বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পূর্বাপর

Bangabondhu

১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত  ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে  লাখ লাখ মানুষ রাজপথে বেরিয়ে আসে।  অফিস আদালত স্কুল কলেজ হাটবাজার সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকাসহ দেশের প্রধান শহরগুলোতে কার্ফু জারি করা হয়।  বিক্ষুব্ধ জনতা সান্ধ্য আইন উপেক্ষা করে অব্যাহতভাবে আন্দোলন চালিয়ে যায়।  এক পর্যায়ে সমারিক জান্তার বুলেটের আঘাতে ঢাকাতে ২৬ জন আর চট্টগ্রামে ১২ জন নিহত হলো। খুলনায় মিছিলে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হলো ২১ জনকে। এমনিভাবে যশোর, পাবনা, ফরিদপুর, দিনাজপুর প্রভৃতি জেলাতে নিহত হলো অসংখ্য মানুষ। কিন্তু বিপ্লবী জনতা সকল মৃত্যুকে তুচ্ছ করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে দৃঢ়প্রত্যয়ে এগিয়ে যায়।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে দশ লাখ মানুষের বিশাল জনসমুদ্রে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। যা বিশ্বের রাজনীতিতে শ্রেষ্ঠ ভাষণ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ঘোষণা হিসেবে পরিগণিত হয়। ৭ মার্চ ছিল বাঙালির জীবনের এক অবিস্মরণীয় দিন।  রেসকোর্স ময়দানে এত জনসমাবেশ আর কখনও হয়নি।  চারদিক মুখরিত করে তখন মুর্হূমুর্হূ স্লোগান হচ্ছিল।

‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ /‘ তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা’/‘তোমার নেতা আমার নেতা /  শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’/‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো – বাংলাদেশ স্বাধীন করো’/‘ভুট্টোর মুখে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ /‘হুলিয়ার ঘোষণা, মানিনা, মানিনা’/‘জয় বাংলা’ /‘পরিষদ না রাজপথ – রাজপথ রাজপথ’/‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’

আকাশে উড়ছে সোনার বাংলার মানচিত্র আঁকা লাল সূর্যের পতাকা। স্লোগানের সাথে সাথে বীর জনতা আকাশের দিকে তুলে ধরছে  বাঁশের লাঠি। মঞ্চে স্লোগান দিচ্ছেন সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্রলীগ নেতা আ স ম আব্দুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন,  আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান আবদুর রাজ্জাক। লক্ষ লক্ষ কন্ঠে ফিরে আসছে স্লোগানের জবাব। জয়বাংলা, আপোস না সংগ্রাম? সংগ্রাম সংগ্রাম।

৩-২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভামঞ্চে এসে উপস্থিত হন। ওই দিন বঙ্গবন্ধু ছিলেন একমাত্র বক্তা। শুরু করেন তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণ আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনটি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ঐ ভাষণ বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করেছে স্বাধীনতার পবিত্র সংগ্র্রামে।

৭ মার্চের ভাষণ ঢাকা বেতার থেকে সরাসরি রিলে করার সমস্ত ব্যবস্থা  বেতার কর্তৃপক্ষ করেছিল।  বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার শুরুও হয়েছিল। কিন্তু সামরিক কর্তৃপক্ষ তার প্রচার বন্ধ করে দিলে বেতারের সমস্ত কর্মচারি বেতার ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। ফলে বেতার বন্ধ হয়ে যায়। সামরিক কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে ৪ মার্চ সকালে ভাষণের টেপ প্রচারের অনুমতি দিলে পুনরায় বেতারের কাজ শুরু হয়।৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ চলা অবস্থায় লেঃ জেঃ টিক্কা খান ও জেনারেল রাও ফরমান আলী ঢাকা এসে পৌঁছান।

বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের পরই বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁর নির্দেশিত অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যায়। এই ভাষণের পর সমগ্র বাংলার চলমান আন্দোলন আরো তীব্র হয়ে ওঠে এবং সর্বস্তরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করে।  ৭ মার্চের ভাষণের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনকে সমর্থন করে গড়ে তোলা হয় সংগ্রাম কমিটি। ভারত, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানী, জাপান প্রভৃতি দেশে বসবাসরত বাঙালিরা এর নেতৃত্ব দেন ।   লন্ডন হয়ে ওঠে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান কেন্দ্র। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বহিঃবিশ্বে এই সংগঠনসমূহের মূল নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে রাশিয়া ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সর্বাত্মক সহযোগিতার পাশাপাশি আমেরিকা, চীন, সৌদি আরবসহ আরো কয়েকটি দেশ এদেশের মুক্তি সংগ্রামের তীব্র বিরোধিতা করে পাকিস্তানকে যুদ্ধাস্ত্রসহ সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করে।

আর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হবার সর্বশেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বীর বাঙালি এই ভাষণের নির্দেশনাকে মান্য  করে যুদ্ধ চালিয়ে যায়।

Author: রক্তবীজ ডেস্ক

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment