সেই মনিহার ও মায়াবী সোনার হরিণ

সেই মনিহার ও মায়াবী সোনার হরিণ

রাজনীতি নিরপেক্ষ নির্বাচনী মোর্চা পাইয়োনিয়ার্স ফ্রন্টের কর্ণধার বদরুল। ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের আমি। বদরুলের নেতৃত্বাধীন পাইয়োনিয়ার্স ফ্রন্টের মনোনয়নে শাহাদাত জিতে গেলো সাধারণ সম্পাদক পদে।আমার দলের প্রার্থী সেন্ট গ্রেগোরির মেধাবী ছাত্র ওসমান ফারুক (সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী)মাত্র ৫ ভোটে হেরে গেলো। মিষ্টভাষী সদালাপি শাহাদাতের চোখে মুখে একটা বিনয়ের হাসি কাঁঠালের আঠার মত লেগেই থাকতো। সেটাই তাকে সবার কাছে প্রিয় করে তুলেছিল। এদিকে বছর না গড়াতেই বিমান বাহিনী থেকে ডাক আসলো তার । তাতে সাড়া দিয়ে সে টাটা বাই বাই করে বিদায় নিলো।প্রমোদ সম্পাদক মহীউদ্দীন খান আলমগীর ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদকের বাড়তি দায়িত্ব পেলো।তার দায়িত্বে ছিল দুটো বার্ষিক অনুষ্ঠান, মিলাদ ও নাটক।ঢাবিতে বিশিষ্টজন ও প্রাক্তন‘ ঢা-ক’ ছাত্রদের বার্ষিক মিলাদের নিমন্ত্রণপত্র হাতে হাতে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলাম আমরা সমদর্শী তিনবন্ধু।

কলেজের ভিতর আমাদের কোন রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। কিন্তু আমরা তিনজনই ছিলাম চিন্তা চেতনায় ছাত্র ইউনিয়ন পন্থী। বদরুল পটুয়াখালি শহরের নামকরা উকিলের ছেলে। স্কুল থেকেই ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী। ম-খাঁ আলমগীরের জ্যেষ্ঠ সহোদর বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর ১৯৫৫ তে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির দফতর সম্পাদক ছিলেন। যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করে ’৯২- ক’ ধারায় পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল ‘৫৪সালের শেষ ভাগে।রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শেষ প্রান্তে শহীদ দিবস পালন নিষিদ্ধ হ’ল। ১৯৫৫ সালে আবার সেই ভাষা যুদ্ধ।আইন ভাঙা সত্যাগ্রহ।সেবছর ২১ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হয়ে করাবরণের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে আমার অভিষেক ঘটে।ভাষা সংগ্রামে সক্রিয় শতাধিক  নেতা কর্মীর  সাথে মাসাধিক কাল কারাবন্দী জেল অবস্থা  থেকে  মুক্ত হতেই কারাসঙ্গী,পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আওয়াল ১৯৭ নওয়াবপুর রোডের অফিসে আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন।ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুল মোমেন তালুকদারসহ সদ্যকারামুক্ত ছাত্র রাজবন্দীদের জন্য একটা অনাড়ম্বর সংবর্ধনার ছোটখাটো আয়োজন্ । আমার পরিচয় সেখানে কিশোর সংগ্রামী এবং সুবক্তা হিসাবে।জেলখানায় প্রতি সকালে চা নাস্তার পর বসতো আমাদের মক এ্যাসেম্ব্লি। সেই কৃত্রিম সংসদ অধিবেশনে দিনেদিনে আমি হয়ে উঠেছিলাম বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান বক্তা। মোমেন তালুকদার ভরাট গলায় কারাগারে তাঁর সাথে গড়ে ওঠা  হার্দ্যের কথা  বললেন। আরও  বললেন বন্দী মুক্তির দাবিতে  আমার মত আরও কয়েকজন  কিশোর রাজবন্দীর অনশন ভাঙাতে আসা চীফ সেক্রেটারি এনএম খানের কপালে “ঠুস রকেট” মেরে কালশিরে তুলে দিয়ে ফাঁসির সেলে যুধিষ্টিরের নরক দর্শনের মত শাস্তি ভোগের কথা্। তিনিও আমাকে ছাত্রলীগে যোগদানের অকৃত্রিম আহবান জানালেন। সমগ্র উপস্থিতি করতালি দিয়ে তা অনুমোদন করলো। ফিরতি বক্তব্যে   ছাত্র লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান ও নেতৃবৃন্দের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ম্যাট্রিক পরীক্ষার সমাপ্তি পর্যন্ত সময় চেয়ে নিলাম । ফরমানুল্লাহ খানের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ছাত্রশক্তি ও ইবরাহিম তাহার মুসলিম ব্রাদারহুডের  ডাকা সংবর্ধনা সভায় আর গেলাম না।এর পরেই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন “কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভা  ও রাজবন্দী সংবর্ধনায় “  আমন্ত্রণ  পেলাম।  সে সময়কার  প্রদেশব্যাপী বৃহত্তম ছাত্র   সংগঠনের  শীর্ষ নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে সেই সভায় সর্বসম্মতিক্রমে  আমাকে  কোন ওজোর আপত্তির অবকাশ না দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদে  কো-অপ্ট করে বোরহান ভাইর সাথে দাপ্তরিক কাজে সম্পৃক্ত করা হ’ল।সেই সূত্র ধরেই ম.খাঁর সাথে আমার আজীবন সখ্য অম্লান রয়েছে। ! ১৯৫৭ সালের মার্চ মাসে বসন্ত অতিক্রান্ত মধ্যাহ্নে আমরা আটকে পড়েছিলাম আমতলায়।সেখানে চলছিল পররাষ্ট্র নীতি ইস্যুতে ছাত্র ইউনিয়ন- ছাত্র লীগ মৈত্রীঘাতি কলহ।হাতাহাতি, বক্তৃতা পাল্টাবক্তৃতা, স্লোগান পাল্টা স্লোগান। পাকিস্তানের  তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ  সোরাওয়ার্দীর “০+০=০” তত্ত্ব ও মার্কিন পরাশক্তির আনুকূল্যে প্রতিরক্ষা বলীয়ান করার পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে দুই পক্ষের বাকবিতন্ডা এক পর্যায়ে সংঘর্ষের রূপ নিলো।তাতে আমরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও  জড়িয়ে গেলাম। জোট নিরপেক্ষ  পররাষ্ট্র নীতির পক্ষে  স্লোগান দিয়ে আমাদের গলা বসে গেলো। সেখানে একটা তৃতীয় পক্ষ্ ছিল । তারা উভয়ের অনিষ্টকামী   উগ্র মৌলবাদী গোপন সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড্।তাদের নেতা আক্তার আহাদ , ইব্রাহিম তাহা, এ আর ইউসুফ ,ইসলামী ছাত্র শক্তির ফরমানউল্লাহ খান ও তাদের চ্যালা চামুন্ডারা সুযোগ বুঝে ছাত্র লীগের পাশ্চাত্যপন্থী গোষ্ঠীর  পাশে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুললো। তৃতীয় শক্তি এসে বন্ধুপ্রতিম দুই সংগঠনের বিরোধে ইন্ধন যোগাচ্ছে দেখে বিবাদমান পক্ষদ্বয় নিজেদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সাদা পতাকা তুললো।

শামসুল আরেফিন খান
শামসুল আরেফিন খান

 

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts