নাম এবং পদবি সমাচার

আমার কোন এক কর্মস্থলে এক ভদ্রলোকের নাম ছিলো, ধরা যাক, মনীন্দ্রনাথ বালা তিনি চেয়ারম্যান ইলেকশন করবেন। যথারীতি নমিনেশন পেপার দাখিলকরলেন।  নামের ঘরে মনীন্দ্রনাথ বালাই লিখলেন, বাবার দেয়া নাম! কিন্তু বাছাইয়ের দিন বিরাট হইচই। ছাপানো ভোটারলিস্টে তাঁর নামে সামান্য একটু ভুল এসেছে। একটা আ-কার বাদ গেছে এবং পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে, একেবারে বালার শেষ আ-কারটি। বিরোধীপক্ষের জোরালো আপত্তি, যেহেতু ভুল নামে দাখিল তাই নমিনেশন পেপার বাতিল হবে। রিটার্নিং অফিসার এতো বুঝান, ভাইরে এটা একটা ক্লারিক্যাল মিসটেক। কিন্তু কে শোনে কার কথা। আপত্তিকারীদের
হম্বিত​ম্বি, ‘না, মানবো না, মানবো না।’
রিটার্নিং অফিসার সবাইকে নিয়ে এলেন ইউএনও সাহেবের কাছে। তিনিও বুঝালেন। না, যেই পানি সেই জল। দরকার হলে তাঁরা এই ‘বাল’ নিয়ে হাইকোর্টে যাবেন। শুনেছি, অতীষ্ঠ এই ভদ্রলোক সম্প্রতি মল্লিক পদবি ধারণ করেছেন।
বাঙালিদের মধ্যে প্রায় সকলেরই কোন-না কোন বংশীয় পদবি আছে।মুসলমানদের কারো কারো বংশীয় পদবি দৃশ্যমান না হলেও হিন্দুসম্প্রদায়ের সকলেরই এটি নামের অপরিত্যাজ্য একটি অংশ।এর কারণ সম্ভবত বংশীয় পদবিটা অধিকাংশ হিন্দুর কাছে একটি ধর্মীয় অনুষঙ্গ, অধিকাংশ মুসলমানের কাছে তা নয়। যাই হোক, নামের সাথে লিখতে লিখতে এটা একসময়ে নামের একটা অংশই হয়ে যায়।ইংরেজিতে সম্ভবত এ কারণেই এটাকে বলে Surname বা বংশনাম। বংশীয় পদবি ছাড়াও যে লোক নেই তা নয়।অথবা বিষয়টা এমনও হতে পারে যে পদবিটা তাঁরা ব্যবহার করেন না বলে আমরা জানতে পারি না।
আগে নিজেরটা বলি। যে সময়ে উচ্চবর্ণের নানাবিধ অত্যাচারে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বলতে গেলে দলে দলে মুসলমান হতো সেই সময়ে আমার এক পূর্বপুরুষ, ধোপা-নাপিত-কৈবর্ত-ডোম বা চাঁড়াল, ইসলাম গ্রহণ করেন এবং যথারীতি শেখ পদবি পান।
সেই সময়ে নওমুসলিমদের ব্যাপকহারে এই পদবিটি দেয়া হতো। শেখ ছিলো মুসলমানত্বের প্রতীক। হিন্দু সম্প্রদায়ও মুসলমানদেরকে শেখ বলেই চিহ্নিত করতেন। একটু হেয় করার দরকার হলে বলতেন নাড়িয়া বা নেড়ে। যে কারণে নেড়ে বলা হতো সে কারণটি পৃথিবীর তিনটি ধর্মে বিদ্যমান, অর্থাৎ পুরুষদের খৎনাক্রিয়া। ওল্ড টেস্টামেন্টের বর্ণনামতে, আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পাদিত অনেকগুলি চুক্তির(Covenants) ষষ্ঠ চুক্তিটি হলো খৎনাক্রিয়া। এটি নবী ইব্রাহিমের সাথে সম্পাদিত বলে তৎপরবর্তী তিনটি কিতাবি ধর্মাবলম্বী অর্থাৎ ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা তা পালন করে, খৎনা দেয়। ঘৃণাব্যঞ্জক ম্লেচ্ছ বা যবন ছিলো কিছুটা পুঁথিগত অভিধা। অন্যদিকে মুসলমানরা বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দুদেরকে কিছুটা অবজ্ঞার সাথে বলতেন নমো যেটি শূদ্র শ্রেণীভুক্ত এবং এই অবজ্ঞা ঘৃণারূপে প্রকাশ পেতো মালাউন শব্দে, এর আভিধানিক অর্থ যা-ই থাকুক না কেনো। এইভাবে ভারত-ভূখণ্ডে বহিরাগত একই আর্যজাতি হিন্দু-মুসলমানে বিভক্ত হয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে গালাগাল করতো। আমার পূর্বপুরুষ হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছেন বলে আমার ভেতরে কোনো লজ্জা বা গ্লানিবোধ তো নেইই বরং আছে শ্লাঘা বা অহংবোধ। কারণ যখন আমাদের মহানবী (দ:)র পূর্বপুরুষ জুয়া খেলতেন, প্রথম কন্যাসন্তান হলে জ্যান্ত পুঁতে ফেলতেন এবং গোত্রে গোত্রে খুনোখুনি করতেন তখন আমার পূর্বপুরুষ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যস্ত ছিলেন দশমিক সংখ্যার গবেষণায়। যাই হোক যা বলছিলাম, আমার বংশনাম নিয়ে, তারপর একটু সেয়ানাগিরি করে শেখ থেকে পাওয়া গেলো হাওলাদার এবং সর্বশেষ অতিচালাক হয়ে জুটলো তালুকদার পদবি এগুলি মূলত তৎকালীন ধুরন্ধর এবং চতুর মধ্যস্বত্বভোগীদের বংশীয় পদবি বা মাঝখানে বসে প্রজাশোষণের স্মারকচিহ্ন। কোম্পানি আমল বা তারপরের ভারতবর্ষে যাদের বংশীয় তকমাটি যত ভারি তাদের প্রজানিপীড়ণের ইতিহাসও ততো কলঙ্কিত।
আমার পূর্বপুরুষ বরিশাল অঞ্চল​ থেকে ভেসে ভেসে বাগেরহাটে এসেছিলেন। বংশের লোকেরা বলেন, তালুকদারী কিনে এখানে এসে ভদ্রাসন গেড়েছেন। আমার বিশ্বাস হয় না। ভদ্রলোকেরা ভদ্রাসন গাড়বেন এটা তো ঠিকই  আছে,
কিন্তু আমরা? সম্ভবত দাঙ্গাবাজি বা আহাংরাপনার জন্য স্থানীয় লোকেরা তাদেরকে ভিটেমাটি থেকে খেদিয়ে দিয়েছেন। এখানে এসেও একই হাল, বংশের কেউ তালুকদার কেউ হাওলাদার। বিরাট ক্যাচাল। আমি আমার নামটিকে অন্তত লেখার ক্ষেত্রে করেছি টিএস রহমান। কেউ আবার মনে করবেন না আমি বুঝি নামের আগে একটি ড-বিসর্গ বসানোর লোভে নামটিকে দুটি শব্দে এনেছি। এটি করেছি ঐ ভূমিহীন তালুকদার থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার জন্য। আমি আমার দুটি পুত্রের নাম রেখেছি প্রখর অর্ক এবং প্রগাঢ় অর্থ। নো তালুকদার। শাহ বংশের মেয়ে ওদের মায়ের মনের কথা, বংশীয় তকমাটি থাকলে খারাপ হতো না। তাঁর অনুযোগ, দুটি ইসলামি নাম রাখলে ভালো হতো। আমি বুঝি না, নামের আবার ধর্ম কী? অধিকাংশ মুসলমানের নাম আরবি। বাপের জন্মে শুনি নি, আরবি ধর্ম নামে কোনো ধর্ম আছে। ইরাকের উপপ্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তারিক আজিজ, একজন পাক্কাখ্রিস্টান। লেবাননের দুজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন আমিন জামায়েল এবং বশির জামায়েল, পাঁড় খ্রিস্টান। অথচ ব্রিটেনে দেখেছি জার্মান তরুণী ডাক্তার ক্রিস্টিনা হিজাব পরেন এবং পাঁচবেলা নিয়মিত নামাজ পড়েন।
বাঙালি মুসলমান সমাজে সৈয়দ, শাহ, কাজী, মীর্জা, চৌধুরী, তালুকদার, সরকার প্রভৃতি পদবি আকর্ষণীয়। তবে চৌধুরী পদবীটাই দামি এবং লোভনীয়। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, যাদের বংশীয় পদবী চৌধুরী তাঁরা মূলনাম রাখেন ছোট করে; পারলে একশব্দে। তাতে পদবীটা ফোটে ভালো। যেমন মুনির চৌধুরী,কবির চৌধুরী, আয়েশা চৌধুরী ইত্যাদি। লম্বা নাম বলার শেষে চৌধুরী বললে সেটা কেমন যেনো মিইয়ে যায়। আমি চিন্তা করে দেখেছি, এই পদবিটা এতো আকর্ষণীয় হওয়ার কারণ হলো প্রথম বর্ণের ‘ঔ-কার’ এবং মাঝের ‘ধ’ বর্ণটি। এতে শব্দটি উচ্চারণ করতেই শরীরে একটি দেমাগি ভাব আসে। চৌধুরীর বদলে ‘চদরী’করে দিন দেখবেন কেউ আর ওটিকে নামের শেষে লিখতে আগ্রহী হবেন না। তাছাড়া তিনটি ব্যজ্ঞনেরই আছে তিনটি কার, ফলে কোনো বর্ণই মুখ থুবড়ে পড়ে নি। কার তিনটিকে মনে হয় সর্বশেষ মডেলের তিনখানা ব্র্যান্ড নিউ প্রাইভেট কার যেনো।
বাংলা বর্ণমালায়ও আছে জোতদারী ব্যবস্থা।
স্বরবর্ণের আছে কার, ব্যঞ্জনের আছে ফলা। স্বরবর্ণের এই কারে চড়ে বেড়ায় ব্যঞ্জনকুল। ব্যঞ্জনেরা স্বরবংশের কারে চড়ে নিজেদের ফলায় করে ফলাহার। খেয়াল করে দেখুন, কোনোদিন কোনো স্বরবর্ণ কোনো কারেও চড়তে পারলো না, ফলারও করতে পারলো না। আপনি কোনোদিন কোনো স্বরবর্ণের সাথে কোনো কার (আ-কার উ-কার) ব্যবহার করেন নি বা কোনো ফলাও (র-ফলা য-ফলা) দেন নি। বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণগুলিকে আমার কাছে মনেহয় বাংলার মধ্যস্বত্বভোগী তালুকদার-জমিদার, অন্যের সম্পত্তি গ্রাসকারী। (ইদানীং অ স্বরান্তে য-ফলা+আ-কার হচ্ছে, অ্যাকাউন্ট )।
মীর বংশের লোকেরা কেউ লেখেন মীর কেউ সৈয়দ। মীর নাকি আমীর থেকে এসেছে। এরা সৈয়দ বংশীয়। এই মীরের জাদা বা ঔরসজাত যারা তাঁরা আমীরজাদা বা মীরজাদা। কালে কালে এই মীরজাদাই হয়েছে মীর্জা।  ইংরেজ আসার আগে এদেশে রাজ-কেরানিদের মুনশি বলা হতো। এই কেরানিদের প্রধানকে বলা হতো মীরমুনশি। দেখতে মুসলমান মুনশি পদবিটি হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকদেরই আছে। ভারতের একসময়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির নাম কে না জানেন। এই ভদ্রলোক আর আমি একই রুমে বসে পড়াশোনা করতাম। ঘটনা হলো উনি ১৯৪৫ সালে চিরিরবন্দরের যে কক্ষে জন্মেছেন এবং শৈশব কাটিয়েছেন আমি ১৯৮৭ সালে এসি ল্যান্ড
হিসেবে সেই কক্ষে বসে বই পড়তাম।
কোনো এক কর্মস্থলে এক মহিলার নাম পেলাম আমেনা চৌধুরী। ওনার স্বামীর নাম আবদুল কাদের সরকার, বাবার নাম মজিদ প্রামানিক। ঘটনা কী? খবর নিয়ে জানা গেলো, ভদ্রমহিলার নানারা চৌধুরী। মামাবাড়ির সম্পত্তি, হক আছে ওনার।
সমস্যা হয় যখন দুটি খান্দানি পদবি থাকে। ধরা যাক জনাব আহমেদ সাকলায়েন। ওনারা সৈয়দ বংশের লোক। কোনো-না-কোনো ভাবে আবার চৌধুরীও। এখনতো বিপদ। কোনটা ছাড়েন কোনটা বেড়েন। একটাও ছাড়া যাবে না।
উনি লিখলেন, সৈয়দ আহমেদ সাকলায়েন চৌধুরী। আমরা ছোটবেলায় বলতাম, আগায় খান পাছায় খান, খান আবদুস সবুর খান।
দুই বোন। বাবার নামটি নিজেদের নামের শেষে ব্যবহার করেন। বাবাও পরিচয় দেবার মতোই কেউ একজন। দুটি মেয়েরই বিয়ে হলো। একজনের স্বামী আবার চৌধুরী। ওমা, তিনি বিখ্যাত বাবার নামটি ছেঁটে স্বামীর দামি চৌধুরী পদবীটিই লিখতে শুরু করলেন নামের শেষে। অন্য বোনটি বাবার নামটা নিয়েই পড়ে থাকলেন অগত্যা। আরেক ভদ্রমহিলার খবর জানি। বাবাও বিখ্যাত স্বামীও অখ্যাত নন। তিনি নামের শেষে দুজনকেই রেখেছেন। আর একজনের কথা জানি। তিনি নিজের নামটি মাত্র একশব্দে রেখে বিখ্যাত স্বামীর দুটি অংশ রেখেছেন যাতে বোঝা যায় তিনি অমুকের স্ত্রী। স্বামীর দুটি অংশের একটিতে আবার বংশের শরাফতি আছে।
পদবি নির্বাচনে নারীদের সুবিধাটা একটু বেশি। জমকালো না হলে পৈত্রিক পদবি তাঁরা গ্রহণ করতে চান না। নিজের জন্মদাতা এবং সন্তানের জন্মদাতা এ দুজনের মধ্যে যার পদবি মহার্ঘ তাঁরটাই তিনি ধারণ করেন। তাই পদবির ব্যাপারে প্রায় কখনই নি:সঙ্গ হন না তিনি। পুরুষ শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুক হিসেবে বাড়ি-গাড়ি-সোনাদানা সবই নেবেন কিন্তু পদবি নেবেন না। সম্ভবত সেটি টাকায় রূপান্তর করা যায় না বলেই। পদবির ব্যাপারে পুরুষের বাছাই করার সুযোগ নেই। বাপের যা আছে তা নিয়েই তাকে খুশি থাকতে হয়, না থাকলে নি:সঙ্গ। হায়, নি:সঙ্গ পুরুষ!এবার যে গল্পটি শোনাবো সেটি সম্ভবত ইত:পূর্বেও বলেছি। প্রাসঙ্গিক বলে আবারও শোনাচ্ছি।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ি উপজেলা। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব শামস্ উদ্দীন আহম্মদ। ভদ্রলোক নি:সন্তান। অফিসারদেরকে সন্তানের মতো ভালোবাসেন। পিতৃসম প্রৌঢ় এ ভদ্রলোকের সবই ভালো কিন্তু ফাইল সই করতে সময় নেন প্রচুর। কম্পিত হস্তে নামের একটি অক্ষর লিখে শুরু করেন গল্প। আবার একটি অক্ষর বসান। আবার গল্প। তিনি তাঁর নামের পুরো তিনটি অংশ লিখেই স্বাক্ষর করেন। ফলে একটি ফাইলে সই করাতে সময় লেগে যায় অনেক।
আমরা অধীর হয়ে উঠি। হৃদয়বান ভদ্রলোক বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেন। শেষতক তিনি ঠিক করলেন, এর একটা সুরাহা করতে হবে। একদিন অফিসে এসে হাসতে হাসতে বললেন, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব, ফয়সালা পেয়ে গেছি। আমি এখন থেকে অনুস্বাক্ষর মানে ইনিশিয়াল দেবো। তাহলে সময় কম লাগবে, আপনাদেরও বিরক্তি লাগবে না।তিনি আমার সামনেই একটি কাগজে অনুস্বাক্ষরটি করে দেখালেন। শামস্ থেকে ‘শা’, উদ্দীন থেকে ‘উ’ এবং আহম্মদ থেকে ‘আ’ নিয়ে তিনি যা লিখলেন তা আর কহতব্য নয়। আমি তাঁর হাত চেপে মিনতি করে বললাম, চেয়ারম্যান সাহেব, সময় লাগে লাগুক, পুরো নামই লিখুন। তবু আপনি দয়াকরে এই অনুস্বাক্ষরটি দেবেন না।

Author: টিএস রহমান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment