সুচিত্রা সেন-আলো আড়ালের রহস্যময়তা

তখন ক্লাস সিক্স সেভেনে পড়ি। পয়সা জমিয়ে বন্ধুদের সাথে লুকিয়ে সিনেমা দেখি । যশোরের ‘তসবির মহল’ আর ‘নিরালা’ সিনেমা হল আমাকে অহর্নিশ টানে। সিনেমা হলের অন্ধকার কুঠুরির ভাসমান জ্বলজ্বলে পর্দা নিয়ে যায় মায়ার জগতে। নায়িকার কান্নার সাথে গলা মিলিয়ে কাঁদি, হাসির সাথে হাসি। সে এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতা! রাজ্জাক কবরী সুচন্দা শর্মিলি সুজাতা সবাইকেই অপরূপ লাগে। আনোয়ার হোসেন আর রোজি তথন আদর্শ ভাই-ভাবির প্রতীক । রাজু আহমেদকে দেখলে রাগে শরীর জ্বলে যায় । একটা ছবি দেখার পর আর একটা কবে দেখব সেই অপেক্ষা জেগে থাকে চোখে।

দেশের নায়িকাদের চিনি তবে বাইরের নায়িকাদের ভাল করে চিনে উঠতে পারিনি তথনও। সে সময় একদিন বন্ধু স্মৃতি বলল, ‘সুচিত্রা আর অপর্ণা এ দুজনের মধ্যে কাকে বেশি ভাল লাগে তোর?’
প্রশ্ন শুনে কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ি। দু’জনের কাউকেই তো চিনি না। কাকে ভাল লাগে বলব কি করে! তারপর ঝাড়া দিয়ে উঠি। হঠাৎ মনে পড়ে, দিন কয়েক আগে অপর্ণার একটা ছবি দেখেছিলাম। সজোরে বলি, ‘অপর্ণা, অপর্ণা।’ বন্ধু কেমন একটা হাসি দিয়ে বলে, ‘কী যে বলিস, এই তোর পছন্দের ছিরি! আমার তো পছন্দ সুচিত্রা।’ এরপর সে বড় মানুষের মতো ভারি কন্ঠে বলে, ‘সুচিত্রার বিকল্প শুধুই সুচিত্রা।’
খানিকটা দমে যাই। বরাবরই ভাল ছাত্রি আমি। স্কুলে সহপাঠি আর শিক্ষকদের কাছে মূল্য আছে আমার । এভাবে কেউ কথা বলে না। কিছু না বলে চলে আসি গোমড়া মুখে আর অনুসন্ধানে নেমে পড়ি সুচিত্রার।

আজও আমি অপর্ণাকে পছন্দ করি। তবে সুচিত্রার জায়গাটা কাউকেই দিতে পারিনে। তাঁর সেই নিজস্ব স্টাইলের ব্লাউজ আর সাজ, ঘাড় ঘুরিয়ে মোহময় হাসি, চোখের সুতীক্ষ চাহনি আর বহুমাত্রিক উপস্থাপনা, অভিনয়শৈলি, নান্দনিকতা, আধুনিকতা, সাহসিকতা, স্টাইল আমাকে মোহবিষ্ট করে তোলে।
১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল পাবনার বেলকুচি থানার রাজবাড়িতে জন্ম সুচিত্রার। করুণাময় ও ইন্দিরা দাশগুপ্তের সেজ মেয়ে। বাবা মা আদর করে ডাকতেন রমা। পাবনার হেমসাগর লেনের বাড়িতে কেটেছে শৈশব। পাবনা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে পড়েছেন ক্লাস নাইন পর্যন্ত।
দেশবিভাগ যেমন আমাদের অনেক কিছুতে ভাগ বসিয়েছে, তেমনি ভাগ বসিয়েছে সুচিত্রাতেও। দেশবিভাগের পর কলকাতায় পাড়ি জমায় রমার পরিবার। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বালিগঞ্জের শিল্পপতি দীবানাথ সেনের সাথে বিয়ে হয় তাঁর।
প্রথম দিকে সুচিত্রার ইচ্ছে ছিল না সিনেমায় অভিনয় করার। তিনি চেয়েছিলেন গায়ক হতে। অডিশনও দিয়েছিলেন। কিন্তু পরিচালক সুকুমার দাশগুপ্ত তাঁকে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দেন। আর সুকুমার দাশগুপ্তের সহকারি নিতীশ রায় নামকরণ করেন সুচিত্রা। বিয়ের ৩-৪ বছর পর তিনি সিনেমায় অভিনয় করতে শুরু করেন।
শুরুতে চলচ্চিত্রের বৈতরণীতে পোক্ত আসন করা অত সহজ ছিলো না। কলকাতার রক্ষণশীল সমাজ মেয়েদের ছবিতে অভিনয় করাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানায়নি। মধ্যবিত্তের প্রচলিত ধ্যান ধারনা, ভাবনাতে ঝড় তুলেই সিনেমায় আসেন সুচিত্রা। তাঁর প্রথম ছবি ‘শেষ কোথায়’ শেষ পর্যন্ত রিলিজ হয়নি। প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘বারো নম্বর কয়েদী।’ এ ছবির মাত্র ১২দিন পর মুক্তি পায় উত্তম সুচিত্রা জুটির প্রথম ছবি ‘সাড়ে ৭৪।’ এরপর অগ্নিপরীক্ষা, শাপমোচন, সাগরিকা, হারানো সুর, পথে হলো দেরি বক্স অফিসে ঝড় তোলে। তারপব শুধু সামনে এগিয়ে চলা।

আমার দেখা সুচিত্রার প্রথম ছবি ‘সাগরিকা।’ তারপর বুভুক্ষুর মতো তাঁর ছবিগুলো গিলেছি আমি। সুচিত্রা বার বার নিজেকে প্রমাণ করেছেন। নিজেকে অতিক্রম করে উন্নীত হয়েছেন নায়িকা থেকে মহানায়িকায়। বসন্ত চৌধুরীর সাথে ‘দীপ জ্বেলে যাই ছবি’তে দাপুটে অভিনয় করে প্রমাণ করেছেন, তিনি শুধু উত্তমের নয়িকা নন, তিনি সব নায়কের নায়িকা, সবার নায়িকা। সৌমিত্রর সাথে করা ‘সাত পাঁকে বাঁধা’ তাঁকে ১৯৬৩ সালে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে শ্রেষ্ঠ নায়িকার পুরস্কার এনে দেয়। ‘উত্তর ফাল্গুনী’তে তিনি দেখান আধুনিকতা, প্রতিবাদ আর স্মার্টনেস। পরিণত হন স্টাইল আইকনে। পুরুষ শাসিত সমাজে নারীদের প্রতিষ্ঠার পথ দেখায় এই ছবি। ১৯৫৪ সালে ‘দেবদাসে’ বলিউডের ট্রাজেডিং কিং দিলীপ কুমারের বিপরীতে অভিনয় করে দৃষ্টি কাড়েন। সঞ্জীব কুমারের সাথে ‘আধি’ আর ধর্মেন্দ্রর সাথে ‘মমতা’ ছবিতে অভিনয় করে নিজের আসন উঁচুতে তোলেন। মমতা ছবিতে অভিনয়ের সময় তিনি ধর্মেন্দ্রর নাম দিয়েছিলেন ‘ডি।’ স্যুটিং চলাকালে তিনি তাকে ডি নামেই ডাকতেন।
১৯৭৮ সালে তাঁর শেষ ছবি ‘প্রণয় পাশা’ ফ্লপ করে। এরপর তিনি চলে যান পর্দার অন্তরালে। সেই অন্তরাল থেকে বেরিয়েছিলেন মাত্র দুবার। উত্তম কুমার মারা গেলে মাঝরাতে আর একবার ভোটের পরিচয়পত্রের জন্য বাধ্য হয়ে ছবি তুলতে । এমনকি জনসমক্ষে বের হতে হবে বলে ২০০৫ সালে ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার নিতে অস্বীকার করেন।
প্রতিভাময়ী এই অভিনেত্রীকে নিয়ে ছবি বানাতে চেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। কিন্তু তিনি ডেট মিলাতে না পারায় সত্যজিৎ শেষ পর্যন্ত ছবিটিই বানাননি।

প্রচন্ড আত্মাভিমানী ছিলেন তিনি, ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। শোনা যায়, একবার ধর্মেন্দ্রর ছবি সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ধর্মেন্দ্র নাকি মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে ফিল্মি কায়দায় তাঁকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যা তিনি পছন্দ করেননি।
২৫ বছরের উদ্ভাসিত অভিনয় জীবন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে চিরতরে অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন সুচিত্রা। পুজো আর্চায় দিন কাটতো তাঁর । কোন এক আশ্রমে দীক্ষাও নিয়েছিলেন।
অন্তরালে থাকতে থাকতেই একসময় অসুস্থ হয়ে পড়েন । ফুসফুসের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে বেলভিউ হাসপাতালে ভর্তি হন। আর ২০১৪ সালে ১৭ জানুয়ারি সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে চিরবিদায় নেন এই কিংবদন্তি নায়িকা। তখন তার পাশে ছিল কন্যা মুনমুন, নাতনি রিয়া আর রাইমা।
চলে গেলেন সুচিত্রা। কিন্তু আসলেই গেলেন কি? ১৯৭৮ তেকে ২০১৪ দীর্ঘ সময়ে সবার মাঝে থেকেও তিনি ছিলেন সবার আড়ালে । আর আজ সবার আড়ালে গিয়েও তিনি রয়েছেন হৃৎমাঝারে।

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

2 thoughts on “সুচিত্রা সেন-আলো আড়ালের রহস্যময়তা

  1. মাহমুদ হাফিজ

    মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বর্ণাঢ্য জীবনের ওপর এই সুলিখিত নিবন্ধ নতুন প্রজন্মকে প্রাণিত করবে।

  2. কাব্য করিম

    তথ্যবহুল। লেখককে ধন্যবাদ।

মতামত দিন Leave a comment