সোনার হরিণ

সোনার হরিণ

বিয়ের এক সপ্তাহ পর প্রথমবার বাপের বাড়ি বেড়াতে এসে রাবেয়া যখন চামচকে ‘চামিচ’, কাঁকইকে ‘চিরুনী’ এবং পিছাকে ‘ঝাড়ু’ বলল , তখন মা-খালারা এর ওর গা-এ হাসতে হাসতে ঢলে পড়ে নানান বিশেষণে ওকে এবং ওর মানুষটাকে সজ্জিত করায় ব্যস্ত হল। মানুষটা ওকে ভালবাসে, পাগলের মতো ভালবাসে। রাবেয়া ভাবে ভঙ্গীতে,অসমাপ্ত বাক্য এবং ছোট বড় হাসির সাহায্য নিয়ে মানুষটার ভালবাসা ওকে কতখানি সুখি করেছে, তা বোঝাতে ব্যস্ত হল। স্পষ্ট হয়নি কিছুই, না কথা, না হাসি, কেননা অতটা লজ্জাহীনা ও হতে পারেনি। বিষম লজ্জা মানুষটার ভালবাসার পাগলামি ওর চোখের পাতা আর দু’ ঠোট ভারী করে দিয়েছে বলেই লজ্জার ভান করে বন্ধ দু’ চোখে দৃশ্যগুলো আবার দেখে বন্ধ দু’ ঠোঁটে নি:শব্দে শব্দাবলী আওড়ায়। মনের মধ্যে বৃষ্টির মতো রিমঝিম ঝংকারে সুখ। এ্যাত সুখ ছিল তার কপালে!

রাবেয়ার কপালটা ভাল হওয়াই স্বাভাবিক। এ পাড়ার সেরা সুন্দরী সে। ক্লাস টেনে ওঠার পর বিয়ে হল। তার আগ পর্যন্ত গোটা স্কুলেই ওর নাম ছিল ‘সুকেশী গোলাপ সুন্দরী’ বলে। সোলায়মান স্যার ওকে বিয়ে করার জন্য কম ছটফট করেছেন? রাবেয়া তার মুখের উপরেই বলেছিল. গোনা পয়স্যায় আমার কুলাবে না। বান্ধবীদের বলত, লোহার চামচ মুখে নিয়া আমি না হয় জন্ম্যাইছি। আমার পুলাপাইন জন্মাইব মাশাল্লা সোনার চামচ নিয়া।

ভাল বংশ, প্রাচুর্যময় সংসার আর সুদর্শন শিক্ষিত পাত্র ছাড়া রাবেয়ার চলবে না। কৃষক বাপের সুন্দরী মেয়েটা সেই স্বপ্ন দেখেই দিন কাটাত। স্বপ্নটা সত্যি হয়ে গেল বলে রাবেয়া এত সুখ, এত সুখ বলে পাখির মতো ভেসে বেড়াচ্ছে স্বাভাবিক কারণেই।

প্রথমবার বাপের বাড়ি এসে যাদেরকে ও ঈর্ষাতুর করে তুলেছিল, তাদের মনের ভেতরকার অব্যক্ত বদদোয়া এত তাড়াতাড়ি তাদেরকে স্বস্তি দেবে, তা কে ভেবেছিল? দ্বিতীয়বার একা এল রাবেয়া। কাঁদতে কাঁদতে চোখের কোল ফুলে গেছে। মায়ের বুকে আছড়ে পড়ে আকাশ বাতাস ভারি করে তুলে শুধু বলল, আমি আর ঐখানে যামু না। যাইতে পারুম না। না। না।

নানান মুখের অনুমান মিশিয়ে যেটুকু জানা গেল, তা সুখবর নয়। রাবেয়ার সুখের কপালে ছাই পড়েছে। পাড়া-পড়শিদের কুঁচকানো ভ্রু স্বাভাবিক হচ্ছে না তো হচ্ছেই না। কী হল এমন যে মেয়েটা এক কাপড়ে চলে এসেছে? ওর স্বামী-শ্বশুর-দেবর কি ওকে শারীরিক নির্যাতনে অতীষ্ঠ করে তুলেছে?

রাবেয়ার অক্ষত শরীর দেখে সেই অনুমান বাদ দিয়ে নতুন ভাবনা এলো। মুখের কথায় মেয়েটাকে কষ্ট দিয়েছে?

তাও না। পুরো পরিবারটাই রাবেয়াকে ভালবাসত। বলা যায় মাথায় করে রাখত। এইবার পড়শীদের ভাবনা গভীরে প্রবেশ করল। রাবেয়ার একান্ত দাম্পত্য জীবনে উঁকি মেরে উত্তর খুজে হয়রান হল। এখানেও সমস্যা। রাবেয়া কয়েকদিন আগেই জানিয়ে গেছে, মানুষটা ওকে ভীষণ ভালবাসে। কী এমন হল যে ভালবাসা ফুরিয়ে গেল? তেল ফুরানো সলতের মতো দপ্ করে নিভে গেল রাবেয়ার স্বপ্ন সুখ ভবিষ্যতের শুভকামনা!

কেন?

পুরুষের প্রেম বালির বাঁধের মতো কতটা ক্ষণস্থায়ী, তার নানান বিশেষজ্ঞ মতামত উড়ে বেড়াল রাবেয়ার দুঃখকাতর মনটার আশে পাশে। নারীরা নিজেদের স্বামীদের অবিশ্বস্ততা ও ঘুমহীন যন্ত্রন দায়ক রাতের বর্ণনায় সরব হল। অন্য নারীতে আসক্তি, ঘরে বউ রেখে পরনারীকে নিয়ে রাত কাটানো যেন পুরুষদের স্বাভাবিক অভ্যাস। রাবেয়া শুনতে শুনতে অস্থির হয়ে একসময় বলেই ফেলল, তোমরা সব মজমা দাও। ও রে, ঐসব নয়। ঐসব বদকাম মানুষটারে করতে দেখিনি।

রাবেয়াকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মনে করতে হয় রাতগুলোর কথা। অত ভালবাসা, ঐ রকম ভালবাসা তাকে সংসারে রাখতে পারল না কেন? রাবেয়া ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে আর জবাবের আশায় ছটফট করতে থাকা মুখগুলোর সামনে ছুঁড়ে মারে যে বিশেষণটি, সেটি প্রথমবার সবাই বলছিল। এ বার ও একা বলছে। মানুষটা পাগল। ভালবাসার পাগল। স্বাভাবিক ভালবাসাবাসি নয়, স্বাভাবিক নয় সে। শ্বশু বাড়ির লোকেরা সব গোপন রেখেই অথবা গোপন রাখার মতো বিষয় কিনা বুঝতে না পেরেই গোপন রেখে তার সর্বনাশ করেছে। পাগল স্বামীর সাথে ঘর করা সুকেশী গোলাপ সুন্দরীর পক্ষে সম্ভব নয়।

পাগল মানুষটাকে দেখা যেতে লাগল প্রতিদিনই। দূর থেকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে রাবেয়াকে। শালিসের দিন মানুষটার আছাড়ি-পিছাড়ি কান্না দেখে চোখ ভিজে গেছে উপস্থিত সকলেরই। রাবেয়ার মা মেয়ের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে কান্নাভেজা কন্ঠে বলেছে, হারামজাদী। এমুন কপাল তর সইলনা ক্যান?

রাবেয়া দৃঢ় কন্ঠে বলেছে, এমুন কপালের আমার দরকার নাই।

ভাল বংশ, টাকা পয়সা সব আছে, কিন্তু মানুষটা যে পাগল! সোজা কথা, রাবেয়া ভাগ্যের লিখনের কাছে হেরে যেতে পারে না।

শালিসে দাঁড়িয়ে রাবেয়ার শ্বশুর যা জানাল, তা হচ্ছে ঢাকায় পড়ালেখা করতে গিয়ে এক মেয়ের সাথে ভাব-ভালবাসা হয়েছিল রাবেয়ার স্বামীর। সেই মেয়ে আরো বড় লোক পাত্রের সন্ধান পেয়ে ভেগে যায়। ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি মানুষটা। শেষ পরীক্ষা না দিয়ে বাড়ি চলে আসে আর বাপ-মাকে জানিয়ে দেয়, বিয়ে করবে না। কখনোই না। গোটা বিশেক পাত্রী দেখিয়েও মন গলানো যায় নি। কিন্তু রাবেয়াকে দেখে নিজেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে বিয়ের জন্য। বিয়ের সময় রাবেয়া নিজের জন্য ব্যাপারটাকে আনন্দের ভাবলেও যত দিন গেছে টের পেয়েছে মানুষটা কি যেন খুঁজে ফিরছে তার ভেতরে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে নির্ভরতা নেই, পারস্পারিক বোঝাপড়া নেই, কেবলি একতরফা অস্থিরতা। ভালবাসায় ডুবিয়ে দিয়ে হঠাৎ গলা টিপে ধরেছে মানুষটা। হিসহিস করে বলেছে, তোমাকে একেবারে মেরে ফেলব। তাহলে আর কোথাও কারোর কাছে চলে যেতে পারবে না। আমার বুকের ভেতরে ধরে রাখব তোমাকে। তুমি চলে যাবে, তা হবে না। হতে দেব না।

প্রথম দিকে এটাও ভালবাসাবাসির অংশ বলে ভেবেছিল রাবেয়া। কিন্তু যখন সত্যিই গলায় চাপ পড়ল, মানুষটার চোখের দৃষ্টি এফোঁড় এফোঁড় করে জানতে চাইল, কেন তার ভয় লাগছে? রাবেয়া অজানা আতঙ্কে বিছানার চাদর দুই হাতের মুঠোর ভেতর আঁকড়ে ধরে পা ছুঁড়েছে। চিৎকার করে বলেছে, বাঁচাও! আমাকে মাইরা ফালাইলো গো।

লাখ টাকা দিলেও রাবেয়া ঐ বাড়িতে, ঐ ঘরে, ঐ বিছানায় শোবে না। ও মুক্তি চায়। ও বাঁচতে চায়। তা-ই হ’ল। রাবেয়াকে বাঁচতে দেওয়া হ’ল। শালিসের সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পরে মানুষটা রাবেয়ার দিকে তাকিয়ে কেঁদেছে।

রাবেয়ার সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া শ্বাশুড়ি রাবেয়ার দুটো হাত ধরে কাতর কন্ঠে বলেছে, ও তোমারে ভালবাসছিল। তুমি বাস নাই। নাইলে তুমিই পারতা। ভালবাসা দিয়া, মমতা দিয়া ওর কইলজাডা ঠান্ডা করতে তুমিই পারতা।

রাবেয়া ঠোঁট উল্টিয়ে বলেছে, আমি পারুম না। অন্য মাইয়া যদি পারে তো তারে ঘরের বউ বানান। আমারে ক্ষমা দ্যান আপনারা, ক্ষমা দ্যান।

ছয় মাসের মাথায় আবারো রাবেয়ার বিয়ে হল। চট্টগ্রামে ভাল ইনকামের চাকরি করে লোকটা। রাবেয়াকে দেখে পাগল হয়ে গেল একদম, আগের বিয়ের কথা শুনেও দমে যায়নি। পরের দিন বিয়ে করে তার পরের দিন নিয়ে গেল নিজের বাসায়। ঈর্ষাকাতুর পড়শীরা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,কপাল বটে মাইয়াডার।

এবার অত তাড়াতাড়ি নয়, এক সপ্তাহ নয়, পুরো দেড় মাস পর বাপের বাড়ি এল রাবেয়া। কাঁদতে কাঁদতে চোখের কোল ফুলে গেছে। মা-কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলল, আমি আর কখনো ফিরা যামু না। যামু না।

কেন যাবে না রাবেয়া? আবার কী হ’ল?

রাবেয়ার সাফ কথা। লোকটা পাগল। আমারে মাইরা ফেলতে চাইছিল। আমি পলাইয়া আইছি।

জানা গেল, এই লোকটাও পাগলের মতো ভালবাসে রাবেয়াকে। আর পাগলের মতোই ভালবাসতে গিয়ে লোকটা রাবেয়ার শরীর আর মনে খুঁজত পাল্টা ভালবাসা। স্বচ্ছল সংসারে তৃপ্ত রাবেয়া ভালবাসেনি অথবা তখনো ভালবাসার ফুরসত পায়নি, অথবা ভালবাসলেও তীব্রতায় নোনাজল তখনো।

লোকটা রাবেয়ার কোথাও ভালবাসা খুঁজে না পেয়ে প্রথম স্বামীর ছায়া খুঁজে পেত অকারণেই। তীব্র আতঙ্কে রাবেয়াকে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলত, কোথাও যেতে দেব না তোমাকে।

রাবেয়া কোথাও যেতে চায়নি। বিশ্বাস করেনি লোকটা। বলেছে, তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে চাইলেও আমি দেব না।

বেশ্ তো। দেবে না। আটকাবে নিশ্চয়ই। কীভাবে?

লোকটা তখন কেমন করে যেন বলেছিল, তোমাকে আমি একদম মেরে ফেলব। একেবারে মেরে ফেলব। এমনভাবে মেরে কেটে কুচি কুচি করে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে উড়িয়ে দেব বাতাসে, যে আর কেউ তোমাকে পেতে পারবে না। কেউ তোমাকে খুঁজেই পাবে না।

রাবেয়ার ভয়ে শিউরে ওঠা শরীরটাকে আঁচড়ে কামড়ে একাকার করে দিয়ে লোকটা কাতরায়। কান্নার দমকে ফুলে ফুলে উঠে বলে, আমি যে তোমাকে খুব ভালবাসি। আমি তোমাকে পাগলের মতো ভালবাসি।

শালিসের দিন লোকটা কাঁদল।

রাবেয়া সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর ক্লান্ত কণ্ঠে বাপকে বলল, এইবার এমুন কারোর হাতে দিও, যে আমারে ভালবাসে না। কুনদিন বাসব-ও না।

নাসরীন মুস্তাফা
নাসরীন মুস্তাফা

 

 

Author: নাসরীন মুস্তাফা

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment