আমাদের জাতীয় নৃত্যশিল্পী

বুলবুল চৌধুরী
(১৯১৯-১৯৫৪)
বুলবুল চৌধুরী একটি নাম, যাঁর রক্তে নৃত্যের ছন্দ আলোড়িত করতো। আর করতো বলেই তিনি নৃত্যের প্রতি আকৃষ্ট হন। আর এই নৃত্যেরই মাধ্যমে তিনি সমাজের
সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, শোষণ অনাচার, কুসংস্কারের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে পেরেছিলেন। তাঁর এ সকল অসাধারণ সৃষ্টিসমূহ উনিশ শতকের শুরুর দিকে বৃটিশ
শাসিত ভারতের এতদাঞ্চলেই শুধু নয়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূরপ্রাচ্যেও বুলবুল চৌধুরী অনন্য নৃত্যশৈলীতে যে সমাজের বাস্তব চিত্রটি তুলে ধরতে পেরেছিলেন, তাতে করে
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও এই নৃত্যধারাটির মাধ্যমে একটা ঝাঁকুনি দিতে পেরেছিলেন। এমন একজন শিল্পীকে ভারত বিভাগের পর তৎকালীন পাকিস্তান “সিতারা ই বুলবুল” খেতাব দিয়েছিলো।
একবার সাতকানিয়া স্কুলের এক অনুষ্ঠানে জ্ঞান তাপস আবুল ফজল সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। কিশোর বুলবুলের অপূর্ব নৃত্য অবলোকন করে আবুল ফজল সাহেব বিমোহিত হয়ে বলেছিলেন, ‌‌’নৃত্য যে আনন্দের কত বড় উৎস​, তা বুলবুলের নৃত্য না দেখলে আমি বুঝতে পারতাম না।’ এ প্রসঙ্গে একবার সুরস্রষ্টা মিহিরকরণ বাবুরএকটি উক্ত উল্লেখ করা যেতে পারে। ‘আরেকজন উদয়শঙ্ককে আবিস্কার করেছি, বুলবুল নিজেই নিজের শিক্ষক।’

বুলবুলের অসংখ্য নৃত্যে সঙ্গীত সংযোজন করেন স্বর্গতঃ মিহিরকরণ, তিমিরবরণ, অমিয়কান্তি ভট্টাচার্য, শ্রী নীরদবরণ, ধনঞ্জ মল্লিক, অনিল বোস, বেণীমাধব বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বিখ্যাত পরিচালকবৃন্দ। সকল সভ্য দেশই এমন গুণীদের শ্রদ্ধার জায়গায়, সম্মানের জায়গায় স্থান দিয়ে থাকে। দেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতির এ শাখায় যাঁরা অনন্য অবদান রেখে যান, তাঁদের স্মৃতিরক্ষায় জাতীয়ভাবে সকল দেশই নিয়ম নীতি অনুসরণ করে জাতীয় শিল্পীর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে থাকেন। দুর্ভাগ্য আমাদের, এদেশের গর্ব এই গুণী নৃত্যগুরু দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ১৯৫৪ সালের​ ১৭ মে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কলকাতায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর অকাল মৃত্যুতে দেশের যে অপরিসীম ক্ষতি হয় পত্র-পত্রিকায় বুলবুলের নৃত্যশৈলীর ওপর নিবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে তা প্রতিভাত হয়েছিল। ক্ষণজন্মা এই নৃত্যশিল্পীর স্মৃতিরক্ষার্থে তার বন্ধু-বান্ধব ও গুণীজনদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৭ মে ১৯৫৫ সালে বুলবুল ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয় নৃত্যশিল্পীর স্মৃতিরক্ষায় প্রতিষ্ঠিত এই একাডেমিটি প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই এটি একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। দেশের প্রতিষ্ঠিত অধিকাংশ নৃত্যেশিল্পী এ প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রশিক্ষণ নিয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত। নৃত্যের কারণেই দেশ- বিদেশে বুলবুল ললিতকলা একাডেমির সুনাম দুইযুগ পূর্বেও ছিল। এখন আর এখনকার প্রজন্ম বুলবুল একাডেমির সৃজনশীল ঐতিহ্যের কথা ভুলতে বসেছে।

বুলবুল একাডেমির উদ্যোক্তা ও সংগঠকদের প্রায় সবাই আজ প্রয়াত। প্রচলিত নিয়মমাফিক একাডেমির পরিচালনা পর্ষদ কিংবা কোন নিয়ন্ত্রক সংস্থাও তদারকিতে নেই। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত টিউশন ফি, বিশেষ কোচিং ফি আদায় করে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তার কোন হিসাব নেই। শোনা যায় মহলটির সাথে যুক্ত ব্যক্তিরাই নিজেদের মতো করে সংশ্লিষ্ট শাখার আয় নিজেদের পকেটে রেখে ব্যবসায়িক ফায়দা লুটে চলেছে। গানের কতিপয় শিক্ষক নামধারী ব্যক্তি, গিটার বাদক, ধান্ধাবাজ গোষ্ঠি আর তবলা বাদকেরাই আজকাল নাকি সেখানকার শিক্ষকতার দায়িত্বে নিয়োজিত। এ অবস্থায় একটি কুচক্রি চক্র ওয়াইজঘাটস্থ একাডেমির সম্পত্তিটাও হাতিয়ে নেওয়ার ফন্দিতে কাজ করে চলেছে। কোন সাংগঠনিক নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই একাডেমিটিকে নিজেদের আয় রোজগারের একটি মাধ্যম হিসেবে ভাগ বাটোয়ারা করছে। রাজধানীর অলি-গলিতে, রাজধানীর উপকন্ঠে যার যেখানে সুবিধা সেখানেই বুলবুল ললিতকলা একাডেমী-বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস কিংবা বুলবুল রিসার্চ সেন্টার নামে একাডেমীর কার্যক্রম পরিচালনা করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়ার উৎসবে মত্ত রয়েছে।
নৃত্যশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন​, এ প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের একটি পরিকল্পনা নিয়ে একটি চক্র বাংলাদেশের শেকড়ের কৃষ্টি-সংস্কৃতি বিরোধী কাজ করে যাচ্ছে। এই মহান নৃত্যগুরুর নামে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটিকে অবিলম্বে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান হিসেবেই জাতীয় নৃতশিল্পীর নামেই পরিচালিত হোক এই প্রতিষ্ঠানটি। তাহলেই বোধকরি যথার্থ সম্মান জানান হবে বুলবুল চৌধুরীর অমর কীর্তির প্রতি।

Author: আবদুল​ মতিন​

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment