ভিক্টর​ হুগোর ‘লা মিজারেবল’ সীমার মাঝে অসীমের ঠিকানা

ছেলেবেলা থেকেই বই পড়ার অভ্যাস আমার। বাড়িতে ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিল। সেখানে দেশ বিদেশের প্রচুর সংগ্রহ ছিল। আমার চোখে আজও ভাসে গোর্কির মা, রবীন্দ্রনাথের নৌকাডুবি, যাযাবরের দৃষ্টিপাত, অবধূতের মরুতীর্থ হিংলাজ নামের বইগুলির চেহারা। মনে পড়ে দস্তয়ভস্তির ‘ইডিয়ট’, আলেকজান্ডার দ্যূমার ‘থ্রী মাস্কেটিয়ার্স’ এর মতো অনেক বইয়ের কথা। বাড়ির আলমারিতেই পেয়েছিলাম হুগোর ‘লা মিজারেবল।’ সেই থেকে হুগোকে পড়া আর মুগ্ধতা।
আজ ভিক্টোর হুগোর জন্মদিন।
ভিক্টর হুগো পুরো নাম ভিক্তর মারি হুগো । তিনি ফরাসি সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, এবং মানবাধিকার কর্মী। ১৮০২ সালের আজকের দিনে জন্মে তিনি প্রয়াত হন ২২মে ১৮৮৫ সালে । তাকে বলা হয় উনিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারকারী রোমান্টিক লেখক । লা মিজারেবলস এবং দা হাঞ্চব্যাক অভ নটরডেম তাকে অমর করে রেখেছে।
হুগো প্রবলভাবে প্রভাবিত ছিলেন রোমান্টিসিজম নামক সাহিত্যিক ধারার অগ্রপথিক এবং ১৯ শতকে ফ্রান্সের প্রখ্যাত চরিত্র François-René de Chateaubriand দ্বারা। যৌবনে তিনি প্রতিজ্ঞাও করেছিলেন , হয় Chateaubriand এর মতো হবেন অথবা কিছুই হবেন না। Chateaubriand এর মত হুগোও রোমান্টিসিজমের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যান। রিপাবলিকানিজমের সমর্থক হিসেবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এমনকি রাজনৈতিক মনোভাবের কারণে নির্বাসনে পর্যন্ত যেতে বাধ্য হন । তার রচনায় আবেগ আতিশয্য ছিল, ছিল বাগ্মীতা । আর সে কারণেই অল্প বয়সে সাফল্য এবং খ্যাতি অর্জন করেন। হুগোর প্রথম কবিতা সংকলন (Odes et poésies diverses) ১৮২২ সালে প্রকাশিত হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০। ১৮২৬ সালে প্রকাশিত তাঁর পরবর্তী বইটিই (Odes et Ballades) তাঁকে একজন মহান কবি, সুরকার এবং গীতিকার হিসেবে সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়।
লা মিজারেবলের কথা বলছিলাম লেখার শুরুতে।
এই উপন্যাস ফরাসি বিপ্লবের পটভূমিকায় রচিত । রচনায় একযোগে সন্নিবেশ ঘটেছে তৎকালীন ফ্রান্সের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনীতি এবং ফরাসী সমাজের ভালো-মন্দ, নীতি-নৈতিকতা, দর্শণ, ধর্ম । প্রাধান্য পেয়েছে মেহনতি মানুষের যাপিত জীবনের কথা।

Misérables শব্দের অর্থ হতভাগ্য। উপন্যাসের মূল চরিত্র জাঁ ভালজাঁ (Jean Valjean) সত্যিই এক হতভাগা। তার জীবনে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা এ উপনাসের উপজীব্য। ক্ষুধার তাড়না সহ্য করতে না পেরে মাত্র একটুকরো রুটি চুরি করে ভালজাঁ । ভাঁলজার বয়স তখন ১২ বছর। ওই বয়সে সে দন্ডিত হয় ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ডে। জেলে দন্ডভোগকালে কষ্ট সহ্য করতে না পেরে সে বারেবারে পালানোর চেষ্টা করে। আর বারবারই সে ধরা পড়ে। শাস্তি স্বরূপ দন্ড বাড়তে বাড়তে ১৯ বছরে গিয়ে দাঁড়ায়। সুদীর্ঘ ১৯ বছরের জেলজীবন পার করে জাঁ ভালজাঁর সমাজের প্রতি বিতশ্রদ্ধা জন্মায় । সে হয়ে ওঠে তথাকথিত অমানুষ।
এমনকি যে পাদ্রি তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিল তার বিড়ি চুরি করে সে ধরা পড়ে। কিন্তু, পাদ্রির মহানুভবতায় সে ছাড়া পায়।
এই ঘটনাটি তাকে আমূল বদলে দেয় । অপরাধী জাঁ ভালজাঁ পরিচয় লুকিয়ে নাম নেয় ম্যাদেলীন। কঠোর পরিশ্রম করে। আর একসময় হয়ে ওঠে ফ্যক্টরী মালিক এবং শহরের মেয়র। তখন তার জীবনে এসেছে অনেকটাই শান্তি আর স্বস্তি। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। শহরে নতুন আসা পুলিশ ইন্সপেক্টর জাঁভার্ট (Javert) চিনে ফেলে তাকে।
সুতরাং পালাতে হয় ভাঁলজাকে। পালানোর সময় ভাঁলজা সাথে নিয়ে যায় তার ফ্যাক্টরির কর্মচারী, তার ভালবাসার মানুষ ফন্টিনের আগের প্রেমিকের সন্তান কোসেতকে ।

প্যারিস শহরের এখানে ওখানে লুকিয়ে কাটে পরের দিনগুলো। জাঁভার্ট খুঁজতে থাকে তাকে। কোসেত ক্রমে বড় হয়। রাজতন্ত্রবিরোধী বিপ্লবী মরিসের (Marius) প্রেমে পড়ে সে। ভাঁলজার পছন্দ হয় না। তবু মেয়ের সুখের কথা ভেবে মেনে নেয়। অন্যদিকে, বিদ্রোহ চলাকালে বিদ্রোহীদের হাতে আটক জাঁভার্টকে বাঁচিয়ে দেয় ভালজাঁ। বিদ্রোহে আহত মরিসকেও মরণপণ করে বাঁচায়। কিন্তু, শেষ মূহুর্তে জাঁভার্টের হাতে ধরা পড়ে যায়। তখন, ভালজাঁ নিজের প্রাণের বিনিময়ে ভিক্ষা চায় মরিসের জীবন।
আশ্চর্য হয়ে যায় জাঁভার্ট। মানসিক দোটানায় পড়ে ছেড়ে দেয় ভালজাঁকে । আর অতীত জীবনের গ্লানি সইতে না পেরে সীন নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। শেষ জীবনটা কোসেত আর মরিসকে নিয়ে ভালই কাটে ভালজাঁর।

উপন্যাসটি দীর্ঘ ৫ ভলিউমে প্রকাশিত। এত অল্প কথায় কাহিনি বোঝানো সম্ভব না। এর ব্যাপ্তি অসীম। প্রকাশের পরই বইটি ফরাসী বোদ্ধা মহলে প্রচন্ড সাড়া ফেলে। এ নিয়ে একটা গল্প গল্প আছে । গল্পটা এমন, লা মিজারেবল প্রকাশের সময় হুগো ফ্রান্সের বাইরে ছিলেন। বইয়ের কাটতি কেমন জানতে তিনি প্রকাশককে চিঠি লেখেন কাগজে শুধুমাত্র একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?) দিয়ে। আর প্রকাশক জবাব দেন চিঠিতে একটা বিরাট আশ্চর্য্যবোধক চিহ্ন (!) লিখে। এটাই নাকি বিশ্বের সবচেয়ে ছোট চিঠি।

পৃথিবীর অনেকগুলো ভাষায় অনুবাদ হয়েছে লা মিজারেবল। নির্মিত হয়েছে কমপক্ষে তিন ডজন চলচ্চিত্র। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে বই এবং চলচ্চিত্র দুটোই আজও পৃথিবীব্যাপী পাঠক দরশকদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয় ।
জন্মদিনে প্রিয় লেখক ভিক্টর হুগোর স্মৃতি আর কীর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts