ইকেবানা: ঈশ্বর, মাটি ও মানুষ

প্রকৃতির রূপের মুগ্ধতা থেকে মানুষের শিল্পবোধের উন্মেষ। নিবিড় ঘন অরণ্যের সমাহার, অবারিত ঢেউয়ের মতো পাহাড়ের সারি,সবুজ ঘাসে ছাওয়া মাঠ,অপরূপ সব বর্ণময় পুষ্পের প্রতি মানুষের এক  সহজাত ও চিরন্তন আকর্ষণ।

কবির ভাষায় বলা যায়-

ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি বনের পথে যেতে
ফুলের গন্ধে চমক লেগে উঠেছে প্রাণ​ মেতে
ছড়িয়ে আছে আনন্দেরই দান
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার…

অপরিসীম এই সৌন্দর্য সৃষ্টির যিনি স্রষ্টা সম্ভ্রমে তাঁর প্রতি মানুষের মাথা আপনা থেকেই নুয়ে আসে।
স্রষ্টার এই সৃষ্টি থেকেই মানুষের ভেতরেও একসময় জন্ম নিলো শিল্পসৃষ্টির  অনন্য প্রেরণা।

শিল্পসৃষ্টির এই প্রেরণা থেকেই পুষ্প বিন্যাস। আর এই বিন্যাস করতে গিয়ে নিবিড়ভাবে প্রকৃতিকে লক্ষ্য করে মানুষ উপলব্ধি করল,  গাছের ডাল বা ফুলের বিচিত্র সব মোহনীয় ভঙ্গিমা।প্রকৃতির এই ভংগিমাকে অনুসরণ থেকেই ‘ইকেবানা’ নামের পুষ্পবিন্যাসের সৃষ্টি।

এই পুষ্পবিন্যাস কোন সাধারণ​ পুষ্পবিন্যাস নয়। পৃথিবীর সমস্ত পুস্পবিন্যাসের রীতিকে তাই ম্লান করে দিয়ে ইকেবানা  এনেছে  চরম উৎকর্ষ ও ভিন্নধর্মিতা  

ইকেবানা একটি জাপানী শব্দ।
জাপানে শত শত বছরে সহস্র ইকেবানা শিল্পীর চর্চার​ ফসল এই পুষ্পবিন্যাস।  এই শব্দের সঠিক অর্থ বাংলায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এটুকু বলা যায়, ইকেবানা এক জীবন্ত শিল্পকলা।শৈল্পিক দিক ছাড়াও  এই পুষ্পবিন্যাসে রয়েছে  আধ্যাত্মিক অনুভূতির এক চমৎকার  প্রকাশ বা বিশেষ  দর্শন। জাপানের বৌদ্ধ সন্যাসীরা এই দর্শনের উদ্ভব করেন।  পুষ্পপাত্রে তিনটি স্তর রচনা করে বৌদ্ধ সন্যাসীরা এই পুষ্পবিন্যাস রচনা করতেন।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও দীর্ঘ ডাল বা ফুলটি ঈশ্বর বা স্বর্গের প্রতীক। দ্বিতীয় স্তরটি মানুষের প্রতীক আর তৃতীয় স্তরের প্রতীক হচ্ছে মাটি। পবিত্রতার প্রতীক ফুল ও ফুলের ডাল দিয়ে জাপানীরা এইভাবেই সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে থাকেন। এই বিন্যাস ক্রমশ এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করলো যে, একসময়ে আর মন্দিরে সীমাবদ্ধ  রইলো না।  মানুষ তা ভালোবেসে নিজের ঘরে সাজানো শুরু করলো। বর্তমানে যদিও বৌদ্ধ সন্যাসীদের রীতিনীতি অনেক শিথিল করে ঘরে সাজানো হয়, তবে মূল তিনটি স্তরকে অনুসরণ করেই তা করা হয়।

তবে ইকেবানার এই পদ্ধতিগত পুষ্পবিন্যাসে শিল্পী সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন। এই বিন্যাসের আসল রূপের অবগুন্ঠন   উন্মোচন হয় তখনই যখন একজন ইকেবানা শিল্পী পদ্ধতিগত রূপের মুল ভাব বজায় রেখেই তাতে স্বাতন্ত্র্য  রচনা করেন। স্বাতন্ত্র্যতার এই পর্যায়ে শিল্পী রূপ থেকে অরূপে প্রবেশ করেন।শিল্পীর এই শিল্পবোধের প্রেরণা আসে অতীন্দ্রিয়ের আভাস থেকে। যে শিল্পী এই অতীন্দ্রিয়ের আভাস পান না তাঁর পক্ষে এই শিল্পের কিছু কলা-কৌশল আয়ত্ব করা হয় মাত্র, প্রকৃত শিল্পের রূপ প্রকাশ করা কখনোই সম্ভব হয় না।  

Author: অনুপা দেওয়ানজী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts