১৯৭১ ফিরে দেখা ২০১৭

১৯৭১/ মার্চ ০১ আজ  এই দিনের দুপুর ১টা । কুষ্টিয়া জেলা স্কুল । টিফিনের ঘণ্টা বেজে গেছে ক্লাশরুম থেকে দৌড়ে ছুটে এলাম স্কুল গেটে । একমাত্র চটপটি বিক্রেতা আলী তার ছোট্ট রেডিওটা ততোক্ষণে অন করে দিয়েছে, কানের কাছে নিয়ে শুনছে পাকিস্থান জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ইয়াহিয়া খানের ভাষণ । আমি ও আরো কয়েকজন ছাত্র এই রেডিওতে হুমড়ি খেয়ে ভাষণটি শোনার চেষ্টা করছি । উর্দু বুঝি না, তবুও যেন বুঝতে পারছিলাম । প্রতিদিনের রসনা বিলাস আলীর চটপটিকেনা ও বেচায় কারো কোন আগ্রহ নেই ! গত ডিসেম্বরে অর্জিত বাঙালি জাতির নিরঙ্কুশ নির্বাচনী বিজয়কে চুরমার করে ধূলিসাৎ করে দিতে পাকিস্তানীদের শেষ ষড়যন্ত্রের ভাষণ । শুধু কি আমরাই সেই ভাষণটি শুনছিলাম ! সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঘৃণাভরে এই ভাষণ শুনেছিলো । ভাষণ শেষ হতেই অকস্মাৎ বেজে উঠলো স্কুলের ছুটির ঘণ্টা ! কে বাজিয়েছিল এই ঘণ্টা ! আবার দৌড়ে ক্লাশ রুমে ফিরে গিয়ে বই খাতা নিয়ে ছুটে চললাম ৩/৪ কিলোমিটার দূরে আমার অস্থায়ী আবাস স্থল চৌড়হাস সরকারি কোয়ার্টারের (এখন বাস স্ট্যান্ডের সামনে) দিকে। পথিমদ্ধে পরিকল্পনা এঁটে নিলাম আমার সুশৃঙ্খল শরীরচর্চার শিশু কিশোর বাহিনীকে কিভাবে অস্ত্র প্রশিক্ষণে সুসজ্জিত বাহিনীতে রূপান্তর করা যায় । কাঠের রাইফেল নিয়ে স্কুল ক্যাডেট ট্রেনিং আমার রপ্ত ছিল । অগ্রজদের নকশাল আন্দোলনের জেহাদি কলা কৌশল, বিস্ফোরক তৈরির ফর্মুলা ও তা ছুঁড়ে মারার সাহস অর্জন করেছিলাম আগেই । পুলিশের সন্তান হিসেবে থ্রি নট থ্রি রাইফেলের চরম বাস্তবতা আমার মুখস্ত । কলোনিতে ফিরে গিয়েই দেখা হলো সিরাজ ড্রাইভারের ছেলে জামালপুরের আনছার (আমার সমবয়সী) এর সঙ্গে । ওকে বলা মাত্রই সে কাঠ সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ল । আমি বই খাতা বাসায় রেখে ভাত খেয়ে ফিরে এসে দেখি কাঠের বদলে মোটা মোটা বাঁশের বাকাড়ি (বাঁশ ফেড়ে বানানো হয় যা) যোগার করেছে খুব দ্রুত আমরা সেগুলো কেটে আমাদের বাহিনীর উপযুক্ত করে নিলাম । কোথা থেকে যেন এক ডিব্বা ফিরোজা রং নিয়ে এসে বাঁশের রাইফেলগুলো রঙিন করে দিলো । আমারা সেগুলো সারিবদ্দভাবে রোদে শুকাতে দিলাম । বিকেল হলেই আমার পিটি প্যারেড বাহিনীদের ঘাড়ে শোভা পাবে এই প্রতীকী অস্ত্র ! আসন্ন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশ কে আমাকে দিয়েছিলো ? শেখ মুজিবের  সঙ্গে আমার কি টেলিফোনে কথা হয়েছিলো ? না । তবে ৭০ এর নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি যখন হেলিকপ্টারে চড়ে কুষ্টিয়া এসেছিলেন,  তাঁর অভ্যর্থনা বহরের বিরাট মিছিলটি আমাদের স্কুলের সামনে দিয়ে ইউনাইটেড হাই স্কুলের (শহরের অন্যান্য বেসরকারি স্কুলগুলো এদিন বন্ধ ছিলো) সভাস্থলের দিকে যাচ্ছিলো । আমি তখন আমার ক্লাস রুমের শিকবিহীন জানালা দিয়ে (শিক্ষক ও অন্য ছাত্রদের বুঝে ওঠার আগেই) এক লাফে দৌড়ে সেই মহামানবের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম ! তিনি একটি ছোট্ট নীল রঙের মাইনর মরিশ গাড়ির মধ্যে ডান দিকের সামনের ছিটে বসেছিলেন তাঁর বাঁ হাতে ছিলো সেই বিখ্যাত পাইপ । আমি মানুষের হাঁটুর নিচে দিয়ে প্রবেশ করে গাড়িটির উইন্ডো ধরে চলতে লাগলাম (ছোট ছিলাম বলেই সম্ভব হয়েছিলো) আর অবাক বিস্ময়ে আমার মেঝো মামার চেহারার আদলে দেখতে অপূর্ব শেখ মুজিবকে দেখছিলাম । শুভ্র পাঞ্জাবির উপরে কালো মুজিব কোর্টে সুশোভিত সেই মহামানবও বিশাল বড় মানুষের ভিড়ে একটি কিশোরকে দেখে নিশ্চয় অভিভূত হয়েছিলেন ! নইলে কেন তিনি তাঁর সেই ঐতিহাসিক হাতের তালু রেখে পাঁচ আঙুল দিয়ে আমার মাথায় আদর করছিলেন ! সেই নরম তুলতুলে হাতের ছোঁয়ায় তিনি কি আমার মাথায় স্বাধীনতার বীজ বপন করে দিয়েছিলেন ! ৫/৬ মিনিটের মধ্যে মানুষের প্রবল চাপে আমি গাড়ির কাছ থেকে ছিটকে পড়লাম । আমি দৌড়ে আমাদের মজমপুরের বাড়িতে চলে গেলাম, সেখানে অধীর আগ্রহে আমার বোনেরা অপেক্ষা করছিলো আমাকে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করলো, দেখেছিস দেখেছিস কেমন দেখতে ? আমি বললাম, মেঝো মামার মত দেখতে ! মিছিলের স্লোগান গর্জন আমাদের বাড়ি থেকে তখনও শোনা যাচ্ছিলো । ঐ মিছিলেই আমি একটি পাইলট পেন পড়ে পেয়েছিলাম । আমরা সেটা নিয়েই তখন ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম । শেখ মুজিব যে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন সে কথা আর প্রয়োজনীয় মনে হয় নাই । পরদিন শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বিনা শাস্তিতে স্কুল থেকে বই খাতা ফেরত পেয়েছিলাম ।

১৯৭১ মার্চ ৭, আজকে আমার রাইফেল-বাহিনীরপিটি-প্যারেডে ছুটি দেয়া আছে। গত ৬ দিন অস্ত্রসহ প্রশিক্ষণে ওরা কিছুটা ক্লান্ত । এ ছাড়া আজকে একটা বিশেষ কারণে বন্ধ রাখা হয়েছে ট্রেনিং । আজ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন ! আমাদের ট্রেনিং এর সময় ও স্বাধীনতা ঘোষণার সময় ওভার ল্যাপিং হয়ে গেছে ।

গত মাস থেকে একটা মাদুর পাঠাগারচালু করেছি । মাদুর পেতে খবরের কাগজ পড়া বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে । পূর্বদেশ ইত্তেফাক দিয়ে শুরু করে এখন একটা ইংরেজি ও আরো দুতিনটা পত্রিকা বেড়ে গেছে এসবের জন্য আমার কোন পয়সা খরচ হয়নি । তাছাড়া পয়সা ছিলোও না । শুধু উদ্যোগ নিয়েছিলাম । স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় কলোনীর বয়স্ক কেরানীকুল বেশ উদার হয়ে উঠেছিলো ।

আজ সেই মাদুর পাঠাগারে কেউ একজন একটা রেডিও নিয়ে এলো । চড়া ভলিউমে সেটা বাজতে শুরু করলো । পাটিতে বসা সিনিয়রদের পিঠে হুমড়ি খেয়ে আমরা সেই অমর ঘোষণার প্রতীক্ষায় ধৈর্যহীন অপেক্ষায় । ইয়াহিয়া খানের ১ তারিখের দেয়া ভাষণের জবাব দেবেন আজ শেখ মুজিব । কে এই শেখ মুজিব ? আমার মামার আদলে দেখতে সেই অলৌকিক মানুষটা যিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন ! আজ তার মুখের বাণী নিজ কানে শুনবো ! তা সে কিসের বাণী ? ‘স্বাধীনতার ঘোষণাএই মুহূর্ত কি মানুষের জীবনে বার বার আসে ?

কেরানীদের চোখে মুখে আতঙ্ক স্পষ্ট । অনিশ্চিত আগামীর লাভ ক্ষতির মাসিক বেতনী হিসাবে । শুরুতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও রেডিও থেকে শেখ মুজিব গর্জে উঠলেন ! বাংলায় ! একদম আমার মেজ মামার ভাষা কিন্তু এ কণ্ঠ মামার না । এ এক অন্য কণ্ঠ ! এর আগে কখনো শুনিনি ! এ কণ্ঠে কলোনীর মাঠের ঘাসেরা আমার শরীরের লোমের সঙ্গে খাড়া হয়ে উঠলো !রাস্তার ওপারে ইটের ইয়ার্ডে জমে থাকা ইটগুলো নড়ে চড়ে উঠলো । সেই কণ্ঠ আর আমার আত্মা ছাড়া সকল মহাজাগতিক অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে গেলো মুহূর্তে, মহাশূন্যের কোন এক অবস্থান থেকে ছুটে আসা জ্যোতির্ময় এই ভিডিও কনফারেন্সিংএ

কি ছিলো সেই বাণীতে ! কি ছিলো সেই ভাষণে ! ভাষণ শেষ হলেই রেডিওটা আস্তে করে দেয়া হলো । কেরাণীদের মুখমণ্ডলে প্রশ্ন বোধক যুক্তি-তর্ক ফুটে উঠলো ! স্বাধীনতার ঘোষণা নাকি দেন নাই শেখ মুজিব !

তাহলে আমি কি শুনলাম ! এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম ! তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে । প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল !

সেদিন থেকেই আমি ও আমার শিশু কিশোর রাইফেল বাহিনীর যোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধা ।

Author: সোহেল অমিতাভ

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment