ভাষা  সৈনিক অ্যাডভোকেট আফসার উদ্দীন আহমেদঃ  নিবেদিত এক জননেতার নাম

বৃটিশ ভারতবর্ষের তদানীন্তন যশোহর(বর্তমানে যশোর নামায়িত) জেলার নড়াইল মহকুমার চাঁচড়া এক বর্ধিষ্ণু জনপদ। পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলির জনসংখ্যার ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ট অংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। মুসলিম অধিবাসীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। শিক্ষার আলোক বঞ্চিত দারিদ্রপীড়িত মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই নিগৃহীত, নিপীড়িত। তবে সাধারণভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর অগ্রসর বাম মতাদর্শের সংগঠনের দৃঢ় ভিত্তির কারণে জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা। এই আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটেই ছোট্ট সুরম্য কাব্যিক ছন্দের কাজল নদীর তীরবর্তী গ্রাম চাঁচড়ার প্রখ্যাত বিশ্বাস পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আফসার উদ্দীন আহমেদ। পিতা আবির আহমেদ বিশ্বাস । তিনি একজন ভূস্বামী  হলেও শিক্ষানুরাগী আর যুগোপযোগী সামাজিক ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী নীতিবাদী মানুষ।

চাঁচড়ায় তখন কোন বিদ্যালয় নেই। নদীপথে ডোঙ্গা(তালগাছের কান্ড চেঁরা বিশেষভাবে নির্মিত ছোট আকারের স্বল্প পানিতে চলাচল উপযোগী লোকজ জলযান)তে করে দূর বসুন্দীয়াতে বিলের পথে পুত্রকে নিয়ে যেতেন বিদ্যালয়ে। পুত্র বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। পিতা অদূরে বসে অপেক্ষমান। স্কুল সময় শেষে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে ফিরে আসা। শুকনো মৌসুমে বিকল্প যানের অভাবে সুদীর্ঘ পথ হেঁটে স্কুলে যাওয়া ও বাড়ীতে ফিরে আসা। এভাবেই তৎকালীন কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চারটি লেটারসহ মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে মেধা তালিকায় স্থানলাভ করে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর গ্রাম থেকে প্রায় ৯ মাইল দূরের নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যয়ন। তারপর শিক্ষানুরাগী পিতার আগ্রহে আইন অধ্যয়নে কোলকাতা গমন। এভাবেই নিভৃত গ্রাম চাঁচড়ার এক শান্ত বালকের আইন ব্যবসার সাথে সম্পর্ক স্থাপন।

নড়াইল বারে তখন মুসলমান আইনজ্ঞ নেই বললেই চলে। ছোট মফস্বল মহকুমা শহরে একখন্ড জমি কিনে ছোট বাসগৃহ নির্মাণ। আইন ব্যবসার জন্য কাচারিতে(কোর্ট) যাবার পথের দুধারে মূলত হিন্দু বসতি। কেউ কেউ অতি রক্ষণশীল। পথে হেঁটে গেলেই পেছনে পথের উপরে গোবর-জল ছিটানো হতো চোখে পড়লেই। সাম্প্রদায়িক মনোভাব জেগে ওঠা অসম্ভব ছিলো না। অথচ এই অপ-মানসের পারিপার্শ্বিকতায় থেকেও তিনি হয়ে উঠলেন প্রগাঢ় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঋদ্ধ।


তৎকালীন প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা, যিনি পরবর্তীতে কয়েক দফা মন্ত্রী ও বাংলার পার্লামেন্টের স্পিকার হন, সেই সৈয়দ নওশের আলীর ভাগ্নি কে এফ মতিয়া বেগমের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। গণচেতনার সাথে যোগ হয় সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ। কংগ্রেস রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও কৃষক জনতার স্বার্থের প্রশ্নে ছিলেন অনমনীয়, দৃঢ়চিত্ত, অনাপোষ। তাইতো তেভাগা আন্দোলনের প্রবল ঢেউ বিস্তৃত হলে কারবান্দী তেভাগা আন্দোলনে গ্রেফতারকৃত নেতৃবৃন্দের পক্ষে বিনা পারিশ্রমিকেই তিনি করে গেছেন আইন পরামর্শকের কাজ। এদিকে সৈয়দ নওশের আলী যশোর জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন একই সময়ে তিনি নির্বাচিত হন জেলা বোর্ডের সদস্য রূপে।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভাষা প্রশ্নে আন্দোলনের সূচনা লগ্ন থেকেই নিজেকে সম্পৃক্ত করেন তিনি। জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক প্রমুখ  নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। পরবর্তীতে মুসলিম শব্দটি বর্জন করে আওয়ামী লীগ গঠিত হলে আজীবন তিনি সক্রিয় দায়িত্বশীলতার সাথে এই সংগঠনে সম্পৃক্ত থাকেন। বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।  নড়াইল মহকুমা আওয়ামী লীগের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।  বিভিন্ন সময়ে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক কমিটির সদস্যও নির্বাচিত হন।

ভাষা আন্দোলনে তাঁর ও তাঁর পরিবারের অবদান ব্যাপক। তিনি ছিলেন সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি। ভাষা আন্দোলন প্রশ্নে নড়াইলে প্রথম প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দেন তিনি। ঐ মিছিলে তাঁর স্ত্রী বেগম মতিয়া আহমেদ, কিশোরী কন্যা সুফিয়া বুলবুল ও বালক পুত্র(পরবর্তিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে শহীদ ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত) সাঈফ মীজানুর রহমান দুলুও অংশ নেন। ভাষা আন্দোলন প্রশ্নে প্রথম জনসভায় সভাপতিত্ব করেন তিনি। গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী হয় তাঁর নামে।গ্রেফতার হন।  ভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর ভূমিকার উল্লেখ আছে।

১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তাঁর ভূমিকা গৌরবোজ্জ্বল। প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়ন লাভ করেও যুক্তফ্রন্টের স্বার্থে জনাব আব্দুল হাকিমের অনুকূলে প্রার্থিতা পরিত্যাগ করেন। নির্বাচনে বিজয়ী জনাব আব্দুল হাকিম পরবর্তীতে স্পিকার নির্বাচিত হন।

বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হয় তার বিরুদ্ধে। একাধিকবার কারবারণ করেন। পুলিশের হাতে নির্যাতিত হন। ইস্কান্দার মির্জার শাসনামল ও আইউব খানের সামরিক শাসনামলে গ্রেফতারী পরোয়ানা ও কারাভোগ করেন। ’৬২ এর আন্দোলন, ৬৪ এর আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ আন্দোলন ও গণ অভ্যুত্থানে তাঁর ছিলো গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। পুলিশি প্রহার, নির্যাতন, জেল, জুলুম কিছুই তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।

মহান স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন, মুক্তিযুদ্ধের অনুকূলে উদ্বুদ্ধকরণ ও মনোবল সমুন্নত রাখার জন্য গ্রাম গ্রামান্তর, মুক্তিবাহিণীর ঘাঁটি থেকে ঘাঁটিতে তিনি চারনের বেশে ঘুরেছেন। তাঁর স্ত্রী বেগম মতিয়া আহমেদও যোগ্য সহধর্মিনীর ভূমিকা পালন করেছেন। নড়াইলে তাঁর দ্বিতল আবাসিক ভবন লুণ্ঠিত ও পেট্রলের আগুনে পোড়ানো-ভাঙচুর হয়েছে। তাঁর মালিকানাধীন আরও কয়েকটি ভবন/গৃহ আগুনে পোড়ানো হয়েছে। প্রথম পুত্র সাঈফ মীজানুর রহমান, পিরোজপুর মহকুমার প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ও ট্রেজারী অফিসার থাকাকালীন প্রবাসী মুজিব নগর সরকারে প্রতি মহকুমা প্রশাসনের আনুগত্য ঘোষনা করে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরোচিত প্রতিরোধ যুদ্ধ পরিচালনার এক পর্যায়ে আহত, ধৃত ও নিষ্ঠুর, বর্বরোচিতভাবে নিহত হন। অন্যসব সন্তানেরাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে উজ্জ্বল অবদান রাখেন।

আজীবন ধর্মাচারী আফসার উদ্দীন আহমেদ নিজ ধর্মপালনে নিবেদিত থেকেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ ছিলেন। একাধারে মসজিদ কমিটি আর পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি/ সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন একাধিকবার। অন্য ধর্মাবলম্বীদের যথোচিত মর্যাদায় ধর্মপালনের অধিকার রক্ষায় কখনো কখনো স্বধর্মীয়দের কোপানলে পড়েছেন। তবু কখনোই নীতি, আদর্শ, মানবিকতার প্রত্যয় থেকে বিন্দুমাত্রও বিচ্যুত হননি।

আজীবন গঠনমূলক কাজে নিয়োজিত রেখেছিলেন তিনি নিজেকে। নড়াইল পাবলিক লাইব্রেরীর তিনি প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি। নিজ গ্রাম চাঁচড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। চাঁচড়া
র পার্শ্ববর্তী তুলারামপুরে প্রতিষ্ঠা করেন তুলারামপুর জুনিয়ার হাই স্কুল, যেটি পরবর্তীতে তুলারামপুর হাইস্কুলে উন্নীত হয়। তিনি এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।পূর্ব পাকিস্তান কোওপারেটিভ  সোসাইটিরও তিনি সভাপতি হন । এছাড়া আরও বেশ কটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নড়াইল মহকুমা উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি বহু বছর পরিচালনা পরিষদের সদস্য ছিলেন। পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ পরিচালনা পরিষদেরও। নড়াইলের মহিষখোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। নড়াইল বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদেও সদস্য ছিলেন তিনি অনেক বছর।

চাঁচড়া জামে মসজিদ ও নড়াইল জামে মসজিদে সুদীর্ঘকাল সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মহিষখোলা জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠায়ও তাঁর সক্রিয় অবদান ছিলো।

আফসার উদ্দীন আহমেদ নড়াইলে ব্যাপকভাবে নন্দিত ও জনপ্রিয় নাম। তিন পুত্র ও তিন কন্যার জনক তিনি। সন্তানেরা সকলেই উচ্চশিক্ষিত ও নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের পিতা তিনি।

জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে অভিষিক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে কেন্দ্রীভূত রেখেছিলেন নড়াইলের রাজনীতি, সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা উন্নয়ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুরক্ষা ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজে। পরমত সহিষ্ণুতার উজ্জ্বল ব্যতুক্রমী উদাহরণ তিনি। প্রথমে কংগ্রেস ও পরে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হলেও বাম রাজনীতিবিদদের সাথে তার সখ্য ছিলো অপরিসীম। কমরেড অমল সেন, কমরেড হেমন্ত সরকার, কমরেড রসিক ঘোষ, কমরেড নেপাল সরকার তাঁর বাড়িতে আসতেন। ঘনিষ্ষ্ঠতম সম্পর্ক ছিলো কমরেড অমল সেনের সাথে। অপার মৈত্রি আর পারিবারিক পর্যায়ের ঘনিষ্টতা ছিলো তে’ভাগা আন্দোলন খ্যাত নুর জালাল মুন্সী, মোদাসসের মুন্সী প্রমুখদের সাথে।

পক্ষান্তরে ব্যক্তিগত পর্যায়ের নিবিড় সম্পর্ক ছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগিশ, শহীদ মসিউর রহমান প্রমুখের সাথে। নড়াইলে সভা করতে এলে বঙ্গবন্ধু তাঁর বাড়ীতেই উঠতেন।

পরবর্তিকালের বাম রাজনীতিকদের মাঝে কাজী জাফর আহমেদ, হায়দার আকবর খান রণো, বিমল বিশ্বাস ছিলেন তাঁর বিশেষ স্নেহধন্য।

সদালাপী, স্নেহপ্রবণ, পরোপকারী, জনহিতব্রতী , নিঃস্বার্থ, নিবেদিত এই মানুষটিকে নড়াইলের মানুষ তাঁর মৃত্যুর অনেক বছর পরও গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

নড়াইলের জনগণের কাছে অ্যাডভোকেট মৌলভী আফসার উদ্দীন আহমেদ এক উজ্জ্বলতম  নাম।

একুশের মাসে ভাষা আন্দোলনের এই বীরের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।


 

Author: সাঈফ ফাতেউর রহমান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment