নামফলক

সড়কটা দীর্ঘ নয়। একপাশে বড় একটা দিঘি, অন্যপাশে কয়েক ঘর বসতি, মাঝখানে এই সড়ক। কিছুদিন আগেও কাঁচা ছিল, এখন খোয়া পড়েছে। পিচ পড়েনি এখনও। সহজে পড়বে বলে মনে হয় না। গাড়ি তেমন একটা চলে না, রিক্সা চলে, তাও খুব বেশি না। পথচারিরা হাঁটে, টুটাং করে যায় সাইকেল। ফেরিওয়ালারা ডাক পাড়ে। মাছওয়ালা হাঁকে মাছ মাছ, মুরগিঅলা মুরগি চাই, মুরগি, চানাচুরঅলা, এইযে নেবেন মজাদার চানাচুর। আরো কতকি। নদীর কূলে নাও ভিড়িয়ে বেদেরা আসে লাল নীল রেশমি চুড়ি বেঁচতে। তবে আস্তেÍ আস্তে এসব কমে যাচ্ছে। নগর যতো বাড়ছে , আধুনিকতা ততোই গ্রাস করছে পুরোনো জিনিসগুলোকে।
সড়কটা বহুদিন নামহীন ছিল। মফস্বল শহরে কয়টা সড়কেরই বা নাম থাকে। নাম নিয়ে কেউ তেমন ভাবেওনি এতদিন। ইদানিং তোড়েজোরে শুরু হয়েছে নাম সংস্কৃতি। এ সড়কেও তাই ঘটল। হঠাৎ একদিন রাস্তার মোড়ে একটা সাইনবোর্ড টানিয়ে দিলো, ‘জসিম আহমেদ সড়ক।’ জসিম সাহেব এই পাড়ার গড়পড়তা আর দশজনের একজন । মাসখানেক আগে মারা গেছেন। একসময় অবস্থা খুবই নাজুক ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহিনিতে নাম লিখিয়েছিল । অনেক মুক্তিযোদ্ধা হত্যা আর ঘর বাড়ি জ্বালিয়েছে সে পাকিস্তানিদের সাথে থেকে । পড়তি অবস্থা তখন থেকে ফুলতে থঅকে। তার ওপর হালে তার ছেলেরা ঠিকাদারি করে ভাল পয়সা কামিয়েছে। রাতারাতি তার নামে সড়কের নামকরণ। কে করল এই নামকরণ? পৌরসভা ? কেন তিনি কি কোন দানবীর ছিলেন, কোন সংস্কারক, বড় রাজনীতিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, আমলা, সাংবাদিক , মুক্তিযোদ্ধা? কোনটাই না। ছিলেন রাজাকার । তাহলে? ওসব হওয়ার দরকার কি, ছেলেদের পয়সা আছে, গায়ের জোর আছে, ক্ষমতার কাছাকাছি আছে , তাই এককালের রাজাকার হলে অসুবিধা কি! ওরা সাইনবোর্ড টানালে পৌরসভা সেটাই মিটিং করে অনুমোদন দেবে এটাই তরিকা।
এ সড়কের একেবারে পশ্চিম কোণে রাশেদ সাহেবের বাড়ি। রাশেদ সাহেব মৃত। তবে তার স্ত্রী আছেন। তারও যথেষ্ট বয়স হয়েছে । হাঁচা-চলা তেমন করতে পারেন না, তারপরও জোর করে করেন। পুরোনো দিনের মানুষ, সারাজীবন দশহাতে কাজ করেছেন দরকার পড়লেও না পড়লেও। এখনও সে অভ্যাস যায়নি। টুক টুক করতে করতে পেছনের রাস্তায় গিয়েছিলেন বিকেলবেলা প্রতিদিনের অভ্যাসমতো। এদিক ওদিক একটু ঘুরে ফিরে আসছিলেন। তখনই পেছনে পদশব্দ শুনে ঘুরে দাঁড়ালেন আর চোখে পড়ল সাইনবোর্ডটা। যিনি আসছিলেন তার দিকে চেয়ে বললেন,
:ওটা কি বাবা?
:চাচি আম্মা ওটা একটা বোর্ড বসানো হয়েছে। এই রাস্তার নাম দেয়া হয়েছে, জসিম আহমেদ সড়ক।
: কেন জসিম আহমেদ সড়ক কেন, জসিম কি করেছে ? চিৎকার করে ওঠেন মায়মুনা।
: তাতো জানিনে..
বলতে বলতে মায়মুনার রুদ্র মূর্তি দেখে দ্রুত সরে পড়ে পথচারি। মায়মুনা দুর্বল পায়ে যতটা দ্রুত হাঁটা যায় হেঁটে বোর্ডের সামনে দাঁড়ায় । তাইতো তাইতো ওই নামইতো লেখা আছে! মায়মুনা কাঁপতে কাঁপতে ভিতরে ঢোকে। ওর অবস্থা দেখে ছুটে আসে কাজের লোকেরা।
: কি হয়েছে চাচিজান, কি?
একজন এসে হাত ধরতে যায়। মায়মুনা ধাক্কা দিয়ে হাত সরিয়ে দেয়। ঢুকে যায় বাড়ির ভিতরে। কাজের মেয়েরা হা করে তাকিয়ে থাকে। চাচি আম্মার এমন রাগ তারা জীবনে দেখেনি। বড় হাসি খুশি আর মিষ্টভাষি মানুষ তিনি। হঠাৎ কি হল তাঁর!

দুই
ডাক্তারের চেম্বার। চেয়ারের সামনে বসা একজন পাশে তার কোন এক আত্মীয়। জুনিয়র ডাক্তারের নেয়া হিস্ট্রি ডাক্তার ভাষার সামনে। সেটার ওপর চোখ বুলিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে ভাষা বলল,
: বলেন আপনার কি অসুবিধা ?
রোগি সবে শুরু করেছে । ডাক্তার আপা আমার..।
তথনই ঝনঝন করে বেজে উঠর হাতের মোবাইল। একবার তাকিয়েই কেটে দিলো কুমুম। পরমুহূর্তে আবার বাজল, বাজতেই থাকল। সুইসড অপ করতে গিয়ে চোখ পড়ল পর্দায়। মার ফোন এসময় ? মা বড় বিবেচক মানুষ। তিনি জানেন এ সময় ভাষা চেম্বারে থাকে। কখনই তিনি এ সময় ফোন করেন না। বরং ভাষাকে বলেন, ‘চেম্বারের সময় তোমার রোগিদের। তাদের সময় থেকে সময় চুরি করবে না কখনও।’ সেই মা ফোন করছেন এ সময়। তাও কেটে দেয়ার পর আবারও।
: সরি এক্সকিউজ মি, বলে ফোনটা কানে তোলে ভাষা।
: মা আমি চেম্বারে । পরে ফোন দিচ্ছি তোমাকে
: না, এখনই শুনতে হবে।
মা তাকে তুমি করে বলছেন! তার মানে সিরিয়াস কিছু!
: মা কি হয়েছে? সিরিয়াস কিছু?
: আমার কাছে সিরিয়াস। তোমার কাছে নাও হতে পারে। শোন আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে একাত্তরের রাজাকারের নামে। ওই রাস্তার অনেকটা জমি আমাদের। সেটাও বড় কথা না, নামকরণ করা হয়েছে একজন স্বাধীনতা বিরোধীর নামে। আমি আর কিছু বলতে চাইনে। আমি এখানে থাকব না। কোথায় থাকব জানতে চেওনা। তোমার কাছেও যাবো না। যে মেয়ে এতবড় ডাক্তার হয়েও বাবাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কিছু করে না তার কাছে আমি মরে গেলেও যাবো না।
: মা মা, শোন আমার কথা । মা
: তোমার কোন কথা শোনার আমার দরকার নেই। বাড়িতে তালা দিয়ে যাচ্ছি।
মার কন্ঠে রাগ অভিমান আর কান্না। আচমকা কেটে দেন ফোন।

তিন
সেদিন সারারাত জেগে থাকে ভাষা। পরদিন তার চেম্বারের সামনে টানিয়ে দেয়া হয় একটা নোটিস, ‘অনিবার্যকারণবশত চেম্বার ৭ দিন বন্ধ থাকবে । যাদের সিরিয়াল দেয়া হয়েছে পরবর্তীতে তাদের সিরিয়ালের জন্য যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হল। এ অনিচ্ছাকৃত ক্রুটির জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।’
সারাদিন ছোটে ভাষা সচিবালয় আর এ অফিস থেকে ও অফিস, সংবাদপত্র বেতার টিভি । ছোটে আর হতাশ হয় । তারপর সেদিন সকালে বেজে ওঠে ফোন।
: হ্যালো
: আপনি ড. ভাষা?
: জ্বি বলুন
: আমি ‘দৈনিক প্রতিদিন’ থেকে বলছি । আপনার সাথে কথা বলতে চাই। আপনি তো ভাষা সৈনিক রাশেদ চৌধুরীর কন্যা?
: আপনি জানলেন কি করে?
: আমি ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করছি। আপনার সাথে কথা বলতে চাই
: বেশ চলে আসুন
তারপর সেই বিকেলে অনেকক্ষণ কথা হল । আর সে ইতিহাস বলতে বলতে গলা ধরে এলো ভাষার।
‘ জানেন জীবনে কোনদিন আমার জন্মদিন পালন করা হয়নি। কারণ আমার যেটা জন্মদিন বাবার সেটা মৃত্যুদিন, একুশে ফেব্রুয়ারি। ছেলেবেলায় জন্মদিন পালন করতে বললে মা বলতেন, ‘সেদিনই তোর জন্মদিন পালন করব যেদিন তোর বাবা যোগ্য সম্মান পাবে। অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল আমাদের। তোকে আমার পেটে রেখে তোর বাবা গিয়েছিল ঢাকায় পড়তে। ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মরণপণ করেছিল। তোর পেটে আসার খবর শুনে আমাকে বলেছিল, ছেলে মেয়ে যাই-ই হোক নাম রাখব ভাষা।’
: এ আবার কেমন নাম?
: এটাই আমার সন্তানের জন্য যোগ্য নাম। আমি ভাষার জন্য লড়ছি, আমার সন্তানের নাম ভাষা ছাড়া আর কি হতে পারে!
আমার যেদিন জন্ম হল সেদিনই আমার বাবা একুশের মিছিলে অংশ নিয়ে শহীদ হলেন। আমি বাবাকে দেখিনি। তার একটা ঝাপসা ছবি দেখেছি, ওটাই আমার সম্বল।
: আর আপনার মা?
: অভিমান নিয়ে কাটালেন সারাটা জীবন। বাবার কোন মূল্যায়ন হলো না এই অভিমান নিয়েই জীবন পার করলেন। এবার আমার আর মানুষের ওপর প্রচন্ড রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। আমার মাকে আমি চিনি। তাই ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করিনি।
: সেকী কেন?
: আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তাটা একজন যুদ্ধাপরাধীর নামে হয়েছে, মা সেটা মেনে নিতে পারেননি।
: মানতে পারার কথাও না । দেখি কিছু করতে পারি কিনা। একজন ভাষা সংগ্রামীর মেয়ে হিসেবে আমি আপনার পাশে থাকব ।

চার
মাস দেড়েক পরের কথা। প্রত্যন্ত গ্রাম মির্জাপুরের রাস্তায় এসে দাঁড়ায় একটা রিক্সা। রিক্সা তেকে নামে ভাষা। অনেকদিন আসা হয়নি। তাই কিছুই তেমনভাবে চিনতে পারে না। একে ওকে জিজ্ঞাসা করে সৈয়দ বাড়িতে হাজির হয়। বারান্দায় চেয়ারে নিশ্চুপ বসে আছেন মা। চেহারা আরো ভেঙে গেছে। ভাষা ধীরে ধীরে উঠে মায়ের পায়ের কাছে বসে।
: মা আমার সাথে চলো
: কোথায়?
: বাড়িতে
: তোকে তো বলেছি ও বাড়িতে আমি যাবো না
: বলেছ, মা এতদিন আমি কিছু করতে পারিনি। এবার পারব। আমার ওপরে আস্থা রাখো। তোমার মেয়ে নিজে মওে যাবে কিন্তু তার মাকে ছোট করবে না
ভাষার কথার মধ্যে কি যেন ছিল!
: তুই বস। খাওয়া দাওয়া কর। আমি তৈরি হই
মায়ের মুখে তুই শুনে ঘর কাঁপিয়ে একটা শ্বাস পড়ে ভাষার। উহ কি শান্তি!

পাঁচ
রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে আছে ভাষা আর ওর মা। সাথে অনেক লোক। টিভি ক্যামেরা আছে, আছে সাংবাদিকরা। পৌরসভার লোকজন আগের নামফলক নামিয়ে আরেকটা নামফলক সেখানে বসিয়ে দিল। একজন মায়মুনাকে বলল, ‘চাচিজান আপনি এখানটায় ধরেন। ভাষা আপা আপনিও ধরেন।’
ওরা দুজন ফলকটা ধরে। জায়গা মতো টানানো হয় ফলক। তারপর মায়মুনা একটু সামনে সরে দাঁড়ায়। ফলকে জ্বলজ্বলে অক্ষরে লেখা ‘ভাষাসৈনিক রাশেদ চৌধুরী সড়ক।’ মায়মুনা ডুকরে কেঁদে ওঠে। ভাষা ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে।

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts