সেই মনিহার ও মায়াবী সোনার হরিণ

সেই মনিহার ও মায়াবী সোনার হরিণ

রাজনীতি নিরপেক্ষ নির্বাচনী মোর্চা পাইয়োনিয়ার্স ফ্রন্টের কর্ণধার বদরুল। ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের আমি। বদরুলের নেতৃত্বাধীন

পাইয়োনিয়ার্সফ্রন্টের মনোনয়নে শাহাদাত জিতে গেলো সাধারণ সম্পাদক পদে।আমার দলের প্রার্থী সেন্ট গ্রেগোরির মেধাবী ছাত্র

ওসমান ফারুক (সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী)মাত্র ৫ ভোটে হেরে গেলো। মিষ্টভাষী সদালাপি শাহাদাতের চোখে মুখে একটা বিনয়ের হাসি

কাঁঠালের আঠার মত লেগেই থাকতো। সেটাই তাকে সবার কাছে প্রিয় করে তুলেছিল। এদিকে বছর না গড়াতেই বিমান বাহিনী

থেকে ডাক আসলো তার । তাতে সাড়া দিয়ে সে টাটা বাই বাই করে বিদায় নিলো।প্রমোদ সম্পাদক মহীউদ্দীন খান আলমগীর ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের   সাধারণ সম্পাদকের বাড়তি দায়িত্ব পেলো।তার দায়িত্বে ছিল দুটো বার্ষিক অনুষ্ঠান, মিলাদ ও নাটক।ঢাবিতে বিশিষ্টজন ও প্রাক্তন‘ ঢা-ক’ছাত্রদের বার্ষিক মিলাদের নিমন্ত্রণপত্র হাতে হাতে পৌঁছে দিতে গিয়েলাম আমরা সমদর্শী তিনবন্ধু।

কলেজের ভিতর আমাদের কোন রাজনৈতিক পরিচয় ছিলনা। বস্তুত আমরা তিনজনই ছিলাম চিন্তা চেতনায় ছাত্র ইউনিয়ন পন্থী। বদরুল পটুয়াখালি শহরের নামকরা উকিলের ছেলে। স্কুল থেকেই ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী। ম-খাঁ আলমগীরের জেষ্ঠ সহোদর বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর ১৯৫৫ তে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির দফতর সম্পাদক ছিলেন। যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করে ’৯২- ক’ ধারায় পূর্ব

পাকিস্তানে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল ‘৫৪সালের শেষ ভাগে।রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শেষ প্রান্তে শহীদ দিবস পালন নিষিদ্ধ হ’ল। ১৯৫৫ সালে আবার সেই ভাষা যুদ্ধ।আইন ভাঙা সত্যাগ্রহ।সেবছর ২১ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হয়ে করাবরণের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে আমার অভিষেক ঘটে।ভাষা সংগ্রামে সক্রিয় শতাধিক  নেতা কর্মীর  সাথে মাসাধিক কাল কারাবন্দী  অবস্থা  থেকে  মুক্ত হতেই কারাসঙ্গী,পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল  আওয়াল ১৯৭ নওয়াবপুর রোডের অফিসে আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন।ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুল মোমেন তালুকদারসহ সদ্যকারামুক্ত ছাত্র রাজবন্দীদের জন্য একটা অনাড়ম্বর সংবর্ধনার ছোটখাটো আয়োজন্ । আমার পরিচয় সেখানে কিশোর সংগ্রামীএবং সুবক্তা হিসাবে।জেলখানায় প্রতি সকালে চা নাস্তার পর বসতো আমাদের মক এ্যাসেম্ব্লি। সেই কৃত্রিম সংসদ অধিবেশনে দিনে দিনে আমি হয়ে উঠেছিলাম বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান বক্তা। মোমেন তালুকদার ভরাট গলায় কারাগারে তাঁর সাথে গড়ে

ওঠা  হার্দ্যের কথা  বললেন। আরও  বললেন বন্দী মুক্তির দাবিতে  আমার মত আরও কয়েকজন  কিশোর রাজবন্দীর অনশন ভাঙাতে আসা চীফ সেক্রেটারি এনএম খানের কপালে “ঠুস রকেট” মেরে কালশিরে তুলে দিয়ে ফাঁসির সেলে যুধিষ্টিরের নরক দর্শনের মত শাস্তি ভোগের কথা্। তিনিও আমাকে ছাত্রলীগে যোগদানের অকৃত্রিম আহবান জানালেন। সমগ্র উপস্থিতি করতালি দিয়ে তা অনুমোদন করলো। ফিরতি বক্তব্যে   ছাত্র লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান ও নেতৃবৃন্দের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেম্যাট্রিক পরীক্ষার সমাপ্তি পর্যন্ত সময় চেয়ে নিলাম ।ফরমানুল্লাহ খানের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ছাত্রশক্তি ও ইবরাহিম তাহার মুসলিম ব্রাদারহুডের  ডাকা সংবর্ধনা সভায় আর গেলামনা।এর পরেই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন “কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত

সভা  ও রাজবন্দী সংবর্ধনায় “  আমন্ত্রণ  পেলাম।  সে সময়কার  প্রদেশব্যাপী বৃহত্তম ছাত্র   সংগঠনের  শীর্ষ নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে সেই সভায় সর্বসম্মতিক্রমে  আমাকে  কোন ওজোর আপত্তির অবকাশ না দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির  সদস্য পদে  কো-অপ্ট করে বোরহান ভাইর সাথে দাপ্তরিক কাজে সম্পৃক্ত করা হ’ল।সেই সূত্র ধরেই ম.খাঁর সাথে আমার আজীবন সখ্য অম্লান রয়েছে। !

১৯৫৭ সালের মার্চ মাসে বসন্ত অতিক্রান্ত মধ্যাহ্নে আমরা আটকে পড়েছিলাম আমতলায়।সেখানে চলছিল পররাষ্ট্র নীতি ইসুতে ছাত্র ইউনিয়ন- ছাত্র লীগমৈত্রীঘাতি কলহ।হাতাহাতি, বক্তৃতা পাল্টাবক্তৃতা, স্লোগান পাল্টা স্লোগান।

পাকিস্তানের  তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ  সোরাওয়ার্দীর “০+০=০” তত্ত্ব ও মার্কিন পরাশক্তির আনুকূল্যে প্রতিরক্ষাবলীয়ান করার পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে দুইপক্ষ্যর বাকবিতন্ডা এক পর্যায়ে সংঘর্ষের রূপ নিলো।তাতে আমরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও  জড়িয়ে গেলাম।জোট নিরপেক্ষ  পররাষ্ট্র নীতির পক্ষে  স্লোগান দিয়ে আমাদের গলা বসে গেলো। সেখানে

একটা তৃতীয় পক্ষ্ ছিল । তারা উভয়ের অনিষ্টকামী   উগ্র মৌলবাদী গোপন সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড্।তাদের নেতা আক্তার আহাদ , ইব্রাহিম তাহা, এ আর ইউসুফ ,ইসলামী ছাত্র শক্তির ফরমানউল্লাহ খান ও তাদের চ্যালা চামুন্ডারা সুযোগ বুঝে ছাত্র লীগের পাশ্চাত্যপন্থী গোষ্ঠীর  পাশে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুললো। তৃতীয় শক্তি   এসে

বন্ধুপ্রতিম দুই সংগঠনের বিরোধে ইন্ধন যোগাচ্ছে দেখে বিবাদমান পক্ষদ্বয় নিজেদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সাদা পতাকা তুললো এবং কেউ কোন উস্কানিমূলক আচরণ না করার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হ’ল।

মেঘ কেটে যাওয়ায় আমরা তিনবন্ধু মধুর চা-সিঙাড়া সাবাড় করে আসল কাজে নামবো ভাবছি। নীলাম্বর থেকে হঠাৎ বজ্রপাত! দেখলাম

সংস্কৃতি সংসদের সভাপতি আমার সাবেক সহরাজবন্দী সাখাওয়াত হোসেনকে একা পেয়ে লম্বা একটা টেবিলের চিপায় ফেলে দেয়ালে

ঠেসে বেধম কিলাচ্ছে কিছু উগ্রপন্থী মুসলিম ব্রাদারহুডকর্মৗ।আমি টেবিলের ওপর উঠে দাঁড়ালাম , সাথে বদরুল। লম্বা মোটা শরীর

নিয়ে দৌড়ঝাপ করতে না পারলেও ঠেলাঠেলিতে জিতে বদরুল   তার বিশাল বপু দিয়ে আগলে দাঁড়ালো সাখাওয়াত ভাইকে।কিল চড়

ঘুষি অবিরাম পড়লো তার গদাধর পিঠে।সে এক নাগাড়ে স্লোগান দিচ্ছে , সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক। গলা মিলাচ্ছেন সাখোয়াত ভাই আর এদিক দিয়ে  আমাদের সাথে দৃশ্যপটে নবাগত আরও ক’জন । আমি আটকে গেলাম টেবিলের ওপর । এ আর ইউসুফ [পরে এনএসএফ সভাপতি, ব্যারিস্টার, এরশাদের মন্ত্রী] আমার ঝাঁকড়া চুলের মুঠো ধরে টেবিলের ওপরেই পিটানো শুরু করলো। পিছনে তাকিয়ে দেখি আমার স্কুলের এক  বন্ধু আবুল হাসনাত  (পরে এনএসএফ নেতা ‍ও জিয়ার মন্ত্রী  ও ঢাকার মেয়র ব্যারিষ্টার হাসনাত)  আমাকে ধমাধম বক্সিং  কিল চড় ঘুষি ও লাথি মারা শুরু করেছে।ইউসুফ ও হাসনাতের মুখে একই কথা, বাইরের লোক কেন এখানে ? ছাত্র লীগ- ছাত্র ইউনিয়নকে বড় রকমের সংঘর্ষে ঠেলে দিতে না পেরে মুসলিম ব্রদারহুডের পুরো বাহিনী মাঠে নেমেছে তখন হকি স্টিক নিয়ে । সংস্কৃতি সংসদের সভাপতি ও ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ সাখাওয়াত হোসেন ((পরে লন্ডন প্রবাসী ব্যারিস্টার)) হলে হলে যেয়ে জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতির পক্ষে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন এটাই ছিল উগ্র ডানপন্থী ও ইসলাম দরদীদের  কাছে  তার অপরাধ। আমি সেই হাঁটুরে মারে টিকতে না পেরে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় টেবিল থেকে নিচে লাফিয়ে পড়লাম ।

হকিস্টিক ও রডধারি হার্মাদরা  আমার পিছু নিলো।  হাঁটুরে মার থামলোনা।আমি দৌড়াছি।হামলাকারীরা খ্যাপা কুকুরের মত আমাকে তাড়া করছে। বিশ্ববিদ্যালয় গেটের সামনে পুলিশের ট্রাক দাঁড়িয়ে ছিল।

আমি ছুটে সেখানে গিয়ে মারমুখী ধাওয়া থেকে বাঁচলাম। শার্টের পিছনটা নেই। ভিতরে সোয়েটার ছিল বলে রক্ষে। একটু পরেই

দেখলাম বদরুল আর আলমগীরও উত্তম মধ্যম খেয়ে ঝোড়ো কাকের মত  বেরিয়ে এসেছে।বদরুল হাঁপাচ্ছে দারুণ।

প্রেক্ষাপট :২০ অক্টোবর ১৯৪৭,পাকিস্তানের জন্মের ঠিক দুইমাস ৬ দিন পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবার আগে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করলো। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ১৯৫৪ সালে সামরিক গাটছড়া বেঁধে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা জোট ‘সেন্টো’ এবং ‘সিয়াটোর’ সক্রিয় অংশীদারে পরিণত হ’ল।

তার আগে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান যুক্তরাষ্ট্রে ২৩-দিনের সরকারী সফরে যান ৩১ মে ১৯৫০।প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান পয়লা রাতেই বিড়াল মারতে চাইলেন।বন্ধুত্বের বিশাল উপঢৌকন সামনে রাখলেন।  বিনিময়ে   সোভিয়েত পারমানবিক ঘাঁটির  ওপর  সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্যে, পাকিস্তানে সিআইএর একটা ছোট খাটো ঘাঁটি  তৈরীর অনুমতি চাইলেন। কিন্তু পাঞ্জাবের ভূস্বামী লিয়াকত আলী খান তাতে রাজি হলেন না।পশ্চিম পাকিস্তানে সিন্ধু বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশ এবং পূর্ব পাকিস্তানে সে সময় বাম প্রগতিশীলদের অবস্থান অবহেলা করার মত ছিলনা। বেলুচ  ও পাঠানদের স্বাধীনতার প্রশ্নে বেপরোয়া  উন্মাদনা এবং  সিন্ধুর ‘জিয়ে সিন্ধ আন্দোলন  তখনও তুঙ্গে।সেকথা মাথায় রেথে লিয়াকত আলী খান বাঘের  লেজ দিয়ে

কান চুলকাবার সাহস দেখালেন।এদিকে ক্ষুদ্র মেষের ঘুরে দাঁড়াবার স্পর্ধায় ক্ষুধার্ত বাঘ অসম্মানিত বোধ করলো। ১৬ই অক্টোবর

১৯৫১ অপরাহ্নে রাওয়ালপিন্ডি সেনাসদরের সুরক্ষিত ময়দানে জনসভায় ভাষণ দিতে উঠে পাকিস্তনের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পাঞ্জাবের নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান আতোতায়ীর গুলিতে নিহত হলেন।ক্ষমতায় বসলেন ঢাকার নওয়াবজাদা! সামন্তবাদী শাসক গোষ্ঠীর ক্ষমতা কুক্ষীগত রাখার থেলা চলতে থাকলো।১৬ অক্টোবর ‘৫১ খেকে ১৭ এপ্রিল ‘৫৩ নওয়াবজাদা খাজা নাজিমুদ্দিন, ১৭এপ্রিল ১৯৫৩ থেকে ১২ আগস্ট ১৯৫৫ বগুড়ার মোহাম্মদ আলী এবং ১২ আগস্ট ‘৫৫ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর ‘৫৬ চৌধুরি মোহাম্মদ আলী মিউজিকাল চেয়ারের মত এক জনের পর আর একজন প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসলেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডালেস পাকিস্তান সফরে এসে কলকাঠি নেড়ে গেলেন।  মে, ১৯৫৪ পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি সম্পাদিত হ’ল। এসময় প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর অধীনে জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আইন মন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন।

পৃথিবীতে চলছে তখন ত্রিমুখী লড়াই।একদিকে সামন্তবাদ  ও পুঁজিবাদের  ‘সারভাইভাল অব দি ফিটেস্ট’তত্ত্বের বিরুদ্ধে সাম্যবাদীদের নেতৃত্বে ‘ সবল-সক্ষম ও দুর্বল-অক্ষমদেরও সবাই মিলে একসাথে বাঁচার লড়াই। তৃতীয় সীমান্তে ক্ষয়িষ্ণু-সামন্তবাদ ও উপনিবেশবাদের সাথে উদীয়মান  সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের লড়াই।এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর

সফর পাকিস্তানে সামরিক শক্তি নির্ভর পুঁজিবাদী রাজনীতির অভিষেক ঘটালো।

১২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬ শহীদ সোহরাওয়ার্দী ৪র্থ প্রধানমন্ত্রী চৌধুরি মোহাম্মদ আলীর স্থলাভিষিক্ত হন। ৫ম প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ

সোহরাওয়ার্দীকে মোবারকবাদ জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার তার কাছে পেশোয়ার বিমান বন্দর ইজারা নেয়ার ইচ্ছা

প্রকাশ করলেন। অনতিবিলম্বে তা মঞ্জুর হ’ল। সোভিয়েত ইউনিয়নের আন্তঃমহাদেশী ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির  উপর গোয়েন্দা নজরদারি কায়েম  করার  জন্য সেখানে মার্কিন বিমান ঘাঁটি স্থাপিত হ’ল। সেখান থেকে মার্কিন গোয়েন্দা বিমানের গোপন অভিসার শুরু হ’ল।দুএকটি বিমান ভূপতিত হ’ল।

জনাব সোহরাওয়ার্দিী পাকিস্তানের বাণিজ্যিক অর্থনীতি সংস্কার ,পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পারমাণবিক শক্তি কমিশন গঠন,

সশস্ত্র বাহিনীর পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাসে বিশেষ ভূমিকা রাখলেন।সোহরাওয়ার্দীর  উদ্যোগে গড়া আণবিক শক্তি কমিশন পরবর্তীকালে পাকিস্তানকে পারমাণবিক বোমা উপহার দিলো যুক্তরাষ্ট্রের বদান্যতায়।   সব কিছু বিসর্জন দিয়ে বিজ্ঞ নেতা সেক্যুলার নীতিতে

অটল রইলেন  বুর্জোয়া রাজনীতি বিকাশের স্বার্থে।সোহরাওয়ার্দী সাহেব যুক্তনির্বাচন ব্যবস্থা রেখে শাসনতন্ত্র  প্রণয়ন করলেন । কিন্তু নির্বাচন করতে পারলেন না। ৫৬শতাংশ নাগরিকের নিবাস  পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যা গরিষ্ঠতা হরণ এবংসিন্ধি বেলুচ পাঠানের স্বাধীনতার আকাঙক্ষা হত্যা করতে ‘সংখ্যা সাম্য’ও  ‘এক ইউনিট’ নীতি  বাস্তবায়ন করলেন । জনমত উপেক্ষা করে কুখ্যাত পাকমার্কিন সামরিক চুক্তির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অংশীদারিত্বমূলক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কায়েম করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখলেন। সব চেয়ে বড় ভুলটি করলেন মেয়াদোত্তীর্ণ সেনা প্রধান জেনারেল আইয়ুব খানের চাকুরির মেয়াদ বাড়িয়ে এবং তাকে বার বার যুক্তরাষ্ট্রে সফরসঙ্গী করে।পাকিস্তান রাজনীতির সব ষড়যন্ত্রের নেপথ্য নায়ক আইয়ুব খান । তিনি  ১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যেয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বাইরোডকে বলেছিলেন,“ আমি তোমাদের ব্যারাক দেথতে আসিনি।আমাদের সেনাবাহিনী তোমাদের

সেনাবাহিনী হিসাবে কাজ করতে পারে! আসো আমরা সেই বিষয়টাই ঠিক করে ফেলি ”! তার এই উক্তি প্রবাদবাক্যের মত মুখে মুখে

ছড়িয়ে পড়েছিল।তার ওপর ভিত্তি করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধার নীল নকশা তৈরী করেছিল। [সূত্র : “টেল অফ এ

লাভ এ্যাফেয়ার দ্যাট নেভার ওজ: ইউ এস পাকিস্তান ডিফেন্স রিলেশন্স”, লেখকঃ হামিদ হোসেন, ‘ডিফেন্স জার্নাল অফ পাকিস্তান]

 

উল্লেখ থাকে যে, ১৯৫৪ সালেই পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদে ‘পাক- মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়ে প্রস্তাব পাশ হয় ।

যুক্তফ্রন্টের একুশ দফায় জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি ও পূর্ব পাকিস্তাসনর পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনের পক্ষে দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যসহ পথনির্দেশ

ছিল।সেই অঙ্গীকারে সোহরাওয়ার্দী সাহেবও শরীক ছিলেন।কিন্তু তিনি ঢাকায় এসে ২৮  ফেব্রুয়ারি ’৫৭,আওয়ামি লীগের কাগমারি সম্মেলনে জোটনিরপেক্ষতার নিকুচি করে পাক- মার্কিন সামরিক চুক্তি ও সিয়াটো,সেন্টো ও বাগদাদ প্যাক্টের পক্ষে জোর ওকালতি করলেন।কাগমারি সম্মেলনের দ্বিতীয দিনে প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পররাষ্ট্র নীতির উপর দেয়া তাক লাগানো বক্তব্যে

ডান বাম ঐক্যের আধার আওয়ামি লীগে ভাঙনের শানাই বেজে উঠলো।

পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মুসলিম হলের সংবর্ধনা সভায় সোহরাওয়ার্দী বললেন, “ আমি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছি তাতেই

ধরে নিতে হবে যে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি ৯৮ শতাংশ পূর্ণ হয়েছে।” বাঙালির একমাত্র সম্বল  সংখ্যাগরিষ্ঠতা। তার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবি।  নিজের উল্টোরথ যাত্রার  সাফাই গেয়ে সোহরাওয়ার্দী বললেন , “পূর্ব পাকিস্তান তার সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে কথনও ১০  শতাংশ বখরাও পায়নি । সংখ্যা সাম্য ও এক ইউনিটের বদৌলতে  এখন     বৈদেশিক ঋণসহ সব ভাগ বাটোয়ারায় পূর্ব পাকিস্তান সমান অংশীদারিত্বে ৫০% পাবে।তাছাড়া , বাংলাতো অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হয়েই গেছে! আর থাকে পররাষ্ট্র নীতি ; সে যদি আমরা স্বাধীনতা

স্বার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে চাই তাহলে বড় শক্তির হাত ধরেই চলতে হবে। কারণ জোট নিরপেক্ষতা মানে হচ্ছে শূন্যের সাথে শূন্য যোগ করে

আর একটি মস্ত  শূন্য পয়দা করা।তার মানে বোকার স্বর্গবাস !”

তুলকালামের সেই দুপুর!

মার্চ ৫৭’র সেই দুপুরে আমরা ত্রিরত্ন একেবারে সাদা মন নিয়ে গিয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেহায়েতই সামাজিক কাজে। কিন্তু পড়ে

গেলাম ইতিহাসের হাতির পায়ের তলায়। ভাগ্যিস সতীর্থ বন্ধুরা আমাদের বিশ্বাস করেছিল, তাই পদ পিষ্ট হইনি ! পরের দিন  ঢাকা কলেজে ক্লাস বর্জন করে বিরাট মিছিল নিয়ে সতীর্থরা ঢাবি ক্যামপাসে যেয়ে প্রতিবাদ জানালো   আমাদেরকে নিগৃহিত করার  বিরুদ্ধে।

যত দোষ নন্দঘোষ!

আগের দিনের ‘অবাঞ্ছিত ঘটনার ‘ জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ছাত্রলীগ নেতা  এটিএম শামসুল হক বললেন, আমি ঢাকা কলেজে পড়েছি।

এই বিদ্যাপীঠের কম করে এক তৃতীয়াংশ ছাত্র ঢাকা কলেজে পড়েছে। তোমরা আমাদের সতীর্থ, ছোট ভাই। তোমাদের কারও বিরুদ্ধেই

কোন বিদ্বেষ থাকার কথা না। যা কিছু ঘটেছে সবই অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা। কিন্তু তালি কখনই এক হাতে বাজেনা। তোমাদের সাথে আমার

যে তরুণ বন্ধু রয়েছে,  শামসুল আরেফিন খান, সে আমাদের সবা্রই খুব প্রিয়।আমরা একসাথে জেলে ছিলাম। এখন সে পূর্ব পাকিস্তান

ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা। কাল যখন ছাত্রলীগ আর ছাত্র ইউনিয়ন ঝাপ্টা ঝাপ্টি করছিল তখন সেও তাতে সামিল হয়।তাতে

হয়ত দুচার ঘা লেগে থাকতে পারে। বন্ধু বদরুল হক ও আলমগীর তখনই প্রতিবাদ করলো। বদরুল বললো, “আমরা তিনজনই একসাথে ছিলাম । তখন কেউ আমাদের উপর হামলে পড়লে বলার কিছু ছিল না।  কিন্তু আমতলার ঝড় থেমে যাওয়ার পর বিনা মেঘে যে বজ্রপাত,  তার জন্যে আমরাতো কেউ দায়ী ছিলামনা”।  বেঁচে গেলাম আর এক দফা হাটুরে মার থেকে।

 

অদৃষ্টের পরিহাস !

আমরা পরিত্রাণ পেলাম।কিন্তু  সেই মনিহার সাজিল না তারে।শহীদ সাহেব বাঁচলেননা। পররাষ্ট্র নীতি, এক ইউনিট , স্বায়ত্ত্বশাসন ,

পশ্চিম পাকিস্তানে পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও পূর্বাঞ্চলের সার্বিক বঞ্চনা প্রভৃতি  নিয়ে সারা বাংলায় ঝড় উঠলো। সিন্ধু, বেলুচিস্তান, উত্তর

পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ উত্তাল হ’ল।  মওলানা ভাসানী  দল ছাড়লেন। ওদিকে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জার নেতৃত্বে পতিত সামন্তবাদী

শক্তি নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করলো। অলৌকিক সোনার হরিণ মায়ালোকে মরিচীকার মত মিলিয়ে গেলো।

বরখাস্তের হুমকির মুখে মাত্র ১২ মাস ২৭ দিনের মাথায় পাকিস্তানের ৫ম প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১০ অক্টোবর ৫৭,

পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।আরও এক বছর পরে ইতিহাসের পাতায় এটা পরিষ্কারভাবে বিভাসিত হ’ল যে সোহরাওয়ার্দীর নিজের তৈরী ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দানব জেনারেল আইয়ুব খানই বুমেরাং হয়ে তাঁকে ঘায়েল করেছিল।

ইতিকথার পরের কথা

১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বাঙালির প্রিয়  নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন।

তাঁর প্রিয় শিষ্য শেখ মুজিবুর রহমান নিজের পায়ে উঠে দাড়ালেন। আমার হাতে বাংলা অনুবাদ করা ৮ পৃষ্ঠা ইংরেজি বিবৃতি

দৈনিক ইত্তেফাকের ১ম পাতায় ৮ কলাম শিরোনামে প্রকাশিত হ’ল। শেখ মুজিব এসে দাঁড়ালেন  পাদপ্রদীপের নিচে। ।

পিডিএম এ বিলুপ্ত প্রিয় দল  আওয়ামি লীগের পুনর্জীবন ঘটালেন।আইয়ুব খান বিপদ বুঝে ভৌতিক গণতন্ত্র“বেসিক ডেমোক্রেসী” চালু করলেন।প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। মুজিব ফিল্ডমার্শাল আইয়ুবকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন। শেখ মুজিবের আওয়ামি লীগ,   মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সীমান্ত গান্ধী খান আব্দুল গাফফার খান, জিয়েসিন্ধ নেতৃবৃন্দ, বিপ্লবী বেলুচ নেতাদের নেতৃত্বাধীন  ন্যাশনাল

আওয়ামি পার্টি, নেজামে ইসলাম , কম্যুনিস্ট পার্টি, নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান ও নুরুল আমীনের  নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম), কংগ্রেস ও ফাতেমা জিন্নার নেতৃত্বাধীন কাউন্সিল মুসলিম লীগ নিয়ে ৬৪ সালের বিডি নির্বাচনে  অংশ নিতে সর্বদলীয়  কম্বাইন্ড অপজিশন (কপ) গঠিত হ’ল। মিস ফাতেমা জিন্নাহকে প্রেসিডেন্ট

প্রার্থী করে  স্বৈরাচার আইয়ুবকে চ্যালেঞ্জ জানালো কপ। ন্যাক্কারজনক কারচুপি ও ছিনতাই করা ফলাফল থেকেই বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬-দফ১১-দফার প্রেক্ষাপট রচিত হ’ল। ফিনিক্স পাখির মত নতুন জীবন পেয়ে মুজিব হলেন বঙ্গবন্ধু! জাতির পিতা ।

শামসুল আরেফিন খান
শামসুল আরেফিন খান

 

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts