সালজবুর্গের হাতছানি

মিউনিখ হাফথ বানহফ থেকে সালজবুর্গগামী ট্রেন ছাড়তেই জানালা দিয়ে তাকাই। বাইরে চোখজুড়ানো সবুজ-নিবিড় বনানী। পাহাড় ডিঙিয়ে গাছপালার ফাঁকে রোদের ঝিলিক। অদূরে খয়েরি টালির ঘরবাড়ি, মায়াবী গ্রাম। সবুজ পাহাড়ের ঢালে খয়েরি গ্রামগুলো ছবির মতো। কম্পার্টমেন্টটিতে বাঙালি বলতে রওশন হাবীব খোকন জার্মান প্রবাসী বন্ধু আর আমি। সবাই ইউরোপের নানা দেশ থেকে ছুটছে সালজবুর্গে।
ঢাকা থেকে ফোনে বন্ধু খোকনের কাছে নামটি যখন প্রথম শুনি, তখন এর কদর বুঝিনি। তার পীড়াপীড়িতে সালজবুর্গ শব্দটি মনে গেঁথে গিয়েছিল । জার্মান সফরের শুরুতে কোলনের ব্যস্ততার মধ্যে এ নাম ভুলিনি একবারও। কোলনের কাজ সেরেই ছুটি ফ্রাঙ্কফুর্টে। সেখান থেকে মিউনিখ। মূল আকর্ষণ, সালজবুর্গ।
আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ। শীত ততটা জাঁকালো নয়। কোলন ভ্রমণ শেষে সঙ্গে আসা অন্যরা ইউরোপের একেক দেশের দিকে পাড়ি জমিয়েছেন। আমি আর সাংবাদিক ওবায়দুল কবির ট্রেনে চেপে সোজা ফ্রাঙ্কফুর্ট। ফ্রাঙ্কফুর্ট বহুতল ট্রেন স্টেশনে ওবায়দুল কবিরের আত্মীয় মোস্তফা ফারুক গাড়ি নিয়ে এসে হাজির। মোস্তফা ফারুকের গাড়িতে চেপে তার বাসায় উঠি। পরদিন ওবায়দুল কবির প্যারিস, আমি মিউনিখ মুখে ছুটলাম। ফ্যামিলি ফ্রেন্ড রওশন হাবীব খোকন আমার সেখানকার গাইড।
ফরিদপুরের খোকন দীর্ঘদিন জার্মানপ্রবাসী। ঢাকা ও জার্মানীতে ব্যবসা গড়তে গিয়ে ব্যবসায়ে মার খেয়েছেন। এখন শুরু করেছেন চাকরি। স্ত্রী ও দুই ছেলের জার্মানী যাওয়ার ভিসা প্রসেসিং চলছে বলে স্ত্রী-পুত্রদের জন্য বড় বাসা ভাড়া নিয়েছেন। মিউনিখে দীর্ঘদিন পর বন্ধুদর্শন করে আর খুশির অন্ত রইল না।
আজ সালজবুর্গের পথে ট্রেনে পর্যটকের ঠাসা ভিড় দেখে জায়গাটি সম্পর্কে আন্দাজ করতে কষ্ট হলো না। দ্রুতগামী ই্উরো রেল যতই ছুটে চলে, ততই বাইরে তাকিয়ে অবাক হয়ে যেতে থাকি। আল্পস পর্বতমালার পাদদেশ ছুঁয়ে স্টেশনের পর স্টেশন পেরিয়ে ট্রেন যখন সালজবুর্গ পৌঁছে, তখন ঝলমলে রোদে ভরা দুপুর। তাপমাত্রা ১০ থেকে ১৮ ডিগ্রিতে ওঠা নামা করছে। পাখির চোখে তাকালে মনে হয়, আল্পস পর্বতরাজির পাদদেশে খরস্রোতা সালজাক নদী বিধৌত সালজবুর্গ যেন ফুল হয়ে ফুটে আছে। আকাশমুখী পর্বতশৃঙ্গে, খরস্রোতা নদীর কলতানে আর ছিমছাম অলিগলির সুনসান নীরবতায় পশ্চিম অস্ট্রিয়ার ছোট্ট শহরটি যেন রূপের মাধুরী ছড়িয়েছে।

সালজবুর্গ রেলস্টেশনের বাইরে বেরিয়ে খোকন আর আমার ঘোর কাটে না। স্টেশনের বাইরে এসে এলোমেলো ছবি তুলতে থাকি। ঝলমলে রোদ পেয়ে পর্যটকরা ছুটোছুটি করছে। শীতপ্রধান দেশের মানুষ রোদ পেলে তা তিলে তিলে উপভোগ করে। রোদেলা দিনে আনন্দ খুশির অন্ত থাকে না তাদের। আমাদের অনুভবে তাপমাত্রা খানিকটা ঠান্ডা। এরকম ঠান্ডায়​ তির্যক রোদের উষ্ণতা বেশ উপভোগ্য। স্টেশন সোজা রাস্তাটি নদী পেরিয়ে পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা একটি ঐতিহাসিক ভবনের দিকে চলে গেছে। সে রাস্তা ধরে আনমনে হাঁটতে থাকি।
খরস্রোতা সালজাক নদী শহরটিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। সালজাকের ওপর অনেকগুলো সেতু। স্টেশনসোজা রাস্তাটি নদী পেরিয়ে চলে গেছে শহরের শেষ প্রান্তের পাহাড় পর্যন্ত। সেতু পেরিয়ে কখন যে হাজার পর্যটকের ভিড়ে নদীতীরের পথ ধরেছি, সে খেয়াল নেই। পিঁপড়ার সারির মতো নদীতীর থেকে হেঁটে চলা পর্যটকরা ভিড় করছে নদীলগ্ন এক হলুদ পুরনো ভবনের সামনে। ওই ভিড়ে নিজেদের আবিস্কার করে জানতে পারি দুবন্ধু দাঁড়িয়ে বিটোফেন খ্যাত আমাদিয়ুস মোজার্টের বাড়ির সামনে।
পাহাড় আর খরস্রোতা সালজাক নদীর মাঝখানে এই হলুদ বাড়িতে সঙ্গীতগুরু মোজার্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম ১৭৫৬ সালের ২৭ জানুয়ারি। মোজার্টের জন্যই পশ্চিম অস্ট্রিয়ার ছোট্ট শহর সালজবুর্গ বিশ্ব পরিচিতি পেয়েছে। মোজার্টকে স্মরণ করতে বিশ্বসঙ্গীতপ্রেমীরা প্রতি বছর মিলিত হন এখানকার মিউজিক ও ড্রামা ফেস্টিভ্যালে। বিশ্বের সব দেশ থেকে মোজার্টপ্রেমীরা ছুটে আসেন সালজবুর্গ। জার্মানীর জাতীয় এয়ারলাইন্স লুফথান্সার বিমান রিজার্ভেশনভিত্তিক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ‘আমাদিয়ুস’ এর নামকরণ হয়েছে মোজার্টের নামে।
সালজাক তীরের যে দিকটিতে আমাদিয়ুস মোজার্টের জন্মস্থান, তার পিছনে পাহাড়। সামনে নদী। নদীর ওপর পাড়ের অন্য বাড়িতে মোজার্ট অবস্থান করেছেন বহু দিন। এই পাড়েই মূলত সালজবুর্গ শহর। মোজার্ট এর স্মৃতিধন্য সালজাক নদীর দুটি পাড়ই এখন পর্যটকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। মোজার্ট-মেনিয়ায় বিভোর মানুষের পদভারে মুখরিত সালজবুর্গের রাস্তাঘাট। রাস্তায় রাস্তায় মোজার্টের প্রতিকৃতি, ভিউকার্ড। দোকানে দোকানে অনায়াসে মেলে তাঁর কীর্তিগাঁথার বই-বুকলেট। মোজার্ট নামের এই বিস্ময় সুরবালক ৩৫ বছর বয়সে ১৭৯১ সালের ৫ ডিসেম্বর মারা যান। কোন রকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও সুরের সাধনায় তিনি ছিলেন অনন্য। তাঁর বাবা লিওপল্ড মোজার্টও ছিলেন ভায়োলনিস্ট। ছয় বছর বয়সে মোজার্ট সঙ্গীতের কারিশমা দেখান এবং ইউরোপ জুড়ে কনসার্টে অংশ নেন। ১৭৮১ সালে একটি গির্জার অনারারি বেহালাবাদকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। মোজার্ট দ্রুত ওই পদ ছেড়ে ইউরোপের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। তাঁর সঙ্গীত কেরিয়ারে জার্মানীর ম্যানেহেইম ও মিউনিখ আলাদা জায়গা দখল করে নেয়। দুই শহরে তিনি বহু কনসার্টে অংশ নেন । আজ গোটা ইউরোপের মধ্যে ‘মুনশেন’ নামে খ্যাত মিউনিখ যে বিশ্বজুড়ে অপেরা হাউজের জন্য সুখ্যাতি লাভ করেছে, তার মূলে রয়েছে মোজার্টের অবদান। ইউরোপের নানা শহর ও লন্ডন ঘুরে ঘুরে মোজার্ট যেসব কনসার্টে অংশ নেন, তা কালজয়ী শিল্পে পরিণত হয়েছে।

সালজবুর্গ নামটি তৈরি হয়েছে জার্মান ভাষার সালজ (সল্ট) আর বুর্গ (ফোর্ট) শব্দ সহযোগে। সালজবুর্গ লবণ খনির নাম ইউরোপ জোড়া। জার্মান ভাষার সালজ আর বুর্গ শব্দের মিলিত অর্থ দাঁড়াচ্ছে লবণের দুর্গ। মোজার্ট-মেনিয়ার কারণে আঠারো শতকের পর সালজবুর্গ পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ছোট্ট শহরটির প্রাচীন ঐতিহ্যেরও কমতি নেই। আল্পস পর্বতমালার মধ্যভাগে অবস্থিত শহরটিতে রয়েছে এগারো শতকের দুর্গ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭শ ফুট উচ্চতায় পাহাড় শীর্ষের এই দূর্গ দেখতে পর্যটকরা দল বেঁধে ছোটে প্রতিদিন। সালজবুর্গের ক্যাথেড্রাল ওই অঞ্চলের মধ্যে সবচে’ প্রাচীন।
দিনভর ঘুরে সন্ধ্যায় আবার মিউনিখ ফেরা। ছোট্ট পাহাড়ি শহরটি ছেড়ে আর উড়–মন ফিরে যেতে চায় না। রাস্তায় আনমনে দু’বন্ধু হাঁটি আর পেছনে ফিরে ফিরে দেখি। মনে হয় পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা নয়নকাড়া সালজবুর্গ যেন হাতছানি দিচ্ছে। অদূরে রেলস্টেশনে মিউনিখগামী ট্রেনের হুইসেলে সম্বিত ফিরে পাই। ফিরতে হবে মিউনিখের ইটপাথরের দঙ্গলে।

Author: মাহমুদ হাফিজ

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

6 thoughts on “সালজবুর্গের হাতছানি

  1. কাব্য করিম

    লেখকের নামটির ফন্টসাইজ আরেকটু বড় হতে পারে। বেশি ছোট মনে হচ্ছে।

    1. মাহমুদ হাফিজ

      সম্পাদক মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

  2. জেসমিন আক্তার

    অনবদ্য ভ্রমণরচনা। এই লেখকের আরও লেখা চাই।

  3. কাব্য করিম

    চমৎকার। লেখকের ভ্রমণরচনা আরও পড়েছি। পূর্বাপর চমৎকার। আরও লেখা চাই। লেখকের নামের ফন্টটি আরেকটু বড় হলে ভাল হবে।

    1. কাব্য করিম ও মাহমুদ হাফিজ,
      লেখকের নামের ফন্টের আকার বৃদ্ধি চেস্টা করছি। প্রতিক্রিয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। – রক্তবীজ