বাল্যবিবাহ

সমাজের সুষ্ঠ বিকাশে এবং সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিবাহ প্রথার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কারণ বিবাহ ছাড়া পরিবার গড়ে ওঠে না , আর পরিবার গড়ে না উঠলে সমাজ সৃষ্টি হয় না । তাই একটি সুশৃঙ্খল পরিবার ও সামাজিক জীবনের পূর্বশর্ত হচ্ছে বিবাহ । কিন্তু নারী পুরুষের জীবনের বিবাহের একটি নির্দিষ্ট সময়কাল থাকে। এই নির্দিষ্ট বয়স কালের মধ্যে নারী পুরুষের বিবাহ হলে পারিবারিক ও সামাজিক কল্যাণ সাধিত হয় । আর অপরিনত বা বাল্য বয়সে বিবাহ হলে তাতে পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে দাড়ায়। এধরণের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯২৯ সালে বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন প্রবর্তিত হয়।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে বিবাহ একজন মানুষের ব্যাক্তিগত ব্যাপার। একজন কোন বয়সে বিবাহ করবে এটা তার নিজস্ব ব্যাপার । এর জন্য আইন করা হলে তা ব্যাক্তি স্বাধীনতার পরিপন্থি । এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে, মানুষের কল্যাণের জন্যই আইন পনয়ন করা হয়। একজন ব্যাক্তির জীবনে কোন আইনের প্রয়োগ তাৎক্ষনিক ভাবে অকল্যানকর বা ব্যাক্তি স্বাধীনতার পরিপন্থী মনে হলেও তা সমষ্টির জীবনে বা জাতীয় জীবনের জন্য কল্যাণকর হতে পারে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে ২১ বছরের কম বয়সী পুরুষ এবং ১৮ বছরের বয়সী মেয়েকে বোঝায়।
একজন নারীর বিবাহ আইনগত ভাবে দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আইন অমান্য করে কেউ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে তা আইনের দৃষ্টিতে দন্ডনীয় অপরাধ হয় । একজন বাবা বা মা সন্তানের কোন বয়সে তাদের ইচ্ছে মত পাত্র পাত্রীর সাথে বিবাহ দেবার ইচ্ছে পোষণ  করতে পারে। এক্ষেত্রে আইনের নিষেধাজ্ঞা অন্যায় বলে মনে হতে পারে।
কিন্তু বৃহত্তর সামাজিক ও পরিবারিক  কল্যাণের জন্যই যে আইনটি প্রনয়ণ করা হয়েছে তা আমরা একটু আলোচনা করলেই বুঝতে পারি। নারী – পুরুষের স্বাস্থ্যগত আলোচনায় আমরা দেখি যে, প্রাণী জগতের মধ্যে একজন মাবন শিশুর শৈশবকাল দীর্ঘতম, যে – কোন প্রাণী জন্মের পর – পরই স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে, একমাত্র মানব শিশুই জন্মের পর – পরই শুধু নয় , দির্ঘকাল যাবৎ অন্যের সাহায্য ছাড়া বাঁচতে পারেনা। একজন মানব শিশুর শারিরীক ও মানসিক পিরপক্কতার জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এসব বিবেচনায় বাল্য বিবাহ নিরোধ আইনের ২১ বছরের কম বয়সী পুরুষ এবং ১৮ বছরের কম বয়সী নারীর বিবাহ বাল্য বিবাহ উল্লেখ করে তা আইনের চোখে দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অপরিনত বয়সে বিবাহ হলে যে সন্তান জন্ম লাভ করে সেই সন্তান এবং তার মা দুজনেই ভগ্নস্বাস্থ্যের অধিকারী  হয়ে থাকে। অপরিনত বয়সের এজন মা অকাল বার্ধক্যের শিকার হয়। অনেক সময় চির রুগ্ন মা ও শিশু এক পর্যায়ে পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে দাড়ায়। বাল্য বিবাহ নিরোধ আইনে বাল্য বিবাহের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ২১ বছরের বেশী বয়সী কোন পুরুষ বা ১৮ বছরের বেশী বয়সী কোন নারী বাল্য বিবাহ চুক্তি করলে একমাত্র বিনাশ্রম কারাদন্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় প্রকার শাস্তি হতে পারে। উক্ত বিবাহ সম্পাদনের সাথে যারা জড়িয়ে থাকবেন তাদের একই শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ঐ বিবাহের সাথে যদি পিতা – মাতা বা অভিভাবক জড়িত থাকেন তাহলে তারাও একই দন্ডে দন্ডিত হবেন।

কোন নাবালক যদি নিজে বাল্য বিবাহের চুক্তি সম্পাদন করে তাহলে তার নিজের কোন শাস্তি হবে না । তবে তার উপর কতৃর্ত্ব সম্পন্ন অভিভাবক বা ব্যাক্তিকে শাস্তি প্রদান করার বিধান করা হয়েছে। তবে দেখা যায়, ২১ বছরের কম বযসী ছেলে বা ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ের বিবাহ হলে তাদের কোন শাস্তি হয়েছে এরকম ঘটনা খুবই কম ঘটেছ।

আসলে আইনের যে বিধানই হোক না কেন সেই আইনের আওতায় কেউ যদি আদালতের কাছে কোন প্রতিকার না চায় তাহলে বাস্তবেও তার প্রয়োগ চোখে পড়ে না। চাছাড়া উভয়পক্ষ যদি তথ্য গোপন করে থাকে সেক্ষেত্রে কেউ যদি সুস্পষ্ট প্রমান নিয়ে আদালতে চ্যালেঞ্জ না করেন তাহলে তার প্রতিকার হবার কাথা নয়। 

একজন ক্ষমতা সম্পন্ন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্টেট তার অধিক্ষেত্রের আওতার মধ্যে কোন বাল্য বিবাহ নিরোধ আইনের আওতায় অপরাধীর বিচার করে থাকেন। কাজেই কেউ এই আইনের আওতায় প্রতিার চাইলে তাকে এলাকার দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্টেটের শরণাপন্ন হতে হবে। আদালতের সাহায্য চাইবার পরেই তিনি প্রতিকার পেতে পারেন।ইসলাম ধর্মে বা মুসলিম সমাজে বিবাহ  একটি আইনগত সামাজিক ও ধর্মীয় বিধান। নর – নারীর একসঙ্গে জীবন –যাপন ও সংসার পালন আইনগত , ধর্মিয় ও সামাজিক সুরক্ষা হিসাবে বিবাহ প্রথার উৎপত্তি। মুসলিম আইন অনুযায়ী বিবাহ একটি দেওয়ানী চুক্তি। ফলে , আচার ও আনুষ্ঠানিকতার ওপর তেমন জোর দেওয়া হয় না । মুসলিম আইনে বিবাহ যেহেতু একটি চুক্তি সেহেতু উক্ত বিবাহে চুক্তির বিশেষ বিশেষ উপাদান সমূহ অবশ্যই পরিলক্ষিত হতে হবে। কবি নজরুলের ভাষায়, বিশ্বে যা কিছু সুন্দর, মহান জনগণের জন্য কল্যাণকর , তার অর্ধেকাংশের সমান ভাগীদার নরী।

ইসলামের বিধান অনুযায়ী একজন পুরুষ একাধিক বিবাহ করতে পারে। তবে শর্ত থাকে যে, পুরুষের তার সকল স্ত্রীর সাথে সমান আচরন করতে হবে,সকলকে সমান ভরণপোষন দিতে হবে। মুসলিম বিধান মতে, একজন মুসলমান সবোচ্চ ৪ টির অধিক স্ত্রী রাখতে পারবে না।

প্রশ্নঃ এই বিষয়টা সম্পর্কে একটু বুঝিয়ে বলবেন কি?
বর্তমান আইনে কোন স্ত্রী জীবদ্দশায় নতুন স্ত্রী গ্রহন করতে পূর্ব স্ত্রীর সম্মতি বাধ্যতামূলক । সম্মতি ব্যতীত পরবর্তী বিবাহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৮৫ এ বেশ কিছু ধারা সংযুক্ত করে বহু বিবাহের পথে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

প্রশ্নঃ ১৯৮৫ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন সম্পর্কে কিছু বলুন।
এই আইনে কলা হয়েছে , স্বামী যদি স্ত্রীর বর্তমানে পুনরায় বিবাহ করতে চান তবে তাকে অবশ্যই ইউনিয়ন পরিষদের বা পৌরসভার চেয়ারম্যান, মেয়র, পৌর কর্পোরেশনের বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইনে নারীকে বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার দিয়েছে, যা নারীর অধিকারকে আরও সুসংহত করেছে। শুধু তাই নয়, বিবাহ বিচ্ছেদ কালে নারীর অধিকারকে ও সুনিশ্চিত করেছে। তাই বহু বিবাহের ক্ষেত্রে স্বামীকে অবশ্যই স্ত্রীর অনুমতি বা সম্মতি প্রহণকেও বাধ্যতামূলক করেছে।
সভ্যতার  অগ্রযাত্রায় , সমাজ উন্নয়ন, রাষ্ট্রের উন্নতি তথা পরিবারের সর্বক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা অগ্রগণ্য। অজকের নারী শুধু নারী নয়, সে মা, স্ত্রী, ভগ্নী, বৈমানিক, আইনজীবি, শিক্ষক, চিকিৎসক ও রাষ্ট্রের সবোর্চ্চ স্তরে তার অবস্থান। কিন্তু অত্যান্ত দুঃখের বিষয় এই যে, বিংশ শতাব্দীর এই যুগে ও নারী অবহেলিত, বঞ্চিত। সে প্রতি পদে পদে নির্যাতিত হচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে, ন্যায্য অধিকার থেকে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে।
তেমনি বিবাহের ক্ষেত্রে ও নারী চরমভাবে নিগৃত হচ্ছে । মানুষ হিসেবে নুন্যতম মর্যাদা ও কখন কখন সে একেবারেই পায়না।
এরপরও কথা থেকে যায়, আইন প্রয়োগ করে পুরুষের এই মানুষিকতার পরিবর্তন করা যায় না। এ অবস্থা থেকে পরিত্রান পাবার জন্য নারীর মর্যাাদা, নারীকে নারী হিসেবে না মূল্যায়ন করে, মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে। এজন্য সরকারের সহযোগিতা, পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানুষিকতা দূর করে নারীর অধিকার দিতে হবে, সমমর্যাদা দিতে হবে। তাহলেই কেবলমাত্র নারী তার প্রাপ্ত মর্যাদা পাবে, ন্যাায্য অধিকার পাবে। তার এখনই সমাজ থেকেএ ব্যবধান দূরীভূত হবে। প্রশাসন অথবা ক্যান্টনমেনট এলাকার সরকার কতৃখ নিযুক্ত প্রাপ্ত অথবা যে ব্যাক্তি ঐ দায়িত্বে নিয়োজিত তার অনুমতি চেয়ে দরখাস্ত করতে হবে এবং স্ত্রী মত দিয়েছেন কিনা তা উল্লেখ করতে হবে।

তাছাড়া একটি করে সালিশী পরিষদ গঠন করতে হবে ।

প্রশ্নঃ মালিশী পরিষদ কিভাবে গঠন করতে হবে।

চেয়্যারম্যান স্ত্রীর পক্ষ হতে এবং স্বমীর পক্ষ হতে ১ জন করে প্রতিনিধি নিয়ে একটি সালিশী পরিষদ গঠন করবেন এবং পরিষদ যদি মনে করেন এরুপ বিবাহের প্রয়োজন আছে তবে কিছু শর্তসাপেক্ষে অনুমতি প্রদান করবেন্

প্রশ্নঃ কি ধরনের শর্ত?

সালিশী কাউন্সিলের রায়ে অসন্তুষ্ট হলে সেক্ষেত্রে রায়ের পুনরায় পরীক্ষার জন্য  মুসেন্ফ কোর্টে আবেদন করতে পারবেন । উল্লেখ্য যে, যদি স্বমী সালিশী বোর্ডের অনুমতি ছাড়া পুনরায় বিবাহ করেন তবে তাকে কিছু কাজ করতে হয়।

যেমনঃ স্ত্রীর দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে হবে, স্বামী যদি পরিশোধ না করেন তবে ভূমি রাজস্বের বকেয়া খাজনার ন্যায় আদায় করা যাবে।

এর ফলে স্ত্রী আদালতে সালিশ করতে পারবেন এবং স্বামীর ১ বছর পর্যন্ত জেল বা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় প্রকার শাস্তিই হতে পারে। সালিশী পরিষদের অনুমতি ছাড়া স্বামী বিবাহ করলে শুধু এ কারণে স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে পারে না।

Author: শারমিনা পারভিন​

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts