বইমেলা ও আমাদের প্রত্যাশা

শুরু হয়েছে মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ১ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্নে মেলা উদ্বোধন করেছেন। এ মেলাকে ঘিরে লেখক, পাঠক, প্রকাশক থেকে শুরু করে প্রচ্ছদশিল্পী, বাধাইশিল্পী, মুদ্রাকর, বিপণনকর্মী সবারই অনেক প্রত্যাশা থাকে। লেখক চান তার সেরা বইটি পাঠকের হাতে তুলে দিতে। বইয়ের সুঘ্রাণে নিজেকে আমোদিত করতে। নতুন লেখকের জন্য এ এক মাহেন্দ্রক্ষণ। বস্তুত একজন লেখকের প্রথম বই প্রকাশের অনুভূতি আর প্রথম সন্তানের বাবা- মা হওয়ার অনুভূতি অনেকটাই এক। সন্তান রক্তমাংসে গড়ে ওঠা আত্মজ আর বই কাগজ কালিতে গড়ে ওঠা আত্মজ। তাই নিজের লেখা বই লেখকের কাছে বিশেষ কিছু।
একজন পাঠকও সারাটা বছর অপেক্ষা করে থাকেন তার প্রিয় বইটি পাবার আশায়। মেলায় নতুন কি কি বই আসছে, তার প্রিয় লেখকরা কি লিখছেন, নতুন লেখকরা কি লিখছেন এসব নিয়ে তাদের প্রত্যাশার অন্ত থাকে না। প্রকাশকরাও চান তাদের সেরা কাজটি পাঠকের হাতে তুলে দিতে। চান তার লগ্নিকৃত টাকাটা যেন মার না যায়, যেন দু পয়সা আয়- রোজগার হয়। প্রচ্ছদশিল্পী থেকে শুরু করে বিপণন কর্মী পর্যন্ত সবারই প্রত্যাশা থাকে প্রশংসা আর কিছু নগদ প্রাপ্তির। তাই বইমেলা এখন এদেশের অর্থনীতির সাথে মিশে গেছে। ফেব্রুয়ারি পুরো মাস জুড়ে যে বইয়ের কেনা বেচা হয় তা অর্থনীতিতে রাখে উল্লেখযোগ্য অবদান।
১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সেকালের বর্ধমান হাউস (আজকের বাংলা একাডেমী) প্রাঙ্গণের বটতলায় এই বইমেলার সূচনা। একটুকরো চটের ওপর চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত (আজকের মুক্তধারা প্রকাশনী) কলকাতা থেকে আনা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতে অবস্থানকারী বাংলাদেশী শরণার্থী লেখকদের লেখা মাত্র ৩২ টি বই নিয়ে যে একুশের বইমেলার যাত্রা শুরু হয়েছিল তা আজ অনেক প্রসারিত।
ফেব্রুয়ারি আমাদের আত্মপরিচয়ের মাস। ভাষার দাবিতে ১৯৫২ সালের এ মাসের একুশে ফেব্রুয়ারি বুকের রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত করেছিল সালাম বরকত রফিক জব্বারসহ আরো কত নাম না জানা শহীদ। তাই এ মাস আমাদের আবেগ আর ভালবাসার। এই ভালবাসার মাসব্যাপী চলে বইমেলা। পৃথিবীতে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যে দেশের মানুষ ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। তাই একুশ আমাদের অহঙ্কারের দীপশিখা।
এরপর দেশ- বিদেশে অবস্থানরত বাঙালি ও তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালে মহান একুশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীৃকতি পায়। একই বছরের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। ২০০০ সাল থেকে সারা বিশ্বে একুশে ফেব্রুয়ারি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।


একুশের মেলা আগে একাডেমী প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হত। প্রকাশক আর লেখকের সংখ্যা বাড়ায় ছোট পরিসরে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় মেলা এখন সোহরাওয়ার্দি উদ্যানেও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। তবে একাডেমীর অংশটিও রয়েছে। সেখানে শিশু কিশোরদের জন্য রয়েছে নিজস্ব কর্নার, রয়েছে সরকারি সংস্থাগুলির স্টল।
বইমেলা ঘিরে আমাদের প্রত্যাশা অনেক । আমরা চাই, মেলা প্রাঙ্গণ হবে ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন, ধুলিমুক্ত। নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে থাকবে ডাস্টবিন। বসার ব্যবস্থা থাকবে পর্যাপ্ত। লেখক পাঠকরা যেমন ঘুরে ঘুরে বই দেখবে, তেমিন ক্লান্ত হলে বসবে, গল্প গুজব করবে। সুপেয় পানি আর সস্তায় খাবার জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকা দরকার। দরকার টয়লেট ফ্যাসিলিটি। লেখক-পাঠকের ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতার ব্যবস্থা করা জরুরি । যেখানে পাঠকরা তাদের প্রিয় লেখকের সাথে আলাপ করতে পারবেন, প্রশ্ন করতে পারবেন। বয়স্ক লোকদের জন্য পৃথক গেটের ব্যবস্থা করা দরকার যাতে তারা ভিড় এড়িয়ে যাওয়া আসা করতে পারে। ইলেক্ট্রনিক​ মিডিয়ার লোকদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু স্থান নির্ধারণ প্রযোজন। পুরোটা মেলা জুড়ে যদি তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন তাহলে পাঠকদের বই পছন্দ করতে, ঘুরতে অসুবিধা হয়। লেখকদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করা দরকার। কিছু ব্যবস্থা করা হয় আমরা জানি। কিন্তু সে জায়গাগুলি প্রায়শই অন্যলোকেরা দখল করে রাখে ।
মেলার বাইরে রাস্তার পুরোটা জুড়ে বারোয়ারি জিনিসের মেলা বসে। এটা মোটেও অভিপ্রেত​ নয়। এতে বইমেলার মেজাজটাই ক্ষুন্ন হয়। তাছাড়া স্বচ্ছন্দে হাঁটতে চলতেও অসুবিধা হয়। গাড়ি পার্কিংএর ব্যাপারটাও গুরুত্বের​ সাথে দেখা দরকার।
মেলা মঞ্চে মানসম্মত অনুষ্ঠান আমরা চাই। চাই সে অনুষ্ঠানগুলিতে যেন শুধু চেনা মুখই স্থান না পায়। নতুন আর সম্ভবনাময়দের যেন সুযোগ দেয়া হয়।
সবচেয়ে বেশি চাই পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা । আর কোন লেখক পাঠকের যেন অপঘাতে মৃত্যু না হয় সেটা কর্তৃপক্ষের দেখা জরুরি।

Author: রক্তবীজ ডেস্ক

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts