সায়াহ্নক্ষণ

চিঠি

অফিস থেকে ফিরে আশিকুর সাহেব মেয়েকে ডাক দিলেন।

-শিউলি মা এদিকে একটু আয় তো।

শিউলি তাড়াতাড়ি বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে বাবার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলে- জ্বী বাবা কিছু বলবে?

-তোর মা ফিরেছে?

-না বাবা।

-ঠিক আছে খাবার আন।

ডায়নিং টেবিল থাকা সত্ত্বেও আশিকুর সাহেব টেবিলে বসে খান না। দস্তরখানা বিছিয়ে খাবার খান। ছোটবেলার অভ্যাস তাই ছাড়তে পারেন না, সেই সাথে নবীজীর সুন্নত পালনও হয়। তিনি ভাত খাচ্ছেন আর মেয়ে পাশে বসে আছন। কখন কি লাগে বাবার তাই। ঠিক যেমন মা তার ছেলের পাশে বসেন তেমনিভাবে।আশিকুর সাহেব সবসময় মেয়ের রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকেন। উনার মায়ের রান্নার হাত পেয়েছে মেয়ে।কিন্তু আজ কোন কথা না বলেই আনমনে ভাত নাড়াচাড়া করছেন, খাওয়াতেও তেমন মন নেই। তাই শিউলি বাবাকে বলল

-বাবা তুমি কি কোন টেনশনে আছো?

-নাতো।

-তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি কোন টেনশনে আছো।

-তেমন কিছু না।তুই দেখি সত্যিই আমার মায়ের মতোই আমার সবদিক খেয়াল করিস।অত চিন্তা না করে পড়ালেখায় মন দে।

শিউলির বাবা আশিকুর রহমান জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের একজন মাস্টাররোল কর্মচারী। সবাই উনাকে আশিক বলেই ডাকে। দুই মেয়ে ও এক ছেলের বিয়ে হয়েছে। তারা যে যার মত করে থাকে। বাবা-মা আর বোনের খোঁজখবর কেউই খুব একটা করে না।শিউলির মা বাতের রোগী। প্রায়ই অসুস্থ্ থাকেন তিনি।তাই শিউলিকেই বাড়ির সবদিক দেখতে হয়। জেলা শহরের একটা কলেজে অনার্স্ তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী সে।তার  বিয়ের কথা চলছে। সেটা শিউলির নানাবাড়ির কাছাকাছি এলাকায়।তাই তার মা বাবার বাড়ি গেছে ভাইদের সাহায্যে ছেলের ব্যাপারে খোঁজখবর করতে।ব্যাপারটা শিউলির অজানা।

কয়েকদিন পর ছেলেপক্ষ শিউলিকে দেখতে এল। মেয়েকে উনারা পছন্দও করল। কিন্তু ছেলে সরকারী চাকরিজীবী বলে তারা মোটা অংকের যৌতুক দাবী করলো যা শিউলির বাবার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, একমাত্র সম্বল বাড়িটাই বিক্রি করে দিবেন।সন্তানদের ভালোর জন্যই যদি বাবার বিষয়-সম্পদ কাজে না লাগে তাহলে কি দরকার সেই বিষয় আশয়ের। সেই মতো বিভিন্ন জায়গায় কথাও চলছে।একদিন কথাটা শিউলির কানেও পৌঁছে গেল।সেদিন আশিকুর সাহেব বাড়ি বিক্রির বায়না নিয়ে বাসায় ফিরে স্ত্রীর হাতে টাকা দিয়ে বললেন মেয়েকে ডাকতে। শিউলির মা শিউলির ঘরে গিয়ে দেখল সে নেই। অসময়ে কোথাও যাওয়ার মেয়েও সে নয়। কিন্তু কোথায় যাবে তা ভেবে পেল না তার মা। অবশেষে একটা ভাঁজ করা কাগজ শিউলির পড়ার টেবিলের উপর দেখে সেটা নিয়ে প্রায় দৌড়ে স্বামীর কাছে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। আশিকুর সাহেব স্ত্রীর হাত থেকে ভাঁজ করা কাগজটা নিয়ে পড়তে লাগলেন।

বাবা/মা,

তোমরা যখন আমার চিঠিটা পড়বে তখন আমি তোমাদের থেকে অনেক দূরে।তোমাদের এরকম পরিস্থিতিতে ফেলতে আমি চাই নি। অনেকটা বাধ্য হয়েই এমনটা করলাম।রবি আমার ক্লাসমেট।সবসময় ভেবেছিলাম তোমাদের দুঃখ দিয়ে আমি কখনোই সুখ কিনতে পারবো না।তাই রবির প্রস্তাবে কখনো হ্যাঁ বলিনি। কিন্তু তোমরা আমার জন্য সুখ কিনতে চাইলে।সুখ কি কখনো কেনা যায় বাবা? তাই অন্ধকার অনিশ্চিতার পথে পা বাড়ালাম। সুখী হওয়ার জন্য নয়।আমি চাই না আমার জন্য তোমাদের মাথার উপরের ছাদটা হারিয়ে যাক।সুখে থাকার, সুখী হওয়ার গ্যারান্টি কে দিতে পারে বাবা?কেউ না।তবে একটু আশ্রয় সবারই প্রয়োজন।তবে তোমার প্রতি আমার এটাই রাগ, যে শিক্ষা নিজেই ধরে রাখতে পারবে না সেই শিক্ষা কেন তবে মিছেমিছি দিয়েছিলে বাবা?

                                           ইতি

                                          তোমাদের অযোগ্য সন্তান

                                           শিউলি

আশিকুর সাহেব চিঠিটা পড়া শেষ করে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলেন।স্ত্রীর অনেক ডাকাডাকির পরও খুললেন না।আর খুলবেনও না কোনদিন।

অঙ্কনা জাহান
অঙ্কনা জাহান

 

 

Author: অঙ্কনা জাহান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts