গল্প নয়, সত্যি

প্রতিদিন যার কলিংবেলে ঘুম ভাঙে তার নাম হাসনা আমাদের খন্ডকালীন গৃহকর্মী বয়স চল্লিশের উপরে হবে চলাফেরা, কথাবার্তা খুব ভদ্র গোছের শান্ত মেজাজের মানুষ অভাবের তাড়নায় গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এসেছে মাস তিনেক হলো সকালে এত ব্যস্ততা থাকে যে, এখনো পর্যন্ত হাসনার অনেক কিছুই জানা হয়ে ওঠেনি কিন্তু আজ সকালে দরজা খুলেই ওর বিমর্ষ্ চেহারাটা চোখে পড়ার মত ছিল তারপরও কিছু জিজ্ঞেস করিনি দুজনই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে সাড়ে আটটা পর্যন্ত হাসনা আমার সহযোগিতা করে মোটামুটি কাজগুলো শেষ হলে ভাত খেতে বসে আর আমি গোসলে ঢুকি আমি গোসল করে বের হলেই দ্রুত চলে যায় পরবর্তী বাসার উদ্দেশ্যে

আজ সকালে গোসল সেরে বেরিয়ে দেখি হাসনা খুব বিমর্ষভাবে আস্তে আস্তে ভাত খাচ্ছে বললাম, কি হয়েছে হাসনা ? খেতে দেরি করছো কেন ? শরীর খারাপ ?

কান্না ভেজা কন্ঠে বললো, ‘আইজ রাইতে একটা খারাপ স্বপ্ন দেখছি খালাম্মা, আমার কিছু বালা লাগছে না।’ জানতে চাইলাম স্বপ্নে কি দেখেছে বললো, ‘খালাম্মা প্যাডের দায়ে দেশের বাড়ীত যা আছিল, হগল বেইচ্যা ঢাহায় আইছি, হাস,মুরগী, গরু, ছাগল আমার যে গরুডা আছিল, ওর নাম আছিল কালু । ছোট থেইহ্যা ফাইল্যা বড় হরছি কালু আমার একটা বেডার লাহান আছিল, ঝড় তুফান, বন্যা কত কষ্টের দিনে আমি কালুরে পালছি এই ঢাহায় আওনের সাতদিন আগে কালুরে আডে নিয়া বিক্রি হরি যেদিন আডে নিব, হেইদিন কালু আর খাওনে মুখ দেয় না, আমারও কইলজাডা ফুরে আডে যাওনের লাইগ্যা যহন ওরে লইয়া যায়, কালুর দুই চোখ দিয়া দর দর কইরা পানি ফরে কালুও কান্দে, আমিও কান্দি
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘কি আর করা বল তো আজকে কি হলো তোমার ?’ আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বললো, ‘আইজকা বিয়ান রাইতে স্বপ্নে দেহি, আমার কালু পানিত পইরা গেছে পুহুর পাড়ে একটা গাছের লগে বান্দা আছিল, এক ব্যাডায় কালুরে দাওয়া দিলে, কালু পুহুরে পইরা যায় দেহি গলার দড়িডায় কালুর ফাঁস লাইগ্যা গেছে, আমি পুহুরে জাফাইয়া পইরা যেন ওর গলা থোন রশিডা খুইলা দিলাম আমার কালু না যেন কার ঘরে কেমুন আছে’ বলে আবার কান্না শুরু করে  
একটা কাঠের পিড়িতে বসে ভাত খাচ্ছিল হাসনা ডাইনিং টেবিলে গালে হাত দিয়ে বসে মিনিট পাঁচেক ধরে শুনছিলাম ওর কথাগুলো। হাসনাকে সান্ত্বনা দিলাম, ‘যাক তুমিতো ভালই দেখেছ, তুমি ওর ফাঁসির দড়ি খুলে দিয়েছো, তাইনা ? মন খারাপ করোনা, তোমার কালু ভালই আছে ।’

সারাটা দিন থেকে থেকে ঘটনাটা মনে আসছে, কিছুতেই বের হতে পারছি না থেকে। মনে হলো কতদিন পর যেন একজন মানুষকে দেখলাম, যে পারে স্বার্থহীনভাবে ভালবাসতে মানুষের শুদ্ধ চেহারাটা এখনো আছে , এখানে সেখানে, আনাচেকানাচে। শুধু আমাদের দৃষ্টি যাচ্ছে নষ্ট হয়ে আমরা অনেক কিছুই দেখতে পাই না

 

আফরোজা বুলবুল

 

 

 

 

 

Author: আফরোজা বুলবুল

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts