সেই সব দিনগুলি-১: চিহ্ন তব পড়ে আছে তুমি হেথা নাই/ শামসুল আরেফিন খান

পরম প্রিয় সুহৃদ শুভ হঠাৎ করেই চলে গেলো। আমার ছোটবেলার আর কোন অকৃত্রিম বন্ধুই সপ্রাণ স্পন্দিত  রইলোনা এই রূঢ় পৃথিবীতে। ।কুসংস্কৃার ও মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সরব, চিন্তাশীল লেখক কবি সাংবাদিক নিবন্ধকার ও অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অনমনীয়  আপোসহীন যোদ্ধা আমার পরমপ্রিয় সাথীর অনুপস্থিতিতে আজ এ বয়সে যেন বড় একা হয়ে গেলাম।পাঠকের মনের সব   অন্ধকার সরাতে ইতিহাসের  উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত টেনে অসির চাইতে ক্ষিপ্র মসি চালিয়েছে যে অক্লান্ত   কলমযোদ্ধা , সে চলে গেলো অনেক অন্যায়-বঞ্চনার অভিমান নিয়ে। কলমযুদ্ধে অপরাজিত  সৈনিক জীবনযুদ্ধেও কখনও হার মানেনি।আপোস করে বিবেকের একইঞ্চি জমিনও ছাড়েনি আমার পরমপ্রিয়  বন্ধু শুভ রহমান।স্বচ্ছ চেতনায় বরিত দর্শনের আলিঙ্গন কখনও শিথিল হতে পারেনি ।আদর্শের বন্ধন অটুট থেকেছে ।বিড়লায় কঠিন অস্ত্রপচারে  হৃৎপিন্ড খর্ব হয়েছে।দৃষ্টি ক্ষীণ হয়েছে। অস্বচ্ছ হয়েছে । চেন্নাইএর শঙ্করা নেত্রালয়ের দেয়া একযুগের সব পরিচর্যা ব্যর্থ করে দিয়ে রঙধনুর সব  রঙ ঝাপসা হয়েছে।কিন্তু মনের দিগন্তে হতাশার মেঘ জমতে পারেনি। স্বপ্নের বেলাভূমিতে কৃষ্ণপক্ষের কালো ছায়াও নামেনি। বাস্তবতার কঠিন পাষাণে আছড়ে পড়ে   মন থেতলে গেলেও মনোবল ভাঙেনি। চারিদিকে এত প্রলোভন,বিলাস বৈভবের এত হাতছানি , স্বর্গের অপ্সরি মেনকার মত পুর সুন্দরীদের রিনিঝিনি নুপুর নিক্কণে চারিদিক মুখর;  তবুও টলেনি ভৃগুর মন।থামেনি প্রত্যয়দৃপ্ত আদর্শের অনুশীলন।

কিশোর  বেলায় মাকে হারিয়ে দেশকে  ভালোবাসলো।বাম হাতে রক্ত ঝরিয়ে ব্লেড দাবিয়ে শিলালিপির মত খোদাই করে লিখলেো “মা“। আর সেই রক্তকে কলমের কালি বানিয়ে  কাগজে লিখলো , “দেশ আমার মা , দেশের সাথে কখনও মিরজাফরী করবো না।জনগণের সাথে বেঈমানি করবোনা। পচা গলা সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়ার লড়াইতে নিরবধি নিবেদিত রবো।শেষ নিশ্বাস অবধি এ শপথ ভাঙবো না“।ওর শপথনামা আমার কাছে গচ্ছিত রইলো । আমারটা ওর কাছে।আমাদের উপলব্ধিতে আবেগের আতিশয্য ছিল।কর্মোদ্যমে বাড়াবাড়িও আদিখ্যেতা  ছিল ।তরুণ দেহ মনে ফাটাফাটি চঞ্চলতা ছিল।সে বয়সে রোমান্টিসিজম দ্বারা বশীভূত হওয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক ।এডভেঞ্চারের নেশায় উদ্দাম হওয়া মোটেও বিচিত্র ব্যাপার ছিলনা।আমরা দুজনাই ছিলাম আবেগপ্রবণ। তবে শুভ গভীর মনোনিবেশে দর্শনচর্চায় নিবেদিত হয়েছিল।কলমও তার ধাঁরালো হয়ে উঠেছিল ক্রমেই। সাংবাদিকতায় ছিল একনিষ্ঠ । পেশায় কোন দ্বিচারিতা ছিলনা । সে অন্তর্মুখী  আর আমি বহির্মুখী।এই পার্থক্য নিয়েই আমরা নিবিড় সাথী। শুভ বিপ্লবকে ধারণ করেছিল তার চিন্তা চেতনা্য়।আমি কাজকেই আপন করেছিলাম। রক্তশপথের রঙটাও ছিল তার একটু বেশি গাঢ়।শিলালিপির খোদাই ছিল আমার চাইতে অনেক গভীর। কখনও মুছে যাওয়ার মত না। আর কেউ আস্তিন তুলে না দেখতে পেলেও তার জীবন সঙ্গীনির দৃষ্টি নিশ্চয়ই এড়াতে পারেনি। ছেলেমেয়েরাও হয়ত দেখেছে।তবে আমার দৃঢ় ধারণা গোপনীয়তার শপথ সে ভাঙেনি।অন্তর্মুখীনতার সাথে প্রচার    বিমুখতা ছিল তার অনেক বিরল গুণের অংশ।কলমে ঝড় তুলেছে।দুর্বার হয়েছে । কিন্তু মুখে রা করেনি।নৈঃশব্দই যেন ছিল তার বড় শক্তি। অচঞ্চল স্থৈরর্য তাকে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছিল সকল মহলে।আপন পর সহমত ভিন্নমত বলে কথা ছিলনা। সেটা বুঝলাম এক শোকাবহ প্রেক্ষায়।

তার বড় ছেলে লেখাপড়ার জন্য  মস্কো গিয়ে  এক সড়ক দুর্ঘটনায়  প্রাণ হারিয়েছিল।বাবার স্কন্ধে সন্তানের  লাশ পাহাড়ের মত ভারি। প্রণাধিক পুত্রের মরদেহ  এসেছিল তার শান্তিনগরের বাসায়। সেই ছেলের রেখে যাওয়া শিশু পুত্র ও রুশ স্ত্রীও এসেছিল । শোক সমাবেশে ঢলে পড়েছিল গুণমুগ্ধ শুভাকাঙক্ষীরা।সেই অনাকাঙ্ক্ষীত বিষাদের ছায়া তার মুখাবয়বে স্থায়ী আসন পেতেছিল। সদাহাস্য মুখে এক অটল গাম্ভীর্য তার ব্যক্তিত্বে নতুন সৌকর্য দিয়েছিল।এমন একজন নির্লোভ নিস্পৃহ নির্বিরোধ মানুষকে নিবিড় বন্ধু হিসেবে পাওয়া যায় অনেক সৌভাগ্যে।আমি সেজন্য গর্বিত। এমন  বন্ধুর চিরবিদায়কে সহজভাবে মেনে নেওয়াও খুবই কঠিন।হৃদয়ের রক্তক্ষরণও অনিরুদ্ধ হতে বাধ্য।

বয়সে আমি মাত্র তিন মাসের বড়।কিন্তু গুণে মেধায় সে আমার চাইতে অনেক বড়। তার উদার মন ও মহানুভবতার স্বাক্ষর  সে রেখেছে আমার প্রথম গ্রন্থ “জনকের চোখে জল“এর সম্পাদক হিসাবে লেখা প্রাককথনে।দৈনিক কালেরকন্ঠে বেনামে প্রকাশিত গ্রন্থ সমালোচনায় সে আমাকে এমন এক অবিশ্বাস্য উচ্চতায় তুলেছে যে আমি লজ্জাই পেয়েছি।আমার ঋণই কেবল  বেড়েছে। ১৯৪০ সালে বাত্যা তাড়িত দিনে আমরা দুজনেই জন্মেছি। সে সময় দ্বিতীয় মহাসমরের দামামা বেজেছে।সেই ঝড়ের ক্ষত নিয়েই আমরা জীবন কাটিয়েছি।মাথা তুলে বাঁচার শক্তিটা আমরা আদর্শনিষ্ঠাবলেই অর্জন করেছিলাম।পিতৃপরিচয়ে কোন শ্রেণীভেদ নেই।দুজনেই জন্মের পর পিতৃকন্ঠে “আজান”শুনে চোখ মেলেছি।ধর্মের গোঁড়ামি আমাদের পায়ে পায়ে হেটেছে।সেই বিন্ধ্যাচল পেরিয়ে আমরা আলোর মুখ দেখেছি।মধ্যবিত্ত পরিবারে দুজনই  মাতৃহীন দশায় পিতৃস্নেহ সম্বল করেই বড় হয়েছি। বসতি ছিল কাছ্কাছি। পাশাপাশি দুই পাড়ায়।খেলার মাঠে দেখা হয়নি। কারণ দুজনেই খেলাধুলায় নিস্পৃহ ছিলাম।পাঠাভ্যাসগুণে দেখা হয়েছে পাঠাগারে। আদর্শের বন্ধন রচিত হয়েছে রাজনৈতিক দর্শনের পাঠচক্রে। গোঁড়ামির অন্ধকার ঠেলে আমরা প্রগতির আলোয় পথ হেঁটেছি একসাথে, সব ঝুঁকি মাথায় নিয়ে।রাজনীতির লড়াইতে যেমন নিরলস থেকেছি মিছিলে দুর্বার হয়েছি।সোচ্চার থেকেছি রাজপথের স্লোগানে।তেমনি  অক্লান্ত লড়েছি আমরা সামাজিক অনাচার ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে। দুষ্কৃতি ও সমাজ বিরোধিদের প্রতিরোধ করতে যেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে।শুভ ছিল নিরন্তর আমার পাশে।রাজনৈতিক সংগ্রামে শুভ’র নীরব সাহচর্য আমাকে সাহসে বলীয়ান রেখেছিল ।দুবৃর্ত্তদের মরণাঘাত থেকে আমাকে বাঁচাতে যেয়ে বিপ্লবী সাথী শ্রমিকনেতা লাটমিয়া ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারালো এক সাঁঝবিকেলে;তখনও শুভ ও অপর বন্ধু গীতিকার মাসুদ করিম আমাকে আগলে রেখেছিল। রোজদিনের মত ঢাকা কলেজ  থেকে ইউনিয়নের সব কাজ সেরে আজিমপুর কলোনীর ভিতর দিয়ে বাড়ির পথে হাঁটছিলাম।নিউমার্কেটের উল্টোদিকে তখনকার সংসদের একতলা সদস্য হোস্টেলের সামনে ছিল বড়সড় একটা পুস্করিনী । তার পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় অসীম সাহসে দুষ্কৃতির হামলা ঠেকাতে যেয়ে বিধমা মায়ের চোখের মনি লাটমিয়া বলতে গেলে আমার জন্যেই প্রাণ দিলো।প্রোলেতারিয়েত লাটমিয়া কমরেড জ্ঞান চক্রবর্তীর পাঠশালায় আমাদের সহপাঠী ছিল।মার্কসবাদে দীক্ষা নিয়ে সে  তখন স্বশিক্ষিত একজন আলোকিত মানুষ।শ্যামবর্ণ, ছিপছিপে গড়ন ইস্পাতের মত পেশীবহুল শরীর।তাই নিয়ে সে আমাকে ছায়ার মত অনুসরণ করতো।

সেটা ছিল ’৫৯ সালের মার্চ মাস। আমি তখন   পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয়  কমিটির সদস্য, ঢাকা মহানগর কমিটির যুগ্ম আহবায়ক ও ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের  মহাসচিব। সময়টা ছিল খুবই খারাপ । দেশে আইয়ুবের সামরিক শাসন বলবৎ হয়েছে ।দফতর সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন কাজী জাফর আহমদ। তিনি উধাও হওয়ায় দপ্তরও আমার কাঁধে।উপরের দিকে পুরোটাই  ধ্বস নেমেছিল। সভাপতি ডা. খন্দকার আলমগীর ও সাধারণ সম্পাদক সাদ উদ্দীন আহমদ সুবিধাবাদের ভেলায় চড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়েছেন।নির্মল সেন ও আহমদ হুমায়ুনসহ ডাকসাইটে নেতারা সবাই হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন।   আমার মাথার ওপর পরোয়ানা। লাটমিয়া স্বেচ্ছায় স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই আমাকে সম্ভাব্য বিপদ থেকে বাঁচানোকে বিপ্লবী দায়িত্ব হিসাবে গ্রহণ করেছিল।আমাদের আর এক সাথী ইদু মিয়া ছিলেন লাট মিয়ার মতই বিড়ি শ্রমিক ।তিনি স্বশিক্ষায় আলোকিত হয়ে দৈনিক সংবাদের সংশোধন বিভাগে কাজ পেয়ে সাংবাদিক পরিবারের  অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন।পরে ঊদীচীর কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।।কমরেড লাটমিয়া, ইদুভাই, শুভ রহমান, কমরেড আলি আকসাদের অনুজ আলী আফাজ লুকেন ও তার অনুসারী দুই সহোদর অমল ও বিমল এবং আমি “সপ্তডিঙ্গা পাঠচক্রের“ সক্রিয় সদস্য ছিলাম।

১৯৫৮ সালে  উচ্চ মাধ্যমিকে মাঝারি ফল নিয়ে ঢাকা কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হলাম।শুভ গেলো নটরডামে।ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হতে না পারলে আমার ঢাকায় থাকাই হ’ত না্।যশোর বা খুলনায় ডিপোরট হওয়া অবধারিত ছিল। আব্বার  মেজাজ খারাপ হয়েছিল সেই ’৫৫ সালে । ২১ ফেব্রুয়ারি আইন অমান্য করে জেলে গেলাম ।বন্দী হ’ল আরও ২০০ ছাত্র ছাত্রী।আমাদের দেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান,তখনকার এস এম হলের ভিপি ও হাসিনা সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত  ও নারায়নগঞ্জের আলোচিত রাজনীতিক শামীম ওসমানের বাবা আওয়ামি লীগ নেতা শামসুজ্জোহাসহ সবকটা ছাত্র সংগঠনের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ছিলেন বন্দী তালিকায়্ । মেয়েদের মধ্যে আনোয়ার জাহিদের প্রথমপত্নী কামরুন নাহার লাইলী ও বঙ্গবন্ধুর কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজের সহপাঠী পাসপোর্ট  মহাপরিচালক খ্যাত বাহাউদ্দীন সাহেবের জীবন সঙ্গী ডা. গুলারা বেগমের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল লালবাগ থানা হাজতে। সে সময় ৯২-ক ধারায় পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছিল শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন জনপ্রিয় যুক্তফ্রন্ট সরকার হটিয়ে। আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। সরকারের চাপে  আব্বা ছুটে এসেছিলেন কর্মস্থল চট্রগ্রাম থেকে। বিশেষ দায়িত্বে সেখানে তাঁকে সাময়িকভাবে বদলি করা হয়েছিল্। তিনি নাজিমুদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় জেলে আসলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। হাতে ছিল ইংরেজি টাইপ করা এক খন্ড কাগজ ।আব্বা বললেন, এই কাগজটায় সই করে দে। এখনই বাড়ি যেতে পারবি।আমি বন্ড সই করলাম না ।আব্বা মনের দুঃখে চোখ মুছে নীরবে প্রস্থান করলেন। একই সময় আমার অতি বিপ্লবী  মার্কসবাদী বন্ধু সেন্ট গ্রেগরির দশম শ্রেণীতে ইংরেজী মাধ্যমে পড়ুয়া মেধাবী ছাত্র আনোয়ার আনসারী খানের বাবা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা এডভোকেট আলী আমজাদ খান ও বড় ভাই তরুণ আইনজীবী ইকবাল আনসারী খান এসেছিলেন একইভাবে গোয়েন্দা বিভাগের তাড়নায় ঘরের ছেলে ঘরে ফিরিয়ে নিতে ।নরম গরম দুই এক কথার পর বাবা ছেলের গালে মোটা চড় কষিয়ে দিলেন।অন্যগালে বড়ভাই দিলো আর এক চড়।ইংরেজি তুবড়িতে জেলখানা মাতিয়ে রাখা মার্কস-এঙ্গেলস এর তত্ত্ব কপচানো  স্যোশালিস্ট আ. আনসারী খান ‘বন্ড‘ সই করে শুড় শুড় করে নত মাথায় নিষ্ক্রান্ত হ’ল জেল গেটের ছোট ফটক দিয়ে। ওদের কান্ড দেখে আব্বা শুধু বলেছিলেন , ওরা কত বড়লোক। তুই গরীবের ছেলে।আমাদের এ সব মানায় না।জীবনটা জেলে পচে শেষ হয়ে যাবে।দেখছিস না ডক্টর শহীদুল্লার ছেলে, সম্পর্কে তোদের মামা, মোহাম্মদ তকিউল্লাহ কতদিন থেকে জেলে পড়ে আছে।এসব ওদেরই মানায়।বাপের টাকায় সারাজীবন বসে খেতে পারবে।কমরেড তকিউল্লাহ ৯৩বছর বয়সে সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন।পথভ্রষ্ট আনোয়ার আনসারী ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয়ে যেয়ে আইয়ুবের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী “এন এস এফ“ এর সাধারণ সম্পাদক হয়েছিল। ৬ মে ২০১৮ লন্ডনে অনেক রোগভোগের পর প্রাণত্যাগ করেছে।

৫৬ সালে ঢাকা কলেজে আবার দেখা হয়েছিল  আনোয়ার আনসারীর সাথে।আমি আব্বাকে কথা দিয়েছিলাম “ছাত্রানং অধ্যায়ন তপ্ঃ“ ই হবে আমার জপ মন্ত্র।কিন্তু আনসারী সেটা ভন্ডুল করে দিলো। বিপ্লবী বোলচালে সম্মোহিত করে আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে লাইব্রেরি থেকে তুলে  নিয়ে গেলো কলেজ গ্যালারিতে।সেখানে তখন “ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্ট ফন্ট “ সমর্থক নির্বাচন পাগল ছাত্রদের সাধারণ সভা হচ্ছিল। আনসারী আমার জেল জীবনের কান্ডকারখানার কথা অনেক রঙ চড়িয়ে মনের মাধুরি মিশিয়ে বলে গেলো। বন্ড সই না করা ,“ঠুস“ নামের প্রতিবাদী  দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করা ,বন্দীমুক্তির জন্যে অনশন এবং এক ঢিলে জেল পরিদর্শনে আসা চীফ সেক্রেটারি এন.এম. খানের কপাল ফুলিয়ে অন্ধকার ফাঁসি সেলে আটক হওয়া এবং জেলখানার মক পার্লামেন্টে বিরোধী দলের হয়ে অনবদ্য বক্তৃতাবাজিসহ কোন কথাই বাদ দিলো না।আর যায় কোথায় । ভিনি-ভিডি-ভিসি কান্ড হয়ে গেলো। আসিলাম দেখিলাম জয় করিলাম। সেই সাথে  আমার ভবিষ্যতও ঝরঝরে হয়ে গেলো।৫৩ সালে ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের খালেদ মোশাররফ এনটারটেইনমেন্ সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছিল।জেলের বন্ধু শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন এবং মওদুদ আহমদ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হয়ে ১৯৫৪ সালে যথাক্রমে সাধারণ সম্পাদক ও প্রমোদ বিভাগের সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিল।পরের বছর ভরাডুবি।কলেজ নির্বাচনে আদর্শগত কোন দলাদলি ছিল না।দুদলেই ছাত্রলীগও ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা সক্রিয় ছিল।পা্ওনিয়ার ফ্রন্টের  দলপতি একে বদরুল হক , তার সহচর মহিউদ্দীন আলমগীর ও নুরুল আরেফিন খান প্রমুখ ছিল পাঁড় ছাত্র ইউনিয়ন। সেই সাথে সিরাজুল আলম খানসহ আরও অনেকে ছিল গোড়া ছাত্রলীগ।আমার ঘাড়ে ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের ভাঙা জোয়ালটা চেপে বসলো আমি কিছু বুঝবার আগেই ।তখনই আমি ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও মনিরুল আলমের অপারগতায় ভারপ্রাপ্ত দফতর সম্পাদক।জেল থেকে বের হতে না হতেই সেই চক্রে ফেঁসে গিয়েছিলাম। ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট কাজী আনোয়ারুল আজীম ও সাধারণ সম্পাদক এস এ বারি এটিসহ ডজন খানেক সিনিয়ার নেতা ও ছাত্র লীগের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আমার সহবন্দী্ । প্রথমে ছাত্র লীগের নওয়াবপুর অফিসে ছোটখাটো সম্বর্ধনা দিয়ে সভাপতি আব্দুল মোমেন তালুকদার  ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আওয়াল আমাকে বেশ সমাদর করেই তাঁদের সংগঠনে যোগ দেয়ার জন্য ‘দাওয়াত’ দিলেন। পরবর্তীতে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভায় যেয়ে তাদের “ধর তক্তা মার পেরেক“ মার্কা তরিৎ কৌশলের কাছে ধরা খেলাম।সরাসরি পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হলাম। এ ব্যাপারে নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছিলেন আমার প্রিয় শিক্ষক মোহাম্মদ সুলতান।আমার দীক্ষাগুরু ও বাতিঘর মোহাম্মদ সুলতান বাযান্নোর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক;কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ঐতিহাসিক গ্রন্থ “একুশে ফেব্রুয়ারি“র প্রকাশক;পূর্বপাকিস্তান ছা্ত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ‍ও যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে খ্যাত।ন্যাপ ভাঙার পর  ভাসানী ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক। তাঁরই প্রেরণায় আমি ভাষা সৈনিক । ৫২ থেকে ৫৫ পর্যন্ত আমার সব সামাজিক সাংস্কৃৃতিক – রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও অনুশীলনের গুরু তিনি।আমি তাঁরই হাতে গড়া কর্মী্।আমার আগে আর কোন স্কুল ছাত্র কখনও অবিভক্ত ছাত্র ইউনিয়নের ২৯ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যপদ পায়নি।পরেও না।আমার অগ্রায়ন যা কিছু সবই তাঁরই কল্যাণে।পরীক্ষার ঠিক আগের রাতে ভূগোল গুলে আমার শূন্য মগজে গুঁজে না দিলে ম্যাট্রকটাই হয়ত পাশ করা হোতো না।

অপরিণত বয়সে গুরুগম্ভীর কাজে জড়ানো আমার জন্য শাপে বর হয়েছিল।শুভর অবস্থাও প্রায় একই রকম।সেন্টগ্রেগরির ছাত্র নটরডামের স্নাতক কমরেড শুভ রহমানে রূপান্তরিত হ’ল ।বাবা লুৎফর রহমান সাহেব ছিলেন গভর্ণর হাউজে খোদ সামরিক আইন প্রশাসকের  দপ্তরে সাঁটলিপিকার। তার আগে পূর্ব পাকিস্তান সংসদ সচিবালয়ে কাজ করেছেন বহুকাল।অবসর নেওয়ার সময় আসন্ন ছিল্ । ভেবেছিলেন চেনাজানা হোমরাচোমরাদের সহায়তায় ছেলেকে একটা চাকুরি জুটিয়ে দিয়ে সরকারি ফ্লাটখানার বরাদ্দ পাইয়ে দেবেন।তারপর নিরাপদ সংসার জীবন ও বংশরক্ষা।আমার আব্বাও তেমনটাই ভেবেছিলেন। বলেছিলেন, “আমার চাকুরি তো প্রায় শেষ। তোর যখন লেখাপড়ায় মন নেই , তখন একটা সরকারি চাকুরি নিয়ে দেই। অফিসে হাজিরা দিয়ে দিব্বি এমএ আর  ল-টা পড়তে পারবি।“আমার বড় ভাইয়ের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কথা বললেন। তাকে আমার আব্বাই নিজের অফিসে বি-কম পাশের পর “ইউডি“ চাকুরি পাইয়ে দিয়েছিলেন। বললেন, “ওকেই দেখ না কেন, অলিখিত অনুমোদনে হাজিরা সই করে এম-কম পাশ করলো। এখন বড় চাকুরি করছে।ওমুক এভাবে বড় উকিল হয়েছে। ইত্যাদি।

আমার সাথে সাথে শুভ-র জীবনটাও ঝরঝরে হযে গেল।১৯৫৯ সালে সামরিক শাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস উদযাপন করতে গিয়ে দুজনেই সরকারের রোষানলে পড়লাম।২০ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে সপ্তডিঙ্গা প্রবেশ করলো আজিমপুর গোরস্থানে একরাশ ফুলের মালা তোড়া আর পোস্টার আঠা ইত্যাদি নিয়ে।সব আলো নিভিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল কমরেড লাটমিয়ার সাঙ্গপাঙ্গরা। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঝিঁঝিঁপোকার একঘেঁয়ে ডাক ও  সচকিত শিয়ালের দৌড়ঝাঁপ ছাড়া অন্য কোন শব্দই ছিল না।হঠাৎ মনে হল আর একটি দ্বিপদ ছায়া আমাদের অনুসরণ করছে । সতর্ক অবস্থান নিয়ে বুঝতে পারলাম অশরীরী আত্মা নয়, জলজ্যান্ত দীর্ঘদেহী একজন মানুষ আমাদের অনুসরণ করছে। আমি আর শুভ মন শক্তকরে কমরেড লাটমিয়ার হাত ধরে একটা পুরানো ভাঙা কবরে নেমে মাথা নিচু করে দাঁড়ালাম। বাকি চারজন একই পন্থায় আত্মগোপন করলো । একটা চর্চ লাইট তীব্র আলো ফেললো চারিদিকে। একাধিক ছায়া চারিদিকে হেঁটে বেড়ালো। পলায়মান শিয়াল আর ধেড়ে ইদুর  ও কয়েকট ঘাপটিমারা লাশ খেকো কুকুর ছাড়া অন্য কিছুই তাদের নজরে এলোনা ।আমরা হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছি ভেবে টিকটিকিগুলো লেজগুটিয়ে পালালো।বাইরে নির্জন রাস্তায় অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকা পুলিশের আরও লোকজন নিয়ে দুটো জীপগাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্যে স্টার্ট নিলো। বাইরে অপেক্ষমান এক সাথী তিনবার শীষ দিয়ে সবুজ সঙ্কেত দিলো। আমরা সব শহীদের কবর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে ফুল দিয়ে সাজালাম। চারিদিকে প্রতিবাদী পোস্টার ঝুলিয়ে দিলাম। ভোরের আলো ফোটার আগেই আমাদের কাজ শেষ হয়ে গেলো। ততোক্ষণে চারুকলার   ছেলে মেয়েরা আল্পনা আঁকার কাজও সেরে ফেলেছে। শহীদ মিনার থেকে আজিমপুর গোরস্থান পর্যন্ত কোন আয়োজনের ঘাটতি নেই। ভোরের আলো ফুটতেই প্রভাতফেরির গান ও শহীদ স্মরণে মুর্হুমুর্হূগানে সব নৈঃশব্দ খান খান হয়ে গেলো।শহীদ বরকতের মাকে নিয়ে আমাদের একজন কর্মী মেয়ে প্রভাতফেরিতে যোগ দিতেই মিছিলে বান ডাকলো।জনজোয়ারে সয়লাব হ‘ল শহীদ মিনারমুখী সব সড়ক।কালোপতাকায় ছেয়ে গেলো ।সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে শহীদ মিনারে যথারীতি সভার কাজও শুরু হলো ।ভাঁজ না ভাঙা পাঞ্জাবি, নিভাজ পাজামা পরে কালো শাল গায়ে মুখচেনা  বক্তারা মাইক নিয়ে যথারীতি কাড়াকাড়ি শুরু করলেন।সপ্তডিঙ্গার কাজ সব কাজ সেরে ফিরে গেলো নিরাপদ পোতাশ্রয়ে।

সে সময় শুভর বাবা সামরিক আইন  প্রশাসকের গোপন সেলে কাজ পেলেন। আমরা  সেই সূত্রে আবহাওয়ার পূর্বাভাষ ও তাপমাত্রার আগাম খবর পেয়ে নিরাপদ ডেরায়  মাথা গুঁজলাম।৫৯ এর একুশ ছিল আইয়ুবের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ। সে যাত্রায়  গ্রেফতার হল অনেকেই ।ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের ভিপি কাজী বারি সামরিক হেফাজতে বেত্রাঘাতে শ্রবণ শক্তি হারালো।যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজের ভিপি কাজী শহীদ মরতে মরতে বেঁচে উঠলো।দুজনই ছাত্র ইউনিয়নের  কর্মী।লাহোর দূর্গে বন্দী নিখিল পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের আহবায়ক হাসান নাসির চরম নির্যাতনে প্রাণ হারালো। মহান একুশের প্রস্তুতি পর্বে পায়াভারি কোন ছাত্র নেতাকেই পাওয়া যায়নি। ডাকসু অফিসে তিনবার মিটিং ডেকে কোরাম হয়নি। ডাকসু  ও হল ইউনিয়নের ভিপি জিএসরা সবাই লাপাত্তা।অনেকে সিএসপি হয়ে মগডালে বিচরণ করছেন।ঢাকা হলের ভিপি এনায়েতউল্লাহ খান ও জিএস তাহের উদ্দীন ঠাকুরকে বার বার তাগিদ দিয়েও ডাকসু অফিসে ডাকা কোন মিটিংএ আনা গেলো না।শেষ মিটিং এ পরবর্তীকালের  চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি তখন ডাকসুর ভারপ্রাপ্ত জিএস, অঙ্কে গোল্ড মেডেলিস্ট ফজলে হোসেন,ফরেন সার্ভিস পাওয়া এস এম হলের ভিপি হুমায়ুন কবির , রোকেয়া হলের ভিপি ফৌজিয়া সামাদ ও আমি কোরাম ছাড়াই একুশের কর্মসূচি চূড়ান্ত করলাম। দায় ঠেকলাম আমি।কথায় বলে, মাঝরাতে কথা বলে যে দুয়ার দেয় সে।ঢাকার বাইরে আমার ডেরায় শুভ পোস্টকার্ড দিয়ে সামরিক আদালতের রুদ্ধদ্বার বিচারের রায় জানালো – “১৪ বছর  পঞ্চাশ বেত-সাধু সাবধান“।

শামসুল আরেফিন খান
শামসুল আরেফিন খান

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts