দেবীর নামে নাম-অ্যালোভেরা

পাতা দেখলে ভ্রম হওয়া খুবই সম্ভব। দেখতে অনেকটাই আনারসের পাতার মত। অনাদৃত ভেষজ উদ্ভিদ। পথচলতি গ্রামীন সড়কের ধারে চোখে পড়তেই পারে। ঝোঁপে ঝাড়ে দেখা মিলবে। একসময় কবিরাজ আর লোকায়ত চিকিৎসকেরাই শুধু কদর করতেন। বাড়ীর গৃহিণীরাও এর গুরুত্ব বুঝতেন কিঞ্চিৎ। তবে সামগ্রিক বিচারে অন্যান্য হাজারো অনাদৃত উদ্ভিদের মতোই পরিত্যক্ত আর উপেক্ষিত ছিলো এটি।
আপনার অচেনা হওয়ার কথা নয়। গ্রামীন বাংলাদেশের মানুষ যদি হন আপনি, নিশ্চিতই দেখেছেন। আনারসের পাতার মতোই দেখতে অনেকটা এর পাতা। পাতার রং গাঢ় সবুজ।পাতা চওড়া আর পুরু।এর পাতাগুলো বর্শা আকৃতির লম্বা, পুরু ও মাংসল। পাতার দু’পাশে রয়েছে করাতের মতো কাঁটা। পাতার ভেতরে আছে লালার মত পিচ্ছিল শাঁস। আমাদের দেশে জন্মে কমবেশি সব জেলাতেই। ভারতেও প্রচুর। এই উপমহাদেশের সর্বত্রই আছে এই উদ্ভিদ। সমগ্র পৃথিবীতে এর বিভিন্ন প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ২৫০। গাছটি দৃশ্যত অনেকটা ফণিমনসা ক্যাকটাসের মত, তবে মনযোগী পর্যবেক্ষণে সহজেই বোঝা যাবে, ক্যাকটাস নয় এটি।
লিলি গোত্রের বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ এটি। উদ্ভিদতত্বে এর স্থান Asphdelaceae (Aloe family) পরিবারে। বৈজ্ঞানিক নাম Aloe Vera । বাংলায় এর পরিচিতি ঘৃতকুমারী নামে। গ্রীক পুরাণের সৌন্দর্যবর্ধনের দেবী অ্যালোভেরা থেকে। সুপ্রাচীনকাল থেকেই এই উদ্ভিদের ব্যবহারের প্রমাণিত তথ্য পাওয়া যায়। বহুনন্দিতা সুন্দরী মিশরের টলেমি রাজবংশের সম্রাজ্ঞী, কূটনীতিক ও পরে সীজার পত্নী ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্যের মূল রহস্য নাকি নিহিত ছিলো অ্যালোভেরা বা ঘৃতকুমারীতে। নিশ্চিতভাবে জানা গেছে বহুখ্যাত বাদশাহ সোলেমান, দিগ্বিজয়ী সম্রাট আলেকজান্ডার, বীর সেনাধ্যক্ষ নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, অভিযাত্রী কলম্বাস আর অহিংস আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব জননেতা মহাত্মা গান্ধীও ব্যবহার করতেন ঘৃতকুমারী।
স্বাস্থ্য রক্ষা ও সৌন্দর্য বর্ধনে সুদূর অতীত থেকেই বিভিন্ন দেশে লোকায়ত চিকিৎসায় ঘৃতকুমারী ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আয়ুর্বেদীয়, ইউনানী আর অন্য সব লোকায়ত চিকিৎসাতেও এর কদর। সাম্প্রতিক সময়ে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতিতেও এর ব্যবহার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাশ্চাত্যে বহুজাতিক কোম্পানীগুলি অ্যালোভেরাজাত বিভিন্ন পণ্য উচ্চমূল্যে বাজারজাত করছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও অ্যালোভেরাজাত ঔষধ ও পণ্যসামগ্রী উৎপাদিত হচ্ছে। ঘৃতকুমারী বাংলাদেশ, ভারতসহ মূলত প্রাচ্যদেশীয় উদ্ভিদ। অথচ পাশ্চাত্যের বহুজাতিক কোম্পানীগুলি এর গুণকীর্তন করে কোটি কোটি ডলার উপার্জন করে চলেছে। গোটা বিশ্ব জুড়ে এই গাছের জুস বা রস ক্যাপসুল বা জেলের আকারে বিক্রি হচ্ছে।
বাংলাদেশেও ঘৃতকুমারী এখন আর অনাদৃত উদ্ভিদ নয়। রীতিমত পরিকল্পিত খামারে এখন এর আবাদ হচ্ছে। লোকায়ত ও আধুনিক ঔষধ নির্মতা প্রতিষ্ঠান ও প্রসাধনী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলি এর চাষে উৎসাহ দিচ্ছেন, লগ্নী করছেন।
আজকাল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও জনবহুল এলাকায় সড়কের ধারে ঘৃতকুমারীর সরবত বিক্রি হয়। একবার যারা পান করেন, এর ভক্ত হয়ে যান। কর্মজীবী মানুষেরা একগ্লাস ঘৃতকুমারীর শরবত পান করে পরিতৃপ্ত হন, শরীর জুড়ান। আধুনিক অভিজাত বিপণীর কুলীন বিক্রেতারাও এখন ঘৃতকুমারীর সরবত বিক্রি করছেন। সড়কের ধারে, বাজারে, এমনকি সুপার স্টোরগুলিতেও ঘৃতকুমারীর পাতা বিক্রি হচ্ছে। দিনদিন এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অ্যালোভেরাতে আছে- ভিটামিন এ, সি, ই, ফলিক এসিড, বি ১, বি ২, বি ৩, বি ১২; প্রায় ২০ রকমের মিনারেলস যেমন ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক, সোডিয়াম, আয়রন, ম্যঙ্গানিজ, ফলিক এসিড, পটাসিয়াম,কপার ইত্যাদি। মানবদেহের জন্য ২২টি অ্যামিনো এসিড প্রয়োজন আর এর মধ্যে ৮ টি উপাদান থাকা অপরিহার্য। এর প্রধান ৮টি উপাদানসহ আনুমানিক ২০ টি অ্যামিনো এসিড অ্যালভেরায় বিদ্যমান।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অ্যালোভেরা বা ঘৃতকুমারীঃ

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, নিয়মিত ঘৃতকুমারীর রস পান করলে পরিপাকতন্ত্রের কার্যাবলি হয় সুষ্ঠুতর। এতে দূর হয় কোষ্ঠকাঠিন্য। ডায়রিয়া নিরাময়েও ঘৃতকুমারীর রস পান অতি সুফলপ্রদ।
কঠিন শারীরিক পরিশ্রমের ফলে যেসব এনজাইম কাজ করে শরীরকে ক্লান্ত, শ্রান্ত, দুর্বল, নিস্তেজ করে তোলে, ঘৃতকুমারীর রস তাদের ভারসাম্য রক্ষা করে শরীরের ক্লান্তি ও শ্রান্তি দূর করে। দাঁতের মাড়ি সুস্থ্য রাখতে ঘৃতকুমারী দারুণ উপকারী। বহুজাতিক কোম্পানীগুলি ঘৃতকুমারী জাত জেল দাঁতের সুরক্ষার জন্য বাজারজাত করেছে।
নিয়মিত ঘৃতকুমারীর রস পান করলে তা শরীরে শক্তি যোগায় এবং ওজনও ঠিক রাখে। কারণ ঘৃতকুমারীতে রয়েছে চর্বি কমানোর উপাদান।
মানবদেহের টিস্যু নিষ্প্রাণ হয়ে গেলে, ত্বকে ফুসকুড়ি উঠলে এলভেরার জেল খুবই উপকারী। যাদের এলার্জির সমস্যা তীব্র তারা ১মাস নিয়মিত অ্যালভেরার শরবত খেলে নিশ্চিত অভাবনীয় সুফল পাবেন।
শরীরে সাদা রক্তকণিকা গঠনে ঘৃতকুমারী সহায়তা করে। বিভিন্ন ক্ষতিকর ভাইরাসের সাথে লড়াই করার জন্যও শরীরকে উপযোগী করে তোলে।
নিয়মিতভাবে ঘৃতকুমারীর রস পান করলে হাড়ের সন্ধি সহজ হয় ও নতুন কোষ সৃষ্টিতে তা সহায়তা করে।
কিভাবে রসপানঃ-
আপনি যদি আগ্রহী হন ঘৃতকুমারীর রস নিয়মিত পানে, তা’হলে পান করবেন দিনে দু’বার এবং প্রতিবারে গ্রহণ করবেন ১০ মিলিলিটার। পাতার উপরের অংশ পরিষ্কার করতে হবে ভালোভাবে। পান করতে হবে কেবল ভেতরের অর্ধস্বচ্ছ অংশের রস করে। ইচ্ছে হলে রসের সাথে মধু মিশিয়ে খেতে পারেন । তবে চিনি মেশানো অনুচিত।
সৌন্দর্যবর্ধনেঃ-
রূপচর্চাতেও ঘৃতকুমারীর অবদান ও সফলতা ব্যাপক। ব্রণ ও মেছতা নিরাময়ে ঘৃতকুমারীর অবদান অনন্য। ঘৃতকুমারীর পাতা, শসা ও মধু একত্রে পেস্ট করে ব্রণ ও মেছতায় নিয়মিত লাগালে তা অত্যন্ত ফলপ্রদ।। পাতার ভেতরের থকথকে অংশটা প্রতিদিন মেছতার ওপর লাগিয়ে মাসাজ করলে দাগ অনেকটাই হালকা হয়ে আসবে।
নতুন চুল গজানোর জন্যও ঘৃতকুমারী খুবই সুফলপ্রদ। ঘৃতকুমারীর রস নারিকেল তেলের সাথে মিশিয়ে মাথার ত্বকে ম্যাসেজ করে ৩০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলতে হবে। সপ্তাহে ২ দিন হিসেবে ২ মাস অনুসরণ করলেই ফলাফল প্রত্যক্ষ করা যাবে। ঘৃতকুমারীর রস চুলকে কন্ডিশনিং করে মোলায়েম হতে সাহায্য করে যা অনেকদিন স্থায়ী থাকে। খুশকি দূর করতে এটি প্রহরীর মত কাজ করে। এটি রক্তের কলেস্টরেল দূর করতে সাহায্য করে।
মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে বলিরেখা পড়ে। নিয়মিত ঘৃতকুমারীর রস লাগালে বলিরেখা দূর হয়ে/কমে গিয়ে অনেকাংশেই তারুণ্যের দীপ্তি ফিরিয়ে আনে। রুপচর্চায় বিভিন্ন কারণে মানব দেহে ঘৃতকুমারীর পাতা ও শাঁস ব্যবহার করা হয়। আর্দ্রতা ধরে রাখতে এর পাতার রস অতুলনীয়। ক্লিনজার হিসেবে ঘৃতকুমারী অত্যন্ত পরিচিত। এর রয়েছে ত্বকের নানা ধরনের সমস্যা সারানোর ক্ষমতা। এর রস ত্বককে নরম, কোমল ও উজ্জ্বল করে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা রক্ষার মাধ্যমে দেয় স্বাস্থ্যকর ত্বকের নিশ্চয়তা। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নারী কিংবা পুরুষের ত্বকে দেখা দেয় বলিরেখা এবং আরও কিছু সুক্ষ রেখা। এসব দাগ/রেখা দূরকরতে ঘৃতকুমারী খুবই উপকারী। ত্বকে নিয়মিত ঘৃতকুমারী ব্যবহারে এ ধরনের রেখা হ্রাস পায়, এমনকি এসব রেখা অদৃশ্যও হয়ে যায়।
শীত ঋতুতে পায়ের গোড়ালি ফেটে যায় অনেকেরই। কয়েকফোঁটা ঘৃতকুমারীর রস কয়েকদিন ফাঁটা জায়গায় হালকাভাবে ম্যাসাজ করলেই গোঁড়ালি ফাঁটা বা ফাঁটা দাগ নিশ্চিত দূর হবে।
রোদে পোড়া ত্বকেও ঘৃতকুমারী অত্যন্ত ফলপ্রসু। ঘৃতকুমারীর রস উপটান বা মুলতানি মাটির সাথে মিশিয়ে ত্বকের পোড়া অংশে লাগালে নিশ্চিত উপকার পাওয়া যাবে।চালের গুঁড়ি স্ক্র্যাবার হিসেবে ব্যবহার করলে এর সাথে মেশানো যেতে পারে ঘৃতকুমারীর রস। এতে ত্বক পরিষ্কারের পাশাপাশি হয়ে উঠবে কোমল, উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয়। অ্যালোভেরার জেল রুপচর্চা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যবহার হয়ে আসছে।
খুশকি দূর করতেও ঘৃতকুমারী অনন্য। সপ্তাহে দুদিন চুলের গোড়ায় ঘৃতকুমারীর রস লাগালে অন্য কোন ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াই মাত্র এক মাসে সুনিশ্চিত সুফল পাওয়া যাবে! নিয়মিতভাবে চুলে ঘৃতকুমারীর রস লাগালে ফিরে আসবেই চুলের হারানো উজ্জ্বলতা। চুল হবে মোলায়েম ও ঝরঝরে।
আজকাল অনেকের গৃহেই এমনকি ঢাকাসহ দেশের সব বড় শহরেই ঘৃতকুমারীর দেখা মিলছে। অনেকের বাড়ীর টবেও শোভা পাচ্ছে ঘৃতকুমারী। আমাদের সচেতনতা বাড়লে ঘৃতকুমারী থেকে আমরা অনায়াসে অনেক বেশি উপকৃত হতে পারবো। সেইসাথে উপার্জিত হতে পারবে বৈদেশিক মুদ্রাও। নিশ্চিতভাবেই কর্মসংস্থানও হবে অনেকের।

Author: সাঈফ ফাতেউর রহমান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts