মিতুদির সংগীত শিক্ষা

এক বিকেলে মিতুদি আমার বাসায় আসলে আমি মিতুদিকে আম টুকরো করে কেটে কাঁটাচামচসহ দিলাম । মিতুদি আমগুলো খেয়ে বললেন,‘ উঁহু খেলাম বটে তবে ঠিক তৃপ্তি হোলো না । তুমি আমাকে কয়েকটা আস্ত আম দাও তো দেখি।
কেন জানি ছোটো বেলায় যেভাবে আস্ত আমের খোসা ছাড়িয়ে খেতাম ঠিক সেভাবে খেতে ইচ্ছে করছে।
আমি মিতুদির ছোট্টবেলা ফিরিয়ে দেবার জন্যে আস্ত আম পরিবেশন করলাম ভ আর মিতুদি সেই আমের খোসা ছাড়িয়ে যখন খেতে শুরু করলেন সে দৃশ্য দেখতে আমার ভালো লাগলো না বলে আমি অন্য ঘরে চলে গেলাম।ওভাবে খাওয়া বাচ্চাদের জন্যে সুন্দর হলেও মিতুদিকে মোটেও ভালো লাগছিল না।যাই হোক মিতুদি আম খাওয়া শেষ করে হাতমুখ ধুয়ে মুছে আমাকে বললেন।ছোট বেলা থেকেই আমার খুব ইচ্ছে রবীন্দ্রসংগীত শেখার। কিন্তু সময় ও সুযোগের জন্যে তা আর হয়ে ওঠেনি।’ বেশি না।দুটি গান নাকি তাঁর খুব প্রিয়। সে দুটিই তিনি আপাতত শিখতে চান।
প্রথমটি হল, ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়’ আর দ্বিতীয়টি হল, ‘ওহে জীবন বল্লভ, ওহে সাধনদুর্লভ।’
প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, মিতুদি একটু নাকি সুরে কথা বলেন। মিতুদি গান শিখবেন বেশ ভালো কথা। কিন্তু কার কাছে শিখবেন?
আমি সে প্রশ্ন করতেই মিতুদি বললেন,‘ কেন? তোমার মেয়ের কাছেই শিখবো।’
আমার বড় মেয়ে বিপাশার তখন মাত্র বিয়ে হয়েছে । আমি বললাম, ‘ কিন্তু বিপাশা তো এখন শ্বশুরবাড়িতে।’ মিতুদি বললেন,
বিপাশা তো নজরুল সঙ্গীত গায় আমি তোমার ছোটো মেয়ে বিদিশার কাছেই শিখবো, ও তো রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখে।’
আমি তো শুনেই আকাশ থেকে পড়লাম। বিদিশা তখন মাত্র অষ্টম শ্রেণীতে উঠেছে।প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের একজন ছাত্রিকে যে কিনা কখনও সা রে গা মা ও সাধেনি তাকে এই গান দুটো শেখাতে ছোট্ট মেয়েটার কি পরিমাণ নাস্তানাবুদ হতে হবে কেজানে?
মিতুদি নাছোড়বান্দা। বিদিশার কাছেই উনি গান শিখবেন জানিয়ে গেলেন আমাকে । বলে গেলেন, পরদিন  বিকেল বেলায় আসবেন।
কি আর করা আমি বিদিশাকে বললাম, ‘তোর মিতু আন্টির খুব শখ তোর কাছে দুটি গান শিখবে, একটু শিখিয়ে দিস তো।’  মেয়ের মোটেও আমার কথাটা পছন্দ হল না কিন্তু মাতৃআজ্ঞা বলে কথা। খানিক গাঁইগুই করে গাল ফুলিয়ে চুপ করে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল।
পরদিন বিকেল বেলায় মিতুদি খুব খুশি মনে আমার বাসায় ঢুকলেন । পরণে সুন্দর একটা তাঁতের শাড়ী। খোঁপায় একটা বেলি ফুলের মালা, হাতে গীতবিতান আর তাঁর ছোট্ট শিক্ষিকার চুল উসকোখুসকো পরনে স্কার্ট।
মিতুদি কার্পেটের উপরে আসন পিঁড়ি হয়ে বসলেন গান শেখার জন্যে।
আগেই বলেছি মিতুদি একটু নাকি সুরে কথা বলেন। মিতুদি চোখ বুজে নাকি সুরে প্রথম গানটি ধরলেন,
‘জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণা ধারায় এসো …’এ পর্যন্ত মোটামুটি গাইবার পরে দ্বিতীয় চরণ ধরলেন ‘সকলই মাধুরী লুকায়ে যায় গীত সুধা ধারায় এসো।’. .গাওয়ার সময়ে হঠাৎ করে পেট চেপে মাথা নিচু করে কার্পেটের ওপরে সেইযে পড়ে গেলেন আর ওঠার নাম নেই।
আমার মেয়ে তো ভয় পেয়ে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গান টান ফেলে মিতুদির জন্যে জল আনতে ছুটলো । আর আমিও খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম কি না জানি হল। কিন্তু না মিতুদি একটু পরে দিব্যি সোজা হয়ে উঠে বসতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ কি মিতুদি পেট ব্যথা করছিল?’
মিতুদি আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ” না পেট ব্যথা করবে কেন? গানটার ভাবই এমন যে নিজেকে সামলানো বড় দায়।’
আমার মেয়ে জল হাতে নিয়ে ছাত্রির এই ভয়াবহ ভাবের কথা শুনে পালিয়ে গেল।
মিতুদির সংগীত শেখার সেদিনই ইতি।

Author: অনুপা দেওয়ানজী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts