একজন লতিফুর রহমান মন্টুর কথা

মন্টু

জন্ম হয়েছিল টাঙ্গাইলের ভুয়াপুরের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে।  নানা এবং দাদা দুজনই এক নাগাড়ে বহুবছর ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।  প্রতিপত্তি আর লেখাপড়ায় পারদর্শিতার কারণে রাণী ভবাণী এ  পরিবারকে খাশনবিশ উপাধী দিয়েছিলেন। সেই পরিবারের সন্তান লতিফুর রহমান। পিতা আফতাব উদ্দীন খাশনবিশ, মাতা বেগম লুৎফা। পিতা সরকারি চাকুরে। মা লেখাপড়া জানা আলোকপ্রাপ্ত নারী।

আজ তাঁর কথা লিখছি । আজ তাঁর ৩য় মৃত্যুবার্ষিকি। বলতে পারেন, পৃথিবীতে কত লতিফুর রহমান আছেন। ইনি অবার কে যার কথা বিশেষ ভাবে লিখতে হবে? এ কথা ঠিক যে, অনেক মানুষ আছেন যারা বিশাল মাপের , যারা বিখ্যাত হয়ে আপামর জনসাধারণের নজরে এসেছেন, আবার এ কথাও ঠিক এ সমাজে এমন মানুষও আছেন যারা আলোচনায় আসেননি, বিখ্যাত হননি। কিন্তু ওই বিশাল মাপের মানুষগুলো   এই মানুষগুলোর পাশে বিদ্যা প্রজ্ঞা চরিত্রবল মনুষ্যত্ব কোনটাতেই দাঁড়াতে পারেন না। ইনি তেমন একজন মানুষ।

দু বছর মেডিকেল পড়ে ভাল লাগে না বলে ছেড়ে দিলাম। হায় হায় করে উঠল পুরো পরিবার। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। বড়ভাই শহীদ হয়ে গেছেন। বাড়িঘর পেট্রল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। আব্বা পুত্রশোকে প্রাকটিস ছেড়ে দিয়েছেন।  সংসারের অর্থিক ভিত একেবারেই ভেঙে পড়েছে। এই অবস্থায় পরিবারের মেডিকেল পড়ুয়া একটা মেয়ে যদি খেয়ালের বশে ভাল লাগছে না বলে মেডিকেল পড়া ছেড়ে দেয় যেমন হতে পারে  পরিবারের অবস্থা আমাদের পরিবারের অবস্থা তেমনই হয়েছিল। সবাই বলেছিল,  এ মেয়ে গোল্লায় গেছে। এর আর কিছু হবে না। আমি জিদ করে বিএ পরীক্ষা দিয়ে টাঙ্গাইলে বড় বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলাম। সেখানেই লতিফুর রহমান মন্টুর সাথে আমার দেখা। কাগমারি সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের নবীন প্রভাষক। টকটকে ফর্সা রং , কাটা কাটা বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা।  বিজ্ঞানমনস্ক, সত্যান্বেষী, উদার, নির্ভীক, সৎ আর সততার এক উজ্জ্বল ছবি। এ গুণগুলোর কথা অবশ্য জেনেছিলাম পরে। তখন শুনেছিলাম পদার্থবিজ্ঞানের চৌকস ছাত্র, ধ্যান জ্ঞান বিজ্ঞান হলেও সাহিত্যানুরাগী। ভাল লেখে, ইংরেজি বাংলা দুই ভাষায়,  বিজ্ঞান সাহিত্য দুটোই।

আপার বাসায় সাহিত্য আসর বসত। সেখানে লতিফ নিয়মিত আসত। আমি সেখানে কবিতা আবৃত্তি করেছিলাম। ও আমাকে দেখল। আপার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিল। তারপর আমাদের বিয়ে। ওর অবশ্য একটু দ্বিধা ছিল, যে মেয়ে বিএ পরীক্ষা দিয়েছে সেকি অার ভাল ছাত্রী হবে। নিশ্চয়ই ফেল করবে অথবা থার্ড ডিভিশন। আর আমি বলেছিলাম, ‘বিএ করতে পারি তবে আমাকে  পড়াতে হবে।’  ও নাকি অবাক হয়ে আপার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘পড়াবো না মানে, এটা আপনাকে বলতে হবে নাকি?’

বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিলাম পালকি চড়ে। অঁজ গাঁ। অবাক হয়েছিলাম এই গ্রামের একটা ছেলে এত ব্রিলিয়ান্ট হয় কি করে! আরও অবাক হয়েছিলাম ও বাড়িতে পুরোনো রেকর্ড প্লেয়ার আর রেকর্ডের সংগ্রহ দেখে, সওগাত পত্রিকা পেয়েছিলাম অনেক। রাতে রাতে উঠোনে পুঁথিপাঠ হতো। চমৎকার পুঁথি পড়তেন আমার শাশুড়ি। শ্বশুর গাইতেন গান। চমৎকার রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইত লতিফ হারমোনিয়া বাজিয়ে। শ্বশুর তাঁর লেখা একটা উপন্যাসের পান্ডুলিপি আমাকে দেখিয়েছিলেন। সেবার শ্বশুরের সাথে একসাথে টাঙ্গাইলে হলে গিয়ে সিনেমাও দেখেছিলাম। আর তখনই বুঝেছিলাম, এবাড়ির ছেলে মেধাবী হবে নাতো মেধাবী হবে কে!

আমি বিএতে রেকর্ডমার্কস পেয়েছিলাম। ওর খরচ বাাঁচাতে আর ওর সাথে থাকতে পারব বলে পড়তে চেয়েছিলাম জগন্নাথে। ও শোনেনি। আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে বাধ্য করেছিল। বলেছিল, ‘খেয়ালের বশে পড় আর যাই করো,  বিএ পড়েছ। এখন যদি জগন্নাথে পড় সবাই বলবে আসলেই তুমি খারাপ ছাত্র। তোমার মন ছোট হবে। তার দরকার নেই।’  

আমাদের বিয়ের পর অল্প কিছুদিন ও টাঙ্গাইলে ছিল । স্বাধীনচেতা মানুষ, খরচে কার্পণ্য ছিল না। ব্যাচিলর অবস্থাতেই একা বাসা নিয়ে থাকত। আর আমি ঢাকায় রোকেয়া হল হোস্টেলে অধীর হয়ে থাকতাম। প্রতি  বৃহস্পতিবার সেই বাসায় আমি যেতাম। লতিফ আমার জন্য শাকভাজি আর কই মাছ রান্না করে রাখত। আমি রাস্তা থেকে সে রান্নার ঘ্রাণ পেতাম। সে এক অদ্ভুত স্বর্ণালী জীবন ছিল!

এরপর ও বদলি হয়ে আসে ঢাকা বিজ্ঞান  কলেজে। আমরা আজিমপুরে একটা সাবলেট ভাড়া নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা যাওয়ার পথে পলাশী বাজার থেকে পাঁচ টাকা দিয়ে একটা ইলিশ অথবা এক পোয়া গরুর মাংস কিনতাম। বাসায় ফিরে দুজনে মিলে রাঁধতাম। লতিফ মাছের কাঁটা বাছতে পারত না। ও পছন্দ করত টক আচার ফল জুস খিচুড়ি পোলাউ  ।আমি আবার ফল মোটেই পছন্দ করতাম না। দিন কাটত অবিমিশ্র আনন্দে। একটা দুটো টাকা জমিয়ে একটা করে ফার্নিচার কিনতাম। অনেক দিন সেই আনন্দে মেতে থাকতাম। যেদিন একটা সাদাকালো টিভি কিনলাম সেদিন তো উৎসব লেগে গেল। ছোট্ট ঘরে রাতে তেলাপোকা ছেয়ে থাকত। ওসব আমাদের চোখেই পড়ত না। সুখ এতটাই তীব্র ছিল।

এর অল্প কিছুদিনের  মধ্যেই বিসিএস করে ও চলে যায় শেরপুরে ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে । শুরু হয় আমাদের উদ্বাস্তু জীবন। লতিফ তাঁর চাকরি জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই খারাপ পোস্টিং পেয়েছে। কারণ ও তদবিরবাজি বা তোষামুদি জানত না। ওর সুযোগগুলো অন্যরা নিয়ে নিয়েছে। ওর বেশিরভাগ সময়ই পোস্টিং ছিল হাওড় অঞ্চলে। ওসব অঞ্চলের লোকরা সবজি খেতে জানত না, সবজি চাষ হতো না।  লতিফ তাঁর কর্মগুণে হাওড় অঞ্চল কলমাকান্দা, ইটনাকে সুজলা সুফলা করে রেখে এসেছে । করেছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন । বানভাসী  মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করে দিয়ে এসেছে ও। তাই  ও যে যে অঞ্চলে কাজ করেছে আজও সেসব অঞ্চলের মানুষ ওকে শ্রদ্ধা আর ভালবাসার সাথে স্মরণ করে।

মন্টু ২আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করার পর কিছুটা হতাশ ছিলাম। নানান জায়গায় চাকরির চেষ্টা করছিলাম। চাকরি পাবো কি পাবো না এই দুশ্চিন্তা যখন করছিলাম লতিফ আমাকে ল পড়তে বলেছিল। নিজে গ্রামে গঞ্জে চাকরি করে আমাকে ঢাকায় বাসাভাড়া করে রেখে ল পড়িয়েছিল। আমি যখন কোন চাকরিতে এপ্লাই করতে চাইতাম ও প্রবলভাবে বাধা দিত। ‘না না কিছুতেই না। ক্লাসওয়ান গেজেটেড অফিসার ছাড়া কোন চাকরির দরখাস্ত করবে না। একবার ছোট চাকরিতে ঢুকলে মন ছোট হয়ে যায়। বিসিএস দাও।’ ও নিজে আমাকে পড়িয়েছে দিনের পর দিন। আমি ‍বিসিএস দিয়েছি । আর মেধা তালিকায় ৮ম হয়েছি। আমার প্রথম পোস্টিং ছিল কুমিল্রায় । লতিফ তখন কিশোরগঞ্জের ইটনার ইউএনও।

আমাদের দু সন্তান, পান্থ রহমান আর নাবিলা পারিজাত। পান্থর জন্ম হয়েছিল আমার এমএ পরী্ক্ষার দুই গ্যাপের মধ্যে। পারিজাতের জন্ম আমি চাকরিতে আসার পর।

সন্তানদের কারণে আমরা কিছুটা কাছাকাছি আসতে পেরেছিলাম। ছোট শিশু কোলে এই বিবেচনায় লতিফকে মুরাদনগরের ইউএনও হিসেবে বদলি করাতে পেরেছিলাম। তখন আমি বৃহস্পতিবারে মুরাদনগরে যেতাম । ও আসতে পারত না।ইউএনওর চাকরি সার্বক্ষণিক। বিশাল উপজেলা, মন্ত্রীর এলাকা। একের পর এক বাধ ভাঙে।  তাই কাছাকাছি হয়েও আমরা কাছাকাছি হতে পারলাম না।  

আমরা প্রথম একসাথে থাকার সুযোগ পেলাম ১৯৯২ সালে । দুজনই বদলি হয়ে ঢাকা এলাম। গড়ে উঠল আমাদের ছোট্ট  একটা সংসার।

স্বামী হিসেবে লতিফকে যে পেয়েছে তার চেয়ে ভাগ্যবান এ পৃথিবীতে আর কেউ নেই । আর তার চেয়ে দুর্ভাগাও কেউ নেই যে তাঁকে অকালে হারিয়েছে।আমি একসাথে সেই ভাগ্যবান এবং দুর্ভাগা।

লতিফ আমাকে একটু একটু করে গড়েই তোলেনি, দিয়েছে অবারিত স্বাধীনতা, খোলা আকাশ। আমি কোথাও গেলে বলত , ‘শুধু বেশি রাত হলে একটা ফোন করো। আমরা চিন্তায় থাকি।’ কখনও জানতে চায়নি আমি কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, কোন দিন জানতে চায়নি কে ফোন করেছে। আমার পুরুষ নারী নির্বিশেষে প্রচুর বন্ধুবান্ধব। কোনদিন কোন বন্ধু নিয়ে আপত্তি তোলেনি। বরং বাসায় এলে তাদের আপ্যায়ন করেছে। আমি ওর সামনেই পুরুষ বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে গেছি। চাকরি জীবনে ওর চেয়ে অনেক বেশি বিদেশে  গেছি আমি। ও বাচ্চাদের আগলে রেখেছে। প্রচুর সময় দিয়েছে। নিজের শিক্ষা আর নিজের আদর্শে দীক্ষিত করেছে। তাই আজ ওরা  এতটা ভাল হয়েছে, মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন হয়েছে। নিজে ত্যাগ স্বীকার করে আমার ওপরে ওঠার পথ প্রশস্ত করেছে লতিফ। আজ আমার যে লেখক জীবন এটাও তার দান। ও না থাকলে আমি লেখার পেছনে এতটা সময় দিতে পারতাম না। আজ আমি যেটুকু যা দাঁড়িয়েছি তা দাঁড়াতে পারতাম না।

লতিফ ছিল অসাধারণ মেধাবী। বিজ্ঞান ছিল তার ধ্যান জ্ঞান। সে সবসময়ই চিন্তা করত নতুন উদ্ভাবনের,  নতুন আবিষ্কারের। মাঝে মাঝেই পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে নানা ধরণের নতুন যন্ত্র বানাতো।  আমি একটা লেখায় লিখেছিলাম, ‘পাশ্চাত্যে জন্মালে আইনস্টাইন হতো, বাংলাদেশে জন্মে লতিফুর রহমান হয়েছে।’ কথাটা আমি আমার বিশ্বাস থেকে লিখেছিলাম। আর আমি এটাও বিশ্বাস করি, যারা তাকে কাছ থেকে দেখেছেন তারা আমার এ কথার সাথে একমত হবেন। এ দেশ তাকে চেনেনি।তাকে মূল্যায়ন করতে পারেনি। অন্য দেশ হলে তাকে খুঁজে নিয়ে কাজে লাগাতো, তার জায়গা হতো বিজ্ঞানীদের জগতে।

তাঁর অসাধারণ কিছু লেখা সন্ধানীতে প্রকাশিত হয়েছিল ।  ধারাবাহিকভাবে কিছু বিজ্ঞান, অনুবাদ আর বিজ্ঞান কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল জনকন্ঠে ।  আত্মনিমগ্ন প্রচারবিমুখ মানুষ ছিল। লিখত আর জড়ো করত।  পত্রিকা অফিসে পাঠাতো না। সে চলে যাবার পর তাঁর তিনটি বিজ্ঞানের ইতিহাস তিনজন প্রকাশক  ছেপেছেন।তাদের প্রতি আমার অপরিসীম কৃতজ্ঞতা।  বইগুলো ব্যাপক সাড়া পেয়েছে এটাই আমার সান্ত্বনা।

চাকরি ক্ষেত্রে পদে পদে  তাঁকে ডিপ্রাইভপড করা হয়েছে । একের পর এক নতুন অফিসে পোস্টিং দেয়া হয়েছে তাঁকে। সে যখন গড়েপিটে অফিসটাকে দাড় করিয়েছে তখনই তাঁকে সেখান থেকে বদলি করা হয়েছে। কষ্ট করেছে সে আর সুবিধাগুলো নিয়েছে অন্যরা। তাঁর বিদেশ যাওযার সুযোগ, টেলিফোন,  ভাল চেম্বার অন্যরা ছিনিয়ে নিয়েছে।সময় মতো পদোন্নতি দেয়া হয়নি তাঁকে, পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়েছে। মনে মনে কষ্ট পেয়েছে, তবে  সে হাসিমুখে মেনে নিয়েছে। নিজের মতো করে সুখি থাকার অপরিসীম ক্ষমতা ছিল তাঁর। সে সুখি ছিল।

অথচ সে সবাইকে অকৃপণভাবে ভালবেসেছে। চাকরি জীবনে জুনিয়রদের প্রতি ছিল তাঁর প্রগাঢ় ভালবাসা, নিবিড়ি স্নেহ। ওদের সম্পর্কে যখন কথা বলত মনে হত, গভীর অাস্থা, বিশ্বাস আর আবেগ ঝরে ঝরে পড়ছে ওর কন্ঠ থেকে। সবরকম সুযোগ সুবিধা আর সাপোর্ট দেয়ার চেষ্টা করত জুনিয়রদের। নিজের অসুবিধা হলেও।  

যেখানে যে স্টেশনে কাজ করেছে গভীর আন্তরিকতা আর নিষ্ঠার সাথে করেছে। সততা তো ছিল প্রশ্নের উর্দ্ধে। আইনের প্রতি ছিল অবিচল শ্রদ্ধা। জানার পরিধি ছিল সুগভীর। ও কতটা সৎ ছিল একটা ঘটনা বললেই বুঝতে পারবেন। ও যখন মুরাদনগরের ইউএনও আমাদের একসাথে থাকার সুবিধার্থে আমাকে মুরাদনগরের উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বদলি করা হয়। আমি ভেবেছিলাম লতিফ খুব খুশি হবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে লতিফ বলল, ‘তোমার এখানে আসা হবে না। আমাকে মন্ত্রী অনেক মামলার তদবির করে। আমি বলি ম্যাজিস্ট্রেট আমার কথা শোনে না। তুমি এলে সেটা বলা শক্ত হবে। তুমি এসো না ‘  আমার মুরাদনগরের অর্ডার ক্যান্সেল হয়েছিল লতিফের অনুরোধে । ব্যক্তিগত সুখ, ছেলে মেয়েদের সাথে একসাথে থাকার সুযোগ ত্যাগ করে চাকরির মর্যাদা  সমুন্নত রখেছিল লতিফ।

montuতাঁর মতো বাবা আমি জীবনে কমই দেখেছি । আমার ছেলে মেয়েরা দুর্ভাগা যে খুব কম সময় তাঁকে পেল। পান্থর ছেলেবেলায় খুব শ্বাসকষ্ট  হত । রাতের পর রাত জাগত লতিফ । ছেলে মেয়ে দুটোকে নিজে পড়াতো। মাথার কাছে বসিয়ে রাজ্যের গল্প করত। পৃথিবীর এমন কোন বিষয় নেই যা সে জানত না, আর সেটা ছেলে মেয়েদের বলত না। নির্লোভ আর অল্পতে তুষ্ট থাকার শিক্ষা সে ছেলে মেয়েদের দিয়ে গেছে। আবার স্বপ্ন দেখাতেও সে শিখিয়েছে।

সাধারণ মানুষের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা ছিল লতিফের। কি শহরের কি নিজ গ্রামের।  গৃহকর্মী পিয়ন দারোয়ান ড্রাইভার চারপাশের লোকজন সবাইকে একান্ত আপনজন মনে করত। বাসার পাশের চাযের দোকানদার, মুদি দোকানদার থেকে শুরু করে হকার পর্যন্ত সবাই তাকে অন্তর থেকে ভালবাসত।  স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালযের ছেলে মেয়েদের সে ছিল বিশেষ বন্ধু। ছেলে মেয়েদের বন্ধুরাও তাঁর বন্ধু হয়ে যেত। যখন সুস্থ ছিল প্রতিদিন হাঁটত লতিফ। নিয়মিত ধানমন্ডি লেকের ধারে যেত। সেখানে ছেলে মেয়েরা আগে থেকেই ওর জন্য চেয়ার রেখে দিত। ও একচেয়ারে বসে আর এক চেয়ারে পা তুলে ওদের সাথে নানান বিষয়ে গল্প করত। ওরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত।আমি শুনেছি এদেশের কোন কোন লেখককে কেন্দ্র করে নাকি এক একটা চক্র গড়ে উঠেছিল। লতিফ তেমন বিখ্যাত কেউ না হয়েও তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হত অনেক মানুষ, এক বিশাল চক্র।  ওদের অনেক ব্যক্তিগত সমস্যাও ওরা লতিফের সাথে শেয়ার করত।  লতিফ চলে যাবার পর তাই চারদিকে শোকের ছায়া নেমে এসছিল। দোকানদাররা বার বার চোখে মুছছিল। ছেলে মেয়েরা  ভেঙে পড়েছিল আমার বাড়িতে। লতিফ যে যে স্টেশনে কাজ করেছিল সব জায়গা থেকেই মানুষ এসেছিল ওর কুলখানিতে। মুরাদনগর থেকে এসেছিল পিয়ন আমির হোসেন। মুরাদনগর আর  ইটনায় মিলাদ আর দোয়াদরুদ পড়ানো  হয়েছিল   স্থানীয় উদ্যোগে।  ওর কুলখানিতে যে অসংখ্য মানুষ হয়েছিল তা সাধারণত অনেক রাজনীতিবিদেরে কুলখানিতেও হয়না। তাই ভাবি, রাষ্ট্র ওকে কিছু না দিলেও মানুষ ওকে দিয়েছে। সবার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।

প্রচন্ড বন্ধুবৎসল এই মানুষটি সবাইকে বিশ্বাস করত। মানুষের মুখের কথাকে মনে করত মনের কথা। কেউ হয়ত বলত, ‘ভাই মনে করে আমার বাসায় আসবেন কিন্তু তাড়াতাড়ি একদিন।’ দিন কয়েক হলেই ও চলে যেত। বলত, কত করে যেতে বলে গেছে, কত দেরি হয়ে গেছে।’  ও সোজা চলে গেল তার বাসায়। যে বাসায় যেত সে  অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত। কারণ কথাটা তো সে মিন করে বলেনি, বলার জন্য বলেছে। এসব ব্যাপারে লতিফ কষ্ট পেত।

আমি অনেকবার লতিফকে এসব বোঝাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি, বৈষয়িকতার বালাই তাঁর মধ্যে ছিল না। সে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি । তারপর ভেবেছি ও বরং ওর মতো থাকুক। ওটাই ওর সৌন্দর্য।

ছোটভাই দুলালের মৃত্যু ওকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। দুলালকে বাঁচাবার জন্য ও বোম্বে পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। এরপর মায়ের ( আমার শাশুড়ি) মৃত্যু পরিবার অন্তপ্রাণ এই মানুষটিকে ভেঙে দুমড়ে দেয়।আমার বার বার অসুস্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকত।  সিগারেট খেত প্রচুর। অনেক চেষ্টা করেও সেটা ছাড়াতে পারিনি। ডায়াবিটিস বাসা বেধেছিল। ডাক্তার দেখানোর ব্যাপারে ছিল প্রচন্ড অনীহা। ওকে যে ডায়াবেটিস ভিতরে ভিতরে এতটা শেষ করে ফেলেছে বুঝিনি। ও নিজেও বোঝেনি। আমাকে বার বার বলত, ‘চিন্তা করোনা, ডায়াবিটিসে মানুষ মরে না, দীর্ঘজীবী হয়। আমি অনেক দিন বাঁচব। ‘ ২০১৪ সালের মে মাসের ১৩ তারিখ বৌদ্ধ পূর্নিমার দিন ওকে বারডেমে ভর্তি করি। জুনের ৯ তারিখে সব শেষ।

আজ সেই দিন।

আজ  যখন নিজের দিকে তাকাই মনে হয়, ও যদি আমার জীবনে না আসত এই আমি কি আজ আমি হতে পারতাম। আর আমাদের ছেলে পান্থ যে হলিউড থেকে মাস্টার্স করে এসেছে, অনেক নাম করেছে, মেয়ে পারিজাত যে ইউএসএআইডিতে কাজ করছে তারা কি এটা করতে পারত! আর এটাও ভাবি, আজ যদি লতিফ থাকত আমরা কত ভাল থাকতাম, কত ‍সুখে থাকতাম। লতিফ তো এসবের কিছুই দেখে যেতে পারল না।

একা একা দাড় বাইতে বাইতে মাঝে মাঝে হাঁফিয়ে উঠি । তখন মনে হয়, বিধাতার এ কেমন বিচার ভাল মানুষগুলো কেন শুধু শুধু আগে চলে যায় । আর ভারবাহী করে রেখে যায় অন্য একজনকে যে প্রতিনিয়ত তাঁকেই  স্মরণ করে দাড় বায় আর চোখের পানি ফেলে!

 

 

 

 

 

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts