শাপলার সুবাস

শাপলা আপা আত্মহত্যা করেছে। কথাটা শুনেই চমকে উঠলাম। লেখাপড়া বেশি না জানলেও শাপলার চিন্তাচেতনা বেশ পজেটিভ। সবসময় সবাইকে পজেটিভ উপদেশ দেয়, পড়শিদের বিপদে-আপদে একান্ত সাহায্যকারী। ভাবী- বোন কিংবা চাচী- দাদী কাকে সাহায্য করে না সে। সারাদিন গাধার মত খাটাখাটনি করার পরও মুখের হাসিটুকু কখনো মলিন হয় না তার। আমরা অবাক বনে যাই। শাপলা আপা এত কিছু পারে কিভাবে? সে কি আমাদের মত মাটিতে গড়া মানুষ নাকি অন্যকোন উপাদানে তৈরি? এত ধৈর্যই বা আসে কোত্থেকে তার?

চাচীকে জ্ঞান পর থেকেই অসুস্থ দেখে আসছি। তাই বড় মেয়ে হিসেবে শাপলা আপাকেই তাদের সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। অবশ্য তার দাদী বেঁচে থাকতে বেচারির একটু কষ্ট কম হত। শাপলা আপা তার বাবা- মার দ্বিতীয় সন্তান। প্রথম হচ্ছে জামিল ভাই। তারপর শাপলা আপা। শাকিলা, শিমু ছোট। আমি আর শাকিলা সমবয়সি। শিমু সবার ছোট। শাপলা আপা আমার থেকে প্রায় পাঁচ বছরের বড় কিন্তু শাকিলার চেয়ে আমার শাপলা আপার সাথেই বেশি ভাব। নতুন কোন কিছু রান্না করলেই আমার ডাক পড়বে নতুবা আমার জন্য লুকিয়ে রেখে দেবে। আমি ভেবে পাই না আপা আমাকে এতটা আদর কেন করে? একদিন লাজ শরমের মাথা খেয়ে বলেছিলাম, ‘আচ্ছা আপা তুমি আমাকে এত ভালোবাসো কেন? শাকিলা, শিমুকে তো এত ভালোবাসো না’।

– সত্যি কথা বললে তুই আবার ওদেরকে বলে দিবি নাতো?

– উহুম।

ফিসফিস করে শাপলা আপা আমাকে তার গোপন কথাটা বলল

– আমার না একটা ছোট ভাইয়ের খুব শখ। কিন্তু আমার তো নিজের ছোট কোন ভাই নেই তাই তোকেই আদর করি। তাই বলে ওদের আদর করি না তা কিন্তু না। দেখিস না শিমুকে ,ওর যত বায়না সব আমার কাছেই। বাবা- মার কাছে ওর কোন বায়না নেই।

এর উত্তরে আমি আর কিছু বলতে পারিনি। কিন্তু সেদিনের পর থেকে শাপলার আপার ন্যাওটা হয়ে উঠলাম আরো। আমাদের বাড়িতে কম শাপলা আপার কাছে থাকতে লাগলাম বেশি। এজন্য অবশ্য বাবা- মার কম বকাও খাইনি। যেখানে অন্য ছেলেরা মাঠে খেলাধুলায় বা বাবাকে কাজে সাহায্য করতে ব্যস্ত তখন আমি ব্যস্ত শাপলা আপাকে সাহায্য করায়। কখনো রান্নাঘরে, কখনো বাগানে, কখনো আবার তার নকশীকাঁথা সেলাইয়ের সময়  তাকে বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করতাম। আমার মা শুধু আমাকে বকেই ক্ষান্ত হতেন না বাড়ি বয়ে এসে শাপলা আপাকে দু’চার কথা শুনিয়ে যেতেন। কিন্তু সে কখনো কিছু মনে করতো না। শুধু আমি যে তার অন্ধভক্ত ছিলাম তা কিন্তু নয়। জামিল ভাইয়ের কয়েকজন বন্ধুও তার ভক্ত ছিল। কিন্তু ওদের মত আমার কোন মতলব ছিল না। ওরাতো খাবারের লোভে শাপলা আপার প্রশংসা করতো আর শাপলা আপাও তাদের পছন্দের খাবার তৈরি করে খাওয়াতো। কিন্তু আমার খাওয়ার প্রতি কোন লোভ ছিল না। তবুও শাপলা আপা আমাকে ছেড়ে কিছু খেত না। সবাইকে আড়াল করে আমার জন্য সে কিছু না কিছু লুকিয়ে রাখতো।

সে অনেক গুণে গুণি হলেও তার একটা গুণের কমতি ছিল তা হল লেখাপড়া। প্রাইমারির গন্ডি পেরুনো হয়নি তার। মা অসুস্থ্, বাবা সারাদিন ধরে দোকানে থাকেন । গঞ্জে তাদের বড় কাপড়ের দোকান, দাদী বুড়ো মানুষ সবসময় পেরে উঠেন না। কাজের মহিলা একটা থাকলেও তার হাতের রান্না খেত না। মা – দাদীর মুখে শুনে এসেছি,  স্কুলে কম সংসারের কাজে বেশি সময় দিতো শাপলা আপা। গ্রামের স্কুলে অতটা ধরাবাধা নিয়মও ছিল না যে আসতেই হবে। তাছাড়া স্কুলে গেলেও প্রায়ই নাকি তাকে স্কুল থেকে ডেকে নিয়ে আসা হত। ছোট থাকতে একদিন শাপলা আপাকে বলেছিলাম

– আচ্ছা শাপলা আপা সবাই স্কুলে যায় তোমার স্কুলে যেতে ইচ্ছা করে না?

 – নাহ্ করে না। স্কুলে আমার ভালোলাগে না।

আমার এতদিনের জীবনে তাকে একদিনও খেলাধুলার ধারে কাছে ঘেঁষতে দেখিনি। একটা মানুষ কিভাবে এতটা দায়িত্ব নিতে পারে। কোথায় যেন পড়েছিলাম “কাজকে ভালোবাসলে কাজের মাঝে আনন্দ পাওয়া যায়”। শাপলা আপাও নিশ্চয় কাজকে অনেক ভালোবাসে। কোনদিন তার মুখে কাজের ক্ষেত্রে ‘না’ কথাটা শুনিনি। খুবই সাহসী আর ধৈর্যশীল ছিল সে। আমি সেটা বুঝেছিলাম একটা ঘটনায়।

জামিল ভাইয়ের বন্ধুরা তাদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করতো প্রায়ই। কিন্তু একজন বেশি আসতো। সেই একজনের উদ্দেশ্য শুধু শাপলা আপার হাতের মজার মজার খাবার ছিল না, ছিল অন্য কিছু। আর সেই অন্য কিছুটা শাপলা আপা বোঝার আগেই গ্রামবাসী বুঝে ফেলেছিল। কিন্তু এখানেও সেই অবলারই দোষ। সে প্রশ্রয় না দিলে কি আর সাফি ভাই এত ঘনঘন তাদের বাসায় আসতো! নিশ্চয় সে সাফি ভাইকে ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে কব্জা করেছে। তা না হলে সাফি ভাইয়ের মত ছেলের পক্ষে এমন অশিক্ষিত, কালো (গায়ের রং দুধে আলতা না হলেও চেহারায় একটা মায়া মায়া ভাব ছিল শাপলা আপার) একটা মেয়েকে মনে ধরার প্রশ্নই আসে না। ফলাফল জামিল ভাইয়ের সাথে সাফি ভাইয়ের সম্পর্ক নষ্ট সেই সাথে জামিল ভাইয়ের অন্য বন্ধুদেরও তাদের বাড়িতে আসা বন্ধ। আমি তখন সবে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। অত কিছু বুঝতাম না। কিন্তু শাপলা আপার কষ্টটা বোঝার চেষ্টা করতাম। তাই ছোট মুখে একদিন বড় কথা বলে ফেললাম

– আচ্ছা শাপলা আপা তুমি কি সাফি ভাইকে ভালোবাসো?

– হুম বাসি। আমি তো তোকেও ভালোবাসি। তাহলে দোষ কি বল? সে আমার বড় আর তুই আমার ছোট বলেই তোকে ভালোবাসা দোষের নয় তাকে ভালোবাসা দোষের? বিশ্বাস কর টোপন আমি সাফি ভাইকে শুধু ভাই হিসেবেই ভালোবেসেছি। তোকে যেমন বাসি।

– কিন্তু সেদিন সবার সামনে তুমি মিথ্যে বললে কেন?

– সেদিনের ব্যাপারটা ছিল অন্য। সেদিন ‘ভালোবাসি’ কথার মানেটা অন্যরকম হতো। আমি যে তাকে শুধুই বড় ভাই ভেবে শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি সে কথাটা কেউ বিশ্বাস করতো না। আজও করবে না। কিন্তু আজও আমি সাফি ভাইকে আগে মতোই সমান ভাবে শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি। এই কথাটা কেউ কোনদিন জানবে না এমনকি সাফি ভাইও না।

– কিন্তু আমি যে জানলাম?

– আমি তোকে বিশ্বাস করি টোপন।

আমি আর কোন কথা বাড়াই নি। প্রাইমারির চৌকাঠ না পেরোলেও অনেক বই পড়তো শাপলা আপা।  জামিল ভাইয়ের বই পড়ার অনেক নেশা ছিল তাই প্রচুর বই কিনতো সে। শাপলা আপা অবসরে জামিল  ভাইয়ের সেই বইগুলো পড়তো। যে জায়গাগুলো বুঝতে পারতো না মার্ক করে রেখে পরে জামিল ভাইয়ের কাছ থেকে বুঝে নিতো।  আর তাই অনেক সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারতো সে।

আমি এখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। লেখাপড়ার জন্যই শহরে থাকা। খবরটা শুনেই আমি ছুটছি। উদ্দেশ্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সেখানে নেওয়া হয়েছে শাপলা আপাকে। আমি পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের কোন আশ্চর্যই স্বচক্ষে দেখিনি। কিন্তু শাপলা আপাকে দেখেছি। সে আমার কাছে এক আশ্চর্য। কিভাবে কি হল? কিছু ভাবতে পারছি না। কি এমন কষ্ট, কি এমন দুঃখ সে পেল যে তাকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হল? শাপলা আপা তো এতটা ঠুনকো মানুষ নয়। কি এমন ঘটনা ঘটল? সাফি ভাইয়ের ঘটনার মত কোন ঘটনা নয় তো? সাফি ভাই তার মনে অনুভূতি তৈরি করতে না পারলেও এই দীর্ঘ পঁচিশ/ছাব্বিশ বছরের জীবনে তার মনের ঘরে যে কেউ নতুন করে উঁকি দেয় নি বা কারো প্রতি তার অনুভূতি জন্মায় নি এমনটা ভাবাও তো বোকামি। সেরকম কিছু নিয়ে কি ঝামেলা?

মেডিকেলে পৌঁছে শুনলাম সে আমাদের মাঝে নেই। সবাইকে ফাঁকি দিয়ে সে চলে গেছে না ফেরার দেশে।

সন্ধ্যার পর শাপলা আপাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হল। শাকিলা আগে থেকেই কেঁদে কেঁদে চোখ লাল করে ফেলেছে। শাপলা আপাকে দেখে সে মাতম শুরু করে দিল। আবছা আবছা শুনেছিলাম ব্যাপারটা এখন শাকিলার বিলাপ আর প্রত্যাক্ষদর্শী শিমুর কাছ থেকে পুরোটা শুনলাম।

উঠোনে শুকোতে দেওয়া কাপড় – চোপড়, রান্নার কাঠখড়সহ আরো কিছু জিনিস বৃষ্টিতে ভিজে একসার হয়ে গেছিল বলে শাপলা আপা শাকিলাকে বকাঝকা করে। কিন্তু শাকিলার কোন কারণে মন খারাপ থাকায় শাপলা আপার সাথে সে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। তর্কের এক পর্যায়ে শাপলা আপা বলে

– আমাকেই কেন সব কাজ করতে হবে? তুই করতে পারিস না?

– না পারি না।

– ওরে আমার নবাবনন্দিনী।

– হ্যাঁ আমি নবাবনন্দিনী, তোমার মতো তো আর কাজের মেয়ে নই।

– কি! আমি কাজের মেয়ে?

– নয় তো কি? লেখাপড়া তো কিছুই করো নি। তোমার জন্য যে সব ঘর আসে প্রায় সব মজুর-মুটে-কুলি। তোমাকে বাবা না পারছে গিলতে না পারছে ওগরাতে। তোমার জন্য না ভাইয়ার ভালো জায়গায় বিয়ে হচ্ছে না আমার। এমন জঞ্জালের জীবন নিয়ে বেঁচে থেকে কি লাভ! মরতে পারো না তুমি?

ছোট বোনের মুখে এমন কথা বোধহয় কারো পক্ষেই হজম করা সম্ভব নয়; বিশেষ করে যাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করে বড় করা হয়। মাটির মত সর্বংসহা শাপলা আপা আর সইতে পারেনি। গৃহস্থ্ ঘরে বিষের কমতি থাকে না। জমিতে দেওয়ার জন্য ঘরে একটা উচ্চমাত্রার রাসায়নিক ওষুধ ছিল সেটার সবটুকুই সাবাড় করেছে সে।

বর্ষার পানি শুকিয়ে যাওয়ার আগেই ঝরে গেল আমাদের গ্রামের চিরজীবন্ত শাপলা নামক ফুলটি।

অঙ্কনা জাহান
অঙ্কনা জাহান

 

Author: অঙ্কনা জাহান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment