১৯৭৫য়ের সেই কালো দিনটিতে

 

সিলেট থেকে ঢাকায় বদলী হয়ে এসেছি সবেমাত্র। মালপত্র সবই পড়ে আছে অফিসের গোডাউনে। পাঁচতলা   একটি বাড়ির তিনতলা এপার্টমেন্ট ভাড়া করা হয়েছিলো তড়িঘড়ি করে রাজারবাগ এলাকায়।

আমরা এসে উঠলাম সেই বাড়িতে ১২ কি ১৩ই আগষ্ট।

সেদিন ছিলো ১৫ই আগস্ট। আমি ভোরে ঘুম থেকে উঠেই নাস্তা বানাবার জন্যে রান্না ঘরে ঢুকেছি।পরোটা তৈরি করবো বলে আটা মাখছিলাম।  হঠাৎ শুনি দোতলা থেকে খোলা জানালা দিয়ে রেডিও থেকে উচ্চস্বরে  আওয়াজ ভেসে আসছে

আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরাচারী শেখ মুজিবকে হত্যা করা করা হয়েছে।

সাথে সাথে আমার হাত থেকে আটার পাত্রটা মেঝেতে ঠন করে পড়ে গেল।

একি শুনলাম আমি ! তাড়াতাড়ি দৌড়ে বারান্দায় আসলাম।

রেডিও থেকে তখন ভেসে আসছে জননেতা খন্দকার মোশতা ক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। সারা দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়েছে এবং কারফিউ জারি করা হয়েছে।

বাংলাদেশে এখন থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র কায়েম করা হবে।

আমার রেডিওটা মালপত্রের সাথে অফিসের গোডাউনে পড়ে আছে বলে নিজের হাত নিজেরই কামড়াতে ইচ্ছে করছিলো।

অর্থহীন এক বোবা দৃষ্টি মেলে শূন্যে তাকিয়ে রইলাম।

পূব আকাশে তখন সূর্য উঠেছে কিন্তু সেই  আলো দেখে মনে হচ্ছিলো আলোটাকে ছাপিয়ে সারা দেশ জুড়ে  

একি  শুনলাম! এও কি সম্ভব!

আমাদের পিতাকেই আমরা হত্যা করেছি! পিতৃহন্তারক আমরা!

শুধু তাই নয়

ধীরে ধীরে আরো সংবাদ কানে আসতে লাগলো।

শিশু রাসেলসহ পুরো পরিবারটাকে তারা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।

ভাগ্যক্রমে তাঁর দুই কন্যা দেশের বাইরে ছিলো বলে প্রাণে বেঁচে গেছেন।

পাকিস্তান আর্মি যা করে দেখাতে পারেনি বাংলাদেশ আর্মির কিছু তরুণ তাই করে দেখিয়ে দিলো!

কিন্তু আততায়ীরা বাংলার মানুষদের কি ভেবেছিলো?

বঙ্গবন্ধু আর তাঁর পরিবারটিাকে  নিশ্চিহ্ন করে দিলেই বাংলার মানুষ তাঁকে ভুলে যাবে?  

বাংলার মানুষের পক্ষে তা কি কখনও সম্ভব?

শুধু দেশ নয়,  বঙ্গবন্ধু হত্যার পরদিনই যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত পত্রিকা The time তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী ছাপা  হয়েছিলো। যেখানে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছিলো “ সব কিছু করা সত্ত্বেও শেখ মুজিব এ জন্যে স্মরণীয় হয়ে  থাকবেন যে তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশ কখনও বাস্তবে পরিণত হতো না।

The Speeches That Inspired History   গ্রন্থটিতে বিগত আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসের অগ্রযাত্রার সহায়ক ঘোষণা গুলির মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঘোষণাটিও স্থান পেয়েছে।

যে ভাষণের নির্দেশনায় রচিত হয়েছে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল । কাব্যিক ও শৈল্পিক এই  ভাষণ নিয়ে দেশে বিদেশে গবেষণা বা আগ্রহের শেষ নেই।

জনপ্রিয় মার্কিন সংবাদপত্র Newsweek পাঁচ এপ্রিল একাত্তর সংখ্যায় তাঁকে poet of the politics হিসেবে  উল্লেখ  করা হয়।

আমরাই শুধু সেই হতভাগ্য জাতি তাঁকে মূল্যায়ন করতে পারিনি।

এই লজ্জা ও কষ্ট আমাদের আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।  মাঝে মাঝে তাই নিজেই নিজেকে বলি,

দুর্বার স্রোতে ছুটেছি আমরা

শুনতে তোমার বাণী

হে জাতির পিতা তোমাকেই কিনা

রক্ষা করতে পারিনি।

এত ভালো তুমি বেসেছো মোদের

অবহেলে দিলে প্রাণ

হে মহামানব ক্ষমো ক্ষমো সবে

করি মোরা আহবান।

 

অনুপা দেওয়ানজি

Author: অনুপা দেওয়ানজী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts