গল্প না লেখার গল্প

এলোমেলো ভাবনার মধ্যেই মুনা এক কাপ ধোঁয়া ওঠা দুধচা, হুগলীর টোষ্ট নামিয়ে রাখে সোহানের সামনে। ট্রেতে ধবধবে চকচকে পরিচ্ছন্ন এক গ্লাস পানি যেন হাসছে। কড়া চায়ের মনকাড়া ফ্লেবারে সোহান নিজের ভেতর ফিরতে সচেষ্ট হয়, ধাতস্ত হবার চেষ্টায় শান্ত হয়। কিন্তু টোস্টে কামড় দিতেই মেজাজ বিগড়ে যায়। বুঝতে পারে না টোষ্ট খাচ্ছে নাকি হুইল সাবান খাচ্ছে চিবিয়ে চিবিয়ে। খুব ইচ্ছে হয় মুনাকে ডেকে জিজ্ঞেস করে ‘মুনা বিষয়টা কি? আনলাম শহরের সবচেয়ে নামী বেকারির টোষ্ট, কোন ম্যাজিকে ফ্লেবারটা পাল্টে দিলে তুমি?’

কিন্তু না, থাক। বাজে ঝামেলা থেকে রক্ষা পেতে হয়ত কাপবোর্ডের পাল্লায় হুইল পাউডার, সাবানের সাথেই টোষ্টের প্যাকেটগুলি রেখেছিল।চেপে যায়, কিছু বলে না। মন এমনিতেই অনেক বিক্ষিপ্ত। প্রিয় বন্ধু রশীদ বারবার তাগাদা দিচ্ছে, ইমিডিয়েট লেখাটা পাঠাবার জন্য। কিন্তু সময় যায়, লেখা গড়ায় না। অফিসের মিটিং, বসের চোখ রাঙানি, একের পর এক ঝামেলা, মুনার অফিসের চাপ থাকায় বাড়তি সময়ে বাসায় বাবুকে টেককেয়ার করা, মেহমান আত্মীয়-স্বজন- ডামাডোল কতকিছু। সব হয় শুধু লেখাটাই যা হচ্ছে না। আগে তো এমন ছিলো না। শত ব্যস্ততাতেও লেখার সময়টা কেউ কেড়ে নিতে পারত না। আজকাল কি হচ্ছে এসব! সব হচ্ছে শুধু লেখালেখির বেলায় সময় নেই, শত চেষ্টাতেও।
যে করেই হোক আজ বসবেই। অতএব নো চেঁচামেচি, নো টেনশ​ন, মাথা ঠান্ডা…
হাতের টোষ্টটা সাবধানে সরিয়ে রেখে ও শুধু পানির গ্লাসটা মুখে দেয়। গ্লাসে তেলাপোকা এবং ডিমপোচের গন্ধে ওর ভেতর থেকে সব বেরিয়ে আসতে চায়। উহ, এ দুটোর গন্ধ মিলে কি বিদঘুটে এক গন্ধ ওর মুখের মধ্যে ঢোকে। এমনিতেই রাতে ভাল ঘুম হয় নি। গল্পের প্লট ভাবতে ভাবতে লুকোচুরি স্বপ্নের মধ্যে রাত আড়াইটায় বিছানায় গিয়েছিল। এপাশ ওপাশ করতে করতে ঘুম এলো কি এলো না ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় পৌনে ছটায় কাজের মেয়েদের বিরামহীন কলিংবেলে দরজা খুলতেই হলো ওকে। মুনা তখন ওয়াসরুমে আধোঘুম আধো জাগরণে তন্দ্রালু চোখের বাবুকে নিয়েই ব্যস্ত। ওর স্কুলের বাস আসে ঠিক পৌনে সাতটায়। ওকে একটা ডিম পোচ খাওয়াতেই প্রায় এক ঘন্টা লাগে। তারপরও… এক গ্লাস পানির মধ্যে এতকিছু? মেজাজটা একেবারেই বিগড়ে যায়।
: মুনা, এই মুনা পানিতে কি অবস্থা বলো তো?
: কেন, পরিষ্কার গ্লাসেই তো পানি দিয়েছি।
: ডিম পোচের গন্ধ, তেলাপোকার নাচানাচি, গন্ধ ওহ, কি বিশ্রি
: ওতে বোধহয় বাবু ঠোট ছুঁইয়েছে। কিন্তু তেলাপোকা আসবে কোত্থেকে? রাতে তো পরিষ্কার গ্লাসই উপুড় করা ছিল।
ঠোঁট ছুঁইয়েছে শব্দটায় সোহানের ভেতরটা কেমন নড়ে ওঠে। ঠোট ছুঁয়েছে …কিন্তু পরক্ষণেই সোহানের মনে পড়ে যায়, রাতে যখন ও মুনার ঘুম ভেঙে যাবার ভয়ে এ্যাটাচ্ডবাথে না যেয়ে ডাইনিংরুম পেরিয়ে কমনবাথে আসছিলো, তখন চিন্তা চোখে একবার দেখেছিল, লাল ডানাওয়ালা তেলাপোকা দুটো লম্বা শুঁড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরিষ্কার উপুড় করা গ্লাসের ভেতর ঢোকার চেষ্টা করছিল । বাতি জ্বলে উঠতেই জোড়া মিলে একসাথে পালিয়ে ছিলো ওরা। ওটা মুনার সেকশান ভেবে আর হাত বাড়ায় নি। যদি তখন গ্লাসটা রান্নাঘরে সিংকে রেখে আসত তাহলে সাত সকালে এই অঘটন ঘটত না। নিশ্চয়ই বাবুও খেতে যেয়ে ঐ গন্ধেই রেখে দিয়েছে গ্লাসটা। আসলে দায় এড়াবার কোন উপায়ই নেই। ধরা পড়তে হয় অনিবার্য।
থাক, ধোঁয়া ওঠা চায়ের ফ্লেবারে অশান্ত মনটা শান্ত করার চেষ্টা করে সোহান। রোজ সকালে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা তো পাওয়া যায়। মুনাকে তো আর কেউ এভাবে এককাপ চা করে দেয় না। মুনাই বরং সকালে কাজের মেয়েদের চা টোষ্ট দিয়ে আপ্যায়ন করে।
: আগে চা খাও। তারপর কাজে হাত দাও।
আসলে মুনা অনেক মানবিক। মনে মনে ওকে ক্ষমা করে দেয়​ চায়ের দিকে তাকিয়ে। খুব আয়েশে চায়ে চুমুক দিলে চায়ের বিস্বাদে মুখের জমিন পুরো পাল্টে যায়। সেখানেও ভিম ডিসওয়াস বার এবং সয়াবিনের উপস্থিতি।
: মুনা কী হলো, হলো কী? চায়ে কী সয়াবিন দিয়েছো? ভিমবার আর সয়াবিন… বাহ​ এখন থেকে আর চা পাতা চিনি কিনতে হবে না এক্সট্রা। এসবেই চা হবে রোজ রোজ। যত্তোসব…
: আরে, আম্মুটা কি তাহলে ওভেনের চায়ের বাটিতে ডিম পোচ করেছিলো? গ্যাসের যে অবস্থা। গ্যাসই তো থাকে না যখন তখন। ছেলেমেয়েদের আর কি বলব। আর তুমিও তো ওভেনের চা ছাড়া মুখে তুলতে পারো না। বাটিটাই হয়ত ঠিকমত মাজেনি বুয়া। ওর মধ্যেই চায়ের পানি দিয়েছে ওভেনে। এদিকে বাবুর গাড়ি, কাজের মেয়েদের কাজ, রান্না বুঝিয়ে দেয়া, তোমার চা বিস্কিট আমার মিটিং ঠিক আটটায়। বলো আমিই বা কি করব?
: যা ইচ্ছে করো…। আর ভালো লাগে না। ধোঁয়া ওঠা চা টা রেখেই বিগড়ানো মেজাজ নিয়ে পড়ার ঘরে আসে সোহান। এরই মধ্যে ফোনটা বেজে যায় ক্রমাগত​…
রশীদের ফোন। ইস, গল্পটাই তো এখনো লেখা হয় নি। কি বলব ওকে…। আর কতো ঘোরানো যায় ছোট্ট একটা অনুগল্পের জন্য! একটু লজ্জ্বিত ভঙ্গিতে একটু সময় নিয়ে ফোনটা রিসিভ করে।
: হ্যা বন্ধু কেমন আছিস?
: শোন, যে জন্য এই সাত সকালে তোকে ফোন করা
: আরে বল, সাত সকাল বলছিস কেন? সূর্যতো ঠিকই আলো ছড়াচ্ছে তার!
: ওহ তাই নাকি! পর্দা সরাইনি এখনো। বিছানাতেই তোকে জানান দিচ্ছি। শোন, তোকে যে গল্পটা দিতে বলেছিলাম ওটা আপাততঃ লাগবে না। ওরা বিজ্ঞাপন পাচ্ছে না, বাজেট শেষ। আবার সামনের বছর দেখবে বলেছে। পরে তোকে জানাবে ওরা।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচে যেন সোহান। ভারি মাথাটা হঠাৎই হাল্কা হয়ে যায় একেবারে। মুনাকে জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছে করে।
: মুনাপাখি, রাগ করো না। আপাততঃ আর জ্বালাব না তোমাকে। গল্পটা আর লিখছি না এখন।
কিন্তু পর মুহুর্তেই মনটা কষ্টে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। লিখতে কষ্ট হলেও গল্প যখন ছাপা হয় তখন কতজন ফোনে উইশ করে, নানান কথা জানায়, জানতে চায়। তখন কি যে ভাল লাগে! এ অন্য রকম ভালো লাগা। অন্য আলোয় মনটা ভরে থাকে তখন। কোটি ডলার দিয়েও কিনতে পাওয়া যায় না পৃথিবীর কোন শপিংমলে। আবার ভাবে, আসলেই কি সংখ্যাটা ছাপছে না? নাকি সময় মত দিতে পারেনি…। ওর ভালো লাগে না। মুখে ফের হুইলপাওয়ারের ঝাঁঝালো গন্ধ, ডিমপোচের বিশ্রি স্বাদ, তেলাপোকার শুঁড়ের বিরক্তিকর ছবি, সয়াবিনে ভেসে থাকা ভিমবারের গন্ধ সব মিলে বমি বমি লাগে। তারপরও টেবিলে বসে খাতাটা টেনে নেয় সযত্নে…।

Author: ড. শাহনাজ পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment