আরজ আলী মাতুব্বর এবং তাঁর দার্শনিকতা

আরজ আলী মাতুব্বর

প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বাংলার প্রবেশদ্বার বরিশালের মাটি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক চারণভূমি। এই মাটির বুকে জন্ম নেয়া কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকেরা এই অঞ্চলকে যেমন উচ্চে তুলে ধরেছেন, তেমনিভাবে সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের বাংলা সাহিত্যকে। তবে তাদের পথচলা এত সহজ ও সুখময় ছিলনা, নানা বন্ধুর পথ অতিক্রম করে তাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তারা থেমে থাকেননি, জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে নিজেকে আলোকিত করার চেষ্টা করেছেন, আলোকিত করেছেন নিজেকে, সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের সাহিত্যকে, সমাজকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রচলিত প্রথা, বিশ্বাস, রীতিনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে সমাজে বিদ্যমান কুসংস্কারকে সরিয়ে সমাজকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করেছেন। তেমনি একজন ব্যক্তিত্ব স্বশিক্ষিত, বিজ্ঞানমনস্ক দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর। তিনি একটি কুসংস্কারমুক্ত, আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনের প্রয়াস চালিয়েছেন। প্রচলিত অন্ধবিশ্বাসের, ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের মতামতকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

আরজ আলী মাতুব্বর বাংলাদেশের এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব। আজীবন জ্ঞানানুসন্ধিৎসু এই ব্যক্তিত্ব বাংলা ১৩০৭ সনের ৩রা পৌষ, ইংরেজি ১৯০০ সনের ১৭ ডিসেম্বর তৎকালীন বৃটিশ ভারতের বরিশাল জেলার কোতয়ালি থানার চরবাড়ীয়া ইউনিয়নের লামচরি গ্রামের এক দরিদ্র্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর চার বছর বয়সে পিতা এন্তাজ আলী মাতুব্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পরহেজগার বিত্তহীনা মাতা রবেজান অতিকষ্টে তাঁকে মানুষ করেন। পাঁচ ভাইবোনের পরিবারে অভাবের কারণে তাঁর মা তাঁকে ঠিকসময়ে পাঠশালায় ভর্তি করাতে পারেননি। বাংলা ১৩২০ সনে দূর সম্পর্কীয় এক চাচা দু’আনা মূল্যের একটি ‘আদর্শলিপি’ কিনে তাঁকে স্থানীয় পাঠশালায় ভর্তি করিয়ে দেন। ‘আদর্শলিপি’ পাঠ শেষ করে ১৩২১ সনে রামসুন্দর বসাকের নিকট ‘বাল্যশিক্ষা’ পাঠ শুরু করেন। তখনই ছাত্রবেতন অনাদায়ে পাঠশালাটি বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর তিনি স্থানীয় এক মুন্সী সাহেবের কাছে কোরআন ও ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে কিছুটা শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ লাভ করেন এবং বিভিন্ন পুরোহিতদের নিকট হিন্দুধর্মের বিভিন্ন বঙ্গানুবাদ পাঠ করেন।

এসময় মুন্সী সাহেবকে তিনি নানা বিষয়ে প্রশ্ন করতেন, বিশেষত প্রকৃতি সম্বন্ধে। যেমন- দিন-রাত, জোয়ার-ভাটা, শীত-গ্রীষ্ম হয় কেন ইত্যাদি। কিন্তু মুন্সী সাহেবের কাছ থেকে তিনি যে উত্তর পেতেন এগুলো তার মনঃপূত হত না। এসময় তিনি নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় লেখাপড়া শিখতে থাকেন। ১৩৩৩ সনে তিনি ভূমি সংক্রান্ত সার্ভে শিক্ষা গ্রহণ করেন, এছাড়া পরিবারের বস্ত্রের অভাব মিটাবার জন্য বস্ত্রবুনন শিখেন। কৃষিকাজের ফাঁকে ফাঁকে বরিশাল হাইস্কুলের স্থানীয় ছাত্র আঃ আজিজ ও ফজলুর রহমান মিঞার পুরাতন পাঠ্যপুস্তক পাঠকরে সাহিত্য, গণিত, জ্যামিতি, ভূগোল, ইতিহাস, ব্যাকরণ ইত্যাদিতে কিছু জ্ঞান ও ইংরেজি ভাষার বর্ণবোধ লাভ করেন এবং নিজের জ্ঞানের পিপাসা মিটাতে বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরী ও শংকর লাইব্রেরীর বাংলা বইসমূহ একজন মনোযোগী ছাত্রের ন্যায় পড়েন। দর্শন ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়। কিন্তু পাঠাগারে পর্যাপ্ত বই ছিল না। পরে বরিশাল বি.এম (ব্রজমোহন) কলেজের অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় কাজী গোলাম কাদির সাহেবের আন্তরিক সাহায্যে কলেজ লাইব্রেরী ও বাহিরের দর্শন-বিজ্ঞানের বিভিন্ন পুস্তক পাঠের সুযোগ লাভ করেন। বরিশাল ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলের শিক্ষক মি. মরিস সাহেবের সংস্পর্শে এসে তিনি বাইবেল, খ্রিস্টধর্মসহ তাদের বিভিন্ন ধর্মীয় পুস্তক পাঠের সুযোগ লাভ করেন। এভাবেই তাঁর মানসিক আকৃতি গঠিত হয়। এভাবে নিজ চেষ্টা ও সাধনায় তিনি বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম ও দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর জ্ঞানার্জন করেন।

আজীবন সত্যানুসন্ধিৎসু, স্বশিক্ষিত দার্শনিক, মানবতাবাদী চিন্তাবিদ ও লেখক আরজ আলী মাতুব্বর অত্যন্ত সাদামাটা জীবনের মানুষ হয়েও আজো আলোচনায় অন্যতম স্থান দখল করে আছেন। বিভিন্ন বিষয়ে বিপুল জ্ঞানের অধিকারী হয়ে পান্ডিত্য বলতে যা বুঝায় তা হয়েছিল তাঁর। কিন্তু তিনি কখনো পান্ডিত্য জাহির করেননি।

ছিয়াশি বছরের জীবনে প্রায় সত্তর বছর আরজ আলী মাতুব্বর জ্ঞান সাধনা করেছেন। নিজের শ্রম, বুদ্ধি ও মেধা দিয়ে তিনি তাঁর আর্থিক অবস্থার উন্নতি সাধন করেছেন। জমিদার মহাজনদের হাত থেকে বন্ধকী জমিজমা উদ্ধার করেছেন।

তাঁর কৈশরের একটি ঘটনা তাঁকে সত্যানুসন্ধ্যানী করে তোলে। তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের ছবি তোলার দায়ে মৃতদেহ কেউ জানাযা পড়ে দাফন করতে রাজি হননি। শেষে বাড়ীর কয়েকজন লোক মিলে তাঁর মায়ের সৎকার করেন। এই সামাজিক আঘাতের পর আরজ আলী মাতুব্বর সত্য অনুৃসন্ধানে ব্যাপৃত হন।

ধর্মের নামে কুসংস্কার সত্য না বিজ্ঞানলব্ধ জ্ঞান সত্য? এই জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরজ আলী মাতুব্বর বিপুলভাবে ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞানের গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। অতঃপর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লেখনি ধরেছেন বৈজ্ঞানিক সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। ধর্ম, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে নানামুখী জিজ্ঞাসা তাঁর লেখায় উঠে এসেছে।

আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন একজন জিজ্ঞাসু বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ, যুক্তি, মুক্তবু্িদ্ধ ও মুক্তচিন্তার এক অনন্য নাম। তাঁর এই যু্ক্তিবাদী মানসিকতার কারণেই তিনি ‘সত্যের সন্ধান’ গ্রন্থের অপর নাম দিয়েছেন ‘যুক্তিবাদ’। আরজ আলী মাতুব্বরের অধ্যয়ন, বিশ্লেষণগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন: প্রকৃতি বিষয়ক বিশেষত জগতের উদ্ভব ও তাঁর নিয়ম বিষয়ক, দৈনন্দিন সমস্যা ও দুর্যোগ বিষয়ক, ধর্ম বিষয়ক, ঈশ্বর, দেবতা, ফেরেশতা, শয়তান, রাম, রাবণ সম্পর্কিত মিথ বিষয়ক।

আরাজ আলী মাতুব্বর নানা যুক্তিতর্ক, প্রশ্নের মধ্যদিয়ে তার মনের মধ্যকার প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার কথা তিনি একাধিক গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন। তার জীবদ্দশায় চারটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এগুলো হল- ‘সত্যের সন্ধানে’, সৃষ্টিরহস্য, অনুমান ও স্মরণিকা। এছাড়া তাঁর অপ্রকাশিত পান্ডুলিপিগুলো পরবর্তীকালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘সত্যের সন্ধানে’ লিখেছিলেন ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে কিন্তু এটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে তাঁর প্রথম বই “সত্যের সন্ধানে” প্রকাশ করার জন্য বাংলাদেশের জন্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এই বইটিতে তিনি তাঁর দার্শনিক  প্রশ্নগুলোকে আত্মা বিষয়ক, ঈশ্বর বিষয়ক, পরকাল বিষয়ক, ধর্ম বিষয়ক, প্রকৃতি বিষয়ক, বিবিধ এই ৬টি শ্রেণিতে বিভক্ত করে তাদের যৌক্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা প্রয়াস চালিয়েছেন। তাঁর মনের এসকল প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে আরজ আলী মাতুব্বর মানুষের মুক্তির জন্য, কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য বেশি বেশি বিজ্ঞান চর্চার কথা বলেছেন। তাঁর মতে দেশে যত বেশি বিজ্ঞানচর্চা হবে সে দেশ থেকে তত বেশি অন্ধকার দূরীভূত হবে।

মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ এবং সে সম্পর্কে সমাজ অধিপতিসহ মানুষের ব্যাখ্যা আরজ আলীকে বিশেষভাবে ভাবিত করেছে। এসব বিষয় অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি আরও গভীর দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। দারিদ্র্য, অনাহার, অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ দুর্গতি এগুলো সম্পর্কে বলা হত এগুলো হল ‘আল্লাহর গজব’, পাপের ফল। কিন্তু পাপ কি তাদেরই বেশি যাদের ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় থাকতে হয় এবং যাদের আশ্রয়  খুবই ভঙ্গুর? যারা টেকসই বাড়ীতে বসবাস করেন এবং নিরাপদ জায়গায় থাকেন হারাম পয়সায়, তাদের পাপে গজব হয় কোথায়? এসব বিষয় নিয়ে আরজ আলী প্রশ্ন তুলেছিলেন।

সত্যের সন্ধানে গ্রন্থের আত্মা বিষয়ক প্রস্তাবে তিনি প্রশ্ন করেছেন- আমি কে? আমি কি? এই রক্ত-মাংস-অস্থি-মেদ-মজ্জায় গঠিত দেহটিই কি ‘আমি’। নাকি আমি আত্মা? যদি তাই হয় তবে আত্মাকে ‘আমি’ না বলে আমার বলা হয় কেন?

তিনি আরও প্রশ্ন করেছেন প্রাণ কি অরূপ না স্বরূপ?

মন ও প্রাণ কি এক?

প্রাণের সাথে মনের সম্পর্ক কি?

প্রাণ কিভাবে দেহে আসা যাওয়া করে?

মৃত্যু সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন- ধর্মীয় দিক থেকে মহাপ্রাণের তিরোধানকে আমরা মৃত্যু বলি। আবার জীবতত্ত্বীয় দিক থেকে জীবদেহের কোন অংশের জীবকোষের মৃত্যুকে বলি ‘রোগ’। তিনি প্রশ্ন করেছেন এর মধ্যে কোনটি গ্রহণযোগ্য? ধর্মীয় নাকি জীবতত্ত্বীয় মতবাদ?

তাঁর ঈশ্বর বিষয়ক প্রস্তাবে তিনি প্রশ্ন করেছেন, আল্লাহর রূপ কি? খোদাতায়ালা কি মনুষ্যভাবাপন্ন? ¯স্রষ্টা কি সৃষ্টি হতে ভিন্ন? ঈশ্বর কি স্বেচ্ছাচারী না নিয়মতান্ত্রিক? আল্লাহর অনিচ্ছায় কোন ঘটনা ঘটে কি? যদি না ঘটে থাকে তাহলে জীবের দোষ বা পাপ কি? তিনি আরও প্রশ্ন করেছেন ঈশ্বর কি দয়াময়? আর তাঁর দয়া কি সমভাবে বণ্টিত। এসম্পর্কে তিনি বলেছেন, জীবজগতে খাদ্য-খাদক সম্পর্ক বিদ্যমান। যখন কোন সবল প্রাণী দুর্বল প্রাণীকে ধরে ভক্ষণ করে, তখন ঈশ্বর খাদকের কাছে দয়াময় বটে। কিন্তু তিনি কি খাদ্য প্রাণীর কাছেও দয়াময়? তিনি বলেছেন, একটি সাপ যখন ব্যাঙকে ধরে আস্তে আস্তে গিলতে থাকে, তখন ঈশ্বর সাপটির কাছে দয়াময় বটে। কিন্তু ব্যাঙটির কাছেও কি তাই?

কোন দেশে যখন ধর্মবিশ্বাস বেশি থাকলেও পুষ্টির অভাব দেখা দেয়, চিকিৎসার অভাব থাকে, পানি দূষিত হয়, অকাল মৃত্যুর হার বেশি থাকে, আর এজন্য মানুষের ইমান কম থাকাকে দায়ী করা হয়। তখন তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যেসব দেশে ধর্মবিশ্বাস কম সেসব দেশে বিনা চিকিৎসায় অকালমৃত্যুর হার কম কেন? আবার ধর্মের মিথ ধরে তিনি প্রশ্ন করেন ‘…আর যদি যাবতীয় জীবের খাদ্যই মিকাইল বন্টন করেন, তবে জগতের অন্য কোন প্রাণীকে নীরোগ দেহে শুধু উপবাসে মরতে দেখা যায় না, অথচ মানুষ উপবাসে মরে কেন? বৈষম্য কেন্?

এর সঙ্গে তিনি আরও প্রশ্ন করেন। ‘ভাগ্যলিপি কি অপরিবর্তনীয়? রাষ্ট্র ও সমাজ মানুষকে শিক্ষা দিতেছে কর্ম কর, ফল পাবে। আর ধর্ম বলতেছে- কর্ম করে যাও, ফল তকদীরে যা লেখা আছে তাই পাবে? তিনি প্রশ্ন করেছেন ফল যদি কর্মের দ্বারা নির্ধারিত না হয়ে ঈশ্বর কর্তৃক নির্ধারিত হয় তবে সৎ বা অসৎ কাজের জন্য মানুষ দায়ী হবে কেন?

ইসলাম ধর্মে সম্পত্তি বন্টনের বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন করিলে বণ্টন সম্পূর্ণ হয় না। আবার ‘আউল’ মানতে গেলে হতে হয় দোযখী। এক্ষেত্রে উপায় কী?

নারীর অবস্থান, নারীর অধিকার, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের বৈধতা-অবৈধতা, সন্তানের উপর অধিকার সম্পর্কে ইসলামে কড়া বিধিবিধান আছে। ইসলাম ধর্মে কোরআন ও হাদিস থেকে এসব বিধিবিধান গ্রহণ ও প্রয়োগ করা হয়। আরজ আলী মাতুব্বর এক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন ‘হিল্লা বিয়ে’ নিয়ে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন স্বামী ভুল করে স্ত্রীকে তালাক দিলে এর প্রায়শ্চিত্ত কেন শুধু স্ত্রীকে করতে হবে? তিনি এই ধরণের বিয়েকে ব্যাভিচারের সাথে তুলনা করেছেন।

আরজ আলী জন্মের পর থেকেই ইসলামের আবহেই বড় হয়েছেন। তিনি এই ধর্মের শাস্ত্রীয় বক্তব্য ও বাস্তব প্রয়োগের রূপ দেখেছেন। কোরআন সম্পর্কে তিনি বলেন, পবিত্র কোরআন মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ এবং তা ঐশ্বরিক ধর্মগ্রন্থ বলে পরিচিত। যেসব গ্রন্থকে ঐশ্বরিক গ্রন্থ বলে দাবী করা হয় কোরআন তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং অতুলনীয়।

তারপরও আরজ আলী মাতুব্বরকে নাস্তিকতার গ্লানি গায়ে মাখতে হয়েছে। কোন এক সময়ে একটি বিষয় সত্য বলে মনে হলেও পরবর্তীকালে তা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। এ প্রসঙ্গে উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, বৈদিক, পারসিক ও ইহুদি ইত্যাদি আদিম জাতি (ধর্ম)- গুলোর কল্পিত দেব-দেবী, দৈত্য-দানব, ভূত-পিশাচ, ডাকিনী-যোগিনী, শীতলা, ওলা, পেত্নী ইত্যাদি জীবসমূহের অস্তিত্ব জগতে পাওয়া যায় না। অথচ এগুলোর সত্যতা ও চরিত্র সম্বন্ধে সম্প্রদায় বা ব্যক্তিবিশেষের আস্থা কম নয়। হয়ত কোন এক সময়ে এগুলোকে সত্য বলে মনে করা হত। কিন্তু বর্তমানে এরা এগুলো মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাই কোন রকম গোড়ামীর আশ্রয় না নিয়ে প্রত্যেক ধর্মকে যথাসম্ভব কুসংস্কারমুক্ত করা উচিত বলে তিনি মতামত ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মতে, কুসংস্কার ত্যাগ করার অর্থ ‘ধর্ম ত্যাগ করা’ নয়।

আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন সততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সৎ ও সহজ জীবনযাপনের অধিকারী এই মানুষটি অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। জীবনের কোন পর্যায়ে তাঁর মধ্যে সততার একবিন্দু ঘাটতি ছিলনা। তাঁর মতের সাথে দ্বিমত পোষণকারী ব্যক্তিরাও তাঁর সততায় মুগ্ধ হয়েছেন। তাঁর সত্যবাদিতায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। আমিন পেশায় থাকাকালে তাঁর সততা ও দক্ষতার কারণে বরিশাল অঞ্চলের মানুষ অনেক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এমনকি তাঁর দর্শনের ঘোরতর বিরুদ্ধবাদী চরমোনাই এর পীর সাহেবেরও জমিজমা সংক্রান্ত মাপজোকের দরকার হলে মাতুব্বর সাহেবকেই ডাকতেন। মাতুব্বর সাহেব কে এবং কী তা জানা সত্ত্বেও পীর সাহেবরা তাঁর সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করতেন।

তাঁর সততা সংক্রান্ত আর একটি ঘটনা-

আরজ আলী মাতুব্বরের বাড়ী থেকে বরিশাল প্রায় ১১ কিলোমিটারের পথ। সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই তিনি বরিশালে আসতেন লাইব্রেরীতে পড়াশুনা করতে অথবা সমমনা লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। বাড়ী থেকে বরিশালে আসার এই পথ তিনি সাধারণত পাশের গ্রামের আমজাদ মাঝির নৌকায় যাতায়াত করতেন। একদিন বাকিতে নৌকায় বাড়ী ফিরে পড়াশুনায় মগ্ন হয়ে মাঝির পাওনার কথা ভুলে যান। রাত দু’টায় মাঝির পাওনার কথা মনে পড়লে নাতিকে নিয়ে তিন কিলোমিটার দূরে মাঝির বাড়ী ছুটে যান এবং ভুলে গিয়েছিলেন বলে বারবার মাঝির কাছে ক্ষমা চান। মাঝি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। ব্যক্তিগত সততার এমন বহু ঘটনা তাঁর সম্পর্কে জানা যায়। আদর্শের সাথে, চিন্তার সাথে জীবন যাপনের এমন সম্মিলন অসাধারণ। আরজ আলী সেই জীবন আয়ত্ত করেছিলেন।

বইপ্রেমিক আরজ আলী মাতুব্বর

জীবনের প্রথম একটি ‘আদর্শলিপি বই’ পাওয়ার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সে দিন আমি যে কতটুকু আনন্দ পেয়েছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবনা, বইটি নিয়ে নাচতে নাচতে পাড়াপ্রতিবেশি, সহপাঠীদের দেখিয়েছিলাম, সারাক্ষণ এই বই সাথে রাখতাম। বৃষ্টি হলে কোথাও স্থান না পেলে বুকের নিচে আগলে রাখতাম।’

আমাদের সমাজে অনেকের জীবনে এই অভিজ্ঞতা হলেও আরজ আলীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন। ভয়াবহ কঠিন জীবন সংগ্রামও তাঁর বইপ্রীতি আর কৌতুহল কমাতে পারেনি। নানা অভাব অনটনের মধ্যেও তিনি ১৮ বছরে ৯০০ বই সংগ্রহ করেন। দুই দুই বার তাঁর সংগৃহীত বই ঘূর্ণিঝড়ে নষ্ট হয়ে গেলেও তিনি থেমে যাননি। বরং নতুন উৎসাহ নিয়ে লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেছেন। দীর্ঘকাল লাইব্রেরীর সংস্পর্শে থেকে তার মধ্যে এই দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে যে, লাইব্রেরী হচ্ছে জ্ঞানালোক বিতরণের কেন্দ্র। তাঁর মতে লাইব্রেরীই পারে অমানুষকে মানুষ করতে, পারে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার দূর করতে।

বইয়ের প্রতি, বিদ্যাচর্চার প্রতি আরজ আলী মাতুব্বরের ক্রমবর্ধমান আকর্ষণের প্রধান কারণই হলো জগত-সংসার, মানুষ, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত নিয়ে অপার কৌতুহল ও মাথায় অনেক প্রশ্ন। এই প্রশ্নই আমাদের সামনে আরজ আলী মাতুব্বরকে উপস্থিত করেছে। জ্ঞানের সীমা সম্প্রসারণের জন্য তিনি সমাজের সকল জ্ঞানচর্চার মাধ্যমকেই গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন। তবে সমৃদ্ধ লাইব্রেরীকেই তিনি সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন এবং তিনি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজে লাইব্রেরী স্থাপন করেছেন।

সার্টিফিকেট বিহীন, স্বশিক্ষিত সত্যানুসন্ধানী এক লোক দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর। সত্যানুসন্ধানে তিনি কতটা সফল হয়েছেন, নাকি সত্যের পথে চলতে গিয়ে ভুল গাড়িতে চড়েছেন সেটা নিয়ে হয়তো বিতর্ক থাকতে পারে। তবে সত্য অনুসন্ধানের আপোসহীন মনোভাব এবং নিরলস প্রচষ্টার সম্মাননা তিনি পেয়ে যাবেন যুগ যুগ ধরে।

মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন মত প্রকাশের কারণে সেই চিরাচরিত নিয়মের ধারাবাহিকতায় আরজ আলী মাতুব্বরকেও বলি হতে হয়েছে। স্বাধীন মত ও চলমান লোকজ ধর্ম বিশ্বাসের বিরুদ্ধ মত প্রকাশের কারণে নাস্তিক ও কম্যুনিস্ট আখ্যা দিয়ে ১৯৫১ সনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত হয়েছে। তবে শত প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে আপোসহীনভাবে স্বাধীন মত প্রকাশের এক সাহসী সৈনিক হিসেবেই আমরা তাঁকে পেয়েছি।

দার্শনিক হিসেবে আরজ আলী মাতুব্বর কতটা সফল বা আধুনিক দর্শনে তাঁর অবদান কতটুকু এটা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে না পারলেও, মানবতাবাদী, সত্যান্বেষী, জ্ঞানপিপাসু একজন আরজ আলী মাতুব্বর তার জ্ঞানচর্চা, জ্ঞানবিতরণ ও কল্যাণকামী মানসিকতার যে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন তা অবশ্যই শ্রদ্ধার দাবীদার।

আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন মানবতাবাদের এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি তাঁর ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত অর্জিত সম্পত্তি স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রাপ্যতা অনুযায়ী বন্টন করে দিয়ে বাকী জীবনের অর্জিত অর্থ ও সম্পত্তি জনকল্যাণকর কাজে উইল করেন। সংস্কারমুক্ত এই মানুষটি জীবন সায়াহ্নে তাঁর নিজের চক্ষু দু’টি চক্ষু ব্যাংকে এবং মরদেহ বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে দান করেন। এমন দানের ঘটনা কেবল তাঁরমত অসাধারণ মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজ, দেশ তথা বিশ্বব্যবস্থা এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসবাদের মতো নানাবিধ সমস্যা আমাদেরকে আকড়ে ধরেছে। আর এই অস্থির সময়ে আরজ আলী মাতুব্বরের মতো কুসংস্কারমুক্ত মানুষের বড় বেশি প্রয়োজন। যার সত্যানুসন্ধানী মানসিকতা আমাদের সমাজের ধর্মীয় গোড়ামী দূর করে বিপথগামী সমাজকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারবে বলে আশাকরি।

শেষ করব আরজ আলী মাতুব্বরের দু’টি কথা দিয়ে “বিদ্যাশিক্ষার ডিগ্রী আছে জ্ঞানের কোন ডিগ্রী নেই, জ্ঞান ডিগ্রীবিহীন ও সীমাহীন।” তাই আসুন আমরা সবাই জ্ঞানের অনুসন্ধান করি।

তাঁর মতে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে শুধু আপন বিশ্বাসই নয়, সকল মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। সকল ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা দরকার প্রতিটি জ্ঞানপিপাসু মানুষের। শুধু সীমাবদ্ধ পরিমন্ডলে আবদ্ধ হলে চলে না। সীমানা অতিক্রম করে যেতে হবে ক্রমান্বয়ে। এর মাধ্যমেই ক্রমশ অতিক্রম করা যাবে নিজেকে।

পরিশেষে সবাইকে আরজ আলী মাতুব্বরের ন্যায় সত্যের অনুসন্ধানের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের আহবান জানাচ্ছি।

 

মাজহারুল ইসলাম
মাজহারুল ইসলাম

Author: মাজহারুল ইসলাম

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts