জানালার ভেতরে নারী

তোমার সমস্যাটা কোথায় জানতে পারি?
আমার এক বান্ধবীকে স্কুলজীবন থেকেই বিষণ্ন​ অবস্থায় দেখেছি। এই পরিণত বয়সে এসেও তাকে আমি একই রকম দেখছি। কোনো উচ্ছ্বাস নেই, শুধুই বিষন্নতায় ডুবে থাকা। সেই বয়সে এসব বিষয় নিয়ে যে কথা বলতে হবে তাইতো জানতাম না। এখন জানি বলেই একদিন জিজ্ঞেস করলাম।
বলে নেই আমার বান্ধবী একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। বিষন্ন থাকলেও তার হালকা রসিকতা মাঝে মাঝে মন প্রফুল্ল​ করে দেয়। সেই ভরসাতেই জিজ্ঞেস করা। তা না হলে মুখের যা অভিব্যক্তি!
‘ছেলেটা ঠিকমতো কথা শোনে না, সারাক্ষণ নেটে বসে টুকুস টুকুস করে। বাপটাও আছে নিজের মতো, বাসায় থাকলে সারাক্ষণ বসে টিভি দেখে আর তসবিহ গুনে।’
এই যদি অবস্থা হয় বান্ধবীর মন প্রফুল্ল​ থাকে কি করে বলুন! তাইতো বিষন্ন মেঘেদের লেপ্টে থাকা! ওর আর দোষ কি!
‘ঠিক আছে এখন না হয় বাপ ছেলেতে বশ মানছে না বলে মুখ লটকায় থাকো, কিন্তু ছোট থেকেইতো এমন ফর্সা মুখটায় ধূসর গোধূলীর ক্রিকেট খেলা দেখছি।’
নড়ে চড়ে বসে বান্ধবী। একটুখানি ঠোঁট ফোলায়!
‘ছোটবেলায় বাড়িতে অনেক কাজ করতে হতো, ভাইয়া আমার চেয়ে দু’বছরের বড় । অথচ মা তাকে একটা কাজও করতে বলতেন না, আমাকেই বলতেন। বালতি বালতি পানি টেনে ঘর মুছতেও হতো। সব সময়তো কাজের লোক থাকতো না। তাছাড়া মা একটু শুচিবাইগ্রস্তও ছিলেন। অতো বড় বাড়ি ধোয়া-মোছা কি সহজ কথা বলো? আমার কষ্ট হতো এই ভেবে যে, ভাইয়াকে সব সুযোগ সুবিধাগুলো দেয়া হতো, কিন্তু আমরা বোনেরা সেই সুবিধাগুলো পেতাম না।’
বান্ধবী মোটামুটি অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়ে। বৈষম্যর শিকার হয়ে তারই যদি মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা এভাবে ব্যাধির দিকে ধাবিত হয়, তাহলে খুব সাধারণ মেয়েদের পরিবারে বৈষম্যের শুরু কিভাবে কিংবা কেমন ভাবে সেটা বোঝা কি খুব কঠিন!
তবে শুরু এটা না, শুরু আরও আগে থেকে…
অপরাধীদের পেট থেকে কথা বের করার মতো আমাদের এক বন্ধুকে জেরা করেছিলাম তার ব্রেকআপের কারণ জানার জন্য। অনেকে এমনিতেই হরহর করে সব বলে দেয়, অপরপক্ষকে দোষারোপ করে। আর এ কেন এমন সাধু সেজে বসে থাকছে কোনো দোষারোপ ছাড়াই! আমাদেরতো জানতে হবে বন্ধু! না বললে হবে! হবে না। তাই যতবারই দেখা হয়েছে কৌশলে প্রসঙ্গটি তোলার চেষ্টা করেছি। কেন জানি মনে হয়েছে স্বাভাবিক আর দশজনের মতো নয় এর বিষয়টা। বোঝা যাচ্ছে দুজনে দুজনকে শ্রদ্ধা করে, ভালোও বাসে, তারপরেও কেন!
‘কমপ্রোমাইজ করে নেওয়া যায় না?’
‘না, যায় না।’
‘ফিফটি পারসেন্ট মেনে নিয়ে সংসারটা টিকিয়ে রাখা যেত না? হানড্রেড কি হয় কোনো সংসারে?’
‘এটা হানড্রেড ফিফটির বিষয় না।’
তাহলে বিষয়টা কি? এটা না জেনে তো ঘুমাতে পারছি না! মানুষের সাইকোলোজি জানার যে প্রবল
আগ্রহ আমার।
শেষ পর্যন্ত বের করতে পেরেছি। শিশুকালে বন্ধুর স্ত্রী তার নিজের বাবার হাতে অ্যাবিউজ হয়েছিল। ভাবুন! মানসিক বিপর্যয় তখন থেকেই। বড় হয়ে এজন্য বিয়ে না করারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে। কিন্তু আমার বন্ধুটির সাথে প্রেম হয়ে যাওয়ার পর বিয়ে করেছিল। কিন্তু করলে কী হবে কিছুতেই ঐ বিষয়টাতে সে এডজাস্ট করতে পারছিল না। আর সব কিছু ঠিকঠাক চলছে কিন্তু ঐ চরম সময়টাতেই মেয়েটি সাংঘাতিকভাবে রিঅ্যাক্ট করছে। কতদিন চলতে পারে এমন! শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত ব্রেকআপের। মেয়েটি নাকি একদম নিজের মতো করে থাকতে চায়। স্বামী তাকে ভালোবাসে জেনেও যদি কোনো নারীর মনের অবস্থা এরকম হয়, মানসিকভাবে সে কতটা অসুস্থ আন্দাজ করুন! এক্ষেত্রে কোনো ঔষধই কাজ করবে না আমি বলে দিতে পারি। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটাতেই যদি ফাটল দেখা যায় তাহলে সে কোথাও দাঁড়াবার সাহস পায় কি করে বলুন!
আমার পরিচিত এক মেয়ে একটা এনজিওতে চাকরি করার সুবাদে শিশু অবস্থাতেই মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্যহানির বেশ কিছু তথ্য দিয়েছিল। এই তথ্যগুলো অত্যন্ত করুণ, হৃদয়বিদারক আর ভয়ংকর। নিজের পরিবারের মানুষদের দ্বারাই এই ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। চাচা মামা দূর সম্পর্কের ভাই এমনকি নানা দাদাদেরও রিপোর্ট পাওয়া যায় বলে জানা যায়। এদিকে শিশুটি বোঝেই না তার সাথে কি হচ্ছে। কিন্তু যখন সে বুঝতে শেখে, তখন এই স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে তাকে কুরে কুরে খায়, বিচলিত করে। সে লজ্জায় ঘৃণায় নিজের কাছেই গুটিয়ে থাকে। তার ভাবনা চিন্তা প্রসারিত করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলে। ফলে শিক্ষা দীক্ষায় উন্নত হলেও সেই কুন্ঠিত হয়ে যাওয়ার বলয় থেকে বের হতে পারে না, আত্মবিশ্বাস জন্ম নিতে পারার জায়গা তৈরি হতে পারে না। পাঠক, এই স্মৃতিগুলো অনেক সময়ই নারীদের দাম্পত্য জীবনে বিঘ্ন​ ঘটায়। দাম্পত্য সুখের বিষয়টিই তার কাছে একধরনের ভৌতিক প্রহসন বলে মনে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, সে কোনো পুরুষকেই বিশ্বাস করতে পারে না। তার জীবনসাথীকেও সে সন্দেহের চোখে দেখে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে শিশুকাল কিংবা কৈশরকাল থেকেই একজন নারীর মানসিক স্বাস্থ্য কেমন ভঙ্গুর অবস্থায় দেহের ভেতর লুকিয়ে থাকে। এই অবস্থায় থেকেই তাকে হাসতে হয়, কাঁদতে হয়, সংসারের দায়িত্ব পালন করে যেতে হয়। আমি ঠিক জানি না কত শতাংশ মেয়েদের এরকম ভৌতিক স্মৃতি জড়িয়ে বড় হতে হয়। কারণ কোনো মেয়ে আজ পর্যন্ত সরাসরি মুখ খোলেনি, একান্তে নিভৃতে দু’একজন ছাড়া। ইদানিং নানা রকম এনজিওর কল্যাণে কিংবা দু’একজন সাহসী প্রতিবাদী মেয়ের এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার সুবাদে জানতে পারছি।
তবে সত্যি কথা বলতে কি, অধিকাংশ মেয়ের শৈশবকাল থেকেই বোধহয় জীবন শুরু হয়ে যায় মানসিক বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে। শুধু প্রকারটা ভিন্ন।
দশ এগারো বছর বয়সে যখন মেয়েদের পিরিয়ড শুরু হয়ে যায় তখন তো মন এবং শরীর নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু! ব্যাপারটা বুঝতে এবং সামলে উঠতে অনেক সময় লেগে যায়। এই সময় তার ভেতর একটা অস্থিরতাও তৈরি হয়। নিজেকে লুকিয়ে রাখার, আড়াল করে রাখার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। শহরের মেয়েরা তাও অনেক সুবিধা পায়, কিন্তু গ্রামের মেয়েদের অবস্থা খুব করুণ। সম্ভবত একটা হীনমন্যতাও গড়ে ওঠে সেইসময়, যেটা পরবর্তীকালেও থেকে যায়। ফলে বড় কোনো স্বপ্ন দেখতেও সে সাহস পায় না। তার জীবন আবর্তিত হয় একটা সীমাবদ্ধতার ভেতর। তবে হ্যাঁ, আমি আশা রাখি, একটা সময়ে এই অবস্থাটা কেটে যাবে। যখন মায়েদের উচ্চশিক্ষার হার বেড়ে যাবে, মায়েরা এই সময়টাতে মেয়েদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে পূর্ণ নজর দেবেন এবং সাহায্য করবেন। বিষয়টা এড়িয়ে যাবেন না কিংবা অবহেলা করবেন না।
মেয়েদের অল্পবয়সে জোর করে বিয়ে দেওয়াটাও মানসিক স্বাস্থ্যহানির আর একটা ক্ষেত্র। আজ পর্যন্ত আমার দেখা অল্পবয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া কোনো মেয়েকে আমি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ দেখিনি। তারা সংসার চালিয়ে নিয়ে যান ঠিকই, কিন্তু অসুস্থতার একটা পাতলা চাদর তাদের জড়িয়ে থাকে, পেছন ছাড়ে না।
যাইহোক, নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির যত কারণই থাকুক না কেন, এর সমাধানও অনেকটা নারীরই হাতে এটা অস্বীকার করতে পারি না। পরিবারের নারী সদস্যরা যদি একটু সজাগ হন, একজন আরেকজনের প্রতি একটু মনোযোগি হন, সহানুভূতিশীল হন তাহলে মানসিক বিপর্যয়গুলো অনেকটাই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। আত্মবিশ্বাস নিয়ে সুস্থ জীবন যাপন করা সম্ভব।

Author: আনোয়ারা আজাদ

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts