জর্জ হ্যারিসন ও কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

আজ জর্জ হ্যারিসনের জন্মদিন। শুভ জন্মদিন। আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তিভূমি প্রিয় জন্মভূাম বাংলাদেশ। আর এই বাংলাদেশ বিনির্মাণে দেশি মানুষের সাথে যোগ দিয়েছিলের অনেক বিদেশি । নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন বিশ্ব জনমত গড়তে, সাহায্য করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় । তাদেরই একজন জর্জ হ্যারিসন । আজ তার জন্মদিন।

১৫ ফেব্রয়ারি  ১৯৪৩ সাল, যুক্তরজ্যে আজকের দিনে জন্সগ্রহণ করেন জর্জ হ্যারিসন । বিংশ শতাব্দীর অত্যন্ত প্রতিভাবান একজন জনপ্রিয় গায়ক এবং গিটারিস্ট তিনি। প্রয়াত হন ১৯ নভেম্বর , ২০০১ সালে।  তাঁর প্রতিভা কেবলমাত্র এ দু’য়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর বিচরণের ক্ষেত্র ব্যাপ্ত ছিল সঙ্গীত পরিচালনা, রেকর্ড প্রযোজনা এবং চলচ্চিত্র প্রযোজনা অবধি। বিখ্যাত ব্যান্ড সঙ্গীত দল দ্য বিটল্‌স এর চার সদস্যের একজন হিসেবেই তিনি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন।

মূলত: লীড গিটারিস্ট হলেও বিটলসের প্রতিটি এলবামেই জর্জ হ্যারিসনের নিজের লেখা ও সুর দেয়া দু’একটি একক গান থাকতো  ।  বিটলস্ এর হয়ে এ সময়ের গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল-

ইফ আই নিডেড সামওয়ান, ট্যাক্সম্যান,হোয়াইল মাই গীটার জেন্টলী উইপস্,হেয়ার কামস্ দ্য সান এবং সামথিং

বিটলস্ ভেঙ্গে যাবার পরও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি। সত্তুরের পরবর্তী সময়ে তাঁর অনেক গান প্রচন্ড জনপ্রিয় হয়েছিল। এ সময় কালের গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মাই সুইট লর্ড (১৯৭০),গিভ মি পিস অন আর্থ (১৯৭৩),অল দোজ ইয়ার্স এগো (১৯৮১),গট মাই মাইন্ড সেট অন ইউ (১৯৮৭)।

পপ সঙ্গীতের জনপ্রিয় ইংল্যান্ডের এই শিল্পী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পন্ডিত রবি শংকরের অনুরোধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে ১৯৭১ সালের ১লা আগষ্টে এক বেনিফিট সঙ্গীত অনুষ্ঠানের কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আয়োজন করেছিলেন। এই কনসার্ট হতে সংগৃহীত ২,৫০,০০০ ডলার বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের জন্য দেয়া হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন জর্জ হ্যারিসন।  কনসার্টে তার  গাওয়া শেষ গান ছিল ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’। যা হাজার বার   শোনার পর আজও আমাদের মনে দোলা দেয়। স্মরণে আসে  মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই সব স্মৃতি। মনে পড়ে যুদ্ধের ভয়াবহতা আর গৌরবের কথা। ভাই হারানোর বেদনা, সম্ভ্রম হারানোর কষ্ট আর নতুন দেশ পাবার আনন্দের কথা। তাই হ্যারিসনকে আমরা প্রতিটি বাঙালি ভালবাসি অন্তরের গভীর তলদেশ থেকে।

বাংলাদেশের  গণহত্যা  আর মানুষের যাতনা তাঁর অন্তরকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।

কনসার্টটি করতে গিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল জর্জ হ্যারিসনের। আর এই সম্পর্কের পেছনে গভীর যোগ ছিল পন্ডিত রবিশঙ্করের। হ্যারিসন ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে রবিশঙ্করের কাছে সেতারবাদন শিখতে শুরু করেন। একই সঙ্গে যোগসাধনাও করেছেন। ভারতে এসেছেন বেশ কয়েকবার। ভারতীয় দর্শন  তাকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু ১৯৬৮ সালে এসে জর্জ বুঝতে পারেন, তাঁর পক্ষে ভালো সেতারবাদক হওয়া সম্ভব নয়। তবে  তাঁদের মধ্যকার গুরু-শিষ্য সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব শেষ জীবন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। আর এই সম্পর্কের জোরেই জর্জ হ্যারিসনকে কনসার্টের ব্যাপারে বলেছিলেন রবিশঙ্কর।

একাত্তরে বাংলাদেশের গণহত্যা, ধ্বংস আর হানাহানি বিপর্যস্ত করে তুলেছিল রবিশঙ্করকে। এ নিয়ে মনোবেদনায় ছিলেন তিনি।  অন্যদিক সত্তর সালে বিটলস ভেঙে যায়। জর্জ তখন  নতুন করে ক্যারিয়ার  গড়তে সচেষ্ট ছিলেল। সেই সময়েই রবিশঙ্কর বাংলাদেশের জন্য তহবিল সংগ্রহে একটি কনসার্ট করতে চান। এই উদ্যোগে জর্জকে পাশে পেতে চান তিনি। জর্জেরও মনে হয়, এ কাজে তার নিযুক্ত হওয়া উচিত। তার ডাকে অনেকে সাড়া দেবে।
এরপর  জর্জ কনসার্টের জন্য বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, রিঙ্গো স্টার, লিওন রাসেল ও অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

জর্জ হ্যারিসন কীভাবে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর সাথে  জড়িয়ে গেলেন, এ বিষয়ে  বিস্তারিত উলেলখ আছে  তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আই মি মাইন ’-এ। ১৯৭১ সালের জুন মাসে  রাগা  অ্যালবামের জন্য তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে কাজ করেছিলেন। সে সময় রবিশঙ্কর বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য একটা কনসার্ট করতে চান বলে জর্জকে জানান। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক  নানা দেশের পত্রিকা ও সাময়িকীর সংবাদগুলো  জর্জের কাছে পাঠান। জর্জ লিখেছেন, ‘বিষয়টি কী, আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করলাম। আমার মনে হলো, কাজটার ব্যাপারে আমার বোধ হয় তাকে সাহায্য করা উচিত।’ তিনি লিখেছেন, ‘এভাবেই জড়িয়ে গেলাম। পরে যা “কনসার্ট ফর বাংলাদেশ” হয়ে ওঠে।’ তাঁর কথা, ‘সামান্য মহড়াই আমরা করেছিলাম। সত্যি বলতে কি, সবার উপস্থিতিতে একটা মহড়া আমরা করতে পারিনি। নানা অসুবিধার মধ্যে অগোছালোভাবে কাজটা করলাম আমরা।…তারপর কনসার্ট করলাম আমরা। দুটি অনুষ্ঠান করেছিলাম। প্রথম অনুষ্ঠানের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ায় দ্বিতীয় কনসার্টটি করেছিলাম। কপালই বলতে হবে, সবকিছু ভালোয় ভালোয় সম্পন্ন হয়েছিল।’

Former Beatle George Harrison, left, performs at a benefit concert for East Pakistani refugees at Madison Square Gardens, New York, Aug. 1, 1971. From left to right; Harrison, Klaus Voorman, Jim Horn and Eric Clapton. (AP Photo)

 

বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্য করতে আর  মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে এ ধরনের  একটি অনুষ্ঠান ছিল বিশ্বে প্রথম। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা বিষয়ে বড় বড় কনসার্ট হয়েছে। দামি শিল্পীরা তাতে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সময় পর্যন্ত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর ব্যাপ্তি কোন কনসার্টই অতিক্রম করতে পারেনি। আই মি মাইন বইয়ে জর্জ হ্যারিসন লিখেছেন, ‘ আমরা যখন কনসার্টের প্রস্তুতি নিচ্ছি, মার্কিনরা তখন পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠাচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মৃত্যু হচ্ছে, কিন্তু সংবাদপত্রে শুধু কয়েক লাইন, “ও, হ্যাঁ, এখনো এটা চলছে।”

এই কনসার্ট হতে সংগৃহীত ২,৫০,০০০ ডলার বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের জন্য দেয়া হয়েছিল।

‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর  প্রধান আকর্ষণ ছিলেন বব ডিলান ও জর্জ হ্যারিসন। জর্জ হ্যারিসন  গেয়েছিলেন আটটি গান। বব ডিলান গেয়েছিলেন পাঁচটি গান । রিঙ্গো স্টার ও বিলি প্রেস্টন একটি করে গান করেছিলেন। লিওন রাসেল একটি একক এবং ডন প্রেস্টনের সঙ্গে একটি গান করেছিলেন। অনুষ্ঠানের শেষ পরিবেশনা ছিল জর্জ হ্যারিসনের সেই কালজয়ী  গান ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’। গানটির কথা ও সুর ছিল  জর্জ হ্যারিসনের। । গানে ছিল সারা বিশ্বের মানুষের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান। গানের কথাগুলো ছিল মানবিক  আবেদনে ভরা।  জর্জ হ্যারিসন পুরো গানটা গেয়েছেন করুণ বিলাপের সুরে উচ্চকন্ঠে গভীর মানবিক আবেদনকে সাথি করে। তাই সেই গানের সুর  আজও আমাদের প্রাণিত  করে।
জর্জ হ্যারিসনের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts