বিন্তি

বিন্তি। বিন্তি ওর ডাকনাম। এ বয়সে এই বিন্তি নামটি নিয়েও বিন্তি বেশ বিব্রত। কারণ বড় হয়ে সে জেনে গেছে, বিন্তি তাস খেলার একটি নিয়মের নাম। ওর আসল নামটি অবশ্য বেশ শোরগোলে। আর সেই নামের জোর-প্যাঁচে অনেকে কীর্তির চেয়ে তাকেই মনে রাখে বেশি। যেমন কুষ্টিয়া জেলার এক স্কুল শিক্ষকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিলো কিছুটা কীর্তির জের ধরেই। ধীরে ধীরে সে জেনেছিলো, ভদ্রলোক একজন মুক্তিযোদ্ধাও। প্রায়ই ফোন করে তিনি বিন্তির খোঁজ-খবর নেন। আলাপ-আলোচনায় বোঝা যায়, ভদ্রলোক পরিমিতবোধসম্পন্ন এবং মর্মজ্ঞ। কথা বলেন পোড় খাওয়া মানুষের মতো। কিন্তু ঘরপোড়ার গন্ধ থাকে না তাতে। বিষয়টি বুঝতে পেরে একটানা ক’দিন ফোন না পেলে বিন্তি নিজেই তাঁকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব মনে করে। কারণ ভদ্রলোক একদিন বলেছিলেন, আপা প্রতিটি মোবাইল ফোন থেকে একটি নাম্বারে কম পয়সায় কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে এক ফোন কোম্পানি। আমি আমার নাম্বারটি আপনার নাম্বারের সঙ্গে এফএনএফ করে নিয়েছি। এখন অনেক কথা বলতে পারবো।

বিন্তি কুণ্ঠিত হয় এতে। কারণ এর যে দায়বোধ, ভদ্রলোকের ধারণার মতো নিজেকে ব্যাপ্ত করা, আরও মার্জিত করার সেই তেজ, সম্ভাবনা কই তার মধ্যে? আরও পরে বিন্তি যখন জানতে পারলো, ভদ্রলোক কবিতা লেখেন, পাঠানো অনেকগুলো কবিতা পড়ে সে নিজেও মুগ্ধ।  সাংবাদিকতায়ও যুক্ত অছেন জেনে সে কিছুটা ভয়ার্তও বটে। যেন কোনো শানের মুখোমুখি সে নিজে এক ভোঁতা ছুরি।

আয়োজন করে দেখা করে নয়। পয়সা খরচ করে মোবাইল ফোনেই । শাহ্ ইউনূস প্রায় তাগাদা দেন। বলেন, ‘আচ্ছা আপা, আপনি মজা করে করে যে গল্পগুলো বলেন, সেসব লেখেন না কেন? সেসব লিখলে আপনার হাতে কী অসাধারণ গল্প হতো জানেন? আপনার দেখার চোখ আছে। আপনি ওইসবই লেখেন।’ কথাগুলো শুনে মনের ভেতর দশখানা হাত গজিয়ে যায় বিন্তির। কিন্তু আবার তারচেয়ে বেশিসংখ্যক হাত সে গুটিয়ে রাখে। কোনো একটি বিষয় তো সে তেমন করে ভেবে রাখেনি। তার তো মনে হয়, জঠরের সন্তানের মতো এক একটি বিষয় মগজে ঢুকে, তার মতো সে নিজেই পরিণত হয়ে লেখককে  প্রসবী করে তোলে। তারপরেই না লেখক হয়ে যান তার সৃষ্টিকর্তা!

নাহ! সিরিয়াস গল্প কেন, অণুগল্প লেখার মতোও কোনো বিষয় তাকে আপাতত তাড়া করছে না। বরং না লেখবার মতো বহু বিষয়ই তাকে ভূতগ্রস্ত করে রেখেছে।

তবু হঠাৎ কোনো এক অসময়ে, হয়তো বিন্তি তখন কোনো শপিংমলে কিংবা মাছের বাজারের ভিতরে বিক্রেতার সঙ্গে জিনিসপত্র, কিংবা মাছের দর কষাকষিতে ব্যস্ত। শাহ্ ইউনূসের অঙ্গুলি সঙ্কেত তখনো বিন্তির মজা করে বলা ঘটনাগুলোর দিকে। বিন্তি ভদ্রলোককে অবদমিত করতে  বলতে পারেন না, ভাই, আমি এখন প্রচন্ড  হট্টগোলে…। এমনও সময় যায়, বিন্তি কিছু না বুঝেই হ্যাঁ হ্যাঁ করে চলছে। অথচ তিনি খুব গম্ভীর স্বরে বলছেন, ‘ওই যে আপনার  ছোটদাদির বাড়িতে সকালবেলা লবণের পোঁটলা নিয়ে এসেছিলো তাঁর কোন মধ্যবয়সী আত্মীয়া। অন্যগ্রাম  থেকে…। আপনার দাদির দেওরের ছেলে হাটের দিন মহিলার স্বামীকে দোকান থেকে লবণ কম দিয়েছিলো সেই অভিযোগ করতে? ওইযে, মহিলার  সন্দেহ হয়েছিলো কলাপাতার ওই পোঁটলায় একসের লবণ হতেই পারে না। এক-আধ ছটাক অবশ্যই কম হবে। এটাই গল্পের মতো করে লেখেন। এটুকুতেই একটা সময়ের ছাপ উঠে আসবে। এখনকার পাঠক বুঝতে পারবেন, শম্বুক গতির সে সময়টা খুব আগে পার হয়নি! বছরত্রিশেক আগের হবে না আপা?’

অপারগ আমি ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থায় জবাব দিয়ে পরিত্রাণ চাই। ‘মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঘটনা এটা।’

‘ঠিকই তো বলেছি! সময় চলে যাচ্ছে আপা। লেখার জন্য ঘটনাটি ছোট করে দেখবেন না।’

বিন্তি খুব বিনয়ের সঙ্গে বলে, ‘সময়ের ছাপ তুলে ধরতে নিজের গোষ্ঠীর এঁদো কথা ফাঁস হয়ে যাবে না।’

‘এটা এঁদো কথা নয়! ছোট বিষয়ের ভেতর অনেক বড় একটা আবহ লুকিয়ে আছে। ডিম ফেটে ঠোঁট উঁকি দিলেই মানুষ বোঝে ডিমটি পাখি হয়ে গেছে। তারপরই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে আকাশ। বোঝেন খোসা থেকে কীভাবে আকাশে পৌঁছানো।’

‘এখন আর আকাশ ভাসলেও স্বচ্ছ আকাশ ভাসবে না। এখন ধুলোবালি ছাড়া আকাশের আসল রঙ কি ঢাকা থেকে আমরা দেখি? তারপর এখন চোর কারা তাই দেখেন?’

‘এই তো আপনি এইগুলোই মুখে না বলে  লিখে ফেলেন! ত্রাণের টিন, খয়রাতের শাড়ি, কোন মন্ত্রীর বাড়ি থেকে কী পরিমাণ পাওয়া গেলো, যা বেরিয়ে আসছে, সব লেখেন। পুকুরভর্তি খাদ্য! আহারে আপা মানুষের খাবারের কষ্ট যদি দেখতেন! খাবার কষ্ট যে কী কষ্ট, তাও যদি ওই মহারথি চোরেরা বুঝতো, তাহলে এদের কিছুটা হলেও মনুষ্যত্ব অবশিষ্ট থাকত।

‘এইটুকু লেখাজোখায় চোর-চুন্নিদের কিছু হবে না ভাই! এতগুলো টিভি চ্যানেল তাদের প্রতি ঘণ্টার খবরে যেভাবে এক একটাকে জনগণের  চোখের সামনে উলঙ্গ টাঙ্গিয়ে ধরছে, তাতে কারো চুন্নি-বিল্লি অবস্থা ফুটে উঠছে কখনো? কীসের জোরে তারা টগবগে দু’আঙুলে ভি চিহ্ন দেখায়?’

‘আপা এরা যখন পার পেয়ে যাবে তখন দেখবেন সাফাই গেয়ে সব ঠিক করে ফেলবে। আমরাই এদেরকে ভোটে জিতিয়ে আনবো। গদিতে বসাবো। মালা পরাবো…।’

‘অতীতেও তো তাই ঘটেছে। ভয়টা সেখানেই।’

‘ভয় না, ঘেন্না বলেন। তেমনি আপনার ওই ঘটনাটুকুতেই বেরিয়ে আসবে তখনকার মানুষের জীবনযাপন। তখনকার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আজকের ব্যবধান…। স্বাধীনতার সেই পরবর্তী সময়ে কী উত্তেজনা ছিলো আমাদের। যেন এক ছটাক লবণচোরও এই পবিত্র মাটিতে থাকতে পারবে না।’

‘হ্যাঁ, পরাজয়ের গ্লানি কাটাতে মানুষের রক্তে যে মাটি ভিজে যায়, সে মাটি পবিত্র না হয়ে পারে?’

কেনাকাটা অর্ধসমাপ্ত রেখে ঘামতে ঘামতে বিন্তি গাড়িতে ওঠে। ড্রাইভার জানে আবার একটা,  দুটো জিনিসের জন্য তাকে বাজারে আসতে হবে এবং কিনে ধমকও খেতে হবে।

কড়াইতে তেল ফুটছে। মাছগুলো ছাড়তে যাচ্ছে বিন্তি। দুপুরের খাবারের সময় পার হতে চললো। বাড়িতে তো সে একা নয়। তবু মিস হয়ে যাওয়া কলটি দেখে তখনি ডায়াল না করে পারে না। গরম তেল আর জলজের মিলনে অদ্ভুত ছ্যাঁৎছুত শব্দ শুনে শাহ্ ইউনুস বুঝতে পারেন সময়টা বড়ই অসময়। বিনয়ী মানুষ তিনি। তাই আরও বিনীতভাবে বলেন, ‘আমি জানি আপা আপনি ব্যস্ত থাকেন। তবু আপনাকে দিয়ে হবে বলেই এসব কথা আপনাকে না বলে থাকতে পারি না। বর্তমান অবস্থা দেখে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছি। আগে যুদ্ধ করেছি বিদেশি শত্রুর কবল থেকে মাতৃভূমিকে উদ্ধারের জন্য। কিন্তু স্বাধীন দেশে আমরা দেশি শত্রুর কাছে জিম্মি হয়ে গেছি। মফস্বলে থাকি বলে রাজধানী থেকে প্রকাশিত পত্রিকার সম্পাদকেরা আমাদের পাঠানো লেখা পড়েও দেখেন না। তো ছাপবেন কীভাবে? এখন প্রকাশের ভাষাও রহিত হয়ে যাচ্ছে। তাই জ্বালা-যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে থাকি। আপনার সঙ্গে কথা বলে একটু শান্তি পাই। তাই বারবার ফোন করি।’

‘আপনি বলেন বলেই তো আমার অনেক কিছু দেখা হয়ে যায় আপনার চোখ দিয়ে!’

‘ওই যে, আপা আপনার ওই ছোট দাদির গল্পটি শোনাতে আপনি নিজেই কিন্তু প্রতিবার একাই হেসে কুটিকুটি হন। অথচ আমার মনে হয় এই তখনকার কম এই এক ছটাক লবণের মূল্য তাদের উসুল করার উপায় ছিলো না বলেই, কয়েক মাইল রাস্তা একজন মহিলা তার ছ’সাত বছরের ছেলেসহ সাত সকালে পায়ে হেঁটে এসেছে দোকানির বাড়িতে। আর সময়ের ব্যবধানটা খুব বেশি নয় বলে লেখার জন্য এটা জরুরি। আপনি বলেছিলেন না মুক্তিযুদ্ধের পরের বছরের কথা। তাহলে দেখেন এই যে দ্রুত সমাজব্যবস্থার অদলবদল।

সেইখান থেকে এখনকার চুরির কথা বলতে গেলে তো ‘পুকুর চুরি’ বলেও কোনো কথা থাকে না। এখন সাগর চুরিও মানুষের গায়ে সয়ে গেছে। অথচ একটু লবণের গলদ আপনাকে এখনো কতটা হাসায়…।

শুধু হাসায় না, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ভাবায়ও আপা!’

‘ভাই, শুধু কি লবণটুকুর জন্য হাসি? ও মহিলা ছিলো ছোট দাদির মৃত মায়ের দিকের কেমন আত্মীয়। যিনি মা’কেই হারিয়েছেন ছ’মাস বয়সে। তো মহিলাকে পেয়ে তো দাদি আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। তখনি সকালের নাস্তা ভর্তা-ভাতের সঙ্গে মহিলার সৌজন্যে একটা করে ডিমের দোপিঁয়াজি হয়ে গেলো সবার পাতে। তখন আমিও ছিলাম ওই বাড়িতে। আর শুরু থেকে শেষপর্যন্ত দেওরের সেই ছেলেকে চামড়া টেনে  খোলার মতো সে কী বকাঝকা করতে লাগলেন দাদি। লবণের দোকানদার ওই ছেলের বাপেরও ততক্ষণে মাথা নুইয়ে পড়েছে। কারো উপায় ছিলো না ছোট দাদির কথার ওপরে একটা কথা বলে। দাদির এ বিষয়টি নিয়ে লিখতে গেলে দুর্নীতি, রাজনীতি সব নীতিই গৌণ হয়ে যাবে। শুধু একটানা ছোট দাদির কিছু কথাই অসংলগ্ন লেখা যাবে।’

‘হ্যাঁ, তাতে নতুন করে আবার কেঁদে-কেটে কিছুটা অনুশোচনা লাঘব করতে পারবেন।’

‘সেটাও কি কম কথা?’ ধনুক ছিলা তীরের মতো কথাটা বিঁধে যায়  বিন্তির প্রাণে। আর সৎ, বুদ্ধিদীপ্ত, বিবেচক মানুষের অনুরোধ কখনো বোধহয় আদেশের মতো হয়ে যায়। না হলে এত বছর পর হঠাৎ, ক্রমে ছোট দাদির মুখখানা অমন অলৌকিক আলো ছড়াবে কেন বিন্তিকে কেন্দ্রীভূত করে!

বিন্তি জানতো ফেলি বেগম ওর আপন দাদি নন। আপন দাদির ওপর বিন্তির তেমন টান ছিলো না। হয়তো আপন দাদি টান তৈরির সে চেষ্টাটি করেননি। কারণ তাঁর তো চার ছেলেমেয়ের ঘরে আরও অনেক নাতি-নাতনি ছিলো। এতগুলোর ভেতর কারো ওপর বিশেষ নজরদারি করার বিষয়টি হয়তো আপন দাদির ঘটেনি। অথবা তিনি নাতি-নাতনিদের কাউকেই অতোটা ভালোবাসতে জানতেনও না।

ফেলি বেগম বিন্তির দাদার চাচাতো বোন ছিলেন। বয়সেও দাদার বেশ ছোট ছিলেন। তাই প্রপৌত্র-দৌহিত্ররা তাঁকে ছোট দাদি, ছোট নানি বলে ডাকত। ছোট দাদির আর কোনো ভাই বোন ছিলো না। জন্মেই ক’জন মারা যাওয়ার পর তার জন্ম বলে নাম ছিলো ফেলি। যেন হেলাফেলার নাম শুনে যমের অরুচি হয়। বিন্তি জ্ঞান হওয়ার  পর থেকে দেখেছে, ছোট দাদির কথাবার্তা সব একটু পাগলাটে ধরনের। তারপরও সবাই তাকে খুব মান্য করতো। ওদের বাবা-চাচা, ফুফুরা ডাকতেন ছোটকাকা বলে। কারণ বোধ হয়, ওদের একজন আপন ফুপু থাকলেও কোনো কাকা ছিলেন না। ফেলি বেগমের বাবার সম্পত্তির পুরো অংশটাই তাকে দিয়ে দেয়া হয়েছিলো। ছেলে না থাকলে ভাতিজারা বড় একটা অংশের মালিক হয়ে যায় আইন মোতাবেক। কিন্তু বিন্তির দাদা ভেবেছিলেন, ফেলি বেগমের যখন ছেলেমেয়ে হয়নি, তখন এ সম্পত্তি নিশ্চয় আবার এ বাড়িতেই ফেরত আসবে। তাই তিনি বাড়তিটুকুর দাবি-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন চাচাতো বোনটিকে।

কিছুটা দুঃসম্পর্কের তবু বাবার বাড়ির ছোট-বড় সবার প্রতি এই ফেলি বেগমের মমতা ছিলো উথলানো। ছিলো ছোটবড় সবার প্রতি সমান মনোযোগও। কিন্তু তাঁর নিজের কোনো ছেলেমেয়ে ছিলো না বলে সবার কাছে বাঁঝা বিশেষণেও কখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতেন।

শ্যামলা রঙের বোচাটে ফেলি বেগম স্বভাবে যতটাই সরল-সোজা ছিলেন, তাঁর স্বামী তর্জনে-গর্জনে ঠিক ততটাই ছিলেন শার্দূল। দেখতেও ছিলেন কান্তিমান। দুধে আলতা গায়ের রঙ ছিলো তাঁর। নাকটিও ছিলো টিকালো। শিশুকালে বিন্তি একবার তার ছোট দাদিকে বলেছিলো, ‘আচ্ছা দাদি অতো সুন্দর দাদার সঙ্গে তোমার বিয়ে হলো কীভাবে?’ উত্তরে দাদি বলেছিলেন, ‘তহন কী আর গায়ের রঙ দেইহে বিয়ে অতো? বিয়ে অতো জাতপাত দেইহে। আমার যহন বিয়ে অলো, তহন আমার ছয়মাস বয়স মাত্তর!’

‘ছ’মাসে বিয়ে হয়?’ বিন্তি চোখ বড় করে জানতে চায়।

‘তহন তো ওরকম বিয়েই অইছে। আমারে তো আমার শাশুড়ি পালছে। আমার মা ওই তহনি মইরে গেলো সূতিকা রোগে। তোর দাদা ছেলো আমার বাপের একমাত্র ভাইয়ের একমাত্র বেটা। তারে বাড়ির কাছে বিয়ে দেয়ার কয়দিন পরেই বউডা মইরে গ্যালো। তারপর আবার জমিদারের মাইয়া বিয়া কইরে শ্বশুরবাড়িতেই গিয়ে গাইড়ে বসলো। ঠিকমতো বাড়ি আসা-যাওয়া করতো না। আর এদিকি আমাগে বংশে বরাবর মানুষ কম থাকাতে সম্পত্তি বেশি ছেলো বাড়ির সবার চাইতে। তাই সবাইর আমরা শত্তুর অইয়ে গেলাম। শত্তুরের যন্ত্রণায় আমার বাপ রাতি ঘুমাতি পারতো না। ঘরের ধাইড়ের নিচ দিয়া শত্তুররা সড়কি দিয়া খোঁচাতো। ঘরের ফুটোফাটা দিয়াও সড়কি দিয়া খোঁচাতো। যদি আমার বাপরে গাঁথতি পারে! বাড়ির সবাই একদিক। আর আমার বাপ একলা। শেষে তোর দাদার ওপর রাগ কইরে আমার বাপ গলাই দড়ি নেলো।’

বিন্তির চোখ ছিটকে বেরিয়ে আসার মতো অবস্থা। তার ওপর দাদি ক্রমাগত বলেই যান, ‘ক্যান তোর ছোট চাচার ঘরে রাত্তিরি শুনিস নাই ঘটরঘটর শব্দ? আমার বাপজান ওই ঘরেই গলায় দড়ি নিছিলো, এহনো আমার বাপজানের রুহ ওই ঘরে ছটফট করে…। আমি তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পইড়ে আমার বাপজানের জন্যি দোয়া করি। তোরাও করিস।’’

বড় হতে হতে সবার মতো বিন্তিও অবগত হচ্ছিলো তার পূর্বপুরুষের করুণ, হজবরল ইতিহাস। কিন্তু ছোট চাচার ঘরে ঘটরঘটর শব্দের কথা আর কারো কাছ থেকে সে শোনেনি। বিন্তিরা শহরে থাকে বলে  মাঝে মাঝে ছোট দাদির সঙ্গে দেখা হয়। এ জন্যেই ছোট দাদি বিন্তিকে একটু বেশি খাতির করেন। অথবা গায়ের রঙ আর গড়নে বিন্তি তার নিজের মতো দেখতে বলে। আর এই খাতিরের টানে বিন্তি কাউকে না বলে যখন তখন চলে যেত ছোট দাদির বাড়ি। শুধু বিশাল একটি মাঠ মাঝখানে। মাঠের পরে আর কতটুকু ফসলের জমি। ছোট দাদির বাড়িটি আড়াল হওয়ার মতো আর কোনো বাড়ি বা বাগান ছিলো না মাঝখানে। অতো বড় মাঠটিকে কেউ মাঠ বলতো না। বলতো পতিত্। বিন্তি এখন বোঝে, ওখানে কোনো ফসল না বুনে গেরস্থরা গরু চরানোর জন্য এমনি রেখেছিল বলে ওটাকে ‘পতিত্’ বলে। তবে এখনো বড় বড় ছেলেদের ফুটবল খেলতে দেখেছে ওখানে। দুই গ্রামের মানুষ একত্র হয়ে খেলে। শেষে গোল নিয়ে মারামারি করে মাথা ফাটিয়ে থানা-পুলিশও করেছে। তাছাড়া বর্ষাকাল বাদ দিয়ে সব বাড়ির গরু এনে বাঁধা হতো ওখানে। ছোট দাদির বাড়ি যেতে কতদিন গরুর তাড়া খেয়েছে বিন্তি! কিন্তু খুঁটো গেড়ে গেড়ে গরুগুলো বাঁধা বলে সে সব গরু বেশিদূর এগোতে পারেনি।

বাবা চাচাদের ফুফা, বিন্তিদের এই ছোট দাদির স্বামী, দাদা ছিলেন পোস্ট অফিসের একজন মাঝারি কর্মকর্তা। বাজারে তার একটা দোকান ছিলো গজকাপড়ে ঠাসা। কয়েকজন দর্জিকে বিন্তি দেখেছে সেখানে অনবরত কাজ করতে। তবু দাদি দাদাকে খলিফা সম্বোধন করতেন।

পোস্ট অফিসটি ছিলো বাড়ি থেকে কয়েক মাইল দুরে। সেই সকালে চলে যেতেন দাদা, ফিরতেন এশার পরে। এর ব্যত্যয় ঘটলে অথবা ছুটির দিনে কখনো দাদার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে বিন্তিদের মতো ছোটরা ভীষণ ভয় পেয়ে যেত। আর তাদের ভয় পাওয়ার কারণ শুধু তার ভয়ঙ্কর সুন্দর চেহারা এবং জোড়া ভ্রুর নিচে লাল চক্ষু দুটিই শুধু নয়? সত্যি কথা এই, ফেলি বেগমের পিতার চল্লিশ বিঘা জমি, যা তার স্বামী ভোগ করছেন। যা ফেলি বেগম মারা গেলে আবার বিন্তিরাই ফেরত পাবে। আবার শনি, মঙ্গল প্রতি সপ্তাহের এই দু’দিনের হাটের পরদিনই বিন্তি দেখতো, দুড়দাড় করে তার সব চাচতো, ফুপাতো ছোট ছোট ভাই বোন সব ক’টি পাল্টাপাল্টি করে যার যার মতো ওই ছোট দাদির বাড়ি উঠেছে। হাট থেকে আনা প্রতিটি বস্তুরই একটা অংশ ফেলি বেগম দ্রুত ত্রস্ত হাতে সবাইকে একটু একটু করে ভাগ করে দিচ্ছেন। ভাগ শেষ হলে ফেলি বেগম বিন্তিকে টেনে পাশে রেখে অন্য সবাইকে বলতেন, ‘এবার তোরা যা! যা তো দেখি…।’

উপযাচকের মতো ক’জন তখন গোবেচারার ছানা পরস্পর পরস্পরের মুখের ওপর দৃষ্টি নাচানো ছাড়া উপায় দেখতো না। হাবভাবে বুঝতো গরীয়সী বিন্তি, ওরা আরও কিছুক্ষণ থাকতে চায়, যতক্ষণ ও ওখানে থাকে। কিন্তু ছোট দাদির তাড়া ওদের দাঁড়িয়ে থাকতে দিতো না। একটু পরে বিন্তি যখন বাড়ি যাওয়ার পথ ধরতো, তখন দেখতো ওরা ক’জন বাড়িটির ঢালে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে গুজুর গুজুর ফুসুরফাসুর করছে। কিন্তু ওকে দেখে সে গুজুর গুজুর একেবারে সাপের ফোঁসফাঁসে পরিণত হয়ে যেত। শত্রুর মুখে ছাই ঢেলে দেয়ার মতো বিন্তি তখন লুকিয়ে রাখা বড়সড় পাটালি গুড়ের টুকরোটি কচকচ করে চিবোতে শুরু করে দিতো। ওদের সামনে চিবোনোর স্বাদই আলাদা। তাই দাদি ওটা খেয়ে শেষ করে যেতে বললেও বিন্তি ওটা হাতে লুকিয়ে নামতো। কখনো ছিটেফোঁটা ওদের হাতে দিলে সবাই একসঙ্গে খেতে খেতে পথ চলতো। না হলে ছত্রভঙ্গ ওরা সবাই মিলে বিন্তিকে যতই আক্রমণাত্মক কথা শোনাক, বিন্তি তা নির্বিবাদে সয়ে যেত। কারণ কাঠের সিন্দুক খুলে পাটালি গুড় ভেঙে ওর হাতে গুঁজে দেয়ার আগে ফেলি বেগম আরও যা করতেন, তা হলো, তাঁর স্বামীর শ্বাসকষ্ট থাকায় তাঁর জন্য সবসময় ওই রোগের প্রতিরোধক সিরাপ কেনা থাকত ঘরে। সেই সিরাপও দাদি বিন্তির গলায় কানিকটা ঢেলে দিতেন। কী তিতকুটে মিষ্টি। তবু বিন্তি তা প্রসন্ন মুখে গিলে ফেলতো। আর এই আতিশয্যের রেশ মন থেকে কখনোই ফুরাতো না।

পাগলাটে দাদি মনে করতেন বাপের বাড়িতে তার এই দেওয়া-থোওয়া বাড়ির কেউ টের পাচ্ছে না। বিন্তির তখনই মনে হতো, বাড়ির অন্য সবাই তো টের পায়ই, স্বয়ং দাদাও সব টের পাচ্ছেন। কিন্তু স্ত্রী’কে তো দাদার ভয় পাওয়ার একটা মোক্ষম কারণ রয়ে গেছে। কিন্তু ফেলি বেগম তাও বুঝতেন না। দাদির এতো আদরের বিন্তি নিজেও যে তার এই দাদার চোখে মস্ত শূলের মতো বিঁধছে, বিন্তি নিজে তা ভালো জানতো। এও জানতো, তার বাবা-চাচারা তার এই দাদার কাছে অবধারিতভাবে মূর্তিমান নারদ। কারণ ছোট দাদি মারা গেলে তাঁর সব সম্পত্তি ফিরে চলে যাবে ওই বাবা-চাচাদের আয়ত্ত্বে। তাই বিক্ষিপ্ত দলবলে ছোট দাদির বাড়ির এই অভিযানের রোমাঞ্চটা ছোট্ট বিন্তির অস্থি-মজ্জায় প্রবল অধিকারবোধের শক্তি যোগাতো। বড়দের কথা শুনে শুনে সেও মনে করতে শিখেছিলো, ছোট দাদির থেকে যা হাতিয়ে নিচ্ছি, তা তো আমাদেরই পাওনা থেকে। ছোট দাদির ঘরের মাচার নিচে তা দিতে বসা ডিমসহ মুরগির খাপরাও মাথায় করে বাড়ি উঠেছে বিন্তি। এ দৃশ্য মা দেখে খুশি হলেও চোখ টাটিয়ে মরেছে অন্য চাচিরা। সব দেখে অন্য ভাগিদারের ছোট কোনো সদস্য যখন ফেলি বেগমের কাছে গিয়ে আব্দার করেছে কোনো কিছু চেয়ে, তখনি তারা তার উল্টো ঝাড়া খেয়ে কাচুমাচু মুখ ফিরে এসেছে। ফেলি বেগমের কথা ছিলো একটাই, ‘ওর সাথে কারোর তুলনা নাই!’

তাই চাইতে চাইতে বিন্তি একদিন চেয়ে ফেললো, ফেলি বেগমের নাকফুলটিও। কারণ অনেককে সে বলতে শুনেছে ওই নাকফুলটা হীরের। এবং নানানভাবে শুনেছে হীরের মাহাত্ম্যও। বিন্তির মনে হলো, হীরের যদি এতো গৌরব, তাহলে ছোট দাদির ওই নাকফুলের উত্তরাধিকারী নিশ্চয় একমাত্র সে। তাই খুব সোচ্চার কণ্ঠে সে এক আনমনা সময়ে বললো, ‘ও দাদি তোমার নাকের ওই হীরের ফুলটা আমার নাকে দাও। ওটা ভারী সুন্দর। সবাই বলে!’

চৈত্রের ভরদুপুরে ফেলি বেগম খুব একচোট ঝাড়লেন বিন্তিকে। বললেন, ‘আমার ছয়মাস বয়সে যহন বিয়ে অয়, তহন আমার শ্বশুরবাড়ি থেইকে এই ফুল নাকে পরায়। নাকফুুল অলো সধবার লক্ষণ! আর আমি বোলে এইডা খুইলে ওরে দেবো! ষাট বছরের জেওর!’ দাদুর কথায় বিন্তি থতমতো খায়। এতটা গুরুত্ববহ হলে ও কি আর ওটা চেয়েছে! আর চেয়েও যদিও থাকে, তো সেটা ছোট দাদিরই প্রশ্রয়ের জের! তা ছাড়া সবাই তো বলে, ফেলি বেগমের মাথায় ছিট আছে! ছিটমাথা মানুষের সাথে কি এত হিসেব করে কথা বলতে হয়!

একটু পরেই কী হলো, প্রাণপণ চেষ্টায় ফেলি বেগম নাকফুলটি খুলে বছর দশেকের বিন্তির হাতে তুলে দেন। বলেন, ‘যা। এইডা নিয়ে বাড়ি গিয়ে লুকিয়ে রাহিস। বিয়ের সময় পরবি। এখন বাড়ির অন্য কেউ দেখলি আমার সঙ্গে ঝগড়া করবেনে। এমনিতেই সব্বাই কয়, আমি নাকি তোরে সবতা বেশি দিই।’ বিন্তি বাড়ি এসে ফুলটা দেখিয়ে ছোট দাদির কাণ্ডকারখানা অভিনয় করে মা’কে বয়ান করতেই, মা আঁৎকে ওঠেন। বলেন, ‘এখনই এটা ফিরিয়ে দিয়ে আয়! ফুপু আম্মার মাথায় সত্যিই ছিট আছে। না হলে এমনটা কেউ করে!’

কিন্তু বিন্তি কাল যাবো, বলে দ্রুত উঠোন পার হয়ে খেলতে নেমে চলে গেলো মাঠে।

পরদিন সূর্য ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়ি মাথায় করা হট্টগোল শোনা গেলো। ঘটনার মধ্যে ঢুকে বিন্তি দেখলো সবাই কাঁটার মতো চোখে তার দিকে দৃষ্টি বিঁধিয়ে রেখেছে। কারণ ছোট দাদি এসে বিন্তির নিজের দাদিকে সাক্ষী মেনে বলছেন, ‘রাতে খলিফার হাঁপানি এমন বাড়ছে, এমন অবস্থা জীবনে অয়নাই। ও ভাবিসাফ, তোমার নাতনি আমার কাছে নাকফুলডা চাইছে। আর আমিও না দিয়া পারি নাই। শহরে থাহে। মাঝে মাঝে ওগে দেহি। কিছু চাইলি না দিই কীভাবে? এহন বুড়ো যদি মইরে যায়…।’ ততক্ষণে বিন্তির দিকে ছোট দাদির চোখ পড়ায় প্রতিপক্ষের মতো বলে উঠলেন, ‘বুড়ো যদি মইরে যায়, তোর ভাতার আমারে দিবি…।’ বলে কপাল চাপড়াতে লাগলেন ফেলি বেগম। ফেলি বেগমের কথায় কেউ হাসিতে ঢলে পড়া দূরে থাক, সবারই রক্তে বোধহয় রি রি করে যন্ত্রণার মৌমাছি খুবলাতে শুরু করেছে। বিন্তির পারঙ্গমতা সবাইকে খটকায় ফেলে রাখলো। কিন্তু  বিন্তির মা মেয়েকে বেশ কয়েকটা কিল-ঘুষি দিয়ে ফুপু শাশুড়ির নাকে ফুলটা আবার পরিয়ে দিতে গেলেন। কিন্তু ফেলি বেগম তা আর নেননি। বলেছিলেন, ‘না, ওর মন ছোট অবে। ওরে তোমরা আর বইকো না। আমি না দিলি, ওকি আর নিতি পারছে?’ বলে ঠাণ্ডা মেজাজে বাড়িমুখো রওনা দিলেন। আর বাড়ির দক্ষিণ পাশের নিমতলায় বসে বুকে শীতল কাঁপন তুলে বিন্তি দেখলো, ছোটদাদি ছায়াদায়ী মেঘের মতো খুব ধীরে ধীরে তাঁর বাড়ির দিকে হাঁটছেন। বরবরের মতোই পতিত পেরিয়ে যাচ্ছেন একা!

বছর পনের পরে বিন্তি যখন বাড়িতে গেলো, তখন ঢাকা শহরে তার ভরা সংসার। এর মধ্যে আর তার ছোট দাদিকে দেখা হয়নি। মারা গেছেন, নিজের দাদিও। বিন্তি মজা করে সেই ছোটবেলার মতো পরদিন সকালে উঠে বললো, ‘ছোট দাদির বাড়ি কে কে যাবি!’ কথাটি বলতে বিন্তি যেন সত্যিই তার সেই শৈশবে পৌঁছে গেল। যেন এখনো হাটের পরের দিনের মতো সওদাপাতির ভাগ গলাতে যাচ্ছে সে দলবল নিয়ে। ছোট দাদি যতই বলতেন, একদৌড়ে বাড়ি যাবি। কেউ য্যান না দ্যাহে! কিন্তু ওরা সব বাড়ি থেকে নেমেই যাচাই করতে বসতো। কে কি পেলো না পেলো। এরপর হেরফেরের সব খটকা ওখান থেকে খোলাসা করে পরে উঠতো। এতে ও বাড়ির কেউ কেউ আসা-যাওয়ার পথে দাঁড়িয়ে থেকে ফেলি বেগমের সরল চাতুরী কঠিনভাবে চাউর করে ছাড়তো। কিন্তু ফেলি বেগমের সামনে দাঁড়িয়ে এর জবাবদিহি করে সে দুঃসাহস তার একমাত্র স্বামী ওই বাড়ির সবচেয়ে বড় ছেলে ষাট বছরের খলিফারও ছিলো না। তবে পিছনে চলতো ঢের কথা। আর তারই জের ধরে তিনি কতদিন ভোর হতেই রওনা দিতেন অপঘাতে মৃত বাপের বাড়িটির দিকে। তিনি বাড়ির ঢাল বেয়ে উঠতে উঠতে বউ-ঝি যে ক’জন তাঁকে এগিয়ে আনতে নামতো। তাদের দিয়েই শুরু হতো, ‘যত আমি কই, তোগে আমি যা দিই, তা য্যান কেউ দ্যাহে না! এহন বাড়ি সয়লাব এইসব কথায়, আমি আমার বাপের বাড়ি সব দিয়ে দিই।’ শেষমেশ নিজেই রায় দিয়ে ফেলতেন শ্বশুরবাড়ির মানুষের বিপক্ষে, ‘ আমার বাপের বাড়ির সম্পত্তির ভাগ থেইকে আমি দেই, তাতে কার কি রে?’ বলেই সেই বাড়িমুখো ফিরে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ইঙ্গিত করে লোক হাসিয়ে মারতেন।

বিন্তির উচ্চকণ্ঠ ডাকে কয়েকটি কণ্ঠ খুব নিস্পৃহভাবে উত্তর দিলো, ‘ কেউ যাবে না ও-বাড়ি। এমনকি তুমিও যাবে না।’ বিন্তি ভেবেছিলো দাদির বাড়ির সেইসব যাতায়াত নিয়ে এখন খুব মজার কথা উঠবে। কিন্তু উল্টোভাব দেখে সে উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলো, ‘কেন যাবো না?’

ছোট চাচা বললেন, ‘কাকা সব সম্পত্তি ফুপাজানের নামে দলিল কইরে দিয়ে দিয়েছে। আর ফুপাজান মারা যাওয়ায় এহন তো সব সম্পত্তির মালিক তার গোষ্ঠী। ছোট দাদি তার পৈত্রিক সম্পত্তি দাদার নামে লিখে দিলে সে সম্পত্তির মালিক হবে ছোট দাদার সব ভাই, ভাতিজা। তার মানে বিন্তির বাপ-চাচার ভাগে পড়লো ইয়া বড় এক জিরো!’ বিন্তি সবার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তবু বেরিয়ে গেলো। সেই পতিত্ জমি আর ফসলের মাঠটুকু পেরোতে বুঝতে পারলো, ছোটবেলা দিনে কয়েকবার এক একদৌড়ে ও বাড়ি যাওয়া-আসা করলেও, আসলে পথ একেবারেই কম ছিলো না। তারপরেও পাখির ডানার মতো প্রতিবার ফুরফুরে মনে হয়েছে এই ধু ধু পথটুকু। আর ছোট দাদিকে মনে হয়েছে স্বর্ণ-দুর্গের রাণী।

ফেলি বেগম বিন্তিকে পেলে আগের মতো খুশি হবে ভেবে বিন্তি শিহরিত হচ্ছিলো। বয়সের সব ভার খুলে গেছে তার শরীরমন থেকে। বাড়ির ঘরগুলোর চেহারা অন্যরকম হয়ে গেছে যদিও। দাদিকে খুঁজতে আগের মতো এঘর-ওঘর করতে আবছা চেনা বয়স্ক একজন মহিলা হাত ধরে টেনে এনে, চোখের ইঙ্গিতে দেখিয়ে দিলো ‘এই আপনার সেই দাদি!’ ফেলি বেগমকে পাওয়া গেলো তার নিজের ঘরে খেজুরপাতার এক জীর্ণ পাটিতে। মাটিতে শোয়া। শরীরের মাংস অবশিষ্ট নেই। চোখ-দুটি কোটরাগত। চামড়ার ক্ষত গন্ধ ছড়াচ্ছে। জবানও নাকি বহুদিন বন্ধ। কিন্তু কী ভয়ঙ্কর তিনি বিন্তিকে চিনতে পেরেছেন! বিন্তির নেয়া মিষ্টি তিনি বিন্তিকে নিজে হাতে খাইয়ে দেয়ার ক্ষীণ ইঙ্গিত করছেন! বিন্তির খাওয়ানো শেষ হলেও ফেলি বেগম হাঁ করে থাকলেন। কিন্তু খাবারটা ওবাড়িরই কেউ তৎক্ষণাৎ সরিয়ে রেখে বললো, ‘আর দিও না। বিছানা ধুতি ধুতি আমাগোর জান যায়।’

কোনো কথা নেই। শুধু অপলক চেয়ে থাকা ঘোলা প্রায় মৃত দুটি চোখের সামনে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয় বিন্তির। মনে হয় কেন এই চেতনাটুকু রহিত হলো না। কেন দাদি তাকে চিনতে পারছেন? সে জানে, তাকে দেখে যে দু-চারজন ভিড়েছে, সে চলে গেলেই এ স্থান আগের মতোই নিজ্ঝুম হয়ে যাবে। জাগর চেতনার একটি মানুষের শরীরে পোকা জন্মাচ্ছে, অথচ তার রক্তের সম্পর্কের কেউ এসে সেবা করছে না স্থাবর-অস্থাবর কিছু পাবে না বলে! ধর্মের দোহাই দিয়ে, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভক্তি প্রমাণ যাচাইয়ের গ্যাঁড়াকলে ফেলে নিজের উত্তরসূরিদের পক্ষে কেল্লা মাত করে গেছেন ছোট দাদা। বুড়োটা আসলে মহাপাতক ছিলেন। ছোট দাদি তা বুঝতে পারেননি। যাতে ছোট দাদার অধিকার ছিলো না, তা লিখিয়ে নিতে উনি লোভী হলে, যাদের অধিকার ছিলো, তারা কেনো রুষ্ট হবে না? বিড়বিড় করে বলে বিন্তি। কোনোধরনের ভূমিকা রাখতে অপারগ নিজেকে বড় অসহায় মনে হয় তার। ব্যক্তিগত লোভে নয়, অনুতাপে, অক্ষম আক্রোশে জর্জরিত হয়ে নিজের অজান্তে উঠে দাঁড়ালো সে।

অনেকটা পথ পার হয়ে এসে মনে পড়লো, দাদি কী ওর গমন পথের দিকে চেয়ে ছিলেন? তাঁর ইচ্ছের হাতটি দিয়ে ওকে টেনে ধরতে চেয়েছিলেন? পাদুটোয় পথ আগলে দাঁড়িয়েছিলেন কি! সবশেষে সেই  হাঁপানির তিতকুটে সিরাপ? সিন্দুকের কোণ থেকে তাঁর মন কি সেটা টেনে বের করেনি? বলেনি হাঁ কর, ‘এইখানেতে একটু খা! শরীরে শক্তি হবে।’

ইদানীং শ্বাসকষ্টের সঙ্গে মাঝে মাঝে কফ জমে যায় বিন্তির বুকেরও। প্রতিবার ওরকম সিরাপের বোতলের মুখ খোলার সময় ছেলেমেয়ে কাছে থাকলে সে বলে, ‘আমার ছোট দাদি আমাকে একটুখানি করে এই সিরাপ গলায় ঢেলে দিতেন। মাঝে মাঝে অবশ্য বেশিও পড়ে যেত। ভাবতেন এটা খেলে শক্তি হয়। এখন তিনি যদি দেখতেন তাঁর সেই সিরাপই আমি বোতল বোতল কিনে খেতে পারি, তাহলে কী খুশি হতেন, না?’ ছেলেমেয়েরা খুব একটা হাসে না দেখে বিন্তির বলার মজাটা নিজের কাছেও কমে যায়। চিত্রনাট্য যত ভালো হোক, দৃশ্যায়ন যথার্থ না হলে নাটকের যা গতি হয়!

কিন্তু শাহ্ ইউনূস সবটুকু শুনে বলেন, ‘আপা আমাদের শৈশব অনেকটা প্রকৃতি গড়লেও, এদের শৈশব নিরেট হাতে গড়া। তাই সম্পর্কের সুতো ছেঁড়া একজন রূপকথার মতো মানুষের একা ঘরে মরে, বাসি হওয়ার খবর তার পরবর্তী প্রজন্মের কাউকে কতটা কাতর করে, এরা তা বুঝবে কীভাবে? আমি বুঝতে পারছি, সাজিয়ে-গুছিয়ে কারো ফরমায়েশে এ সব কথা লেখা যায় না! এ শুধু পুনরাবৃত্তির। তাও নিজের সঙ্গে নিজের। দুর্নীতি, সুনীতিগুলো কেমন তালগোল পাকিয়ে গেলো, না? লিখতে বললাম, দুর্নীতি নিয়ে, আর আপনি ঢুকে গেলেন, পারিবারিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম রন্ধ্রে। লেখার জন্য দুটো দুইরকমের বিষয়…।

Author: দীলতাজ রহমান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts