি। ধীরে ধীরে তা ফিকে হয়ে গেছে। ফিকে হয়ে গেছে অনামিকার চঞ্চল জীবনও। জীবনের প্রয়োজনে প্রেমহীন নিষ্ঠুর সমাজে ভেসে বেড়াচ্ছে কলাগাছের ভেলার মত। কলাগাছ যেভাবে ধীরে ধীরে পঁচে যায়, ঠিক সেভাবে অনামিকারও হৃদয়টা পঁচে যাচ্ছে ভালবাসার অভাবে।

আজ অবশ্য অনামিকা চেয়েছিল, ফোন না করলেও যেন আজকের অনুষ্ঠানে সাগর উপস্থিত থাকে। আজকের এ প্রাপ্তির সঙ্গে তো সাগরই মিশে আছে।

চার বছর আগে অনামিকা যখন উপন্যাসটি লিখতে শুরু করে তখনই প্রথম পাঁচ লাইন শুনে অনেক উচ্ছ্বসিত হয়েছিল সাগর। একই সঙ্গে প্রতিদিন লেখা শেষে পড়ে শোনানোর দাবি। অনামিকাও উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। এরমধ্যেই বিচ্ছেদ। পরে আর ভাঙ্গা হৃদয় নিয়ে উপন্যাসটিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ বিরতি নিয়ে সম্প্রতি লেখাটি শেষ করেছে অনামিকা। এ বছর বইমেলায় প্রকাশিত হবার পর থেকেই চারিদিকে সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। মনোনীত হয় বাসন্তি কান্তি সাহিত্য পুরস্কারের জন্য। আজ ১০টায় বাংলা একাডেমি চত্বরে পুরস্কারটি অনামিকার হাতে তুলে দেয়া হবে। পুরস্কারটি সাগরকে উৎসর্গ করার কথাই ভেবে রেখেছে অনামিকা। ভালই হলো। সাগরও বোধহয় পুরস্কারের বিষয়টি জেনেছে।  অথবা উপন্যাসটি পড়ে আন্দোলিত হয়েছে। নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে সব অভিমান ভুলে ফোন করেছে। না অন্য কোনো কারণে? সাগরের চিরদিনের অভ্যেস চমকে দেওয়া। আজকের চমকটা কী হতে পারে? ভাবতে ভাবতে ফোনটা রিসিভ করে অনামিকা। কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকে; আগে সগরের কণ্ঠ শুনবে বলে। কিন্তু না। সাগর নয়। চার বছরে সাগরের কণ্ঠ এত পরিবর্তন হবার কথা নয়। তাছাড়া যত পরিবর্তনই হোক অনামিকা চিনতে ভুল করবে না। ফোনটা সামনে ধরে পুরো নম্বরটা দেখে নিশ্চিত হয়ে নেয় পুনরায়। ঠিকই আছে; এটা সাগরেরই ফোন নম্বর। আবার ফোনটি কানে তোলে অনামিকা। ইথারে ভেসে আসছে- ‘হ্যালো, শুনতে পাচ্ছেন? হ্যালো, হ্যালো..’.

-জ্বি, কে বলছেন?

-আমাকে চিনবেন না। এই ফোন ব্যবহারকারী কিছুক্ষণ আগে পল্টন মোড়ে বাস চাপা পড়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনার পর তার মৃত্যু হয়েছে। ওনার ফোনে ‘মাই অক্সিজেন’ নামে আপনার নম্বরটি সেইভ করা। তাই আপনাকেই ফোন করলাম…


রনি রেজা

 

Author: Rony Reza

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts