সাঈফ মীজান আছে, নাকি  নেই

Saif Mizan

কি বার ছিল সেদিন মনে নেই। তখন সময়ের হিসেব  ছিল না। মুখ্য ছিল বেঁচে থাকা । যেন তেন ভাবে বেঁচে থাকা। দুঃসহ সময়টাকে পার করা। আর প্রতীক্ষা করা এক নতুন দিনের। যেদিন এদেশের আকাশে উড়বে নতুন পতাকা। স্বাধীন দেশের স্বাধীন পতাকা। সে পতাকা হবে একান্তই নিজের। তাতে ভাগ থাকবে না একহাজার মাইল দূরের বিজাতীয়দের।

সেই কাল গোণার মুহূর্তে আমি স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছাত্রী। নিজেকে নিয়ে সদা বিব্রত। এ বয়সের মেয়েরা পাকিস্তানী হানাদার আর তার দোসরদের চোখে নিতান্তই লোভনীয়।  সর্বদা নিজেকে লুকিয়ে রাখি । মা থাকেন আমাকে নিয়ে  ভীত সন্ত্রস্ত। ভাইয়েরা যুদ্ধে।  বয়স আব্বাকেও  দমাতে পারেনি। তিনিও করে চলেছেন দেশের কাজ।  বড়বোন অন্ত:সত্তা। একুশ মাইল রাস্তা পায়ে হেঁটে তিনি এসেছেন গ্রামে। আমাদের নড়াইলের বাড়ি পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা এখন সহায় সম্বলহীন, নিঃস্ব। বেঁচে আছি হবখালি গ্রামের মুক্তিপাগল মানুষের দয়ায়।

আমাদের সবার বড় আপা বুলবুল। তারপরই বড়দা সাঈফ মীজানুর রহমান( দুলু) । বড়দা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ সালের ৩১ ডিসেম্বর  নড়াইলের ‘সাঈফ ভীলা’ নামের বাড়িটিতে । প্রত্যুষের প্রথম আলোয় পুত্রের মুখ দেখে আব্বা নাম রাখলেন মীজান। মীজান অর্থ তুলাদন্ড। সত্য আর ন্যায়ের প্রতীক। সারাজীবন এ নামের সম্মান রেখে গেছেন বড়দা।  বড়দা দুলুর জন্মের আগে  আমার মা  অন্তঃসত্তা মা  বেড়াতে গিয়েছিলেন কলকাতার বৈঠকখানা রোডে মামার বাড়িতে। সেখানেই দেখেছিলেন মহররমের দুলদুল ঘোড়া। কী তার তেজ, কী তার শক্তি!  বলগা ছোটানো অশ্ব যেন। তখনই মনে মনে স্বপ্ন দেখেছিলেন যদি পুত্রসন্তান হয় নাম রাখবেন দুলদুল। রেখেছিলেনও তাই। ভালবাসার মানুষদের মুখে উচ্চারিত হতে হতে নামটা হয়ে গেল দুলু। দুুলদুল ঘোড়ার মতই দাদা  ছিলেন  তেজদীপ্ত আর শক্তিমত্ত। সাথে ছিল  প্রখর বুদ্ধিমত্তা।  

বড়দার জীবন  ছিল রাজনৈতিক ঐতিহ্যমন্ডিত।  ছিল দেশের প্রতি গভীর ভালবাসা আর দেশের মানুষের প্রতি অপরিসীম দরদ। দেশপ্রেমের চেতনা আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে ঠেলে দিয়েছিল তাকে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের পক্ষে দাদার কন্ঠ ছিল সদা সোচ্চার। অন্যদিকে মানুষের প্রতি মমত্ববোধ থেকে উৎসারিত হয়েছিল দাদার গল্প কবিতা উপন্যাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক ও পত্রিকা সম্পাদক হিসেবে সবার দৃষ্টি  আকর্ষণ করেছিলেন তিনি।  নাটকের প্রতি বড়দার ছিল অপরিসীম আগ্রহ। চারটি নাটক লিখেছিলেন । অনেক তারার স্বর, প্রতিবিম্ব, প্রবাল ও ক্রান্তিকালের আকাশ । প্রতিবিম্ব নাটকটি পিরোজপুরে মঞ্চস্থ হয়। এ নাটকে বড়দা নিজে অভিনয় করেছিলেন। ক্রান্তিকালের আকাশ নাটকটি অসমাপ্ত । রাজনৈতিক পটভূমিকায় লেখা এ নাটক। মৃত্যুর সময় পর্যন্ত বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সত্তরের নির্বাচন অবধি  বড়দা এ নাটকে  লিখে যেতে পেরেছিলেন। এই নাটকের চরিত্রগুলোও রাজনৈতিক। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক,  হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধৃ শেখ মুজিবুর রহমান, আইয়ুব খান, ইয়াহিযা খান প্রমুখ এ নাটকের চরিত্র। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ নাটকটি অভিনীত হওয়ার সুযোগ পেলে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জনমনে আগুন ধরিয়ে দিতে পারত নিঃসন্দেহে।

ইংরেজি এবং বাংলা উভয় ভাষাতে পনেরটির বেশী অর্থনীতির পাঠ্যবই লেখেন বড়দা । অবশ্য বড়দার প্রথম বইটি প্রকাশিত হয়েছিল তিনি দশম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায়। বড়দাকে অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তক রচয়িতা  হিসেবেই অনেকে জানেন। আমাদের দুর্ভাগ্য তার কোন সৃষ্টিশীর রচনা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়নি। তাই বড়দার লেখক সত্তার একটা দ্বিখন্ডিত অংশের সাথেই আমরা পরিচিত হই। তার সার্বিক লেখক প্রোফাইল দেখার সুযোগ  থেকে আমরা চিরকালের মতো বঞ্চিত  হয়েছি।

আমাদের  পিতা এ্যাডভোকেট আফসার উদ্দীন আহমেদ ছিলেন নড়াইলের প্রতিষ্ঠাবান আইনজীবী।  তিনি তৎকালীন নড়াইল মহকুমা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। যশোর জেলা আওয়ামী লীগের  প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি।  আমাদের মা মতিয়া আহমেদও ছিলেন প্রগতিশীর চিন্তাভাবনায় বিশ্বাসী, সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী। আব্বা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন । ১৯৫৬ কিংবা ১৯৫৭ সালের দিকে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও প্রাদেশিক মন্ত্রীসভার গরুত্বপূর্ণ সদস্য। তিনি ওই সময় নড়াইলে এলে আব্বা বড়দাকে তাঁর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। বড়দাকে দেখে সেদিন চমকে গেছিলেন বঙ্গবন্ধু। কারণ ছাত্রলীগের যে অংশটি বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে  কাজ করে  যাচ্ছিল নড়াইলে তার একজন কিশোর সদস্যের দেখা পাবেন ভাবেননি তিনি। সেদিন মহান নেতার কাছে দাদা যে দীক্ষা নিয়েছিলেন, যে শপথ উচ্চারণ করেছিলেন জীবন দিয়ে সে শপথের মর্যাদা রক্ষা করে গেছেন।

শিক্ষা আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার কারণে কলেজ জীবনেই তিনি কারারুদ্ধ  হন। কলেজ জীবন শেষ  করার পর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে।  বাঙালির সংস্কৃতি কৃষ্টি ও স্বার্থের পরিপন্থী  ১৯৬২ এর শিক্ষা আন্দোলনে বড়দা  ছিলেন সামনের সারিতে। ১৯৬৪ এর কনভোকেশন আন্দোলনে ছিলেন অগ্রভাগে। সেদিন সচেতন ছাত্র সমাজ কুখ্যাত গভর্নর মোনেম খানের হাত থেকে স্নাতকপত্র নিতে দীপ্ত ও সোচ্চার কন্ঠে প্রতিবাদ জানায় । সেদিন কার্জন হলের সমাবর্তন স্থলে  প্রবেশকালে  মোনেম খান  তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। বড়দা মাত্র কয়েক গজ দূর থেকে মোনেম খানের গাড়ি লক্ষ্য করে ইট ছোড়ে।  সে ছবি সরকারী গোয়েন্দারা তুলে রাখে । দেশদ্রোহীতার অকাট্য প্রমাণ , লাটসাহেবের গায়ে  হাত দেয়ার সামিল। বড়দা  সমস্যার সম্মুখীন  হয় চাকুরিতে প্রবেশকালে । সেন্ট্রাল সুপিরিয়র পরীক্ষায় মনস্তাত্বিক লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হলেও স্পেশাল ব্রাঞ্চ  দেশদ্রোহীতার অপরাধে তাঁকে ছাড়পত্র দিতে অস্বীকার করে । একই বছর বড়দা প্রাদেশিক সরকারের পরীক্ষাও দিয়েছিল।  প্রাদেশিক সরকারের চাকুরি দেয়া হলো বড়দাকে,  বিরত করা হলো কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরি থেকে।  চাকুরিতে প্রবেশ করেই বড়দা সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার বিষয়বস্তু ছিল ‘তিনি  যদি দেশদ্রোহীই হন তাহলে যে অপরাধে তাঁকে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরি থেকে বিরত করা হল সেই একই অপরাধে কি করে তাকে প্রাদেশিক সরকারের চাকুরি দেয়া হল। তাহলে কি পাকিস্তান অখন্ড দেশ নয়।’

এই চাকুরিতে আসার আগে বড়দা  অধ্যাপনা এবং ইউনাইটেড বাংকে কিছুদিন চাকুরি করেছিলেন।  কিন্তু বাংলায় নাম স্বাক্ষর করাতে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় ব্যাংকের চাকুরি তিনি ঘৃণাভরে ত্যাগ করেছিলেন ।  

মুক্তিযুদ্ধকালে  তিনি ছিলেন পিরোজপুরের ১ম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ও ট্রেজারি অফিসার। যুদ্ধের শুরুতেই  পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তিনি জনগণ ও পুলিশ বাহিনীিকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। পিরোজপুরের এসডিও, এসডিপিও এবং বড়দা মুক্তিপাগল জনতার সাথে একাত্ম  হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন  পাকিস্তানের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের অনুকূলে অফিস পরিচালনা করার।  সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পড়েছিল বড়দার উপরে।  ট্রেজারির সমস্ত অস্ত্র শস্ত্র ও গোলাবারুদ বড়দা  তুুলে দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে । চিহ্নিত ছিলেন ছাত্রজীবন থেকেই । মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বড়দার এই জোরালো ভূমিকার কথা  রাজাকার শান্তিবাহিনী আর তার দোসরদের তৎপরতায় পৌঁছে গিয়েছিল পাকিস্তানীদের কাছে।

সেদিন ৫ মে ১৯৭১ , যুগপৎ নৌবিমান আর স্থল পথে আক্রমণ করেছিল পাকিস্তানীরা।  এক পর্যায়ে ভেঙে গিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধবূহ্য। ধরা পড়েছিল বড়দা। পাকিস্তানী সৈন্যরা তাঁকে জিপের চাকায় বেঁধে টেনে হিঁচড়ে এবড়ো থেবড়ো  রাস্তা দিয়ে ফুলস্পীডে চালিয়ে দেয় জিপ।   এক সময় ক্ষতবিক্ষত বড়দাকে  নিয়ে দাঁড় করানো হয় বলেশ্বরের ঘাটে।  সারমেয়রা তাঁকে বলে , ‘বল পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’ বড়দা সর্বশক্তি দিয়ে উচ্চারণ করেন ‘জয়বাংলা।’ বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝরা করে দেয়া হয় তাঁর দেহ।

সেদিন বড়দার শরীরে কোথায় গুলি লেগেছিল, কয়টা গুলি লেগেছিল জানা যায়নি। কারণ তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। সেদিন গল গল করে রক্ত ঝরে রক্তিম হয়েছিল বলেশ্বরের জল । সে রক্ত গায়ে মেখে  পবিত্র হয়েছিল  বলেশ্বর।   

লেখার শুরুতে যে দিনের কথা উল্লেখ করেছিলাম সেটা ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম দিকের কোন একটি দিন।  আপা  ঘন ঘন চোখ মুছছিলেন, মা বার বার ডুকরে কেঁদে উঠছিলেন। কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করে কোন উত্তর পাইনি। পরে জেনেছিলাম বড়দার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বড়দার খোঁজে মা আব্বা দাদারা অনেকবার গিয়েছেন পিরোজপুরে । খুঁজেছেন পিরোজপুরের প্রতিটি অলি গলি ।

মা চলে গেছেন, আব্বা গেছেন তারও আগে। মা আমৃত্যু বিশ্বাস করে গেছেন তার দুলু বেঁচে আছে। একদিন ঠিকই ফিরে আসবে । বড়দার জন্মদিনে আর প্রতিটি ঈদে কারো পদধ্বনি শুনলেই  চমক উঠতেন। পীর ফকিরের দরগায় ছুটতেন। তাবিজ কবচ থেকে শুরু করে যে যা বলতেন তাই-ই করতেন । আমার প্রগতিশীর মা ছেলের কারণে হয়ে গেছিলেন নিতান্তই অবুঝ, দিশেহারা।

আমরা ভাইবোনরা জানি বড়দা আর কোনো দিন ফিরে আসবেনা। তার কোন সন্তানও নেই যার মধ্যে আমরা খুঁজে পেতে পারি বড়দার প্রতিচ্ছবি। এদেশের কোথাও  বড়দার কোনো কবর নেই । যেখানে আমরা দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলতে পারি।

কবর না থাকলেও আমার মতো অসংখ্য ভাইহারা বোন চোখের জল ফেলে প্রতিনিয়ত। চোখের জল ফেলে আর ভাবে, এমন একটি দেশ পাবার জন্য কি এই আত্মহুতির প্রয়োজন ছিল? লোকে বলে শহীদের মৃত্যু নেই। আসলেই কি শহীদরা অমর? ভাইবোন  পরিবার আর বন্ধুজনের বাইরে সত্যিই কি  বেঁচে আছেন বড়দা? কোথায়,  কার অন্তরে ? ভাইকে হারানোর শোক কি আমাদের ব্যক্তিগত শোক, ভাইয়ের বীরত্বের  গর্ব কি আমাদের  ব্যক্তিগত?  এ প্রশ্নের জবাব কে দেবে। মাঝে মাঝে বিশ্বাসের ভিত্তিভূমি কেঁপে ওঠে বার বার । মনে হয় দেশ কি সত্যিই স্বাধীন হয়েছে ?

এদেশের আকাশে পতপত করে ওড়ে স্বাধীনতার পতাকা। মাঝে মাঝে ভাবি ও পতাকা কি ওড়ে , নাকি কাঁদে !

আফরোজা পারভীন​
আফরোজা পারভীন

 

 

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts