চার্লি চ্যাপলিনের কফিন চুরি

১৯৭৭ সালের শুরু থেকেই কিংবদন্তি অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। ১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বরে চার্লি প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান সুইজারল্যান্ডের কার্সিয়ারে। ওই দেশের ডিঙ্গিতে চার্লির শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এরপর ঘটে একটা দুর্ঘটনা। পরের বছর চার্লির মৃতদেহ চুরি হয়ে যায়। ১৬ দিন পর তা উদ্ধার করে আবার সমাহিত করা হয় । আজ সেই কফিন চুরির দিন​।

 

পরিচ​য়​
চার্লি চ্যাপলিন একজন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র অভিনেতা। হলিউড সিনেমার প্রথম থেকে মধ্যকালের বিখ্যাততম শিল্পী চ্যাপলিন পৃথিবী-বিখ্যাত একজন চলচ্চিত্র পরিচালকও। চ্যাপলিনকে চলচ্চিত্রের পর্দায় শ্রেষ্ঠতম মূকাভিনেতা ও কৌতুকাভিনেতাদের একজন বলেও উল্লেখ করা হয়।

জন্ম শৈশব
১৮৮৯ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন ফিল্মের জন্য ক্যামেরা আবিষ্কার করলেন। পৃথিবীজুড়ে হৈ হৈ শুরু হয়ে গেল। একই বছরে অস্ট্রিয়ায় জন্ম নিলেন পৃথিবীর নির্মম ঘাতক হিটলার। সে বছরেরই ১৬ এপ্রিল লন্ডনে আরেক শিশু জন্ম নেয়, যে কিনা পৃথিবীর মানুষকে হাসাতে হাসাতে লুটোপুটি খাইয়ে ইতিহাসের সেরা কৌতুক অভিনেতা এবং নির্মাতা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সেই মানুষটির নাম ‘চার্লি চ্যাপলিন’।

 

তার পুরো নাম স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন জুনিয়র। যদিও তার জন্মতারিখ নিয়ে কিছুটা সন্দেহ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ এ বিষয়ক নির্দিষ্ট কোনো দলিল-দস্তাবেজ উদ্ধার হয়নি। এমনকি জন্মস্থান নিয়েও রয়ে গেছে সন্দেহ। তিনি নিজেও ফ্রান্সকে তার জন্মস্থান হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ১৮৯১ সালের স্থানীয় আদমশুমারি থেকে জানা যায়, চার্লি তার মা হান্না চ্যাপলিন এবং ভাই সিডনির সঙ্গে দক্ষিণ লন্ডনের বার্লো স্ট্রিটে থাকতেন, এটি কেনিংটনের অন্তর্গত। ইতিমধ্যে তার বাবা চার্লস চ্যাপলিন জুনিয়রের সঙ্গে তার মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। চ্যাপলিনের শৈশব কাটে প্রচণ্ড দারিদ্র্য আর কষ্টের মধ্য দিয়ে। আর তাই হয়তো তিনি উপলব্ধি করতেন দেয়া ও পাওয়াতে যে কি আনন্দ! তিনি একটা কথা প্রায়ই বলতেন যে বৃষ্টিতে হাঁটা খুবই ভালো। কারণ এ সময়ে কেউ তোমার চোখের জল দেখতে পাবে না।

 

বাল্যকালের কষ্ট
পিতৃহারা চ্যাপলিন অবর্ণনীয় কষ্ট ও দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছেন। শৈশব সম্পর্কে চার্লি চ্যাপলিন বলেন, যদি ভাগ্য সহায় না হতো, তাহলে আমি লন্ডনের পথে পথে চুরি করে বেড়াতাম। আর, বেওয়ারিশ লাশ হয়ে কবরে যেতে হতো। মা ও ভাইয়ের সঙ্গে দক্ষিণ লন্ডনের একটি শহরে বিভিন্ন বাড়িতে ভাড়া থাকতেন চ্যাপলিন। ভাড়া দিতে না পারায় প্রায়ই তাদের বাসা থেকে বের করে দেয়া হতো। এভাবে তাড়া খাওয়ার চেয়ে চ্যাপলিন পার্কের বেঞ্চিতে ঘুমাতেই বেশি পছন্দ করতেন।
চার্লি একটি মুদির দোকানেও কিছুদিন কাজ করেছিলেন। সেখানে কাজ চলে যাওয়ার পর কাজ নিয়েছিলেন একটি ডাক্তারখানায়। সেখানে কাজ চলে যাওয়ার পর লোকের বাড়িতে বাসন মাজার কাজে লেগে যান চার্লি। এক কাচের কারখানা, রঙের দোকান, লোহার দোকান, ছাপাখানা, খেলনা কারখানা, কাঠ চেরাই কল, কাগজ বিক্রি ইত্যাদি নানা কাজের মধ্যে তিনি যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন।

সম্ভাবনার হাতছানি
তার মা-বাবা দু’জনেই মঞ্চাভিনয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাই এ পেশাতে আসা তার কাছে সহজ ছিল। চ্যাপলিন সেই সময়ের জনপ্রিয় লোকদল ‘জ্যাকসন্স এইট ল্যাঙ্কাশায়ার ল্যাডস’-এর সদস্য হিসেবে নানা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এরপর ১৪ বছর বয়সে তিনি উইলিয়াম জিলেট অভিনীত শার্লক হোমস নাটকে কাগজওয়ালার চরিত্রে অভিনয় করেন। এ সুবাদে তিনি ব্রিটেনের নানা প্রদেশ ভ্রমণ করেন ও অভিনেতা হিসেবে তিনি যে খুবই সম্ভাবনাময়- তা সবাইকে জানিয়ে দেন।

অভিনয় জীবনের শুরু
১৮৯৮ সালে ৯ বছর বয়সে চ্যাপলিন একটি নাচের দলে যোগ দেন। ওই দলটির সঙ্গে যুক্ত থেকে নাচ দেখিয়ে কিছু অর্থ-কড়ি রোজগার করতেন। সেই রোজগার দিয়েই চ্যাপলিন দিন কাটাতেন। ওই নাচের দলে চ্যাপলিন কমেডিয়ানের ভূমিকা পালন করতেন।

১৯ বছর বয়সে ‘ফ্রেড কার্নো’ থিয়েটার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ইংল্যান্ড থেকে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯১৪ সালে ২৫ বছর বয়সে প্রথম সিনেমাতে অভিনয় করেন চার্লি চ্যাপলিন। নাম ছিল ‘মেকিং এ লিভিং’। ছবির পরিচালক ছিলেন ফ্রান্সের অরি লোর্মা। এক রিলের এ ছবিটি প্রদর্শনের মেয়াদ ছিল মাত্র দশ মিনিট। এ ছবিতে চার্লি অভিনয় করেন খামখেয়ালি উচ্ছৃংখল প্রকৃতির যুবকের চরিত্রে।

দ্য ট্রাম্প এবং
১৯১৪ সালে তার নিজের সৃষ্ট দ্য ট্রাম্প বা ভবঘুরে চরিত্রটি দিয়ে তিনি বিশ্ব চলচ্চিত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে মানুষকে হাসানোর মতো দুরূহ কাজটি শুধু অঙ্গভঙ্গি দিয়ে যিনি করতেন অত্যন্ত সফলভাবে। সাদাসিধে ভবঘুরে একটা মানুষ, যার পরনে নোংরা ঢিলেঢালা প্যান্ট, শরীরে জড়ানো জীর্ণ কালো কোট, পায়ে মাপহীন জুতো, মাথায় কালো মতো হ্যাট আর হাতে লাঠি। যে ব্যাপারটি কারও চোখ এড়ায় না তা হচ্ছে লোকটির অদ্ভুত গোঁফ। তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন আর ঘটাচ্ছেন অদ্ভুত সব কাণ্ড-কারখানা। আর এসব দেখেই হেসে কুটিকুটি হচ্ছেন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ।

মজার তথ্য
চার্লি চ্যাপলিন তখন পৃথিবী-বিখ্যাত। তার অনুকরণে অভিনয়ের একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হল। গোপনে চার্লি চ্যাপলিনও নাম দিলেন। প্রতিযোগিতাও হয়ে গেল। ১ম ও ২য় যারা হলেন তাদের নাম ঘোষণা করা হল। আর মজার কথা হল চার্লি চ্যাপলিন এখানে ৩য় হন।

চ্যাপলিনের ঘরসংসার
বিয়ে নিয়ে চার্লি চ্যাপলিনের জীবনে রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। ১৯১৮ সালে মিলড্রেড হ্যারিসকে প্রথম বিয়ে করেন চার্লি চ্যাপলিন। ১৯২০ সালে তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে যায়। প্রথম বিবাহ বিচ্ছেদের পর ১৯২৪ সালে বিয়ে করেন ১৬ বছর বয়সী উঠতি অভিনেত্রী লিটা গ্রে’কে। বিয়ের পরপরই তাদের সম্পর্কে অবনতি ঘটতে থাকে। দাম্পত্য জীবনে বাড়তে থাকে তিক্ততা। বিয়ের প্রায় তিন বছর পর দশ লাখ ডলারের সমঝোতায় চার্লি চ্যাপলিন ও লিটা গ্রে’র মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ১৯৩৬ সালে বিয়ে করেন পোলেট গোদাকে। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪২ পর্যন্ত টেকে তাদের বিয়ে। ১৯৪৩ সালে উনা ও-নিল এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন চ্যাপলিন। জীবনের বাকিটা সময় উনা ও-নিল এর সঙ্গেই কাটিয়েছেন চ্যাপলিন।

 

চার্লি চ্যাপলিন আইনস্টাইনের সাক্ষাৎ
অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের যখন দেখা হল তখন আইনস্টাইন চ্যাপলিনকে বললেন- আপনাকে আমি যে কারণে খুব পছন্দ করি সেটা হল আপনার বিশ্বজনীন ভাষা। আপনি যখন অভিনয় করেন, তখন আপনি হয়তো কোনো সংলাপই বলছেন না, কিন্তু সারা পৃথিবীর মানুষ ঠিক বুঝতে পারছে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন এবং তারা সে জন্য আপনাকে অসম্ভব ভালোও বাসে। উত্তরে চার্লি চ্যাপলিন বললেন- ড. আইনস্টাইন, আপনাকে আমি তার চেয়েও বড় কারণে পছন্দ করি। আপনার থিওরি অব রিলেটিভিটিসহ অন্যান্য গবেষণার বিন্দুবিসর্গ কেউ বোঝে না, তবুও গোটা পৃথিবীর মানুষ আপনাকে শ্রদ্ধা করে।

নানা প্রসঙ্গে তার বিখ্যাত কিছু উক্তি
তিনি তার শৈশব সম্পর্কে বলতেন, ‘আমার শৈশব ছিল অত্যন্ত কষ্টের। কিন্তু এখন তা আমার কাছে নস্টালজিয়া, অনেকটা স্বপ্নের মতো।’

মানুষের জীবন সম্পর্কে তিনি বলতেন, ‘মানুষের জীবন ক্লোজ শটে দেখলে ট্র্যাজেডি, কিন্তু লং শটে সেটাই কমেডি।’ নির্বাক চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি সবাক চলচ্চিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শব্দ খুবই দুর্বল। ওটাকে ‘হাতি’র চেয়ে বড় কিছুই বলা যায় না।’ আর এই কমেডিয়ানের শ্রেষ্ঠ উক্তি সম্ভবত এটাই- ‘না হেসে একটা দিন পার করা মানে একটা দিন নষ্ট করা।

চ্যাপলিনের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
মেকিং অব লিভিং (১৯১৪), দ্য ট্রাম্প (১৯১৪), কিড অটো রেসেস অ্যাট ভেনিস (১৯১৫), এ ডগস লাইফ (১৯১৭), শোল্ডার আর্মস (১৯১৮), দ্য কিড (১৯২১), দ্য সার্কাস (১৯২৬), সিটি লাইটস (১৯৩১), মডার্ন টাইমস (১৯৩৬), দ্য গ্রেট ডিক্টেটর (১৯৪০), দ্য গোল্ড রাশ (১৯৪২), লাইম লাইট (১৯৫২), এ কিং অব নিউইয়র্ক (১৯৫৭) প্রভৃতি। সিটি লাইট ১৯৩১ সালে নির্মিত একটি নির্বাক হাস্যরসাত্মক প্রেমের ছবি। এ ছবিটি চার্লি চ্যাপলিনের কাহিনী, পরিচালনা ও প্রযোজনায় নির্মিত। এটি কমেডি-রোমান্টিক ছবির ক্যাটাগরিতে আজও এক নম্বর স্থান দখল করে আছে।

হাস্যরসের মধ্য দিয়ে চ্যাপলিনের চলচ্চিত্রে উঠে এসেছিল সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতিসহ তৎকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক সমস্যা, দুটি বিশ্বযুদ্ধ, হিটলারের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, জাতীয়তাবাদ, মানবাধিকারসহ নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়বস্তু। প্রতিটি চলচ্চিত্রেই স্যার চ্যাপলিন কোনো না কোনো বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন এবং তিনি সেটা করেছিলেন তার চিরচেনা দ্য ট্রাম্প স্টাইলে। বিশেষ করে বিভিন্ন ছবিতে তার রাজনৈতিক জ্ঞানের যে পরিস্ফুটন দেখা যেত তা ছিল সত্যিই অসাধারণ।

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment