শিক্ষক ও আমাদের সমাজ

শিক্ষক ও আমাদের সমাজ

শিক্ষক ও আমাদের সমাজ  এক ও অভিন্ন। একে অপরের পরিপূরক। শিক্ষকরা নিরলসভাবে সমাজকে শিক্ষিত করার লক্ষ্যে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য যুগ যুগ ধরে ন্যায়, নিষ্ঠা ও সততার সাথে পালন করে আসছেন। কিন্তু সেই নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকরাই যদি সমাজের কতিপয় অসাধু লোক কর্তৃক নিগৃহীত হয়, তখন খুব কষ্ট হয়।

বিশ্বের ১৪৭ টি দেশের প্রায় ২ কোটি  ১৬ লক্ষ শিক্ষক কর্মচারি রয়েছে, যারা কোনো না কোনো ভাবে প্রতিদিন নিগৃহীত হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে নিগৃহীত ও নির্যাতনের ঘটনা ভয়াবহ।

১৯৪৮ সালে মানবধিকার ঘোষণা হতে বিভিন্ন জাতি ও আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংগঠনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা এবং ইউনেস্কো, আইএলও এর  সদস্যভুক্ত দেশগুলোর আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই ১৯৬৬ সালের ৫ই অক্টোবর ফ্রান্সের রাজধানী  প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তঃসরকার সম্মেলনে শিক্ষকদের  ঐতিহাসিক দলিল অর্জিত হয়েছে। এই দলিলে ১৪৬ ধারা-উপধারাায় শিক্ষাকে জাতি গঠনের ও উন্নয়নের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে শিক্ষকদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকার, মর্যাদা এবং তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সারা বিশ্বে শিক্ষকদের জন্য প্রণীত এই সনদের কয়েকটি বিষয় নিম্নে দেয়া হলোঃ

মানব ব্যক্তিত্বের সার্বিক বিকাশ এবং জনগোষ্ঠীর আত্মিক, নৈতিক, সামাজিক. সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রগতির লক্ষ্যে মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতায় গভীর শ্রদ্বাবোধ সৃষ্টি;

শিক্ষার অগ্রগতিতে শিক্ষক সমাজের যোগ্যতা, দক্ষতা ও প্রয়োগিক গুণাবলী সমুন্নতকরণ;

শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের চাহিদার সাথে মর্যাদার সঙ্গতি সাধন;

শিক্ষকতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক পেশা হিসাবে স্বীকৃত;

শিক্ষক সংগঠনগুলোকে একটি শক্তি হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে শিক্ষার অগ্রগতিতে বিশেষত শিক্ষনীতি প্রনয়নসহ শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কার্য়ক্রমে এ শক্তির অবদান সুনিশ্চিতকরণ;

শিক্ষকদের স্বার্থে চাকরির স্থিতিশীলতা ও কার্যাকালীন নিরাপত্তাবিধান নিশ্চিত করা;

শিক্ষকদের পেশাগত অবস্থান ও জীবনের অস্তিত্বের ওপর হামলার বিরুদ্বে সুরক্ষার ব্যবস্থা;

শিক্ষকতা পেশায় দায়িত্ব পালনে শিক্ষায়তনে স্বাধীনতা ভোগের সুযোগ প্রদান;

শিক্ষক-অভিভাবক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষায় কর্তৃপক্ষের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ রোধ;

শিক্ষক ও নিয়োগকর্তার মধ্যে কোন বিরোধ  দেখা দিলে তা নিরসনের জন্য উপযুক্ত যৌথ ব্যবস্থা প্রবর্তন;

শিক্ষকদের মর্যাদাকে সমুন্নত করার লক্ষ্যে প্রদেয় বেতন ভাতা নিশ্চিতকরণ;

সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ভোগের অধিকার সুরক্ষা ; শিক্ষকদের সামাজিক নিরাপত্তা তাদের অধিকার হিসাবে সংরক্ষণ ইত্যদি।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজ বাংলাদেশে ইউনেস্কো, আইএলও সনদের বিভিন্ন ধারা উপধারা লংঘিত হচ্ছে। যা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য হুমকি স্বরূপ। তার থেকে উত্তরণ জরুরী। জানা যায় কোনো কোনো শিক্ষককে সরকারি বিধিবিধান না মেনে বছরের পর বছর সাময়িক বরখাস্ত করে রাখা হয় এবং তাদের বেতন ভাতাদিও বন্ধ করে রাখা হয়। ক্ষেত্র বিশেষে চাকুরিচুত্যও করা হয়।

  উল্লেখ্য যে, গভর্নিং বডি কর্তৃক বেসরকারী স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকদের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সাময়িক বরখাস্ত করে তাদের বেতন ভাতাদি বছরের পর বছর বন্ধ করে রাখা হয়। এতে তাঁরা পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হন। শিক্ষক হলো আধুনিক বিশ্ব নির্মাণের প্রবক্তা ও মানুষ গড়ার কারিগর। তাদেরকে এভাবে সামাজিক ও মানসিকভাবে নিগৃহীত করে কাঙিক্ষত শিক্ষা অর্জন সম্ভব নয়। জানা যায় কোনো কোনো শিক্ষককে ৮/৯ বৎসর বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে সাময়িক বরখাস্ত করে বেতন ভাতা বন্ধ রাখা হয়েছে। যা খুবই অন্যায়, অমানবিক ও শিক্ষকের প্রতি চরম অবহেলা। এর থেকে মুক্তির লক্ষ্যে মহামান্য হাইকোর্ট ৩৬৫৭/২০১৫ নং রিট আবেদনের রায়ে কোনো শিক্ষককে ৬০ দিনের বেশি সাময়িক বরখাস্ত না রাখার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে এবং ৬০ দিনের বেশি সাময়িক বরখাস্ত রাখা হলে তিনি বেতন ও অন্যান্য ভাতা সমুদয় প্রাপ্ত হবেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও এই আদেশকে বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ দান করেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং ৩৭,০০.০০০০.০৭২.৩১.০০৭.১৫ ৬৯৪ তারিখ ০৬/০৮/১৭ খ্রিঃ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) স্মারক নং ৩৭,০২.০০০০.১০৭.৩১.০৮৬.১৬ তারিখ ২১/০৮/১৭ খ্রিঃএর  আদেশ এ এই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।    বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এ আদেশকে একটি যুগান্তকারী, ঐতিহাসিক আদেশ হিসাবে আখ্যায়িত করছি এবং সংলিষ্ট সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এই আদেশ অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্যও অনুরোধ করছি।

 

শিক্ষকদের প্রতি সকলের সম্মানবোধ জাগ্রত হোক এই প্রত্যাশা করছি। কারণ শিক্ষক হলো জাতির বিবেক, মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষক পেশাটা একটি মহান পেশা। পূর্বে কোনো রকমে মেট্রিক পাশ করলেই সরকারি চাকুরি পাওয়া কোনো কঠিন কাজ ছিল না। কিন্তু শিক্ষকতা পেশায় যাওয়া খুবই কঠিন ছিল। প্রাচীনতম স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ, সুপারদের শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখলে আশ্চর্য  হতে হয়। প্রাচীনতম কোনো কোনো স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ, সুপারগন বিএ, বিএড, এমএ,এমএড,এম-এসসি,এমকম,পিএইচডি, ডিগ্রিধারী মেধাবীরাই কেবল শিক্ষকতা পেশায় আসতেন। অনেকের সরকারী ভালো চাকুরি হওয়ার পরেও  শুধুমাত্র সম্মানের জন্যে সরকারী চাকুরি ছেড়েও শিক্ষকতা পেশায় আসতেন। শিক্ষকের প্রতি মানুষের মাঝে সে সম্মান ছিল অন্তরের অন্তস্থল থেকে।সমাজের প্রতিটি মানুষ শিক্ষকদেরকে সম্মান করত। তাঁদেরকে বিশ্বাস করত। শিক্ষক ছিল বিশ্বস্ততার প্রতীক। শিক্ষক হলো ন্যায়পরায়ণতা, সহনশীলতা, মহানুভবতা,মমত্ববোধ,বিচক্ষণতা, সততা,আদর্শবাদীতার প্রতীক। শিক্ষক হলো সমাজের মডেল। তাইতো তখনকার সময় কেবল মেধাবী ও উচ্চ শিক্ষিতরাই  শিক্ষকতা পেশায় আসতেন শুধুমাত্র সম্মান ও মর্যাদার জন্যে , অন্যেরা এই সুযোগ পেতেন না। অনেক শিক্ষকই শিক্ষক পরিচয় দিয়ে আত্মতৃপ্তি বোধ করতেন। শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ও নিবেদিত ব্যক্তিবর্গের কর্মকান্ডে এই শিক্ষক শব্দটা শ্রুতিমধুর, সম্মান ও মর্যাদার আসন লাভ করেছিল। যার ফলে মানুষ শিক্ষকদেরকে সম্মান স্বরূপ স্যার,মহাশয়,হুজুর,গুরু, ঠাকুর, মাষ্টার, দীক্ষক, উপাধ্যায়, শাসিত, শাস্তা, শিক্ষাদাতা, বিদ্যাবাগীশ, পন্ডিত, উপদেষ্টা ও আশ্চার্য বলে সম্মোধন করত। এতে করে শিক্ষকরা নিজেদেরকে সম্মানিত বোধ করত। যারা এই সম্বোধন করত তাঁরা মন থেকেই করত, কোনো ধরণের ভয় বা নিয়ম মানার জন্যে করতো না। পক্ষান্তরে বস, প্রশাসক,নেতা ইত্যাদির ক্ষেত্রে সম্বোধনগুলি কিছুটা নিয়ম মানা বা খুশি করার জন্যই বলা হত।

পূর্বে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষাদান করেছেন জাতিকে শিক্ষিত করার জন্য, কোনো কিছু পাওয়ার জন্যে নয়। যুগযুগ ধরে শিক্ষকেরা শিক্ষার আলো চারিদিকে নিঃস্বার্থভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কেবল শিক্ষাদানেরই তাঁদের আনন্দ নিহিত ছিল। অপরকে শিক্ষা দিতে পারলেই তাঁরা নিজেকে ধন্য মনে করতেন। এমনও নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক ছিলেন যারা শুধু বাড়ি বাড়ি গিয়েই নয়, তাঁরা নিজ গৃহে শিক্ষার্থীদের রেখে ভরণপোষণসহ নিজ খরচে শিক্ষা দান করেছেন। শিক্ষক তাঁর শেষ সম্বল জমিটুকু বিক্রি করে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন এমন নজীরও রয়েছে।

আজ এমন শিক্ষকের খুবই অভাব। বেশীর ভাগ শিক্ষকই আজ কোচিং খুলে শিক্ষা বাণিজ্যে নেমেছেন। তার পরেও বলব, আজও আদর্শ শিক্ষকের কমতি নেই। তাঁরা আজও নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়ে নিরলস ভাবে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণে। কিন্তু সেই নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের থেকে শিক্ষা অর্জন করে সমাজে আজ যারা প্রতিষ্ঠিত, রাষ্টের গুরুত্বপূর্ণ পদ মন্ত্রী, এমপি, আমলা, আইনপ্রণেতা তাঁরা কি কখনো শিক্ষকদের কথা ভাবেন?  আজও সেই সব নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকরা সমাজে অবহেলিত । যে দেশে শিক্ষকের মর্যাদা নেই, সে দেশে কাঙিক্ষত শিক্ষা অর্জন সম্ভব নয়। পৃথিবীর এমন অনেক দেশ আছে যেখানে শিক্ষকদের অবস্থান অন্য সকল পেশার মানুষের উর্দ্ধে। তাই মান সম্পন্ন শিক্ষা দানের লক্ষ্যে, শিক্ষিত ও উন্নত জাতি গঠনে শিক্ষকদের যথাযোগ্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে হবে। এটাই আমার অাহ্বান।

প্রিন্সিপাল এম.এ. মোনায়েমপ্রিন্সিপাল এম.এ. মোনায়েম
প্রিন্সিপাল এম.এ. মোনায়েম

 

 

Author: প্রিন্সিপাল এম.এ. মোনায়েম

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment