অভিশাপ

অভিশাপ

ছোট ছেলেটা কতদিন ধরে ইলিশ মাছের বায়না ধরেছে। পহেলা বৈশাখের অপেক্ষায় রেখেছিলেন গফুর উদ্দিন।সরকার তো এখন পহেলা বৈশাখ উপলক্ষেও বোনাস দেন। সেই বোনাসের আশায় ছেলেকে প্রবোধ দিচ্ছিলেন এতো দিন। কিন্তু বোনাসের টাকা হাতে পাওয়ার আগেই তার চেয়ে ঢের বেশি টাকা ঋণ হয়েছে অফিসে। প্রয়োজন কি আর প্রবোধ মানে? আজ মেয়ের প্রাইভেট টিউটর টাকা চেয়েছে তো কাল বউয়ের ঔষুধ লাগবে অথবা পরশু ছেলেকে স্কুলের শিক্ষক কান ধরে দাড় করিয়ে রেখেছিলেন ড্রেসের জুতা না পরে আসার কারণে।এরকম কতশত প্রয়োজন। তার উপর স্কুলের গাদা গাদা বেতনের কথা না হয় বাদই থাকল। নামিদামী স্কুলে না পড়ালে নাকি সন্তান মানুষ হবে না। আরে বাবা আগে তো প্রায় সবাই গ্রামের প্রাইমারী স্কুল থেকে লেখাপড়া করেই ডাক্তার-মাস্টার হয়েছে। এখন হতে দোষ কি?আর একটা কি যেন বের হইছে “এ প্লাস (এ+)”। ওটা না পেলে নাকি সে লেখাপড়ার “ল” টাই জানে না।

পহেলা  বৈশাখের দিন  আপন মনে সমসাময়িক নানা বিষয়ের উপর এমন খিস্তি দিতে দিতে বাজারে ঢুকেছিল গফুর উদ্দিন।যদিও অনেক কেনাকাটা আছে তারপরও সোজা চলে গিয়েছিল মাছের বাজারে। গিয়ে ইলিশের দাম জিজ্ঞাস করতেই দোকানদার যে দাম বলেছিল তাতে গফুর উদ্দিনের হার্ট্ এ্যাটার্ক্ হওয়ার জোগাড়। তারপর ও বলেছিল একটু কম রাখতে। দয়ার শরীর দোকানদার বলেছিল কেজি প্রতি দশটাকা কম রাখতে পারবেন, এরবেশি না। আস্তে করে সেখান থেকে সরে এসেছিল গফুর উদ্দিন।অন্যান্য মাছের দাম জেনে নিয়ে সবথেকে কম দামের পেট পঁচা কিছু মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল। ছেলেটা অনেক আগ্রহ করে বাজারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘বাবা ইলিশ এনেছ?’ ‘নারে বাবা ইলিশ শেষ হয়ে গেছে। আরো দুএকদিন আগে বাজারে যাওয়া লাগত।’ ‘কে বলেছে? লিটনের বাবাকে আজ বিকালেই আনতে দেখলাম।’ ‘ওই তো হয়তো বিকালে ছিল, কিন্তু এখন নেই।’

ছেলে কি বুঝেছিল গফুর উদ্দিন তা বুঝতে পারেনি। কিন্তু নিজেকে সে কিছুতেই বোঝাতে পারছিল না। তার বাবা তো তাদের সব ইচ্ছাই কমবেশি পূরণ করেছেন।তাহলে সে কেন তার সন্তানদের ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে পারছে না।এটা কি তা পাপের ফল নাকি অদৃষ্টের লিখন? নাকি সৎ পথে চলার শাস্তি?

উদভ্রান্তের মতো ছুটে চলে গিয়েছিল  রাস্তায়। হাঁটতে থাকে তো হাঁটতেই ছিল। সময় বয়ে যাচ্ছিল কিন্তু সেদিকে খেয়াল ছিল না  গফুর উদ্দিনের। রাত হয়ে গিয়েছিল।কিন্তু সে বাড়ি ফেরে নি সেদিন।

পরদিন তার মনে পড়েছিল,  একদিন তাকে একজন লোক একটা কাগজ ধরে দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন, ‘যদি কখনো প্রয়োজন পড়ে তো বন্ধু ভেবে চলে আসবেন।বিপদেই তো মানুষ মানুষকে সাহায্য করে। তাই না?’

মানিব্যাগে অনেকদিন ধরে কাগজটা পড়ে আছে। সেটা খুলে দেখার ইচ্ছা বা অভিরুচি কোনটাই হয়নি তার। কিন্তু আজ কি মনে করে কাগজটা বের করে তাতে থাকা মোবাইলটাতে ফোন করে বলে, ‘আমি গফুর উদ্দিন। আপনার সাথে দেখা করতে চাই।’

তারপর সেদিন রাত দশটার দিকে হাতে ব্যাগ নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে গফুর উদ্দিন। ছেলেকে ডেকে বলে, ‘বুঝলি টাকা হলে বাঘের চোখও মেলে আর ইলিশ তো কোন ছাডর।আর এই নে তোর বৈশাখী পোশাক। আর তো বলতে পারবি নে যে তোর বাবা তোদের আশা পূরণ করতে পারে না। আজ তোদের সবার জন্যই কেনাকাটা করেছি।’

গফুর উদ্দিনের স্ত্রী তাকে বলে যে, এতো টাকা সে কোথায় পেল। উত্তরে একটা রহস্যের হাসি দেয় গফুর উদ্দিন।বলে, আসলে ব্যাপারটা কি জানো লেখাপড়া শেখার মতো টাকা আয় করাটাও না শিখতে হয়। আর আমি এখন তা শিখে ফেলেছি। তুমি কোন চিন্তা কর না।  আমাদের আর কোন অভাব থাকবে না ‘ কথা শেষ হতে না হতেই বেরিয়ে পড়ে গফুর উদ্দিন। তার আজ অনেক তাড়া, কত কাজ।বাড়িতে বসে থাকলে তার চলে?তাই সে বেরিয়ে পড়েন। স্ত্রীর শত ডাক উপেক্ষা করে হাঁটতে থাকে সে।

পরদিন । আজ তার উপর মস্ত গুরুদায়িত্ব। তা তাকে পালন করতেই হবে, তাকে সফল হতেই হবে। তা হলেই না তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত!তাই সে বেরিয়ে পড়ে।সারারাত বাড়ি ফেরে না। শুধু যাওয়ার সময় বউকে বলেছিল, আমার জন্য অপেক্ষা কর না। আমি আজ ফিরবো না।

গফুর উদ্দিন তার কাজ শেষ করে যখন বাসায় ফিরল তখন দুপুর একটা।বাসায় এসে দেখে কেউ বাসায় নেই। অতটা চিন্তিত নয় সে। ভাবে হয়তো এখানে সেখানে বেড়াতে গেছে। পাশের বাসার ভাবীকে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। আর যে খবরটা তিনি দিলেন তাতে গফুর উদ্দিনের হাত-পা অবশ হয়ে গেল। এটা সে কি করল? নিজেই নিজের সন্তানদের খুন করল? যখন সে নিরবে নিঃশব্দে মাঠের এককোণায় দাড়িয়ে গ্রেনেডটা ছুড়ে মারছিল তখন অনেক ফুটফুটে ছোট বাচ্চা মাঠে হইচই করছিল।অনেক ভালো লাগছিল দেখতে। কিন্তু পরক্ষণেই তার চেহারায় একটা কাঠিন্যভাব চলে আসে।আর কত সে অন্যের বাচ্চার হাসি মুখ দেখে জীবন পার করবে যেখানে প্রতিদিন ঘরে ফিরেই তার স্ত্রী-সন্তানের মলিন চেহারা দেখতে হয়? না এবার সে শুধু নিজের কথাই ভাববে, আর কারো না।শুধু নিজের।কিন্তু ওই ফুটফুটে বাচ্চাদের সাথে তার মলিন চেহারার ছোট ছেলেটাকেও যে ফুটফুটে দেখাবে তা কি জানতো গফুর উদ্দিন। ইলিশ খাওয়া আর হল না গফুর উদ্দিনের ছেলেটার। মেডিকেল মর্গের বারান্দায় শুয়ে কি কেউ ইলিশ খেতে পারে? গফুর উদ্দিন ভাবে, ইচ্ছেগুলোকে মর্গে পাঠালে আজ হয়তো ছেলেটা তার কোলেই থাকতো।

অঙ্কনা জাহান
অঙ্কনা জাহান

 

Author: অঙ্কনা জাহান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts