শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুল্লাহিল বাকী বীর প্রতীক

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুল্লাহিল বাকী

একাত্তরের এপ্রিল। গ্রীষ্মকাল। কিন্তু ঢাকায় তখন অদ্ভুত শীতলতা। মাঝে মাঝে ভেসে আসে বন্দুকের গুলির আওয়াজ। কখনো পাকিস্তানি সৈন্যদের বুটের শব্দে ছড়িয়ে যায় ভয়, কখনো খবর আসে ‘মুক্তি’ সন্দেহে তরুণ যুবাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে। খিলগাঁওবাসী মো. আবদুল বারীও পরিবারের সবাইকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন গ্রামে, বিক্রমপুরে। স্ত্রী, চার কন্যা, তিন পুত্রের সংসার তাঁর। ব্রিটিশ কোম্পানি রেলি ব্রাদার্সে কর্মরত আবদুল বারীর দিনগুলো কাটছিল ভালোই। এর মধ্যে শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেজ ছেলে আবদুল্লাহিল বাকী চলে গেলেন যুদ্ধে। মা আমেনা বারীকে একটি চিঠি লিখে গেলেন, ‘দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না। …মা, তুমি কেঁদো না, দেশের জন্য এটা খুব ন্যূনতম চেষ্টা।’বাকী তখন ২১ বছরের টগবগে তরুণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র। পরিবারের মধ্যমণি। সবাইকে সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখেন।ঢাকা কলেজে পড়ার সময় একবার লাহোরে গিয়েছিলেন বাকী। তখনই তাঁর কাছে প্রকট হয় পাকিস্তানের দুই অংশের বৈষম্য। সব ক্ষেত্রেই পূর্ব বাংলা অবহেলার শিকার। বাকীর রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ হয়েছিল তখনই।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে বাকী যুক্ত হয়েছিলেন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে। ১৯৭১-এর মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের পরদিনই গভর্নর হাউসে (বর্তমানে বঙ্গভবন) হামলা চালায় বাকীর নেতৃত্বে একটি ছোট দল। ভবনের পেছনের অংশে তিনটি বোমা নিক্ষেপ করেন তাঁরা। ২৫-২৬ মার্চের প্রতিরোধ যুদ্ধেও বাকী সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এরপর মাকে চিঠি লিখে চলে যান মুক্তিযুদ্ধে।

১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিলের সেই চিঠিতে বাকী লিখেছিলেন—

‘মা,

আপনি এবং বাসার সবাইকে সালাম জানিয়ে বলছি, দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না। তাই ঢাকার আরও ২০টা যুবকের সাথে আমিও পথ ধরেছি ওপার বাংলায়। মা, তুমি কেঁদো না, দেশের জন্য এটা খুব ন্যূনতম চেষ্টা। মা, তুমি এ দেশ স্বাধীনের জন্য দোয়া করো। চিন্তা করো না, আমি ইনশা আল্লাহ বেঁচে আসব। আমি ৭ দিনের মধ্যেই ফিরে আসতে পারি কি বেশিও লাগতে পারে। তোমার চরণ মা, করিব স্মরণ। আগামীতে সবার কুশল কামনা করে খোদা হাফেজ জানাচ্ছি।

তোমারই

বাকী (সাজু)’

চিঠিটি এখন সংরক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। এটি ছাপা হয়েছে প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত একাত্তরের চিঠি বইতেও।

একাত্তরের চিঠিতে বেশির ভাগ তরুণ মুক্তিযোদ্ধা রণাঙ্গন থেকে চিঠি লিখেছিলেন তাঁদের মায়ের কাছে। আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র সম্পর্কে তাঁদের যেমন ধারণা ছিল না, তেমনি ধারণা ছিল না যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কেও। দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করার কী দুর্বার প্রেরণা তাঁদের পরিচালিত করেছিল, তা ফুটে উঠেছে এসব চিঠির ছত্রে ছত্রে।

মুক্তিযোদ্ধা আবদুল্লাহিল বাকীর চিঠিটিও তেমনই একটি চিঠি। সংক্ষিপ্ত, মাত্র ৮১ শব্দের। বাকী মাকে খুব ভালোবাসতেন। মা একটু অসুস্থ বোধ করলে তিনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে বাড়ি মাথায় তুলতেন।

ভারত চলে যাওয়ার মাসখানেকের মধ্যেই বাকী প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মতিঝিলের চারটি ঘাঁটিতে একযোগে হামলা চালায় তাঁর দল। কিছুদিন পর আবার উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে চলে যান ভারতের চাকুলিয়ায়। প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশে এসে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন বাকী। ঢাকা জেলার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন তিনি। তিনি ছিলেন ইউনিট কমান্ডার।

বাসার সবাইকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেও বাকীর বাবা আবদুল বারী মুক্তিযুদ্ধের বেশির ভাগ সময় থেকেছেন ২০৩/সি খিলগাঁওয়ের বাসাতেই। এখানে বাকী এসে মাঝে মাঝে দেখা করতেন বাবার সঙ্গে। আবদুল বারীর একটি অপ্রকাশিত লেখায় দেখা যায়, বাকীর অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সরকারি নথিপত্র রাখা ভবনগুলো। বাকীর নেতৃত্বে একের পর এক সাঁড়াশি আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। মাঝে একবার ধরাও পড়েছিলেন বাকী। কিন্তু বুদ্ধি খাটিয়ে নিজেকে মুক্ত করে পালিয়ে যান।

নভেম্বরের শেষ দিক থেকে বাকী তাঁর দল নিয়ে অবস্থান করছিলেন ঢাকা শহরের উপকণ্ঠে। ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের আকাশে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর বিমান উড়ল। সে বিমান দেখে আনন্দে আত্মহারা বাকী। ভেবেছিলেন দেশ তো স্বাধীন হয়েই গেছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সেদিনই দেখা করতে এলেন খিলগাঁওয়ের বাসায়।

সেদিন রাতেই বদর ক্যাম্পে আক্রমণের কথা ছিল বাকীর। কিন্তু মা-বাবার সঙ্গে দেখা করে ফেরার সময় বাকী ও তাঁর দল পড়ে যায় একদল পাকিস্তানি সেনার সামনে। একঝাঁক গুলি এসে তাঁদের মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। বাকী ও তাঁর সহযোদ্ধারা পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। দুটি বুলেট এসে লাগে বাকীর মাথায় ও সহকারী বাবুলের দেহে। বাকি মুক্তিযোদ্ধারা কোনোমতে আত্মরক্ষা করেন।

শহীদ বাকীর বোন দেলোয়ারা গনি প্রথম আলোকে বলেন, বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করার পর সেদিন পাড়ার আরও অনেকের সঙ্গেই দেখা করেছিলেন বাকী। সেখান থেকেই হয়তো একজন খবর দিয়েছিল শত্রুপক্ষকে।

মাঝে মাঝে বাকী বিক্রমপুরে গ্রামের বাড়িতে এসে মায়ের সঙ্গে দেখা করতেন। দেলোয়ারা গনি প্রথম আলোকে সেসব দিনের কথা বলেন। পিঠোপিঠি বোন বলে বাকীর সঙ্গে তাঁর অনেক স্মৃতি। সেসব কথা উঠলে এখনো ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না তিনি। কান্নায় ভিজে আসে গলা। দেলোয়ারা গনি বললেন, প্রথমবার যখন বাকী এলেন দেখা করতে, সেবার মায়ের জন্য শাড়ি আর জর্দা নিয়ে এসেছিলেন। বোনদের জন্য এনেছিলেন গলার হার ও গয়নার সেট।

দেলোয়ারা বলেন, আরবিতে বাকী নামের অর্থ চিরন্তন। মুক্তিযুদ্ধ করে তিনি চিরন্তন হয়ে গেছেন। অনেক সাহসী ছিলেন তাঁর ‘মেজ ভাই’। প্রাণের কোনো ভয় ছিল না। চঞ্চল ছিলেন। সবাইকে ভালোবাসতেন, মাতিয়ে রাখতেন। জামাকাপড়ের ব্যাপারে শৌখিন ছিলেন, ছবি তুলতে ভালোবাসতেন। বাকীর অনেকগুলো ছবি এখনো দেলোয়ারার কাছে আছে।

মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য আবদুল্লাহিল বাকীকে ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর বীর প্রতীক খেতাব দেয় বাংলাদেশ সরকার। তাঁর নামে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে পল্লীমা সংসদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি পাঠাগার—শহীদ বাকী স্মৃতি পাঠাগার। খিলগাঁওয়ে শহীদ বাকীর নামে একটি সড়কের নামকরণও করা হয়েছে।

(সংগৃহীত)

Author: রক্তবীজ ডেস্ক

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment