প্রথাবিরোধী ছাত্র আইনস্টাইন

আলবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন মহাবিজ্ঞানী, অংক কষে যিনি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত আলো বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর ল্যাবরেটরি বলতে ছিল মস্তিষ্ক​ এবং যন্ত্রপাতি ছিল কলম ও পেন্সিল। কেমন ছিল এমন একজন বিজ্ঞানীর ছাত্রজীবন? ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন আর দশজনের থেকে একেবারে আলাদা। বালকসুলভ চপলতা তাঁর মধ্যে ছিল না। কথা বলতেও শেখেন অন্যদের থেকে অনেক দেরিতে। স্কুলের পড়াশুনা এবং পরীক্ষা পদ্ধতি তাঁর ভাল লাগত না। আর পড়া মুখস্ত করতে তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। মোট কথা স্কুলে তাঁর ফলাফল মোটেই আশাব্যঞ্জক ছিল না।

আইনস্টাইনের জীবনে দুই ধরনের শিক্ষক ছিলেন। একধরনের ছিলেন শ্রেণী শিক্ষক- তিনি সরাসরি যাদের সংস্পর্শে এসে শিক্ষালাভ করেছিলেন। দ্বিতীয় ধরনের শিক্ষক ছিলেন তারা- তিনি যাদের সংস্পর্শে না এসে, যাদের লেখা পড়ে ও পত্র বিনিময় করে অনেক কিছু শিখেছিলেন। প্রথম শ্রেণীর শিক্ষকদের সঙ্গে আইনস্টাইনের সম্পর্ক ছিল শীতল, এমনকি কোন কোন সময়ে বৈরীতামূলক। কারণ আইস্টাইন গতানুগতিক ধারার ছাত্র ছিলেন না। আইস্টাইনের জীবন ও মানস গঠনে এই দ্বিতীয় ধারার শিক্ষকদের প্রভাব ছিল ব্যাপক।
মাত্র পাঁচ বৎসর বয়সে আইনস্টাইনের জন্য একজন মহিলা গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। একদিন আইনস্টাইন তাঁর পড়ানোর ধরণ দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর দিকে চেয়ার ছুঁড়ে মারেন। ভীত সন্ত্রস্ত শিক্ষক সেই যে পলায়ন করলেন, আর কোনদিন ফিরে আসেননি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি আইনস্টাইন কোনদিন শ্রদ্ধা পোষণ করেননি। পরবর্তী জীবনে তিনি এসকল শিক্ষকদের সামরিক বাহিনীর কর্মচারীদের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন- কাউকে সেপাইর সঙ্গে কাউকে লেফটেন্যান্টদের সঙ্গে। মিউনিখ স্কুলে পড়ার সময় একবার সেখানকার পরিচালক ড. জোসেফ ডিজেনহার্ট আইনস্টাইনকে ডেকে বলেন যে, তার কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মানবোধ সৃষ্টি হচ্ছে না। তিনি আইনস্টাইনকে স্কুল থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন । আইনস্টাইন খুশি মনে তাতে সম্মত হন। জুরিখ জিমনেসিয়াম পলিটেকনিক থেকে কোন ডিপ্লোমা ছাড়াই তিনি বের হন। তবে গণিতে তাঁর অসাধারণ পারদর্শিতার পরিচয় তখন থেকেই পাওয়া যায়। ফলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেন এবং জুরিখের সুইস ফেডারেল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তির চেষ্টা করেন। কারণ ঐ ইনস্টিটিউটে ভর্তির জন্য কোন হাইস্কুল সার্টিফিকেটের বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিন্তু এখানেও তিনি ভর্তি পরীক্ষায় সফলকাম হতে পারেন নি। কারণ গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চ নম্বর পেলেও অন্যান্য বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর ছিল খুবই কম। সেখানকার পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক ফেরিস্ক ফ্রেডারিক ওয়েবার তাঁর পদার্থবিজ্ঞানে গভীর জ্ঞান দেখে তাঁকে সুইজারল্যান্ডে আরাউএর অপেক্ষাকৃত ছোট একটি স্কুলে এক বৎসর পড়াশুনা করে পুনরায় ফেডারেল পলিটেকনিকে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার পরামর্শ দেন। এক বৎসর পর ফিরে আইনস্টাইন ১৮৯৬ সালে অক্টোবর মাসে ফেডারেল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হতে সমর্থ হন। এখানে ছিলেন বিখ্যাত গণিতবিদ হারম্যান মিনকাওস্কি। জ্যামিতির মাধ্যমে সংখ্যাতত্ত্ব, গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞান ও আপেক্ষিকতত্ত্বের জটিল সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষভাবে পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু আইনস্টাইন বেশির ভাগ সময় তাঁর লেকচারে অনুপস্থিত থাকতেন। এ বিষয়ে পরে তাঁকে ক্লাস নোট দিয়ে সাহায্য করতেন তাঁর হাঙ্গেরিয়ান ইহুদী বন্ধু মার্সেল গ্রসম্যান। এই মার্সেলও পরবর্তী জীবনে একজন বিখ্যাত গণিতবিদ হন। আইনস্টাইন যখন তাঁর সাধারণ ‘আপেক্ষিকতত্ত্ব’ নিয়ে কাজ করেন তখন গ্রসম্যান তাঁকে প্রভূত সাহায্য করেন। তিনিই আইনস্টাইনকে তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতত্ত্বের ব্যাখ্যার জন্য নন-ইউক্লিডিয়ান বা উপবৃত্তীয় জ্যামিতি এবং টেনসর তত্ত্ব প্রয়োগের পরামর্শ দেন। আইস্টাইন ওয়েবার এর থার্মোডিনামিক্স এর ক্লাশগুলো নিয়মিত করতেন এবং নোট নিতেন। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষকদেরও তিনি যথেষ্ট জ্ঞানী ও পন্ডিত মনে করতেন না। তিনি মনে করতেন, তাদের কারোই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সর্বশেষ জ্ঞান ছিল না। এ বিষয়ে তিনি মিলেভাকে এক পত্রে লেখেন, ‘‘Unfortunately, no one here at Swiss Federal Polytechnic is up to date in modern physics and I have already tapped all of them without success.’’ পরবর্তীকালে এই মিলেভাকে আইনস্টাইন বিবাহ করেন। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষকদের ক্লাস থেকেও বিরত থাকা শুরু করেন। ফলে পদার্থবিজ্ঞানের ল্যাবরেটরির প্রফেসর জ্যা পারনেট তাকে ক্লাশের মধ্যে সর্বনিম্ন​ নম্বর প্রদান করেন। যে অধ্যাপক ওয়েবারএর লেকচার আইনস্টাইনকে তুলনামূলকভাবে আকর্ষণ করত সেই ওয়েবারেরও তাঁর উপর ভাল ধারণা ছিল না। এর ফলে বিভাগে গবেষণা সহকারী নিয়োগের সময় ওয়েবার আইনস্টাইনের পরিবর্তে অন্য দুইজনকে সুপারিশ করেন যারা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র। এতে আইনস্টাইন অত্যন্ত হতাশ ও ক্ষুব্ধ হন। পরবর্তীকালে ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে’র উপর আইনস্টাইনের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলে তাঁর গণিত শিক্ষক মিনকাউস্কি অত্যন্ত আশ্চর্য হন এই ভেবে যে, কিভাবে তাঁর মত একজন সাধারণ মেধার ছাত্রের পক্ষে এই কাজ সম্ভব হল।


মিউনিখে থাকাকালে ইহুদী প্রথা অনুযায়ী তাঁদের বাসায় প্রতি সপ্তাহে একজন ছাত্রকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো হত। আইনস্টাইনের বয়স যখন দশ বছর তখন ম্যাক্স টালমুড নামে এক মেডিকেল ছাত্রকে তাঁদের বাসায় নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই টালমুড আইনস্টাইনকে সব সময় বিজ্ঞানের উপর কোন না কোন বই উপহার দিতো যেগুলি আইনস্টাইন ভীষণভাবে পছন্দ করতেন। এর মধ্যে ছিল হেনরিক আলেকজান্ডার ভন হামবোল্ডস এর ৫ খন্ডের বই, The Cosmos: Attempt at a Description of the Physical World এবং ইম্যানুয়েল ফার্মা এর Critique of Pure Reason|  এই বইগুলো আইস্টাইনের মনে গভীর রেখাপাত করে।

প্রকৃতপক্ষে আইস্টাইন যে সকল শিক্ষকের ক্লাশ পছন্দ করতেন না সেসব ক্লাসে হয় অনুপস্থিত থাকতেন অথবা উপস্থিত থাকলেও অন্যমনস্ক থাকতেন। তিনি ক্লাশের লেকচারের চেয়ে একাকী নিজে পড়াশুনা করতে বেশি পছন্দ করতেন। জুরিখ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট-এ থাকাকালে আইস্টাইন বিশেষ আগ্রহ নিয়ে পড়তেন অষ্ট্রিয়ান পদার্থবিদ লুডউইগ বোল্টজমান এর স্থির বলবিদ্যার উপর বিভিন্ন বই। তিনি জার্মান পদার্থবিদ হারম্যান ভন হেলমুজ এবং হেনরিখ হার্টজ এর তড়িৎচুম্বকবিদ্যা বিশেষ আগ্রহ নিয়ে পড়তেন। এছাড়া তাঁর উপর যিনি বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তিনি ছিলেন মিউনিখ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আগাষ্ট অক্টো ফপ। ফপ এর লেখা Introduction to Maxwell’s Theory of Electricity বইটি পড়ে আইনস্টাইন আপেক্ষিক ও পরম গতি সম্পর্কে এবং চলমান পরিবাহকের তড়িৎগতিবিদ্যা (electrodynamics) নিয়ে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ হন। আসলে ফপ এর লেখার মধ্যে আইনস্টাইন সেই চিন্তার খোরাক পান যা তিনি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নিয়মিত শ্রেণীকক্ষের শিক্ষায় কখনও পাননি। জুরিখে থাকাকালে আইনস্টাইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন মাইকেল বেসো। তাঁর মাধ্যমে আইনস্টাইন পরিচিত হন আর একজন বিখ্যাত শিক্ষক আর্নেষ্ট ম্যাক এর গবেষণাপত্রের সঙ্গে। আইনস্টাইন যখন জুরিখ থেকে বার্ণ এ যেয়ে পেটেন্ট অফিসের কেরানী হিসেবে চাকুরি নেন তখনও তিনি ম্যাক এর লেখা নিয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। যদিও পেটেন্ট অফিসের কাজ তাঁর ভাল লাগত না তথাপি তিনি বার্ণে দুজন বন্ধুর সংস্পর্শে আসেন যারা তাঁর সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞান ও দর্শন নিয়ে আলোচনা ও মত বিনিময় করতেন। এই দুজন বন্ধু ছিলেন মরিস সলোভিন এবং কনরার্ড হেবিট। তিনি লক্ষ্য করেন যে, দৃষ্টবাদ (Positivism) যা পদার্থ বিজ্ঞানের মূলতত্ত্ব, সম্পূর্ণভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য বস্তু ও রাশিমালার উপর নির্ভর করে। তিনি ইথারের মত অদৃশ্য বা শূন্য অধিবিদ্যার ধারণাকে নাকচ করে দেন।

 

আইনস্টাইন ছাত্র জীবনে ডিজেনহার্ট, ওয়েবার, মিনকাওস্কি, পার্নেট প্রমুখ শিক্ষকের সরাসরি সংস্পর্শে আসেন শ্রেণীকক্ষে। কিন্তু তাঁদের চেয়ে যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন, বোল্টজম্যান, হেলমুজ, হার্ট, ফপ এবং ম্যাক। তবে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, আইনস্টাইন গতানুগতিক ধারার আদর্শ ছাত্র ছিলেন না- তিনি ছিলেন প্রথাবিরোধী ছাত্র। আর তাইতো তিনি পেরেছিলেন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের বিস্ময়কর অধ্যায়ের সৃষ্টি করতে।

 

Author: সৈয়দ জিয়াউল হক

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts