তিনি মানুষ তিনি আনিসুজ্জামান

শুভ জন্মদিন স্যার। কখনও সামনাসামনি বলা হয়নি, আজ আড়াল থেকে বলি, ‘আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষদের একজন আপনি।’ আপনিই তিনি যার পা থেকে মাথা অবধি পুরোটাই মানুষ, কোনো ভেজাল নেই। প্রবাদ আছে, ‘বিপদে বন্ধুর পরীক্ষা হয় ।’ স্যার আপনি কখনই আমার বন্ধুস্থানীয় নন, সেটা ভাবার ধৃষ্টতাও আমার নেই। আপনাকে বরাবরই দূর থেকে দেখেছি একজন মহৎ মানুষ , একজন শিক্ষক আর দেশপ্রেমিক হিসেবে । কিন্তু আপনি যে এত কাছের, এত আপন আর সাদাসিধে মানুষ তা আপনার কাছে না এলে জানতাম না।
মনে পড়ে সেদিনটার কথা। এডর্ন পাবলিকেন্সের একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম জাদুঘরে। আপনি ছিলেন প্রধান অতিথি। এর আগে অল্প-স্বল্প কথা হয়েছে আপনার সাথে দু’চারবার। আমি সামনের সারিতে বসা। আপনি এলেন, সালাম করলাম। আপনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘কেমন আছো আফরোজা। চেহারা এত মলিন দেখাচ্ছে কেন?’ আমি অভিভূত হলাম, আপনি আমার নাম মনে রেখেছেন! স্নেহের স্পর্শ পেয়ে চোখে জল এলো। সে জল চেপে রাখতে পারলাম না। ধরা গলায় বললাম, ‘স্যার আমার হাসবেন্ড মারা গেছেন।’
‘সেকি বলছ কি !’ কাঁধ থেকে হাত খসে পড়ল আপনার। পরক্ষণে আরো নিবিড়ভাবে হাতটা রাখলেন আপনি। বললেন, ‘কিছুই জানি না আমি।’
‘যেন আপনি আমার কত আপনজন। যেন আপনার জানবারই কথা ছিল।’
এবার চোখ থেকে টপ টপ করে জল গড়িয়ে মেঝে ভিজাতে লাগল। স্যার, আপনি করুণ চোখে সেদিকে তাকালেন। মঞ্চ থেকে ডাক পড়ল আপনার । আপনি উঠতে উঠতে বললেন, ‘পরে তোমার সাথে কথা বলব।’
স্যার, সেদিন অনুষ্ঠান শেষ হবার আগেই চলে গিয়েছিলেন আপনি। আমি বাসায় ফিরে এলাম। মনে একটু কষ্ট হল। আপনার সাথে কথা বলা হলো না!
কিছুক্ষণ পরে এডর্ন পালিকেশন্সের কর্ণধার জাকির ভাই ফোন করলেন। বললেন, ‘আপা এটাই আপনার নন্বর তো? আমি চেক করে নিলাম। আনিসুজ্জামান স্যার চেয়েছেন।’
আর পরদিন দুপুরে ফোন বেজে উঠল, আপনি ফোন করেছেন ।
‘ আফরোজা আমি আনিসুজ্জামান বলছি ..তুমি কি বাসায় আছ? আমি আসছি । বাসার ঠিকানাটা বলো।’ আমি অনেক কিছু পেয়ে গেলাম।
সেই শুরু। তারপর অনেকবার আপনি আমার বাসায় এসেছেন, ছেলে মেয়ের সাথে কথা বলেছেন, ছবি তুলেছেন, ফোন করেছেন, খোঁজ খবর নিয়েছেন। আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আপনার সাথে দেখা করেছি ।
স্যার আপনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, বিদেশে গিয়েছিলেন , হয়তো এখনও ততটা সুস্থ নন। শুধু চিন্তিত নয়, ভীতও ছিলাম আমি। সকালে প্রথম আলোয় আপনার ছবি দেখে মন ভালো হয়ে গেল।
আর একবার আমার বাসায় আসুন স্যার। অনেক কথা বলার আছে আপনাকে। আপনার মতো সমব্যথী আর দরদী এ পৃথিবীতে ক’জন আছে স্যার!
আমার জীবনে তেমন বিশেষ কিছু প্রাপ্তি নেই স্যার। যেটুকু আছে তার অন্যতম আপনার স্নেহ আর আশীর্বাদ পাওয়া । তাতেই আমি ধন্য স্যার।
আজ জন্মদিনে আপনাকে নিয়ে অনেকেই অনেক কিছু লিখবে, আনেক কিছু বলবে। ফুল আর উপহার দেবে। আমি আামার অন্তরের শ্রদ্ধাটুকুই দিলাম। হাজার বছর বেঁচে থাকুন স্যার আমাদের ছায়া হয়ে।

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts