সূর্য ও ঝিঁঝিঁ পোকা

সূর্য ও ঝিঁঝিঁ পোকা

মঞ্জুশ্রি ওর মায়ের সাথে কখনোই কোথাও যেতে চায় না। ও যেমন মুখচোরা, ওর মা ঠিক ততখানি হুল্লোড়ে। যেখানে যায়, সেখানেই মনে হয় য়্যুনিভার্সিটির বন্ধু-বান্ধব বানিয়ে ফেলে। আন্টিরা তো বটেই, আঙ্কেলদের সাথেও বিরামহীন গপ্প করতে থাকে। ওর মা থাকলেই মিথস্ক্রিয়ার গতি রকেটের সাথে পাল্লা দেয়, নইলে স্বাভাবিক হাই-হ্যালো থেকে বড় জোর বাজারের জিনিষ পত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে টাইপের কথা বার্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। মঞ্জুশ্রীর মা বাজারের কুঁচো মাছের কানকো-লেজ নাড়িয়ে আদা-রসুনের খোসা ছিলে হলুদ বেটে আগুন ছাড়াই চুলোয় চড়িয়ে দিতে পারে। বাকিরা দিব্যি খড়কুটো গুঁজতে ব্যস্ত হয় গপ্পের চুলোয়।

এরকম আড্ডায় মঞ্জুশ্রীকে শুনতে হয়, বাচ্চারা যাও, তোমরা তোমাদের মত গপ্প করো গিয়ে। মঞ্জুশ্রী নিজেই নিজের কাছে দাবি জানায়, অমন মায়ের মেয়ে হিসেবে ওরকম আড্ডাবাজ হওয়া তার উচিত, বাকি বাচ্চাদের মাতিয়ে দেওয়া উচিত ওর নিজেরই, ঠিক যেমন ওর মা করছে বাচ্চাদের বাবা-মাদের। হয় না। মঞ্জুশ্রী গপ্পের সূত্র খুঁজে পাওয়ার জন্য হাস ফাঁস করতে থাকে। খুব একটা সফল হয় না। বেশির ভাগ সময়ই বাচ্চাগুলোর নাম, কোন্ স্কুলে পড়ে, কোন্ বিষয়টা পড়তে ভাল লাগে থেকে বড় জোর সাকিব আল হাসান অথবা অরিজিৎ সিং পর্যন্ত গড়াতে পারে মঞ্জুশ্রী। ওদিকে মা দিব্যি কাউকে হয়তো ডাকছে ‘ফ্রেন্ড’, সেই তিনি আন্টি হতে পারেন, আংকেল কেউ হলেও অবাক হবে না ও। মঞ্জুশ্রী জানে, ওর মা সূর্যের মত চারিদিকটা ঝলমল করে দিতে পারে। ও জোনাকি পোকার মত ঝিঁঝিঁ করে ডাকে, তাতে ফ্রেন্ড হয় কেউ? এরপরও হ’ল। শুভকে মঞ্জুশ্রীর সেই রকম ফ্রেন্ড বলে মনে হ’ল। মা-এর সাথে গিয়েছিল এক দাওয়াতে, ওখানেই ওর মত চুপচাপ বসে থাকা শুভকে দেখে ওর হৃৎপিন্ড থমকে গিয়েছিল। ছেলেটা জাস্ট জাস্টিন বিবার…সো সুইট!

শুভকে ও ফ্রেন্ড নয় বয়ফ্রেন্ড বানিয়েছিল। শুভর সাথে দেখা করার দিনগুলোতে মঞ্জুশ্রী যেন টগবগ করে ফুটত। মা নিজেই অবাক হয়ে বলত, মঞ্জু! তুই এত বক্ বক্ করছিস্ কী ভাবে?

শুভর সাথে যে ক’ দিন কথা হয়েছে, মঞ্জুশ্রী প্রচুর কথা বলেছে। শুভও বলেছে। তৃতীয় দিনের পরে খানিকটা হোমওয়ার্ক করে মঞ্জুশ্রী বুঝতে পারল, শুভ যতগুলো কথা বলেছে, তার পুরোটাই ওর মা-কে নিয়ে। বলেছে, মঞ্জুশ্রী, তোমার মায়ের নাম কি? বলেছে, মঞ্জুশ্রী, তোমার মা কোন্ অফিসে চাকরি করেন? বলেছে, মঞ্জুশ্রী, তোমার মায়ের প্রিয় বই কোন্টি? ফিল্ম দেখেন? মাথার চুলে প্যারাস্যুট না জুঁই? তোমার মা-র চয়েস কি পারফিউম না বডি স্প্রে? তোমার মা…তোমার মা…তোমার মা…

সূর্যের আলোয় চোখ জ্বলে যাওয়া মঞ্জুশ্রী আবারো ঝিঁঝিঁ পোকা হয়ে যায়। মা ভ্রু কুঁচকে বলে, মঞ্জু! তোর কি হয়েছে? তোর কি কিছু হয়েছে, মঞ্জু?

নাসরীন মুস্তাফা
নাসরীন মুস্তাফা

Author: নাসরীন মুস্তাফা

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment