বিশ্ব ইজতেমা, ধর্মীয় অনুভূতি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন

বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এ দেশের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মীয় অনুভূতি সম্পন্ন। সব মানুষ ধর্মীয় অনুশাসন পুঙ্খানুপুঙ্খ পালন না করলেও ধর্মের প্রতি তারা খুবই অনুরাগী। বিশ্ব ইজতেমা ধর্মের কোনো অনুষঙ্গ নয়। ‘ইজতেমা’ একটি আরবি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ ‘সম্মেলন।’ তাই একে ধর্মীয় সম্মেলন বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের জন্মের পূর্বে তদানিন্তন পাকিস্তান আমলে ইজতেমার শুভ সূচনা হ​য়​। ১৯৪৬ সালে প্রথম কাকরাইল মসজিদে ইজতেমার আয়োজন করা হয়। এরপর ১৯৪৮, ১৯৫০ এবং ১৯৫৪ সালে চট্টগ্রামের হাজী ক্যাম্পে অনুষ্ঠিত হয় ইজতেমা। এখন যেমন প্রতি বছর ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়; শুরুর দিকে তেমনটা ছিলো না। ১৯৫৮ সালে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় নারায়নগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে। বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তথা তদানিন্তন রমনা রেসকোর্স ময়দানে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬০, ১৯৬২ এবং ১৯৬৫ সালে। ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকার ইজতেমার জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দেয় বর্তমান ইজতেমাস্থল তুরাগ নদীর তীর টঙ্গীতে। এরপর থেকে এখানে নিয়মিত প্রতি বছর ইজতেমা অনুষ্ঠিত হতে থাকে। মুুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ সরকার ইজতেমার জন্য তুরাগ তীরে ১৬০ একর জমি বরাদ্দ করে। ২০০১ সালে ইজতেমায় আগত মুসল্লির সংখ্যা ছিলো ২ মিলিয়ন, ২০১০ সালে যার সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ মিলিয়নে। এভাবে উত্তরোত্তর ইজতেমায় আগত মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে জানা যায়, বিশ্বের প্রায় ২ শত দেশের মুসল্লি ইজতেমায় অংশগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও আমেরিকার মুসল্লিগণ অংশগ্রহণ করেন। ইজতেমাকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সম্মেলন বলে আখ্যায়িত করা হয়। পবিত্র হজ্জের পরে এতো বড় মুসলিম সম্মেলন বিশ্বের অন্য কোথাও হয় বলে কোনো প্রমাণ নেই। কারবালা প্রান্তরে শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়; সেটার চেয়েও ইজতেমার পরিসর বৃহত্তর বলে প্রতীয়মান হয়।

বাংলাদেশের আপামর জনতার ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং দুর্বলতা রয়েছে ইজতেমার প্রতি। এতো বড় একটি সম্মেলন যে দেশে হয় সে দেশের জন্য এটা অত্যন্ত গর্বের বিষয়। বাংলাদেশ সরকারও ইজতেমার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ইজতেমা ময়দানে জায়গা সংকুলান না হওয়ার কারণে এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রয়োজনে সরকার গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশীদের জন্য ইজতেমাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। এখন ইজতেমা দু’দফায় অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দফায় দেশের অর্ধেক জেলার এবং দ্বিতীয় দফায় বাকী অর্ধেক জেলার লোকের​ অংশগ্রহণের ব্য​বস্থা করা হয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। এছাড়াও সরকার যোগাযোগের জন্য রেল, বাস, লঞ্চ, ষ্টিমার এমনকি বিমানেও বিশেষ ব্যবস্থা করে থাকে। সার্বিক নিরাপত্তা, জরুরী মেডিকেল সার্ভিস, পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পানীয় জলের সরবরাহ থেকে শুরু করে নানাবিধ বিষয়ে সরকার যথেষ্ট তৎপর। কিন্তু তারপরও কথা থেকেই যায়। সরকার যা করছে তা জনসংখ্যা উপস্থিতির বিচারে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। যার ফলে ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের ভোগান্তির অন্ত থাকে না। বিশেষ করে নামাজের জায়গা অসমতল, পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা, রান্নার ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সেবাসমূহ প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট ন​য়​। দিন যতো যাবে এ সমস্যাগুলো আরো প্রকট আকার​ ধারণ করবে। কাজেই সরকারের​ এখনই ইজতেমার অবকাঠামোগত উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। ইজতেমার আশপাশের এলাকা থেকে বিভিন্ন শিল্প কারখানা এবং বাসা বাড়ি অন্যত্র স্থানান্তরের ব্যবস্থা করে ইজতেমার জমির সম্প্রসারণ দরকার​। তুরাগ নদীর দুই পাড়​ বাঁধাই করে নদীতে অসংখ্য সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন। নদীর পানি যাতে দূষিত হতে না পারে সেজন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। ইজতেমা এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যাওয়ায়​ যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিদের বিশৃঙ্খল পরিবেশে পায়ে হেঁটে আসতে হয়। মাঠের অনেক দূরে গাড়িতে, ট্রেনে, নৌকায় বসে অনেকের ইজতেমায় শরীক হতে হয়। সেজন্য আব্দুল্লাহপুর থেকে আশুলিয়ার ধৌর প্রান্তের বেড়িবাঁধ পর্যন্ত এবং আব্দুল্লাহপুর থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ করা প্রয়োজন। এতে করে ইজমেতার সময় নিচের রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে, কিন্তু ফ্লাইওভার দিয়ে যথারীতি যানবাহন চলাচল করবে। ইজতেমার জমি কমপক্ষে আরো কয়েক গুণ বৃদ্ধি, প্রয়োজনে উত্তরদিকে চেরাগ আলী পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। এরপর পুরো জমির সেন্ট্রাল পয়েন্টে পশ্চিম প্রান্তে সর্ববৃহৎ বহুতল বিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করে সমস্ত মাঠের ফ্লোর পাকা করা প্রয়োজন। সমগ্র মাঠটি বহুতল বিশিষ্ট করার পরিকল্পনা মাথায় রাখা যেতে পারে। যেখানে মাঝে মাঝে নির্দিষ্ট দূরত্বে পয়:নিষ্কাশন, পানি সরবরাহ এবং রান্নার ব্যবস্থা থাকবে। মাঠের চতুর্দিকে বহুতল বিশিষ্ট বৃহৎ আকারের মার্কেট নির্মাণ করা যেতে পারে। যার একটি ফ্লোর ঢাকা শহরের ফুটপাতের হকারদের জন্য বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। অন্যান্য ফ্লোর বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করে অর্থের যোগান হতে পারে। ইজতেমার জন্য এমন একটি সুবৃহৎ প্রকল্প হাতে নিলে দেশের আপামর জনগণ সরকারকে সহযোগিতা ও প্রশংসা করবে। সহযোগিতা করবে দেশের বড় বড় শিল্পপতিরাও। এ ব্যাপারে সরকারীভাবে সুষ্ঠু যোগাযোগ স্থাপন করা গেলে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোও অনুদান দিয়ে সহযোগিতা করবে, এটা আশা করা যায়।

ছবি: জুবায়ের বিন ইকবাল
jbigallery.com

Author: মাসুদ রানা

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts