প্রিন্সেস লেয়া ও আমার ছেলেবেলা

 

স্টার ওয়ারস ফ্রানসচাইজের অষ্টম ছবি ‘রোগ ওয়ান: এ স্টার ওয়ারস স্টোরি’ এর অর্ধেক পর্যন্ত দেখেছি বহু কষ্টে, আর সহ্য হচ্ছে না। শুধু স্টার ওয়ারস এর ফ্যান বলে আর প্রবীণ নির্মাতা জর্জ লুকাসের সম্মানার্থে এতক্ষণ স্ক্রিনের সামনে বসেছিলাম। কিন্তু আর সম্ভব না। ‘দ্যা ফোরস এওয়েকেনস’এর পরিচালক জে জে এব্রাহামকে গতবছরই গালিগালাজ করা হয়ে গেছে ফিল্ম একাডেমির সবাইকে নিয়ে। এবার গ্যারেথ এডওয়ার্ডসের পরিচালক: ‘রোগ ওয়ান: এ স্টার ওয়ারস স্টোরি’এর পালা। ঠিক করে ফেলেছি রাগ করে বিশাল বড় একটা ইমেইল লিখবো তাকে। জর্জ লুকাসকেও লিখবো যে কিভাবে আপনার অদ্ভুত সুন্দর সৃষ্টিকে এরা ধ্বংস করে ফেলছে। গ্যারেথ এডওয়ার্ডস এর ইমেইল খুঁজে বের করতে যেয়ে চোখে পড়ল, সে একইসাথে পরিচালক, চিত্রগ্রাহক, স্ক্রিনরাইটার, প্রডাকশন ডিজাইনার এবং ভিজ্যুায়াল এফেক্টস আর্টিস্ট। বুঝলাম ফিল্মটা কেন এত বাজে হয়েছে। এদের গালিগালাজ করেও লাভ নেই, শুধুই সময় নষ্ট। হতাশ হয়ে ফোনটা হাতে নিতেই চোখে পড়ল, স্টার ওয়ার্সের রেবেলিয়ান প্রিন্সেস লেয়া অরগ্যানা ‘ক্যারি ফিসার’ মৃত্যুবরণ করেছেন।

সারা জীবন আমার একটা প্রশ্ন ছিল, কেউ মৃত্যুবরণ করলে তার সম্মানার্থে জোর করে নিরবতা পালন করা হয় কেন? উত্তর পেয়ে গেলাম। আসলে ভাললাগা মানুষের মৃত্যুতে আমরা নিস্তেজ হয়ে পড়ি। সব রাগ কোথায় যেন গায়েব হয়ে গেল। প্রায় ৩০ মিনিট অস্বস্তিকর নিরবতার মধ্য দিয়ে আমার ছেলেবেলা ঘুরে এলাম। স্টার ওয়ারস কর্র্তৃক ১৯৭৭ সালে নির্মিত ‘ জর্জ লুকাস’, আরভীন কারসার কর্তৃক ১৯৮০ সালে নির্মিত ‘দ্যা এম্প্যায়ার স্ট্রাইকস ব্যাক’ রিচার্ড মার্কওয়াল্ড কর্তৃক ১৯৮৩ সালে নির্মিত ‘রিটার্ন অফ দ্যা জেডাই’ এর কথা একে একে মনে পড়তে থাকল। এই সবকটি সিনেমা আমার জন্মের আগে নির্মিত। মনে পড়তে লাগল, জর্জ লুকাসের সৃষ্ট অদ্ভুত সব চরিত্র, আর খুবই সীমিত প্রযুক্তিতে তার অসাধারণ বাস্তবায়ন।
প্রিন্সেস লেয়া অরগ্যানা, আমার সেই ছোট্টবেলার দেখা সর্বপ্রথম সিনেমার রাজকুমারি। তিনি ‘সিথ লর্ড প্যালপেটিনের গ্যালাকটিক এ্যামপায়ারকে’ পরাজিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে ‘রেবেলিয়ান বাহিনী’ সংগঠিত করেন। অস্ত্র হাতে লড়াই করেন পৃথিবীর সর্বসেরা ভিলেন চরিত্রদের একজন বিখ্যাত ‘ডার্থ ভেডার’ (প্রিন্সেস লেয়া আর লুক স্কাইওয়াকারের বাবা) এর বিরুদ্ধে। তার সঙ্গি ছিলেন হ্যান সোলো, চুবাকা আর লুক স্কাইওয়াকার। চরিত্রগুলোতে যথাক্রমে রূপদান করেছিলেন হ্যারিসন ফোর্ড, পিটার ম্যাথিউ আর মার্ক হ্যামেল। তাদের সাথে নিয়ে ধ্বংস করেন ‘গ্যালাকটিক সুপার ওয়েপন ডিথ স্টার’; ইম্পেরিয়াল সিনেটে ফিরিয়ে আনেন শান্তি।
আর এ সব ঘটনার দীর্ঘ ৩২ বছর পর ২০১৫ সালে তিনি আবারো ফিরে আসেন ‘দ্যা ফোরস এওকেনস’ নিয়ে । যখন রেন আর হ্যান সোলোর ছেলে, বেন সোলো বা কায়লো রেন ব্রক্ষান্ডের নতুন শত্রু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। একবছর আগে সিনেমার নিজের ছেলের হাতে নিহত হন হ্যান সোলো । অবশ্য স্টার ওয়ারসএ এটা কমন বিষয়। এর আগে এ্যানাকিন স্কাইওয়াকার বা ডার্থ ভেডারকে তার ছেলে লুক স্কাইওয়াকার হত্যা করে ব্রক্ষান্ডে শান্তি আনে। আর এ বছর বাস্তবেই মৃত্যুবরণ করেন প্রিন্সেস লেয়া চরিত্রে রূপদান কারী ক্যারি ফিসার।

এলোমেলো অনেক চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকে। মনে পড়ে যায় নর্থ হলিউডে আমার রুমমেট ‘এরিক কার্লসনে’র কথা । যার সাথে গত দেড় বছরে আমার মাত্র ১০/১৫ দিন কথা হয়েছে (আমার ধারনা সে আমাকে ভয় পেত)। একদিন আমরা দুজনেই দু:খ প্রকাশ করছিলাম যে, যাদের অভিনয় দেখে বড় হয়েছি, যেভাবে তারা একের পর এক মারা যাচ্ছেন, তাতে আমরা কি আদৌ সুযোগ পাবো তাদের নিয়ে কাজ করার? কথায় কথায় এরিক বলেছিল, ওর স্বপ্ন ‘ক্যারি ফিসার’কে নিয়ে সিনেমা করার । একটা স্ত্রিপ্ট লিখছিল সে। গতবছর অনেকগুলো শক্তিমান অভিনেতার মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়েছিল। ফেসবুকে লিখেছিল দু:খের কথা। এবার সাহসই করে নি ফেসবুকে বসার। ফোন, ইমেইল কোন কিছুতেই উত্তর না পেয়ে ওর মাকে ফোন করে জানলাম, ক্রিসমাসের ছুটিতে সে বাড়ি গিয়ে আর ফেরেনি। বেচারা অনেকদিন ঘর ছেড়ে বের হচ্ছে না। গত বছর ওর শর্ট ফিল্ম ‘ওয়ান নাইট এট দ্যা মুভিস’ থেকে পাওয়া অনেকগুলি পুরস্কার জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
‘ক্যারি ফিসার’ তো আমার বা এরিকের আপনজন নন, তাহলে কেন এভাবে এরিক কাঁদছে! আমিই বা কেন পুরানো স্মৃতির গোলকধাঁধাঁয় ঘুরে মরছি! আসলে ক্যারি ফিসার বা প্রিন্সেস লেয়া ছিল অনেকগুলি প্রজন্মের বড় হয়ে ওঠার গল্প। অনেকের উদ্ভট কল্পনা, বিশ্বব্যাপী নারীদের অনুপ্রেরণা, অনেক ছেলের আজগুবী প্রেম, অনেক অভিনেতার ঈর্ষার কারণ আর আমার মত অনেকের জন্য সাইন্স ফিকশন গল্প প্রেমিক হবার প্রথম ধাপ। এসব ভাবতে ভাবতেই অসংখ্য স্ট্যাটাস, টুইট, ছবি, ভিডিও চোখে পড়তে থাকল। ক্যারি ফিসারের মৃত্যু শুধু আমাকে আর এরিককেই ভোগায় নি, সমগ্র সোশ্যাল মিডিয়াকে তোলপাড় করে দিয়েছে।

আচ্ছা আমরা দূরের লোকরাই যদি এতটা কষ্ট পাই তাহলে কাছের লোকদের কি অবস্থা? তার কলিগ মার্ক হ্যামেল, হ্যান সোলো, চুবাকা, ডার্থ ভেডার? তার চেয়ে বড় কথা এই চরিত্রের স্রষ্টা জর্জ লুকাস?
যার কথা চিন্তাই করিনি তার লেখাই সবার আগে চোখে পড়ল। স্টিফেন স্পিলবার্গ। জর্জ লুকাস, ক্যারি ফিসার, হ্যারিসন ফোর্ড সবাই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৯৮০ সালে তিনি ক্যারি ফিসারকে নিয়ে করেছিলেন ‘ব্লুস ব্রদারস’ ফিল্মটি। স্পিলবার্গ স্বপ্ন দেখতেন, জেমস বন্ড এর একটি ফিল্ম পরিচালনা করার। সেই স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় জর্জ লুকাস তার জন্য লিখে দেন ‘ইন্ডিয়ানা জোনস, রাইডারস অফ দা লস্ট আর্ক’। যা তিনি ১৯৮১ সালে নির্মাণ করেন হ্যারিসন ফোর্ডকে নিয়ে। তিনি বলেছেন:
I have always stood in awe of Carrie. “Her observations always made me laugh and gasp at the same time. She didn’t need The Force. “She was a force of nature, of loyalty and of friendship. I will miss her very much.”
ক্যারি ফিসারের মৃত্যুতে হলিউডের দুই বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা বন্ধু জর্জ লুকাস আর স্টিফেন স্পিলবার্গ বলেন, আমরা একজন প্রতিভাশালী অভিনেতা আর অসাধারণ বন্ধু হারিয়েছি।
জর্জ লুকাসের বিবৃতিতে:
“Carrie and I have been friends most of our adult lives, she was extremely smart; a talented actress, writer and comedienne with a very colorful personality that everyone loved. In Star Wars she was our great and powerful princess — feisty, wise and full of hope in a role that was more difficult than most people might think. My heart and prayers are with Billie, Debbie and all Carrie’s family, friends and fans. She will be missed by all.”
স্পিলবার্গ-লুকাস শেষ করে আমি এখন স্টার ওয়ারস ফ্রানচাইজ অভিনেতাদের প্রফাইল ঘাটছি। সাধারণত হলিউডে কেউ মৃত্যুবরণ করলে তার জীবনের ভাল-মন্দ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ক্যারি ফিসার এখনো বিতর্কের উর্দ্ধে।
ক্যারির দীর্ঘদিনের কলিগ হ্যারিসন ফোর্ড টুইটে বলেছেন:
“Carrie was one-of-a-kind…brilliant, original. Funny and emotionally fearless, “She lived her life, bravely…My thoughts are with her daughter Billie, her mother Debbie, her brother Todd, and her many friends. We will all miss her.”
আর অদ্ভুত সেই গরিলার মত ব্যক্তি চুবাকা (পিটার ম্যাথিউস)?
“Carrie was the brightest light in every room she entered. I will miss her dearly.”

লান্ডো কারসিয়ান লিখেছেন (বিলি ডে উইলিয়ামস):
I’m deeply saddened at the news of Carrie’s passing. She was a dear friend, whom I greatly respected and admired. The force is dark today!

ডার্থ ভেডার লিখেছেন (ডেভ প্রোস):
I am extremely sad to learn of Carrie’s passing. She was wonderful to work with. Condolences to her friends, family & fans around the world.
গোয়েন্ডোলিন ক্রিস্টি (ক্যাপ্টেন প্যাম্পাস):
We’ve lost our Princess.

লুক স্কাইওয়াকার (মার্ক হ্যামেল) তার প্রফাইলে দিয়েছেন লুক ও লেয়ার একটি সাদাকালো ছবি যার নীচে লেখা:
No words. #Devastated.

 

আমিও ছেলেবেলা থেকে তার গভীর অনুরাগী । স্বপ্ন দেখতাম নির্মাতা হবার আর ক্যারি ফিসারকে নিয়ে ছবি বানাবার। হলো না।
আমি কোন বড় পরিচালক নই। তবু স্বপ্নভঙ্গ হলো আমারও।
তাই মার্ক হ্যামেলের কন্ঠে কন্ঠ মিলেয়ে বলছি, No words. #Devastated.

Author: পান্থ রহমান

Director/Director of Photography at Steadfast

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

2 thoughts on “প্রিন্সেস লেয়া ও আমার ছেলেবেলা

  1. Masud Rana

    ফেইসবুকের কল্যাণে ক’দিন ধরেই দেখছিলাম ‘রক্তবীজ’ নামে একটি ওয়েব পোর্টাল আসছে। পয়লা জানুয়ারি যাত্রা শুরু হলেও আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ১০ জানুয়ারি। ‘রক্তবীজ’র আত্মপ্রকাশের খবরটি ফেইসবুকে দেখার সাথে সাথে জরুরী কাজের ফাঁকেই ঢুকে পড়লাম ‘রক্তবীজ’-এ। এর ডাইনামিক ওয়েবপেইজটি দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না। যিনি ওয়েবপেইজটি করেছেন সেই পান্থ রহমান নিজের কাজ নিয়েই অত্যন্ত ব্যস্ত। তার সেই ব্যস্ততার ভেতর দিয়েও অতি অল্প সময়ে যে ডিজাইনটি করেছেন তার জন্য তাকে অভিনন্দন।
    সম্পাদককে ব্যক্তিগতভাবে যতোদূর জানি তিনি একজন বড় মাপের লেখক বটে কিন্তু তিনি পত্রিকা বা মিডিয়ার লোক নন। তবুও পোর্টালটির প্রথম সংখ্যাতেই তিনি সম্পাদনায় যে দক্ষতার সাক্ষর রেখেছেন সেজন্য তাকে স্যালুট করতে হয়। অনেক প্রাজ্ঞ সম্পাদক ঈর্ষান্বিত হবেন তার এই সম্পাদনা দেখে। প্রথম সংখ্যা বলেই হয়তো তিনি পরিসরটা একটু ছোট করে ছেড়েছেন। তারপরও বিষয় নির্বাচন, লেখার বিন্যাস খুবই চমৎকার হয়েছে।
    ‘রক্তবীজ’ আজকের দিনে আত্মপ্রকাশ করলেও এর যাত্রা শুরু হয়েছে আজ থেকে চার দশক আগে এটা সম্পাদকীয়তে তিনি উল্লেখ করেছেন। তবে মাঝে মাঝে বিরতি ঘটার কথা তিনি বললেও আশা করবো এবার আর বিরতি ঘটবে না। অনাদিকালের যাত্রাপথে এগিয়ে যাবে ‘রক্তবীজ’ আপন মহিমায়, আপন কক্ষপথে সেই প্রত্যাশা রইলো।
    আগেই বলেছি বিষয় নির্বাচনে সম্পাদক পরিপক্কতা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। উদাহরণত বলা যেতে পারে জালাল উদ্দিন রুমির একটি কবিতার অনুবাদ (ইংরেজি সহ), একটি ঢাকাইয়া ভাষার কবিতা ছাড়াও নানা বিষয় স্থান পেয়েছে এই ক্ষুদ্র পরিসরে; যাতে পোর্টালটি বহুমাত্রিক পাঠকের উপযোগী হয়ে ওঠেছে বলে আমি মনে করি।
    পরিতাপের সাথে বলতে হয় ইচ্ছে থাকা সত্বেও পোর্টালটির প্রথম সংখ্যায় আমি একটি লেখা দিতে পারিনি এটা আমার জন্য খুবই বেদনার। ‘রক্তবীজ’ একদিন ইতিহাস হবে; কিন্তু সেই ইতিহাসের সূচনালগ্নে আমার সম্পৃক্ততা ছিলো এই অহঙ্কারের দাবীটি করার সুযোগ আর আমার থাকলো না। তবু বেদনা ভুলে পরবর্তী সংখ্যা থেকে আমিও লেখা দিয়ে ‘রক্তবীজ’র মহাসড়কে সহযাত্রী হবো সে আশা করছি।

  2. Farhana Jamil

    bhalo likesen. star wars dakhini tobe lekhata porar por theke dakte iche korse.