নূরজাহান বেগম : নারী অগ্রগতির পথিকৃৎ

নূরজাহান বেগম

‘বেগম’ পত্রিকার নাম শুনে আসছি অনেক দিন ধরে। অনেক সময় পেরিয়ে গেছে । কত দিন ধরে শুনছি সে দিন তারিখ সময় ঠিকঠাক বলতে পারবো না । কিন্তু ততটা দোলা লাগেনি মনে, যতটা লাগার দরকার ছিল। কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি। তাঁর জীবনী পড়তে যেয়ে ‘সওগাত’ পত্রিকার নাম পড়েছি। দুর্ভাগ্যবশত সেটাও পড়ার প্রতি আমার আগ্রহ হয়নি । আজ নিজেকে ধিক্কার দিই । কত কিছু থেকে নিজেকে নিজে বঞ্চিত করেছি আমি যা আর কখন ফেরত পাবার নয়।
মনে প্রাণে আচার আচরণে চালচলনে কথোপকথনে ন্যায় নীতিতে কর্মতৎপরতায় ভালবাসায় এক অভাবনীয় শক্তিধর নারী নূরজাহান বেগম। তাকে ছুঁয়ে দেখার অপার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ছুঁতে পারিনি । এ আমার ব্যর্থতা এ আমার দুর্ভাগ্য এ আমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ!
‘কচি কাঁচার মেলা’ এই প্রতিষ্ঠানের ভাইস চেয়ারম্যান বকুল ভাই যখন ফোন দিয়ে বললেন, ‘নূরজাহান আপাকে নিয়ে আপনি কি কোন লেখা লিখেছেন ?’ তখন বুকের মধ্যে এক আলাদা শূন্যতা সৃষ্টি হল। আমি কিছুটা সময় হতভম্ব হয়ে গেলাম, নির্বাক হয়ে গেলাম। নীরবতা কাটিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, ‘লিখেছি নিজের জন্য সামান্য কিছু।’ উনি বললেন, ‘আপনার লেখাটা বেগম পত্রিকা অফিসে একটু কষ্ট করে যদি পৌঁছে দিতেন তাহলে খুব ভাল হত।‘ বললাম, ‘ঠিক আছে । ‘
বেগম সম্পাদক নূরজাহান বেগমের ডাকনাম নূরী। জন্ম চাঁদপুর জেলার চালিতাতলী গ্রামে ১৯২৫ সালের জুন মাসের ৪ তারিখ এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে । তাঁর বাবা ছিলেন তৎকালীন সময়ের স্বনামধন্য পত্রিকা সওগাত এর সম্পাদক মোহম্মদ নাসিরউদ্দীন। তিনি জ্ঞানে গুণে কর্মে মেধায় ও মননে ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তারই যোগ্য কন্যা নূরী। মায়ের নাম ফাতেমা বেগম । মায়ের নিত্য সাহচর্য ও জীবনবোধ নূরীর জীবনকে করেছে আরো আলোকিত, আরো প্রাণবন্ত আরো গতিশীল। ফাতেমা বেগম ছিলেন নারী অগ্রগতির আর এক পথিকৃৎ। যেমন পিতা-মাতা তেমন সন্তান এ যেন সোনায় সোহাগা। ছোটবেলা গ্রামে থাকার সময় তিনি খালের পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন। তাই তাঁর জীবনের নিরাপত্তার জন্য পরিবার তাঁকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
১৯২৯ সালে মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে মা আর মামার সাথে কলকাতায় তার বাবার কাছে চলে যান। বাবার বাসা ছিল কলকাতা ১১নং ওয়েলেসলি স্ট্রিটের দোতলা বাড়ি যা ছিল সওগাত পত্রিকারও দপ্তর। সেখানে নিয়মিত সাহিত্য মজলিস বসত। যেখানে যোগ দিতেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, খান মোহাম্মদ মুঈনুদ্দীন, আবুল কালাম সামসুদ্দীন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আবুল মনসুর আহম্মদ, হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী, ইব্রাহীম খাঁ, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ। এই মজলিসের নিয়মিত শ্রোতা ছিলেন ফুলের মত মেয়ে নূরী।
নূরীকে প্রথমে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। মা ফাতেমা বেগম তাঁকে প্রতিদিন ভাল ভাল টিফিন দিতেন। এক উর্দুভাষী মেয়ে তাঁর সাথে বন্ধুত্ব করে তাঁকে ফুসলিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে মাত্র দুটো গুলগুল্লার বিনিময়ে সুস্বাদু পুষ্টিকর খাবারগুলো খেয়ে ফেলতো। শিশুবেলার সেই অনুভূতি পরবর্তিতে মানুষ চিনতে খুব সহায়তা করেছে তাঁকে। দ্বিতীয় স্কুল বেলতলা উচ্চ বিদ্যালয় যেখানে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করার পর আবার পূর্বের স্কুলে ৫ম শ্রেণীতে ভর্তি হন। অষ্টম শ্রেণী থেকে ম্যাট্রিক পর্যন্ত তিনি ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা করেন । ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে আই এতে ভর্তি হন কলকাতা লেডি ব্রেবন কলেজে। আই এ তে তিনি পড়েছেন দর্শন ইতিহাস ও ভূগোল। সেখানে তাঁর সহপাঠীরা ছিলেন সাবেরা আহসান ডলী, জাহানারা ইমাম, হাজেরা মাহমুদ, হোসনেয়ারা রশিদ, বিজলী নাগ, রোকেয়া রহমান কবির, সেবতী সরকার, কামেলা খান মজলিস আরো অনেকে। পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি ব্যাডমিন্টন খেলতেন। লেডি ব্রেবন থেকে ১৯৪৪ সালে আই এ পাস করেন। ১৯৬৪ সালে বি এ ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৪৭ সালে শুরু করেন বেগম পত্রিকা প্রকাশনার কাজ । বেগম পত্রিকা প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর বাবা । প্রথম সম্পাদক ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন নূরজাহান বেগম। নূরজাহান বেগমের সাথে যারা ব্রেবন কলেজে পড়াশুনা করেছেন তাঁরা প্রায় সবাই বেগম পত্রিকার জন্য কাজ করতেন। সওগাত এর শিশু সাহিত্যের সম্পাদক ছিলেন রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই)। সেখানেই দুজনের প্রথম পরিচয়। তার পর প্রণয়। প্রথম দিকে বেগম পত্রিকায় নারী পুরুষ উভয়ের লেখা ছাপানো হত। পরে শুধু নারীদের লেখা ছাপানো হত, এখনো তাই হয়।
১৯৫০ সালে নাসিরউদ্দিন কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন সপরিবারে । তখন থেকেই নারিন্দা শরৎগুপ্ত লেনের ৩৮নং বাড়িটিতে বসবাস শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে মার্কিন মহিলা সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী আইদা আলসেক বেগম পত্রিকা অফিস পরিদর্শন করেন। ১৯৫৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেগম ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ, সেক্রেটারি নুরজাহান বেগম। বেগম সুফিয়া কামাল ছিলেন অন্যতম উপদেষ্টা।
আগেই বলেছি রোকনুজ্জামান দাদা ভাই এর সাথে তার প্রথম পরিচয় কলকাতায়। নূরজাহান বেগম ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মহিয়সী নারী । তাই তিনি তাঁর যোগ্য জীবনসঙ্গী চিনতে ভুল করেননি। একদিন তিনিই জামান সাহেবকে তার রুমে ডেকে এনে বিবাহের প্রস্তাব দেন সরাসরি। চিন্তা করা যায় কতটা স্বাধীন ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নারী ছিলেন তিনি! তৎকালীন সময়ে সাহসী বীরের মতো নিজের বিয়ের প্রস্তাব নিজেই পেশ করেন, যা নারী স্বাধীনতা ও অগ্রগতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পরে বিষয়টা জানাজানি হলে তাঁর বাবা ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন । কিন্তু সৌভাগ্যের দূত হিসেবে এগিয়ে এসেছিলেন শেরেবাংলা এ. কে ফজলুল হক। নুরজাহান বেগমের বাবার সাথে তাঁর খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তাই তিনি নিজেই সেই বিয়ের ঘটকালির দায়িত্বটা নিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কিছুটা সময় পর তাদের বিয়ে হয়। রোকনুজ্জামান দাদা ভাই এর বাবা মা আগেই মারা গেছেন। তিনি একা এবং নূরজাহান বেগম নূরীর আর কোন ভাই বোন না থাকায় তিনিও একা। তাই তারা কাজ আর সংসার একসাথে সমান তালে চালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। দুজনেই ছিলেন দুজনার ভীষণ আপন। এত সহজ সরল মধুর জীবন যাপন ছিল তাদের যা ইতিহাসের পাতায় লেখার মত্।
৪৭ বছর জীবন নৌকার হাল শক্ত করে ধরে ছিলেন আমাদের প্রাণের মানুষ রোকনুজ্জামান দাদা ভাই । তারপর সেই হাল ছেড়ে তিনি ছেড়ে চলে গেলেন অজানার দেশে । একা হয়ে গেলেন নূরজাহান বেগম। কিন্তু থামলেন না। কাজ করে গেছেন মানুষের জন্য। মানুষের কল্যাণের জন্য। নারী জাগরণ, নতুন লেখক সৃষ্টি, সাহিত্য ও সৃজনশীলতায় নারীকে উৎসাহিত করাই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। তিনি তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বলতেন, ‘মেয়েরা এখন হরহামেশাই বাইরে পড়তে যাচ্ছে। উচ্চ ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরছে। তারপরও আমার মনে হয় নারীকে আরও সুযোগ সুবিধা দেওয়া উচিত। তাহলে সামাজিক উন্নয়ন দ্রুত ঘটবে। যোগ্যতার সুবিচার করতে হবে তাদের।’
তিনি বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য হিসেবে সমাজ সেবা করতেন। যেমন : আপওয়া, জোনটা ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ, মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ লেখিকাসংঘ ইত্যাদি । তিনি ১৯৯৬ সালে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠ চক্রের সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার থেকে রোকেয়া পদক পান। ১৯৯৯ সালে গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি থেকে শুভেচ্ছা ক্রেস্ট। ২০০২ সালে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার। ২০০৩ ও ২০০৫ সালে নারীপক্ষ দুর্বার নেটওয়ার্ক ও কন্যা শিশু দিবস উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে সংবর্ধনা লাভ করেন। সংবর্ধনা পেয়েছেন বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, চট্টগ্রাম লেখিকা ক্লাব, চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘ, ঢাকা লেডিস ক্লাব, ঋষিজ শিল্পগোষ্ঠী, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক ফোরাম, রোটারী ক্লাব প্রভৃতি সংগঠন থেকে। ২০১০ সালে পত্রিকা শিল্পে তাঁর অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক নারী সংগঠন ইনার হুইল ডিষ্ট্রিক্ট ৩২৮ সম্মাননা পান।
তিনি ছিলেন বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। আর তিনি হলেন ২ কন্যা সন্তানের জননী। তাদের হাতে তুলে দিয়ে গেলেন তাঁর লালন করা আর এক সন্তান বেগম পত্রিকাকে। আমরা আশাকরি যোগ্য মায়ের যোগ্য সন্তানেরা তাঁর যথাযথ মর্যাদা রাখতে সক্ষম হবেন। ৫ মে ২০১৬ সালে অসুস্থ অবস্থায় তিনি হাসপাতলে ভর্তি হন এবং সেখানেই চিকিৎসারত অবস্থায় ২৩ মে ২০১৬ তারিখে ঘুমিয়ে পড়েন মায়ের কোলে।

ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী
ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী

Author: ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment