গণমানুষের  মুক্তির জন্যে লড়েছিলেন সেই মহানায়ক

বহুবচনে ইংরেজি “পিপল“ শব্দের অর্থ সর্বসাধারণের কাছে   “জনগন“ বলেই প্রতিভাত হয়।“Government of the people , by the people , for the people গভার্ণমেন্ট অফ দি পিপল বাই দি পিপল ,ফর দি পিপল“, এই  বিখ্যাত  উক্তির জন্যে আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনকে  সারা পৃখিবীর মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।  সাধারণভাবে তা “জনগণের সরকার , জনগণের দ্বারা গঠিত সরকার  এবং জনগণের জন্য গঠিত সরকার“ বলেই বিদিত  ও ব্যাখ্যাত হয়ে থাকে।পাশ্চাত্য দুনিয়ায় এটাকেই গণতন্ত্রের সংজ্ঞা বলেও  চালিয়ে দেয়া হয়্। কিন্তু পুঁজিবাদী দেশে  ভাষান্তরে  এই আপ্ত বাক্যের  গূড়  অর্থ যে “বিত্তবানের জন্য সরকার, বিত্তবানের দ্বারা গঠিত  বিত্তবানের  সরকার“, সে কথা  যদি খোলাসা করে  বলা না হয় তাহলে সত্যের চরম অপলাপ   হবে। সোজাসাপ্টা ভাষায় “মিথ্যাচার বা ধোকাবাজি“ বললেও অত্যুক্তি হবে না।পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র  ভারতের বেলায়ও বিষয়টা  ভিন্নতর হওয়ার কোন অবকাশ নেই।শুধু ভারত,ইংলান্ড বা আমেরিকার কথাই  বলি কেন, কোন পুঁজিবাদী দেশেই অদ্যাবধি একবচনে “জনের“ সরকার তথা শোষিত দলিত  নিপীড়িত মানুষের  জন্য সরকার  গঠিত হয়নি। আর তেমনটি ঘটাও  কোন সহজ কাজ নয়।ভারতবর্ষের অভিজ্ঞানে “জন“ শব্দের তাৎপর্য ভিন্ন ব্যঞ্জনায় সমাহিত হয়েছে ঐতিহাসিক কারণে।বিস্মৃত অতীতের কোন এক সময় ভারতবর্ষ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার পাদপীঠ ছিল।উজ্জ্বল সে মানব সভ্যতা সৃজিত. লালিত বর্ধিত  ও বিকশিত হয়েছিল ভারত মায়ের কোলেই।ভারতবর্ষের মাটি ও জল হাওয়ায় বিকশিত হয়েছিল সৃজনশীল উৎপাদনমুখী জ্ঞান বিজ্ঞান মেধা সংস্কৃতি  ও ঈর্ষণীয়  সমৃদ্ধি।   সাগরতল ও ভূগর্ভে সঞ্চিত ছিল অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশ্বের অনুসন্ধিৎসু ভোগলিপ্সু  সকল সুজন -দুর্জনকেই চুম্বকের মত আকর্ষণ করেছিল সমৃদ্ধির সেই স্বর্ণচূড়া।পাহাড়পর্বত উল্লঙ্ঘন করে ঘোড়ায় চড়ে   আগ্রাসী হিংস্র হায়নার মত আবির্ভুত  হয়েছিল দুর্জন  আর্য উপনিবেশবাদীরা।তাদের সাথে ছিল ভোজন ও ভজনে মগ্ন বেদের স্তুতিকার পদ্যকার কবিরাও।তারা আগ্রাসন প্রতিরোধে পারঙ্গম  ভারতীয় বীরদের  “মানুষ ,মুনিষ ,মুনিষ্য“ প্রভৃতি নাম মুছে ফেলে  ‘অসুর ওরাক্ষস‘ নাম দিয়ে কলঙ্কিত করেছিল।উপনিবেশবাদীদের  বানিয়েছিল  দেবতা।স্তাবকদের  বানিয়েছিল উপাসক।বিজিত অনার্য বাস্তুচ্যূত সুন্দরী ললনাদের বানিয়েছিল  দেবদসী।হানাদার ও দখলদারদের  কাম লালসার  সর্বগ্রাসী  বিষাক্ত ছোবল  এবং তাদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলা প্রাচীন ভারতের  সার্বজনীন সভ্যতাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল।দৃশ্যমান ও স্মরিত  সর্বযুগে যেমন, বিস্মৃত সেই  অতীতেও  তেমনি, হানাদার ও দখলদার ঔপনিবেশিক শক্তি পূজ্য ধর্মকেই শোষণের হাতিয়ার বানিয়েছিল।পূজারিকে বানিয়েছিল দুষ্কর্মের দোসর।রামের দোসর যেমন সুগ্রীব! নতজানু ধর্মবেনিয়াদের বানিয়েছিল বল্লমের  ফলা।জননির্যাতনের  কুশিলব।ক্ষমতার অংশীদার , রক্ষক ও ভক্ষক ।   সর্বাত্মক ভোগ  -সম্ভোগও সার্বিক শোষণের দোসর।তাদের হিতকাঙক্ষী পেশীজীবী  আর এক তাঁবেদার ক্ষত্রীয় সম্প্রদায় নিয়োজিত হয়েছিল প্রতিরক্ষার  পেশায়।লুটেরা পুজি লগ্নির ভার পড়েছিল পদলেহী বৈশ্যশ্রেণীর ওপর।যারা প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তারা কিন্তু পদপিষ্ট হয়েও  নিশ্চিহ্ন হয়নি।তারা রক্তবীজ। তারাই শূদ্র।আসমুদ্র হিমাচল ভারতবর্ষের প্রতিটি অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মূল ভারতীয়  যারা আজও শূদ্র অস্পৃশ্য ও আদিবাসী বলে নিন্দিত, ধিকৃত, শোষিত, যারা ভারতবর্ষের উৎপাদক শ্রেণী, দলিতবহুজন ,তারাই  অর্থাৎ তাদের পিতৃপুরুষেরাই  গড়ে তুলেছিল উপমহাদেশের সুপ্রাচীন সুসভ্যতা।একাত্তরে বাংলাদেশ সৃষ্টিতেও তারা অসামান্য অবদান রেখেছে।‘হানাদার পাকিস্তানীরা  গণহত্যার  দাবানল ছড়িয়েও তাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে পারেনি বাংলার মাটি থেকে।সিন্ধু অঞ্চলের মহেঞ্জোদাড়ো  হরপ্পার  সভ্যতার জনক ছিল তখাকথিত  অসুর রক্ষসেরা। সেই সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই হানাদার আর্যদের  জারজ বংশ ধারায় যে ধর্মান্তরিত পশুশক্তির পুঞ্জিভবন ঘটেছিল তারাই বলবান করেছিল পাকিস্তান সেনবাহিনীকে ।বেলুচিস্তানের কসাই টিক্কা খানের সেনাপত্যে ১৯৭১ সালে  সেই পশু শক্তিকেই  লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল অনার্য বাঙালিদের নির্মূল করার জন্যে। বেলুচিস্তানে যারা উপনিরেশবাদী আর্য গোলামদের বশ্যতা স্বীকার করেনি   তাদের ঈদের জামাতে বোমা মেরে খতম করেছিল টিক্কা খান ।সিন্ধী, পাঞ্জাবী,পাঠান যারা শিশ্নে  শল্যপ্রক্রিয়া অতিবাহন করে, কলেমা পড়ে ,তরবারির সামনে  মাথা নত করে, জীবন রক্ষার্থ , ধর্মান্তরিত হয়েছিল, কিন্তু নব্য উপনিবেশবাদী   আর্য সামন্তবাদের বশ্যতা স্বীকার করেনি, তাদের কচুকাটা করা হয়েছিল।বুলেটে বুলেটে  বুক ঝাঝরা করে রক্তের নদীতৈ ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল।তাদের অবিসংবাদিত নেতা লালকোর্তা দলপতি খান আব্দুল গাফ্ফার খান, মুক্তিকামী পাঞ্জাবী, বেলুচ ও  জিয়েসিন্ধী নেতৃবৃন্দসহ  ভারতের দলিত বহুজন, হরিজন ও শূদ্রদের মুক্তির দিশারী মহাত্মা গান্ধীর পার্শচর হয়েছিলেন।সেই বীরজাতিগোষ্ঠী  ‘৪৬ এর ভোটাভুটিতেও জিন্নার পাকিস্তান প্রস্তাব বিপুল সংখ্যাধিক্যে প্রত্যাখান করেছিল।পাঞ্জাবের  প্রধানমন্ত্রী সেকেন্দার হায়াত খানও বৃটিশের মিত্র জিন্নাহর পাঞ্জাব বিভক্তিকরণ  প্রস্তাব নাকচ করেছিলেন।পাঞ্জাবের শিখরা অদ্যাবধি গোলামী মানেনি।দলনপীড়নে স্বর্ণ মন্দিরসহ গুরুদ্বারসমূহ রক্তস্নাত হয়েছে, তবুও।মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক পার্সী সুন্দরীর সাথে স্বল্পকালীন  বৈবাহিক  জীবনে    এক কন্যার পিতা হয়েছিলেন।সে লাবন্যময়ী  রমনী পিতৃধর্ম বরণ করেননি । তবে  পাকিস্তান সফর করে   পিতৃ -সম্পদ পরিদর্শন  করেছেন।কিন্তু পার্সী সম্প্রদায় কোনদিনই আর্য বশ্যতা স্বীকার করেনি।বাংলাদেশ সহ  ভারতবর্ষের  সকল অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সাওতাল  সম্প্রদায়ের মানুষ কখনই আর্য ধর্ম  আর্য সংষ্কৃতি ও পূজ্য দেব দেবীকে স্বীকার করেনি।বিজিত ভারতীয়দের প্রতি আগ্রাসী আর্যদের   ঘৃণা বিদ্বেষ এবং পক্ষপাতমূলক আচরণ প্রতিপক্ষে জন্ম দিয়েছিল  এক লাগাতার, ছেদহীন প্রতিরক্ষামূলক প্রতিবাদ এবং সংঘর্ষ।সুদূর অতীত থেকে আজ পর্যন্ত চলে আসা সেই বিদ্বেষাত্বক ভাবনা  আধুনিক ভারতীয় সমাজেও  জ্বলন্ত।এ প্রসঙ্গেএকটি ঘটনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।মি:ই .টি. ডালটন ১৮৬৬ খৃষ্টাব্দে ছোট  নাগপুরের কমিশনার ছিলেন। একদা সেখানকার সাওতাল অধ্যুষিত অঞ্চলে শুরু হয় প্রবল দুর্ভিক্ষ।কমিশনার ডলটন লিখেছেন, তিনি সেখানে  লঙ্গরের ব্যবস্থা করে ব্রাহ্হ্মণ পাচক নিযুক্ত করেন্।কয়েকদিন পরে অবাক বিস্ময়ে তিনি দেখলেন সাওতালদের কয়েকজন ,বামন পাচকের রান্না খাদ্য খেতে অস্বীকার করে অনাহারে প্রাণ দিয়েছে।সাওতালদের আলচিকি ভাষায় লেখা কবিতা ও গানে উল্লেখ আছে যে তাদের বড় বড় শহরে সাত নদীর পাড়ে  দেশ ছিল।পশ্চিম থেকে ঘোড়ায় চড়ে আসা শত্রুদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তারা বিভূইয়ে  চলে এসেছে।সাওতালরা আজও শরৎকালে  দূর্গা পুজার পুরোমাস ভিক্ষে করে কাটায়।শোকের মাস হিসাবে উদযাপন করে শিয়া মুসলমানদের মোহাররম মাসের মত।সারা মাস তারা এ কথা স্মরণ করে বুক চাপড়ে কাঁদে যে তাদের অসুর রাজা  দূর্গা দেবীর  হাতে নিহত হয়েছিল , পূর্বকালে।কৃষকের তেভাগা আন্দোলনে রাজশাহী নাচোলের  শাওতালরা শ্রীমতি ইলা মিত্রের নেতৃত্বে স্মরণীয় ত্যাগ স্বীকার করেছিল।পুলিশ হাজতে ইলা মিত্রের সাথে মুসলিশ লীগ সরকারের পুলিশ যে বর্বর আচরণ করে তা ইতিহাসকে লজ্জা দেয়।১৯৪৯সালে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে ইংরেজ পুলিশ সুপার মি:বিলের হুকুমে লকআপে  থাকা অবস্থায় তেভাগা আন্দোলনের নেতাদের ওপর  গুলি চালানো হয়।গুলিতে অন্যান্যের  সাথে নিহত হন  দিনাজপুরের কম্পরাম সিং।শেখ মুজিবুর রহমান খাপড়া ওয়ার্ড পরিদর্শণ করে  জেলহত্যায় গভীর ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ করেন।তিনি তেভাগা দাবীর সমর্থনে জোরালো বক্তব্য রাখেন।১৯৫৪ সালের ২১ দফায় তেভাগা মানার অঙ্গীকার ছিল।তেভাগা আন্দোলনে বৃটিশ শাসনের ভীত কেপে উঠেছিল।চাখারের একে ফজলুল হক ঋণ সালিশী বোর্ড করে ক্ষিপ্ত কৃষকের পুরাণো ঘায়ে মলমপট্টী না করলে যাওয়ার বেলায় পচা শামুকে বৃটিশ বেনিয়াদের পা কেটে খোড়া হওয়ার ভয় ছিল।ফজলুল হক “বঙ্গ শার্দুল বা বাংলার বাঘ “  না হয়ে শেরে বাংলা উপাধি নিয়ে বাঘডাশা হয়ে গেলেন।৫৪ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে অনেক নাটক করলেন।কিন্তু তেভাগার ব্যাপারে গা করলেন না।তেভাগা চালু হলে দরিদ্র কৃষক চাঙ্গা হতো এবং সামন্তবাদের গায়ে ফোসকা  পড়তো।৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে সারা দেশে সাওতাল সম্প্রদায় “যার যা আছে তাই নিয়ে“ প্রতিরোধ সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েছিল।নানা প্রতিকূলতায় , চিরন্তন বিশ্বাস ঘাতকতায় ও পাকিস্তানীদের “অপোরেশন সার্চ লাইটের“ মুখে বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশব্যাপী গণপ্রতিরোধ , গণাভ্যুত্থান ও সেনা ছাউনি অবরোধের কর্মসূচী বাস্তবায়িত হতে পারেনি।কিন্তু লক্ষ লক্ষ দলিত “জন“ও বহুজন কৃষক মজুর বৃহত্তর যশোর ও খুলনা, ফরিদপুর ও বরিশাল সংলগ্ন এলাকা থেকে উঠে এসে ২৬ ও ২৭ মার্চ যশোর সেনানিবাস অবরোধ করে রেখেছিল।সেই গণ অভ্যূত্থানের পুরোভাগে ছিল তীর-ধনুক-বল্লম  ঢাল কুড়াল হাতে সাওতাল সমম্প্রদায়ের লড়াকু নারী পুরুষ।ঢাকা চট্রগ্রাম রংপুর বগুড়ার সেনা ছাউনি গুলোকে ঘিরেও অনুরূপ অবরোধ গড়ে তোলার কথা ছিল।বাঙালি কয়েক শতাব্দী ব্যাপী লড়েছে স্বাধীনভাবে বাচার অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্যে।কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা ছায়ার মত পায়ে পায়ে হেটে স্বপ্নভঙ্গ ঘটিয়েছে।বিশ্বাসঘাতকতার সোনার পাল্কি চড়ে এসেছিল বখতিয়ার খিলজি।বাংলার শেষ স্বাধীন রাজা লক্ষ্মণ সেন অন্ধকার খিড়কিপথে সটকে পড়েছিলেন।অষ্টাদশ পাঠান অশ্বারোহির সামনে কেউ দাড়ায়নি।সিংহদ্বার দিয়ে নির্দ্বিধায় প্রবেশ করেছিল তারা।টিপু সুলতানের লাশ পড়েছিল দুর্গের বাইরে খোলা ময়দানে সাধারণ সৈনিকদের মৃতদেহের স্তুপের উপর।বিশ্বাসঘাতকতার বুলেটে ঝাজরা হয়েছির তাঁর বক্ষপিঞ্জর।ইংরেজ  বণিক কোম্পানির  কতিপয়    দর্পিত   কারণিকের   সামনে   মুর্শিদাবাদের ভারতীয় ক্ষত্রিয়দের হাতের তলোয়ার খসে পড়েছিল বিশ্বাসঘাতকতার অশনি  আঘাতে।বিশ্বাসঘাতকতা ভিন্ন ভারতবর্ষের কখনও পরাজয় ঘটেনি।সম্রাট বাবরকে ডেকে এনেছিল ভারতবর্ষের এক হিন্দু রাজা।ভারতবর্ষ আক্রমনের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বিদেশী মুঘলকে এক ভারতীয় নায়ক।১৮৫৩ সালে  লেখা চিঠিতে কার্লমার্কস স্পষ্টই বলেছিলেন,“ভারতবর্ষের ইতিহাস সম্পর্কে আমরা যতই অজ্ঞ হই না কেন , এ সত্যটা তো আমাদের নাকের ডগায় ঠেকে আছে যে ইংরেজ রাজ্ত্বকে এখনও টিকিয়ে রেখেছে ভারতবাসীর অর্থে লালিত ভারতীয় সেনা বাহিনী।একই কারণে ভারতবর্ষ বার বার বিজিত হওয়ার দুর্ভাগ্য এড়াতে পারেনি।ভারতবর্ষেল অতীত ইতিহাস তাই কেবল বার বার বিজিত হওয়ারই ইতিহাস“।

র্ধ্বংসের পূর্বাহ্নে সিন্ধু অঞ্চলের মানুষেরা তাদের অনন্যসাধারণ উন্নত সভ্যতা নিয়ে একেবারে ভিন্ন ও বিপরীত ধারা ও বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়েছিল।বিজয়ীরা এমনই বর্বর ও বিপরীত চরিত্রের ছিল যে সেই  সভ্যতার তারা কোন সমাদরই  করেনি।কেবল ধ্বংস করেছে।সোম সুরা, গো-ধণ,মনিমুক্তা দাসদাসী ছাড়া অন্য কিছুতেই তাদের বিশেষ  আগ্রহ দেখা দেয়নি।দুর্বিনীত  দুর্জয় মানুষকে যুদ্ধে হারিয়ে দাস বানিয়েছে তারা ।নারী ধন  কন্যা জায়া জননী, অস্ত্র  অলঙ্কার মনিমুক্তা আর ধনসম্পদ কেড়ে নিয়েছে।

লুটেরা যাযাবর আর্যদের উত্তর পুরুষ  সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ   ভারতবর্ষকে  শোষিত আঁখের ছোবড়া বানিয়ে দেশে ফিরেছিল ১৯৪৭ সালে।সেই  মহাপ্রস্থানের  আগে তারা , রাষ্ট্র ক্ষমতার   মূলো দিয়ে, একদা “হিন্দু মুসলিম ঐক্যের  অগ্রদূত“ নামে খ্যাত,   মহিয়সী নারী সরোজিনী নাইডু কর্তৃক নন্দিত সুবেশধারি সুপুরুষ ও  বিদূষী   ভারত কন্যা বিজয়লক্ষী পন্ডিতের প্রেমাসক্ত মোহাম্দ আলী জিন্নাহ সহ অনেকের ঈমান কিনে নিয়েছিল উচ্চমূল্যে।সমাজপতি উচ্চবর্ন ব্রাষ্মণ ও দলিত শূদ্রদের মধ্যকার তিনহাজার বছরের ঘৃণাবিদ্বেষের হোমাগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল।হিন্দু- মুসলমান সম্প্রীতির অন্ন ব্যাঞ্জনে  নিম করল্লার রস ঢেলে দিয়েছিল  প্রাক্তন সেক্যুলার হিরো জিন্নার  হাত দিয়েই।  প্রথম হাটে বিক্রি হয়েছিলেন  নবাব খাজা সলিমুল্লাহ, স্যার মোহাম্মদ ইকবাল এবং মওলানা  শওকত আলী মোহাম্মদ আলী সহ অনেক আলেম ওলেমা ।

অনেক দরদস্তুর ও দরকষাকষির পর, অবশেষে মওলানা মওদুদীও মধুচন্দ্রিমার     মোহরাণা কবুল করেছিলেন।ভারত বিভক্তির বিরোধিতায় অনড় জামায়াতে ওলেমায়ে হিন্দের সখ্য ত্যাগ করে মওদুদী প্রতিষ্ঠা করলেন জামায়েতে ইসলামী  পাকিস্তান।কাদিয়ানি মুসলমানরা ৫০ সালেই গণহত্যায় প্রাণ দিয়ে তার মাশুল দিল।বিচারে তার মৃত্যুদন্ড হলো।রিমোট কন্ট্রোলে সৌদি ওহাবী সরকার তাকে বাঁচিয়ে দিল। মওদুদীর সাঙ্গাত গোলাম আজম পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতের কর্ণধার হলেন।একাত্তরের হত্যা ধর্ষণেরও সর্দার! পাকি জামায়েত মিশরের অধ্যাপক সাঈদ আল   কুতুবের নেতৃত্ত্বাধীন  মুসলিম ব্রাদারহুডের ভ্রাতৃ সংগঠনে পরিণত হলো।সৌদি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাঈদ কুতুব মার্কিণ স্কলারশীপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামের ইতিহাসের ওপর গবেষণা করলেন দুবছর।মিশরে ফিরে তিনি এলেম দিলেন ঘনিষ্ট শিষ্য   আইমান জওয়াহেরি ও তার বন্ধু  ওসামা বিন লাদেনকে।তারা প্রতিষ্ঠা করলেন আলকায়দা সংগঠন।তারই ধারাবাহিকতায় ক্রমান্বয়ে  প্রতিষ্ঠা পেয়েছে আবুবকর আল  বোগদাদীর নেতৃত্বে জঙ্গীবাদের শীর্ষ সংগঠন আইসিস।এই তথ্য বিশ্লেষণ করলে বিশ্ব সন্ত্রাসের  শিকড় খুজে পেতে তেমন কষ্ট হয়না।খুব বেশিদিনের কথা না যখন প্রাচ্য প্রতীচ্যে বিস্তৃত  বৃটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না।সেই রমরমা যৌবনকালে ব্রিটিশ টপ এজেন্ট “হামফের “ এর পাতা কৌশলে পাঁচ হাজার পাউন্ড ভাতা নিয়ে  ওহাবী ইসলাম কায়েম করলেন  জনৈক আব্দুল ওহাব।। সাবেক সৌদি রাজাকে সরিয়ে উক্ত আব্দুল ওহাব বৃটিশ মদদে  স্বয়ং  সিংহাসনে বসে নতুন সৌদি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করলেন।প্রথম মহাযুদ্ধের পরিনামে ১৯২৩ সালে তুরষ্ক ভিত্তিক খেলাফত তথা অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হয়। তার  পরেই ধূর্ত বৃটিশ মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ লুন্ঠনের রূপকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করে।১৯১২ সালে বৃটিশ নৌবাহিনীর  কয়লাচালিত জাহাজগুলোতে তেলের ইঞ্জিন বসানো হলো।তখন থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সামাজ্যবাদী তেল অনুসন্ধানও ব্যাপক গতি পেলো।১৭৫৭ সালে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডয়া কোম্পানি বাংলার নবাব সিরাজের সিংহাসন দখল করে ভারতবর্ষ দখলের পায়তারা শুরু করলো।আর সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিই বাসরা বন্দরেও  একটা কারখানা স্থাপন করলো ১৭৬৩ সালে।সামরিক ও বানিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় সর্ব প্রথম বৃটিশ এভাবেই মেসোপটেমিয়া তথা ইরাকের মাটিতে পদার্পণ করেছিল।উনবিংশ  শতাব্দির প্রারম্ভেই বৃটিশের তেলের ক্ষুধাটা  দারুন বেড়ে গেলো।১৯০৮ সালে পারস্যের ‘মসজিদ-ই- সোলেমানে‘ সর্বপ্রথম তেলের দেথা মেলে।গোটা অঞ্চলে তেল প্রাপ্তির সম্ভাবনাও তখনই উজ্জল হয়ে উঠেছিল।প্রথম মহাযুদ্ধের পরিনামে বৃটিশের কয়লা ঘাটতি শুরু হয়।রণতরী চলা শুরু হয় তেল দিয়ে।তখনই সাম্রাব্যবাদী বৃটিশ ঈগল চোখে তেল অনুসন্ধান শুরু করে।ইরাক পারস্য সহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ খামচে ধরার গল্পটাও তখনই শুরু হলো।সাম্রজ্যবাদী  বৃটিশ আর্য রক্তেরই উত্তরসূরী।উত্তর আমেরিকা ও অষ্ট্রেলিয়াতেও উপনিবেশ পোক্ত করতে অভিবাসিত হয় আরিশ ও বৃটিশ আর্যরাই।

আচার্য   সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন ,যারা ধর্ম ও স্বজাতি প্রীতির সঙ্গে ইতিহাসকে মিশিয়ে ফেলেন তারা ছাড়া সবাই এখন মানেন যে  আর্যরা ভারতের বাইরে থেকে এসেছিল।“দি মহাভারত“শীর্ষক প্রবন্ধে স্বামী বিবেকান্ন্দ লিখেছেন,আর্যরা খন্ড খন্ড গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে ভারতে এসেছিল।কালক্রমে প্রবৃদ্ধ হয়ে তারা ভারতবর্ষকে গিলে ফেলে অপ্রতিদ্বন্দী সর্বে সর্বা হয়ে বসে।১৮৮১ সালে ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র “অনার্য“ শীর্ষক নিবন্ধে  লেখেন ,“ আর্যরা উত্তর পশ্চিম হইতে ভারতবর্ষে আসিয়াছেন।তাহা হইলে তাহাদিগকে প্রথমে সপ্তসিন্ধু শোভিত পাঞ্জাব প্রদেশে প্রবেশ করিতে হইয়াছিল।…“অতএব আর্যরা দেশান্তর হইতে ভারতবর্ষে আসিয়াছিলেন“

সুউন্নত সভ্যতার পীঠভূমি  ভারতবর্ষ আক্রান্ত হয়েছিল  বিদেশী  বর্বর জাতির দ্বারা।ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমানাদি একথা অত্যন্ত জোরের সঙ্গে  এবং নিশ্চিতভাবেই প্রমান করে যে সেই বর্বর আর্যরা ১৬০০-১৫০০ খৃষ্ট পূর্বাব্দের মধ্যে কোন এক সময় ভারতবর্ষ আক্রমন করেছিল।(সূত্র:ডিডি  কোশাম্বী:এন ইন্ট্রোডাকশন টু দি স্টাডি অফ ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি, পৃ-৬৩)“বিশ্বের বুকে আর্যরা সর্বপ্রথম উপনিবেশ স্থাপন করলো ভারতবর্ষে।ভারতীয়দের মাথার ওপর বসে বিদেশী আর্যরা ভারতবর্ষের বিপুল  বহুজনের উপর রাজত্ব করেছে, সেই দিন থেকে“(জওহরলাল নেহেরু:ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া,পৃ-৭৩-৭৪)ব্রিটিশের ভারত শাসনের ১৯০ বছর পরাভূত ভারতবাসীর   অশ্রুরক্তে ভেজা পরাজয় গ্লানির শেষ গল্প হতে পারতো।যদি  দলিতদের সংখ্যাধিক্যে  ভীত  ক্ষমতালিপ্সু  নেতাদের স্বার্থান্ধতার  কারণে ভারতের স্বাধীনতার আপোষ কাহিনীটার ক্রমস্ফীতি না ঘটতো। লাখে লাখে ভারতবাসীর  ভ্রাতৃঘাতী সহিংসতায় প্রাণ হারানোর বিয়োগ গাথাটা সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশের টপ এজেন্টদের পূর্ব পরিকল্পিত  নাটকের রক্তভেজা পান্ডুলিপি। ভারতবাসী  স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে  মরার সুযোগ পায়নি।বাঙালিরাই ভারতবর্ষের একমাত্র জাতিগোষ্ঠী যারা অকাতরে ৩০ লক্ষ প্রাণ বিসর্জণ দিয়েছে , ৫ লক্ষসম নারীর সম্ভ্রম দিয়েছে স্বাধীনতার জন্য। তিন লক্ষাধিক দুর্বিনীত ‘অনার্য নারী পুরুষ , ছাত্র শিক্ষক , কৃষক শ্রমিক ,  শূদ্র আদিবাসী ও দলিত বহুজন রণাঙ্গণে বীরদর্পে লড়াই করে ধর্মান্তরিত নব্য উপনিবেশবাদী আর্য হানাদারদের পরাজিত করে   স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে।গুড়িয়ে দিয়েছে বাংলার মাটিতে বহিরাগত আর্যবর্গীদের  শেষ ঘাটি।বাঙালি বহুকাল ঘুমিয়েছিল।বাংলার শেষ  স্বাধীণ রাজা লক্ষণ সেন অষ্টাদশ অশ্বারোহীর  ভয়ে খিড়কিপথে    দ্রুত পালিয়ে বাঙালির ললাটে জ্বলন্ত কয়লা  দিয়ে “কাপুরুষ“ শব্দটা খোদাই করে দিয়েছিলেন। মাষ্টারদা সূর্যসেন শুরু করলেন।নেতাজী সুভাষ বসু উজানে গুন টানলেন।হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অনেক সাধনায় সেই কলঙ্ক তিলক মুছে  দিয়ে বীর বঙালির জন্ম দিয়েছেন।কিন্তু বিশ্বাসঘাতকের বংশ লোপ করতে পারেননি।

বঙ্গবন্ধুই ভারতবর্ষের একমাত্র সফল বিপ্লবী ও আপোষহীন  অগ্নিপুরুষ  যিনি বিশ্বাসঘাতকতায় জর্জরিত বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন  হতাশার  গাড় অন্ধকার  শর শয্যা থেকে।৪হাজার ৬শ’ ৮২ দিন   কারাবাসে অর্জিত অভিজ্ঞান নিয়ে ৭ মার্চ ঘোষণা করেছিলেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার  সংগ্রাম“।জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  সেক্যুলার রাষ্ট্রে  শোষিতের গণতন্ত্র কায়েম করতে  চেয়েছিলেন। কৃষকের তেভাগা  দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে কৃষক সমবায় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন।  হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি  শেখ মুজিব বাংলার শোষিত মানুষের  মুক্তি চেয়েছিলেন।দু:খী মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে চেয়েছিলেন।গণমানুষের    মুক্তির   জন্যে লড়েছিলেন  বাংলার সেই  মহানায়ক। জাতির  জনকের স্বপ্ন সফল হোক।দলিত ‘জনের‘ জয় হোক! শোষিত বহুজনের জয়  হোক বাংলার মাটিতে!

 

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts