স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘চরমপত্র’

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘চরমপত্র’

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নাম। বস্তুত এই বেতারকেন্দ্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ তৎকালীন পাকিস্তানের শাসকবর্গ তাদের হিংস্র সামরিক বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের উপর। শুরু হয় পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্যতম গণহত্যা। সে নির্মমতার কথা বর্তমান প্রজন্মের সন্তানেরা চিন্তাও করতে পারবে না। ২৫ শে মার্চ রাতে শুধু ঢাকা শহরেই হানাদার বাহিনী অন্তত পঁচিশ হাজার মানুষ হত্যা করে। নিরস্ত্র বাংঙালী জাতির প্রতিরোধ শীঘ্রই ভেঙ্গে পড়ে। ঢাকার পরে তারা নতুন উৎসাহে সারা দেশে ধ্বংসলীলা শুরু করে। ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ২৫শে মার্চ রাতেই গ্রেফতার করা হয়। অন্যান্য নেতৃবৃন্দ যে যেভাবে পারেন আত্মগোপন করে ভারতের মাটিতে সংগঠিত হয়ে গঠন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার এবং মুক্তিবাহিনী।

একটি জনযুদ্ধের অন্যতম প্রধান শক্তি তার প্রচার মাধ্যম। আর এ লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। স্বাধীনতা যুদ্ধে এই বেতার কেন্দ্রের ভূমিকার কথা লিখে শেষ করা যাবে না। আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সবচেয়ে উদ্দীপনামূলক অনুষ্ঠান ছিল চরমপত্র। এই চরমপত্র রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের এবং অবরুদ্ধ বাংলাদেশের জনগণের মনোবল চাঙ্গা করতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৫শে মে থেকে। রাজশাহী সীমান্তের কাছে পলাশীর আম্রকাননে একটি ট্রান্সমিটার বসিয়ে এই বেতার কেন্দ্রের কাজ শুরু করা হয়। এই চরমপত্র লেখার এবং পাঠের দায়িত্ব পালন করেন এম. আর আখতার মুকুল। এজন্য তাঁকে কি অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছে সে কথা মুকুল ভাইয়ের মুখ থেকে শুনেছি অনেকবার। এই অনুষ্ঠানের জন্য মুকুল ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।  

প্রতিটি চরমপত্রের দৈর্ঘ ছিল ৮ থেকে ১০ মিনিট। এম. আর. আখতার মুকুল মূলত ঢাকার আঞ্চলিক ভাষায় চরমপত্র লিখতেন। এর ভাষা এতই ব্যঙ্গাত্মক ছিল যে, অবরুদ্ধ বাংলাদেশে প্রতিমুহূর্ত মৃত্যুভয়ে সন্ত্রস্ত মানুষেরও হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেত। প্রথম দিনের চরমপত্রেই বেলুচিস্তানের কসাই খুনি জেনারেল টিক্কা খানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘‘না, না, তোমাকে ভয় দেখাবো না। একবার যখন হানাদারের ভূমিকায় বাংলাদেশের কাদায় পা ডুবাইছো তখন এ পা আর তোমাগো তুলতে হইবো না। গাজুরিয়া মাইর চেনো? হেই গাজুরিয়া মাইরের চোঠে তোমাগো হগগলেরই এই ক্যাদোর মাইধ্যে হুইত্যা থাকোন লাগবো।’’ আর এক দিনের চরমপত্রে ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশ্য বলেন, ‘‘হায়রে ইয়াহিয়া। কত কেরামতি না তুমি জানো। বাম্বু চেনো? এখন বুঝি বাম্বু এসেছে আর সেই বাম্বুর ঠেলায় কেরামতি দেখাচ্ছো? কিন্তু বাপধন ময়না আমার, কোন কেরামতিই যে আর কামে লাগবো না। এখন বুঝি চান্দি গরম হইছে। আর এই গরম চান্দি লইয়া পাগল অইয়া তুমি আবোল তাবোল কইতাছো। কিন্তু একটা কথা কইয়া দেই- ঠ্যালা চেনো? হেই রাম ঠ্যালার নাম কিন্তুক জশমত আলী মোল্লা বুঝছো?’’ অবরুদ্ধ বাংলাদেশে যারা হানাদার পাকিস্তানীদের দালালী করত তাদের উদ্দেশ্য অত্যন্ত শ্লেষাত্মক তীব্র ভাষায় হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হত চরমপত্রে। এমনই একজন দালাল ছিল পাবনায় হানাদার বাহিনী কর্তৃক নিযুক্ত জেলা প্রশাসক   ক্যাপ্টেন জায়েদী। তাকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে এম. আর. আখতার মুকুল চরমপত্রে বলেন, ‘‘হায় হায়! একটা জব্বর কথা কইতে কিন্তু ভুইল্যা গেছি। এই ক্যাপ্টেন জায়েদী কিন্তু প্রাক্তন পাকিস্তানের প্রাক্তন পার্লামেন্টের প্রাক্তন পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী ছিলেন। আর আইয়ুব খান সাহেব একে খুবই পেয়ার করতেন। কিন্তু চান্দু আমার! একুট সাবধানে থাইকো। তোমার নাম কিন্তু লিষ্টির মধ্যে রইছে।’’

কুখ্যাত মোনায়েম খান ছিল বাংলাদেশের মানুষের কাছে চরম ঘৃণিত এক গণদুষমণ। ১৯৬২ সালের ২৮শে অক্টোবর তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্ণর নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে তিনি এদেশের গণতান্ত্রিক সকল শক্তিকে ধ্বংস করার জন্য নির্যাতনের ষ্টীম রোলার চালাতে থাকেন। মোনায়েম খান একবার দম্ভ করে বলেছিলেন যে, তিনি যতদিন গভর্নর থাকবেন ততদিন শেখ মুজিবকে জেলের ভিতরে কাটাতে হবে। গণ অভ্যুত্থানের জোয়ারে ১৯৬৯ সালের ২৩ শে মার্চ আইয়ুব খান মোনায়েম খানকে গভর্নরের পদ থেকে অপসারণ করেন। এদেশের মানুষের বিরুদ্ধে গণবিরোধী ভূমিকার জন্য ১৯৭১ সালে ১৩ই আক্টোবর মুক্তিবাহিনী তাকে তার বাসভবনে হত্যা করে। বনানীর সুরক্ষিত বাসভবনে মোনায়েম খান নিহত হওয়ার ফলে দখলদার পাকিস্তানীদের এবং তাদের দালালদের মনোবল একেবারে ভেঙ্গে পড়ে। মোনায়েম খান নিহত হওয়ার দু’দিন পর ১৫ই অক্টোবর এম. আর. আখতার মুকুল তাঁর চরমপত্রে বলেন, ‘‘পাকিস্তান থাইক্যা নতুন আমদানী করা কিছু অফিসার ঢাকার কাকরাইলে সার্কিট হাউসে ক্যাম্প অফিস বানাইছে। হেগো রাইতদিন মছুয়া সোলজাররা পাহারা দিতাছে। কিন্তু তা হইলে কি হইবো? একটুক হিসাব কইরা ঘুমাইয়ায়েন। যে কোন টাইমে বিচ্ছুগো কারবার হইতে পারে। করাচী, লাহোর, পিন্ডিতে যে বউ-পোলাপান থুইয়া আইছেন, হেগো লগে আর মুলাকাত নাও হইতে পারে। ময়মনসিংহের মোনাইম্যা বিচ্ছুগুলার ঘষাঘষিতে সোজা আজরাইল ফেরেশতার কাছে যাইয়া ইয়েচ ছার কইছুইন।’’

আজকাল স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির পক্ষ থেকে প্রায়ই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করার অভিযোগ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধ্বংস করার একটি জলন্ত উদাহরণ চরমপত্রর কোন রেকর্ড আজ না থাকা। স্বাধীনতার পর পরই সরকারী উদ্যোগে প্রতিটি চরমপত্রের রেকর্ড বের করে প্রকাশ করা জাতীয় দায়িত্ব ছিল। ১৯৭৫ সালে বংগবন্ধু হত্যার পর খন্দকার মোশতাক এবং তাহের উদ্দিন ঠাকুর এর নির্দেশে ঢাকা বেতার কেন্দ্রে রক্ষিত চরমপত্রের সকল কপি ধ্বংস করে ফেলা হয়। তবে মুকুল ভাই এর কাছে এর পান্ডুলিপি থাকায় স্বাধীনতার দীর্ঘ ২৮ বৎসর পর চরমপত্র পুস্তকাকারে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু অডিও রেকর্ড না থাকায় মূল চরমপত্রের আবেদন অপূর্ণই থেকে যায়। ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মুকুল ভাইয়ের কন্ঠে পুনরায় রেকর্ড করিয়ে চরমপত্র প্রকাশ করার জন্য আমরা বিভিন্ন মহলে প্রচেষ্টা চালালেও সফলকাম হতে পারিনি। এর ফলে সমগ্র জাতি বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্ম বঞ্চিত হয় তার হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জল অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সবচেয়ে উদ্দীপনামূলক ও জনপ্রিয় অনুষ্ঠান চরমপত্রের স্বাদ থেকে। এ যে কত কষ্টকর তা বুঝিয়ে বলার মত নয়।

সৈয়দ জিয়াউল হক​
সৈয়দ জিয়াউল হক

 

Author: সৈয়দ জিয়াউল হক

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts