ন্যাড়া আর রূপসী রাজকন্যা

ন্যাড়া আর রূপসী রাজকন্যা/ পুনর্লিখন আফরোজা পারভীন
অনেক অনেক দিন আগের কথা। অনেক দূরে এক দেশ ছিল। সে দেশে ছিল এক অপরূপ সুন্দরী রাজকন্যা । রাজকন্যার বিয়ের তোড়জোড় চলছে । দেশ বিদেশের রাজপুত্ররা ঘোড়ায় চড়ে রাজকন্যাকে বিয়ে করার জন্য রাজবাড়িতে যায় । কিন্তু কেউ আর ফিরে আসে না। ব্যাপারখানা কি তা কেউ বুঝে উঠতে পারে না।
সে দেশেই ছিল এক ন্যাড়া লোক। ন্যাড়া বলে তার মনে কোন দু:খ তো ছিলোই না, বরং সে নিজেকে খুবই সুদর্শন মনে করত। সবসময় ভাবত সেই একমাত্র লোক যে রাজকন্যাকে বিয়ে করার যোগ্য। একদিন সে পোটলাতে তিনটে রুটি ভরে নিয়ে রাজকন্যাকে বিয়ে করার জন্য রওনা হল। তা সে রাজবাড়ি কি কাছের পথ! যেতে যেতে সে এক গভীর জঙ্গলের মধ্যে পৌঁছালো। আর জঙ্গলে তাকে দেখেই তেড়ে এলো এক দৈত্য। সে দাঁতে দাঁতে পিষতে লাগল । বলল,
‘হাউ মাউ খাউ মানুষের গন্ধ পাউ । আমার পেটে অনেক ক্ষিদে, এবার এটাকে খাবো।’
ন্যাড়া তাড়াতাড়ি তার পোটলার রুটি তিনটে দৈত্যের সামনে তুলে ধরল। দৈত্য খপ করে রুটি তুলে নিয়ে চিবাতে লাগল। তারপর ন্যাড়ার দিকে তাকিয়ে হাসল । ন্যাড়া চলে যেতে উদ্যত হলে সে ন্যাড়াকে তার মাথা থেকে এক গাছি চুল তুলে দিয়ে বলল,
‘বিপদের দিনে এই চুল পুড়িয়ে আমাকে ডাকিস।’
ন্যাড়া দৈত্যকে ধন্যবাদ দিয়ে এগিয়ে চলল​। যেতে যেতে সে আরো গভীর জঙ্গলের মধ্যে পড়ল। সেখানে একটা ঝর্না ছিল । ন্যাড়ার খুব পানির পিপাসা পেয়েছিল। সে পানি খাওয়ার জন্য ঝর্নার পাশে যেতেই দেখল একটা দৈত্য ঝর্নাটা আগলে বসে আছে। দৈত্যটা শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে । ন্যাড়া সাথে সাথে তার গায়ের কোটটা খুলে দৈত্যকে দিলো। দৈত্য কোট গায়ে চাপিয়ে ন্যাড়ার দিকে চেয়ে হাসল। ন্যাড়া পানি খেয়ে দৈত্যকে জানিয়ে বিদায় নিতে উদ্যত হলো। দৈত্য তার মাথার একগাছি চুল ছিঁড়ে ন্যাড়াকে দিয়ে বলল,
‘বিপদের দিনে এই চুল পুড়িয়ে আমাকে ডাকিস।’
ন্যাড়া খুব খুশি হল। সে পথ চলত লাগল। যেতে যেতে এবার সে একটা নদীর তীরে উপস্থিত হল। সে দেখল একদল পিঁপড়ে নদী পার হবার চেষ্টা করছে । কিন্তু পারছে না। ন্যাড়া এক টুকরো কাঠ নদীর পানিতে ভাসিয়ে দিলো। পিঁপড়েরা দল বেধে সে কাঠে উঠে নদী পার হল। ন্যাড়াও নদী পার হয়ে যেতে উদ্যত হলে পিঁপড়ে তার মাথার একগাছি চুল ছিঁড়ে ন্যাড়ার হাতে দিয়ে বলল,
‘বিপদের দিনে এই চুল পুড়িয়ে আমাকে ডেকো।’
ন্যাড়া পিঁপড়েকে ধন্যবাদ দিয়ে এগিয়ে চলল। যেতে যেতে একসময় সে রাজবাড়ির সামনে উপস্থিত হল । সে রাজবাড়ির সিংহদরজার ঘন্টা বাজালো। প্রহরী এগিয়ে এলো। হুঙ্কার দিয়ে বলল,
‘কে, কি চাই?’
‘আমি রাজকন্যাকে বিয়ের ব্যাপারে এসেছি। রাজার সাথে দেখা করতে চাই।’
‘বিয়ে কার সাথে?’
‘আমার সাথে।’
‘সেকী! ‘

প্রহরী দৌড়ে গিয়ে রাজাকে এ খবর দিলো। রাজা তো মহাখাপ্পা। কী সাহস এই ন্যাড়ার! সে লোকজনকে নির্দেশ দিলো গোসলের পুকুর রেডি করতে। পুকুর রেডি হলে পাইক পেয়াদারা এসে ন্যাড়াকে বলল,
‘এটা রাজার রাজকীয় পুকুর। পুকুরে পুরোটাই গোলাপজল দেয়া অছে । নামলেই বুঝতে পারবে। তোমাকে এই পুকুরে গোসল করতে হবে। এখানকার নিয়ম, যে রাজকন্যাকে বিয়ে করতে চাইবে তাকে পুকুরে গোসল করতে হবে।’

ন্যাড়া পুকুরের পাশে গিয়ে দেখল, পুকুরের চারধারের কিনারা আগুনের তাপে লাল হয়ে আছে । আসলে ওই পুকুর সবসময়ই গরমে তাতিয়ে রাখা হয়। আর যেই গোসল করতে নামে সেই মৃত্যুবরণ করে। ন্যাড়া বিপড়ে পড়ল । আর তখনই তার মনে পড়ল দ্বিতীয় দৈত্যের কথা যে শীতে কাঁপছিল। সে চুল পোড়াতেই দৈত্য এসে হাজির হলো। দৈত্যকে সব কথা বলতেই সে এক নি:শ্বাসে পুকুরের সব তাপ শুষে নিলো। ন্যাড়া জলাশয়ে নামল। পরদিন সকালে রাজা দেখল ন্যাড়া দিব্বি আছে । এবার সে ন্যাড়াকে আরো কঠিন সাজা দেবার পরিকল্পনা করল। সে ন্যাড়াকে বলল, ‘সাতশ কেজি চালের ভাত, সাতশ কেজি মাংস আর সাতশ কেজি সবজি এক রাতের মধ্যে খেতে ।’

ন্যাড়া আবারও বিপদে পড়ল। সে এবার সেই দৈত্যকে ডাকল যার পেটে অনেক ক্ষুধা। ডাকামাত্র দৈত্য হাজির হল। ন্যাড়া তাকে সমস্যাটা বলতেই সে এক লহমায় সব খাবার খেয়ে শেষ করল। পরদিন সকালে রাজা দেখল, খাবারের একটা কণাও নেই।
এসব দেখে রাজার জিদ আস্তে আস্তে ভীষণ বাড়ছিল। তার মনে হচ্ছিল ন্যাড়া তার সাথে চালাকি করছে। এবার সে সাত গাধাতে টানতে পারে এমন পরিমাণের সাতগুণ চাল গম যব সরিষা একসাথে মিশিয়ে এক রাতের মধ্যে ন্যাড়াকে আলাদা করতে বলল। ন্যাড়া এবার আরো বিপদে পড়ল । তখন তার মনে পড়ল পিঁপড়ে সর্দারের কথা। চুল পোড়ানোমাত্র পিঁপড়ে সর্দার হাজির হলো। সব শুনে সে হেসে বলল,
‘কুছ পরোয়া নেই। তুমি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি সব সামলে নেব।’
ন্যাড়া সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ল। আর সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখল, চার রকমের জিনিস আলাদা করে চারটে ঢিবি সাজিয়ে চলে গেছে পিঁপড়ে সর্দার।
সব দেখে এবার রাজা ভাবল, ছেলেটা সত্যিই করিৎকর্মা, সত্যিই বুদ্ধিমান। এমন ছেলেই তো রাজকন্যার জন্য দরকার। রাজা মহা ধুমধামে রাজকন্যার সাথে ন্যাড়ার বিয়ে দিলো।

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment