সেই মহামানবের মহাউত্থান

টুঙ্গীপাড়া, গোপালগঞ্জ , ফরিদপুর । ১৭ মার্চ ১৯২০! মহামানবের শুভ আগমন! এই বাংলার ধানসিড়ির তীরে এক পর্ণ কুটিরে!

উজ্জ্বল মহাকাশে জ্বল জ্বল লক্ষকোটি নক্ষত্রের সাথে সে রাতে ষোড়শী পূর্ণিমার চাঁদও কী বিনিদ্র রজনী জেগেছিল ? “….. আজি এ প্রভাতে রবির কর , কেমনে পশিল প্রাণের পর, কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত পাখির গান, না জানি কেনরে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ, জাগিয়া উঠিছে প্রাণ… ওরে উথলি উঠিছে বারি , প্রাণের অাবেগ প্রাণের বাসনা রুধিয়া রাখিতে নারি..!”রবির কীরণে তপ্ত হয়ে এমনি করেই কী জেগে উঠেছিলেন গোপালগঞ্জ জজকোর্টের শেরেস্তাদার শেখ লুৎফর রহমান ? ….“আমি ঢালিব করুনাধারা , আমি ভাঙিব পাষাণ কারা , আমি জগৎ প্লাবিয়া বেড়াবো গাহিয়া আকুল পাগল পারা…,এমন করেই কী উদ্বেলিত হয়েছিল পিতৃহৃদয় ? হেসে খলখল গেয়ে কলকল তালে তালে দিব তালি…কেমন হয়েছিল তাঁর আনন্দ উল্লাস ? কেউ এখন আর বেঁচে নেই যার কাছে শুনতে পারি, মাঝিরা কী গান গেয়েছিল, রাখাল বালক বাঁশির সুরে সুরে কেমনে নেচেছিল দুপুরেোদে ঢেলা ভরা মাঠে সেদিন ! পাখিরা কেমন করে কূজনে মেতেছিল !‘কেতকী কী কথা কয়েছিল কাননে কামিনীর কানে কানে’ !কুলকুল গানে তর তর করে বাংলার নদী কেমনে মিলেছিল সাগর সঙ্গমে !

কেউ কী জানতো শেখের ঘরে বাতায়নপরে সেদিন যে অরুণরবি নেমে এসেছিল সেই জাগিয়ে তুলবে বাঙালিকে হাজার বছরের ‘পান্তা ঘুম’ থেকে ? শেথের বেটার সেই ‘বড় খোকা’ নভো থেকে রবিটাকে উপড়ে এনে বসিয়ে দেবে বাঙলার চির সবুজ পটে ধান সিঁড়ির তীরে ! কেউ কী ভেবেছিল ? ঝিঙ্গে বেগুন পুঁই ডাটা ইলিশ পুটি খাওয়া সেই বাঙালি, সেই বাঙ্গাল, ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে ফুটো চালে আকাশ দেখা সেই কাঙাল সভ্যতার আকাশ ছুঁয়ে তরতাজা হয়ে কোটি কন্ঠে শত কোটি বছর গাইবে অমর কবির গান , “আমারসোনার বাংলা আমি তোমায় ভালেবাসি” ! কেউ কী ভেবেছিল ? বাঙালি  লড়বে , মরবে মারবে, লক্ষপ্রাণ লুটিয়ে পড়ে মায়ের মাথায় মুকুট দিতে বিজয় কেড়ে আনবে ! কেউ কী ভেবেছিল? দোয়েল নাচবে ফিঙে নাচবে, শাপলা ফুটবে, কাঠাল পাকবে !বাঘের গর্জনে পৃথিবী কাঁপবে! বাঙালি হাসবে চাঁদের হাসি ! আলোয় আলোয় ভরিয়ে দেবে বাংলার ভুবন পূর্ণশশী ! বাঙালি কাঁদবে না অার পেটের জ্বালায় ! শিশুরা নেচে গেয়ে লাফিয়ে ঝাপিয়ে সদা হেসে হবে কুটি কুটি! নগ্নশিশু ক্ষুধায় ক্লান্ত, চোখ ছল ছল, বলবে না কভু কেঁদে কেটে, ওরে তোরা ‘দ্যাখ্ এসে, “পূর্ণিমার চাঁদটা যেন ঝলসানো রুটি“!‘শুক্লপক্ষ হতে আনি রজনীগন্ধার বৃন্তখানি’ ‘কৃষ্ণপক্ষের অর্ঘথালা রাতে ‘ কে সাজিয়েছিল প্রভাত রবির চরণে ঢালা নৈবেদ্য থালা খানি ? কে পরিয়েছিল লাঞ্ছিত মায়ের গলায় বিজয় মালা ? কে মুছিয়েছিল ধর্ষিত বোনের অশ্রুধারা! না খাওয়া শিশুর পেটের জ্বালা? কে সে ? কোন সে মহামানব ?

সবাই জানে । শিশুও জানে । মাঝিও জানে ।কৃষক জানে , শ্রমিক জানে ।গুরু জানে শিষ্য জানে বিজ্ঞানী জানে।কবি জানে, লেখক জানে সাংবাদিক জানে ।ডাক্তার জানে জজ ব্যারিস্টার উকিল জানে। আমলা জানে কামলা জানে। ফকির জানে বেশ্যা জানে , মাতাল জানে । চোর বাটপার, ধর্ষক খুনি ভুমি দস্যূ, ঘুষখোর সুদখোর কালো বাজারি ? তারাও জানে! নারী পুরুষ বৃদ্ধ যুবক সবাই জানে। কী জানে ?

একথা জানে তারা ! টুঙ্গি পাড়ার শেখের ঘরে সেই খোকাটা জন্ম না নিলে এই বাংলাদেশ একাত্তরে স্বাধীন হ’ত না। কিন্তু একথা কতজনে জানে যে শেখের পুত শেখ মুজিব যদি না ফিরতো স্বদেশে ১০ জানুয়ারি ‘৭২, তা হলে বাংলাদেশ মুক্ত হলেও স্বাধীন হ’ত না। স্বাধীন হয়েও স্বাধীন হ’ত না!

স্বাধীনতা মানে কী ? স্বাধীনতা কী কেবল মাতাল কবির মতলবি গান ?

ঘুষের টাকায় সুদের খাতায় হীরা মুক্তা মানিরক্যর মচ্ছব? কত রক্তদিলো পোলান্ড হাঙ্গেরী, শ্লোভাকিয়া, জার্মানি, জাপান, অষ্ট্রিয়া !২য় মহা সমরে লক্ষ-কোটি প্রাণ দিলো জার্মানি জাপান শ্লোভাকিয়া ! তারা কী পেলো অাজও শৃঙ্খলমুক্ত প্রকৃত স্বাধীনতা ! সার্বভৌমত্ব ?

আপোসের প্রস্তাব দিয়েছিল সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান, নিক্সন -হেনরি কিসিঞ্জারের প্রত্যক্ষ মদদে । “৬দফা নিয়ে এত লড়লে মুজিব! স্বাধীনতার বায়না ছেড়ে দাও ! নগদ যা পাও তাই নিয়ে ঘরে ফিরে যাও । নইলে অবধারিত মৃত্যু! মাটিটাও জুটবেনা নিজ দেশে। কারাগারের ছোট্ট কুঠরির বাইরেই তোমার কবর খুড়ে রেখেছি”। বললেন ইয়াহিয়া – ভুট্টো।পিছন থেকে তাদের মুনিব বললেন , স্বাধীনতাটাও যাতে পাও সেটাও দেখবোখনি ! আমি আছি না ? মুজিব বললেন, কাপুরুষ মরে শতবার ! বীর মরে একবার !জান কবুল !কিন্তু স্বাধীনতার একচুল কমেও কোন নিষ্পত্তি হবে না। স্বাধীনতা বিনে কে বাঁচিতে চায়? স্বাধীনতা ! স্বাধীনতা! স্বাধীনতা ! NOTHING SHORT OF INDEPENDENCE , FREEDOM AND SOVEREIGNTY!

শেখ মুজিব গাইলেন নজরুলের গান, বলবীর চির উন্নত মম শির ! শির নেহারি আমারি নত শির শিখর হিমাদ্রির।বল বীর ….. পৃথিবী দেখেছিল চোথ মেলে , ভারতবর্ষে হিমালয়ের পাশেই আকাশ ছুঁয়ে জেগেছে ততোটাই উঁচু আর এক হিমালয়!তেমনি স্পর্ধিত শিখরে শিখরে, চূড়ায় চূড়ায়। একই নাটক চলছিল তখন কলকাতায়।ঘসেটি বেগমের ফেলে যাওয়া সেই কাশিমবাজার কুঠিতে । মীর জাফর,  রায় চাঁদ রায়বল্লভের প্রেতাত্মাদের মুখেও সেই একই সংলাপ : চলো বাড়ি ফিরে যাই ।

তা কী হয় বিশ্বাসঘাতক ? আমাদের যে স্বাধীনতা চাই,! মুজিবও চাই ! বাংলাদেশও চাই ! এক চুলও তাতে ছাড় নাই ! “রক্ত যখন দিতে শিখেছি আরও রক্ত দেবো, দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ” ! মরণজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের লাথো কন্ঠ গর্জে উঠেছিল বজ্রনিনাদে মুজিবের সেই বাণী! সাতই মার্চ !রেসকোর্স মাঠের উত্তাল জনসাগর !বজ্রকন্ঠে রাজনীতির কবির মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্য পাঠ ! সে কী ভুলা যায় ? পূর্ব পশ্চিম উত্তর রণাঙ্গন গর্জে উঠেছিল ! আর কত রক্ত চাই ? আর কত প্রাণ চাই ? বলো,বলো ! দেবে আরও রক্ত আরও দেবে প্রাণ! দক্ষিণে, বঙ্গোপসাগর ফুঁসে উঠেছিল সুনামি জাগরণে! সপ্তডিঙ্গা মরণতরীর উঁচু শির নুয়ে পড়েছিল । কাগুজে বাঘ পালিয়েছিল লেজ গুটিয়ে !

বাঙালি জাতির পিতা , হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৮ তারিখ পাকিস্তানের মৃত্যু কূপ থেকে বেরিয়ে ৩০ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা, লাখো নারীর অশ্রুসিক্ত স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসলেন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ ! আসার পথে দুঃসময়ের পরম বন্ধু ভারতের মাটি ছুঁলো তাঁর বিমান ! পালাম বিমান বন্দরে ভারতের মহামা্ন্য রাষ্ট্রপতি শ্রী ভিভি গিরি মহান অতিথিকে বহনকারী বিমানের সিঁড়ির কাছে এসে অভ্যর্থনা জানালেন স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট মুজিবকে। প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী অল্পদূরত্বে রচিত সংবর্ধনা মঞ্চে হাজার হাজার উল্লসিত মানুষের তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার নতুন সূর্যকে অভিবাদন জানিয়ে বললেন, আমি তিনটে কথা দিয়েছিলাম বন্ধু ।১. দুর্গত মানুষকে অন্নপানি দেবো, ওষুধ পথ্য দেবো, আশ্রয় দেবো ২. মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেবো , অস্ত্র দেবো,সাজ সরঞ্জাম সহায় সম্বল দেবো অার ৩. মুজিবকে এনে দেবো রাবনের স্বর্ণ লঙ্কা পুড়িয়ে! অামি কথা রেখেছি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি শ্রী ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এবং ভারতের সরকার ও জনগণকে জাতির পক্ষ্ থেকে গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললেন, অামার একদফা ছিল স্বাধীনতা । আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। এখন একটি সুখী সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে চাই ১. গণতন্ত্র, ২. সমাজতন্ত্র. ৩.ধর্ম নিরপেক্ষতা ও ৪. বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করে।

সাড়ে সাতকোটি মানুষের আনন্দাশ্রু ভেজা ভালোবাসায় অভিসিক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন স্বদেশে গণপ্রজাতন্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন । ৩ মার্চ ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী পৃথিবীর বুকে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো বিজিত দেশ ছেড়ে স্বদেশে ফিরে।১৩ মা্র্চ ৫০০ সেনার শেষ দলটিও দেশে ফিরে গেলো।বাঙালির ভালোবাসা রইলো তাদের সাথে।১৫ হাজার শহীদ ভারতীয় সৈন্যের স্মৃতি রইলো বাংলার মাটিতে মিশে।১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শুভেচ্ছার অর্ঘথালা পাঠালেন শ্রমিতি ইন্দিরা গান্ধী।

 

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts