আবার মিতুদি

সেদিন কি যেন একটা বই পড়ছিলাম । কাজের বুয়া হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি বই থেকে মুখ তুলে ওর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বলল, ‘খালাম্মা পাইনসা নামে গালফুলা একজন ভদ্রলোক আইছে। আইতে কমু?’

আমি ওর কথা শুনে উদগত​ হাসিটা কোনোমতে গিলে ফেলে গম্ভীর হয়ে বললাম, ‘পাইনসা কোনো ভদ্রলোকের নাম হতে পারে না। আর শোন, কারো সম্পর্কে কখনও এভাবে কথা বলবে না। গালফুলা ভদ্রলোক আবার কি? সবার চেহারা কি একরকম হয় নাকি? যাও ভালো করে জেনে আসো ভদ্রলোকের নাম কি?

বুয়া যেতে যেতে আপন মনেই বলতে লাগলো,  ‘হ​ গালফুলারে গালফুলা কব নাতো আবার কি কব?’ এবং ফিরে এসে আমাকে বলল যে ও ভুল বলেনি। ভদ্রলোকের নাম পাইনসা।
এবার তো আমাকে উঠতেই হয়।
আমি এসে দেখি দরজার কাছে নতমুখে দাঁড়িয়ে পাঞ্চু। কিন্তু একি! ওর মুখটা ফুলে এমন ঢোল হয়ে আছে কেন?
পাঞ্চু আমার প্রতিবেশী মিতুদির ছোট ভাই। ওর ত ও থ উচ্চারণে একটু সমস্যা আছে এজন্যে ত ও থ এর জায়গায় ট ও ঠ দিয়ে কাজ চালায় । আমি ওর মুখ দেখে ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পাঞ্চু তোমার মুখের এ অবস্থা কি করে হোলো? আর তুমি ঘরে না ঢুকে বাইরেই বা দাঁড়িয়ে আছো কেন? ঘরে এসে বোসো। ঢাকায় কবে এলে?’

পাঞ্চু আমাকে কিছু একটা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু মনে হল ব্যথার জন্যে পারছে না।
মনে মনে ভাবলাম, এ জন্যেই বুয়া ওর নামটা ভালো করে বুঝতে পারেনি।
এর মধ্যেই মিতুদি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে পাঞ্চুর হাত ধরে বলল, ‘চল চল । আমি একটু কাজে বাইরে গিয়েছিলাম।’ এই বলে আমাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে পাঞ্চুকে নিয়ে চলে গেলো।
পাঞ্চুর মুখের এ অবস্থা দেখে আমার মনটা খচ খচ করতে লাগলো। ভাবলাম একটু পরে মিতুদির বাসায় নিজেই গিয়ে জেনে নেব। এই ভেবে যেই দরজা বন্ধ করতে গেছি, দেখি মিতুদি মুখ কালো করে হন্তদন্ত হয়ে আবার ছুটে এলো। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মিতুদি জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার বাসায় ব্যথা কমার ট্যাবলেট আছে? থাকলে দুটো দাও তো।’
আমি ওষুধের বাক্স বের করে ব্যথার ওষুধ খুঁজতে খুঁজতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পাঞ্চু কি ব্যথা ট্যথা পেয়েছে নাকি? মুখটা বেশ ফোলা মনে হল!’

মিতুদি বলল, ‘আর বোল না গ্রামের একটা ফাংশানে গান গাইতে গিয়েছিল। শ্রোতাদের মধ্যে কে যেন এমন একটা ঢিল ছুঁড়েছে। সে ঢিল সোজা ছুটে এসে পাঞ্চুর মুখের হাঁ এর ভিতরে আটকে গিয়ে যা তা কান্ড হয়েছে।’
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হাঁ এর ভিতরে ঢিল আটকে গেছে? এতো মারাত্মক কথা! তারপর?’

মিতুদি বললেন, ‘তারপর আর কি? তাড়াতাড়ি করে ড্রপসিন ফেলে ওর হাঁ করা মুখের ভিতর থেকে ঢিল তো বের করা হল কিন্তু তারপরেই ওর মুখটা ফুলে ঢোল। আর এভাবে মুখ ফুলে ঢোল হওয়াতে লজ্জায় ও আর বাড়ি না গিয়ে সোজা আমার কাছে চলে এসেছে।’

আমি মিতুদিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পাঞ্চু কোন গানটা গেয়েছিলো যে শ্রোতারা ওকে ঢিল ছুঁড়েছে?’ মিতুদি বলল, ‘ওই যে টুংটাং টুংটাং চুড়ির তালে থৈ থৈ বন্যা নাচেরে, রিমঝিম ঝিমঝিম বরষাতে জলতরঙ্গ বাজেরে বাজেরে গানটা।’
আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘পাঞ্চু তো ত,থ বলতে পারেনা যারফলে গানটা নিশ্চয় ও গেয়েছে, টুংটাং টুংটাং চুড়ির টালে ঠৈ ঠৈ বন্যা নাচেরে রিমঝিম ঝিমঝিম বরষাতে জলটরঙ্গ বাজেরে বাজেরে।নইলে শ্রোতারা ওকে ঢিল মারবে কেন?’
কথাটা ভাবতেই আমার নিজের হাসি পেয়ে গেল।আমি আমার ভেতর থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে উঠে আসা হাসিটাকে কাশিতে পরিণত করে মিতুদিকে বুঝতে না দিয়ে বললাম, ‘মিতুদি এই নিন ব্যথার ওষুধ। পাঞ্চুকে তাড়াতাড়ি খাইয়ে দিন।’

Author: অনুপা দেওয়ানজী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

One thought on “আবার মিতুদি

  1. মাহমুদ হাফিজ

    চমৎকার রম্য।